১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

রাজনীতি সাধুকরণে গলদ: ‘কী দেখার কথা, কী দেখছি’

যেখানে ন্যায্য অধিকার হারিয়ে যায়, সেখানে ছোট ঘটনাও বড় ফ্যাসিবাদের বীজ বপন করে।

রাজনীতি সাধুকরণে গলদ: ‘কী দেখার কথা, কী দেখছি’
হবু রাজা আর তার গবু মন্ত্রীর গল্প আজও শিখিয়ে যাচ্ছে—রাজনীতি শুধু ঝাঁটা দিয়ে ধুলো ঝাড়া নয়। ছবি: এআই

সালেহ উদ্দিন আহমদ সালেহ উদ্দিন আহমদ

Published : 03 Jun 2026, 02:59 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:17 PM

বর্তমান সরকার সংস্কার ও সনদ নিয়ে দেশে-বিদেশে এমন একটা প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে, যেন এই সনদ গৃহীত হলে আমাদের রাজনীতি একদম পরিশোধিত হয়ে যাবে এবং দেশে ফ্যাসিবাদের কোনো নাম-নিশানাও থাকবে না। পরে আর কোনো সরকারই ফ্যাসিবাদে পরিণত হতে পারবে না। রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সুর মিলিয়ে যাচ্ছে সংস্কার ও সনদের ব্যাপারে। প্রয়োজনে বিরোধিতাও করছে।

কিন্তু এক বড় ফ্যাসিবাদকে দূর করতে গিয়ে, তারা আরও কত কত ছোট ও মাঝারি ফ্যাসিবাদকে যে প্রশ্রয় দিচ্ছে, তা নিয়ে কথা বলতে গেলেই 'ফ্যাসিবাদের দোসর' বলে সরকারের শুভার্থী ও তথ্য কৌশলীরা তেড়ে আসছেন।

সমস্যা তাড়াতে গিয়ে আরও সমস্যা তৈরির এক চমৎকার উদাহরণ হতে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতাটি। রাজা হবু দারুণ নাখোশ, ঘর থেকে বের হলেই চরণে ধুলা লাগে—‘মলিন ধুলা লাগিবে কেন পায়?’ মন্ত্রী গোবুরায়কে ডেকে নির্দেশ দিলেন এই সমস্যার সমাধান করতে। মন্ত্রীর আদেশে সাড়ে সাত লক্ষ ঝাঁটা কেনা হলো। ঝাড়ুদাররা ঝাড়ু দিতে লেগে গেলেন—দেশ থেকে ঝেঁটিয়ে তাড়াতে হবে সব ধুলা। পরিণাম হলো, ধুলায় ধুলোময় হলো পুরো রাজ্য—‘ধুলার মেঘে পড়িল ঢাকা সূর্য’।

নব্য ফ্যাসিবাদ

ফ্যাসিবাদের কেতাবি ব্যাখ্যা শুরু হয়েছিল হিটলার ও মুসোলিনির শাসন থেকে—যেখানে একজন স্বৈরশাসকের দ্বারা শাসিত সরকার জনগণের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। ক্রমাগত এর অর্থ আরও বিস্তৃত হয়েছে। ফ্যাসিবাদকে এখন ধরা হয় সমাজে মানুষের ওপর যে কোনো কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাকে।

আমাদের দেশে বর্তমানে যে নতুন ফ্যাসিবাদের ঘটনাগুলো হচ্ছে, তা বারবার বলতে ও পড়তে কারও জন্য সুখকর হচ্ছে না নিশ্চয়ই। আমরা প্রতিদিনই পড়ছি পত্রিকার পাতায় এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে। প্রতিবারই নতুন পদ্ধতিতে নতুন ফ্যাসিবাদের উদ্ভব হচ্ছে। অনেকে আবার বলবেন, “এই তো মাত্র কিছু ঘটনা। শেখ হাসিনার আমলে ছিল এটা, ফ্যাসিবাদকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছিল।” একদম খাঁটি কথা। তবে এখন যারা করছেন, তাদের অনেকের পেছনে আছে বড় প্রতিষ্ঠান। কিছু ক্ষেত্রে নাম জানা যায়। কিছু ক্ষেত্রে আসল হোতারা আড়ালেই থেকে যায়, তাদের লেলিয়ে দেওয়া অ্যাক্টিভিস্টরা টেস্ট কেইস পরিচালনা করে।

ফ্যাসিবাদের অনেক মুখ ও মুখোশ আছে। তার কিছু হলো—

১. কিছু লোক নিজেদের ইচ্ছা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয় জোর করে।

২. বিভিন্ন অজুহাতে অন্যদের অধিকার হরণ করা; সেটা ব্যক্তিগত অধিকার বা রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় অধিকার হতে পারে।

৩. ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে মিশিয়ে অন্যদের মানসিকভাবে পরাভূত করা, যাকে বলা যায় রাজনীতির সুগারকোট। আমাদের ধর্মকে ব্যবহার করে কত দল যে রাজনীতির বড়ি বিক্রি করছে!

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ফ্যাসিবাদের দ্বিতীয়টি মুখ ও মুখোশটি সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছিল; আওয়ামী লীগারদের বাইরে কারও কোনো অধিকার ছিল না। ৫ অগাস্ট ওই শাসনামল থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছে।

তবে ৫ অগাস্টের পর থেকে আমরা সমাজে তৃতীয় প্রকারের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের উত্থান দেখতে পাচ্ছি। মূল পার্থক্য হলো—আগের সময়ে ফ্যাসিবাদ একক নিয়ন্ত্রণে বিস্তার লাভ করেছিল, আর আজকের ফ্যাসিবাদ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণের জালে ছড়িয়ে পড়ছে। একবার এমন অবস্থা গেড়ে বসলে তা দূর করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।

যে নতুন ফ্যাসিবাদ আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে জন্ম নিচ্ছে, এখন থেকে সামাল না দিতে পারলে তা মহীরূহ হয়ে গ্রাস করবে আমাদের রাজনীতি, সরকার ও দেশকে। যাদেরকে সরকার কেন প্রশ্রয় দিচ্ছে, তা নিয়ে নানান মত আছে। তার কিছু এখানে তুলে ধরছি—

১. সরকার তাদের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় আছে।

২. পুলিশ বাহিনীর সামর্থ্য নেই তাদের রুখবার।

৩. সরকারের লোকেরা এত বড় বড় কাজে ব্যস্ত যে এত ছোটোখাটো অসঙ্গতি ও গোলমাল নিয়ে মনোনিবেশ করার সময় নেই তাদের।

৪. সরকার সমস্ত সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করছে আওয়ামী লীগকে দমন করতে; বাড়তি কিছু করার ‘ব্যান্ডউইথ’ বা সামর্থ্য নেই।

৫. সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোয়ালিশন করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখছে। তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে, এই কোয়ালিশন ভেঙে যাবে।

এগুলো হয়তো আংশিক সত্য, কিন্তু মিথ্যা নয় যে—এই দুর্বিচারগুলো আমাদের সমাজ এবং অর্থনৈতিক মানকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করছে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ পরিপক্ক হতে ১৫ বছর সময় নিয়েছিল। এখন প্রশ্ন হল, আমরা কি নতুন করে ফ্যাসিবাদকে বিকশিত হতে দেব এবং আবারও ১৫ বছর লালন করে তার পরিপক্কতা দেখতে চাইব?

মানুষের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙার যে একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, এটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য সামনে আরও বিস্তার লাভ করবে। 'বিক্ষুব্ধ জনতা', 'তৌহিদী জনতা', 'ফ্যাসিবাদ বিরোধী জনতা' বিভিন্ন নামে বাড়ি ভাঙা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই, নব্য ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা। চিন্তা করে দেখুন, এই গোষ্ঠীগুলো তাদের মুরুব্বিদের হাত ধরে যদি কখনো ক্ষমতায় আসে, তাহলে দেশের কী হবে?

জোর করে অন্যের চুল কাটা, পোশাক নিয়ে নিজের পছন্দ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, কোন সংগীত আমরা শুনতে পারব না, কোন বই পড়তে পারব না, নির্ধারণ করে দেওয়ার চেষ্টা—সবই ফ্যাসিবাদের অঙ্গ। বই-পুরস্কার লাইব্রেরির ওপর যে হামলা হয়েছে, সেটা আফগানিস্তানের পর্যায়ে গড়াতে পারে—সরকার নির্ধারণ করবে জনগণ কোন বই পড়বে। আফগানিস্তানে ইতোমধ্যে অনেক উদারনৈতিক বিষয় এবং ভিন্ন মতের ওপর লেখা বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং লাইব্রেরি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে; এর মধ্যে মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর বইও রয়েছে। কেউ মওদুদীর দল বা ধর্মীয় দর্শনকে পছন্দ করুক বা না করুক, তার বই পড়ার অধিকার সবার থাকা উচিত। বাংলার মাটিতে চলছে বাউল, গজল ও কাওয়ালি—এইসব জোর করে বন্ধ করার ফ্যাসিবাদী চক্রান্ত; এইসব রুখবে কে?

এক দৈনিকের প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ৫ অগাস্ট ২০২৪-এর পর জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত ছয় মাসেই কেবল ৮০টি মাজার ভাঙচুর হয়েছে। মাজার কেন ভাঙছে এবং এর পেছনে উদ্দেশ্য কী—আমাদের সরকার কি জানে?

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

নতুন দুর্বিচার শুধু সরকারই কি প্রশ্রয় দিচ্ছে? আমাদের রাজনৈতিক নেতারা যারা সংস্কার ও সনদকে আরও পাকাপোক্ত করার জন্য নিজেদের ৩১ দফা, ৭ দফা ইত্যাদি তার সঙ্গে যোগ করেছেন, তারা কী করছেন?

রাজনৈতিক দুর্বিচার কীভাবে ডালপালা গজিয়ে বড় ফ্যাসিবাদে রূপ নিতে পারে, সেটার উদাহরণ দেওয়ার কি প্রয়োজন আছে—শেখ হাসিনার ১৫ বছরে কি আমরা দেখিনি? ক্ষমতায় যাওয়ার আগে থেকেই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে। তার নমুনা হলো চাঁদাবাজদের বিস্তার, অন্যের সম্পদ জোর করে দখল, টেন্ডারবাজি, সাংবাদিকদেরকে হুমকি, সরকারের কাজে বাধা সৃষ্টি করা ইত্যাদি। এখন সবই ফ্যাসিবাদের বীজ বপন করছে; দল ক্ষমতায় গেলে গাছ ও ফল আরও বাড়বে।

ছোট্ট একটা সাম্প্রতিক ঘটনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলে শিবিরের ওই হল শাখার সভাপতি নিয়ামত উল্লাহ ওরফে আবরার ফারাবীকে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই ফারাবী গত বছর ৫ অগাস্টের আগপর্যন্ত ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন কাগজে। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দিতেন প্রশংসামূলক পোস্ট। জামায়াত-শিবিরের সমালোচনাও করতেন। আরবি বিভাগের স্নাতকোত্তর এই শিক্ষার্থী এখন ওই হল সংসদের ভিপি প্রার্থী হয়েছেন। তাকে হলে আসন দিতে গিয়ে আরেকজন ছাত্রকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে হয়েছে; খুবই ছোট ঘটনা। ফারাবী ভিপি হলে, সামনে হয়তো এটাই বড় ঘটনা হবে, সেই হলে আরও ১০০ জন ছাত্র বঞ্চিত হবে। তারপর একই বঞ্চনার অনুকরণ শুরু হবে অন্য হলগুলোতে। এইভাবে ফ্যাসিবাদ বিস্তার লাভ করে।

৫ অগাস্টের পর রাজনীতিবিদদের দুর্বৃত্তায়নের সবচেয়ে বড় উদাহরণ সিলেটের সাদা পাথর চুরি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির তিন নেতার বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর একজন বড় নেতার ছোট ভাই। আর যায় কোথায়? তিন দলই দুদকের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগল—‘দুদক ভুল রিপোর্ট করেছে’। কেউ জিজ্ঞেস করল না, আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতার দুর্নীতি নিয়ে দুদক এত ভালো রিপোর্ট করল; সব দলের রাজনীতিবিদেরা কত বাহ্ বাহ্ দিলেন দুদককে। শুধু সিলেটের সাদা পাথর নিয়ে ওরা কেন এত খারাপ রিপোর্ট করল? পুরো ব্যাপারটা কার্পেটের নিচে ধামাচাপা পড়ে গেল—চরম দুর্বৃত্তায়ন! সব দেখে, একটা দৈনিকের পাতায় একজন পাঠক হায়দারের জনপ্রিয় একটি গান উদ্ধৃত করে লিখেছেন, “কী দেখার কথা, কী দেখছি, কী শোনার কথা, কী শুনছি?”

আমাদের রাজনীতির সাধুকরণ এই পর্যন্তই—যে লাউ, সে কদু! সাধুকরণের পুরো স্কিমটাতেই গলদ, দুর্জনদের প্রশ্রয় না দেওয়ার সনদ কখন হবে?

সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক