Published : 22 Jun 2025, 01:46 PM
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এখন লেখাপড়ায় বেশি সফল। একসময় শিক্ষাক্ষেত্রে ছেলেদের আধিপত্য ছিল বেশি, কিন্তু গত দুই দশকে এই চিত্র আমূল বদলে গেছে। আজ মেয়েরা ওই জায়গায় এগিয়ে যাচ্ছে দৃঢ়ভাবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, মেয়েরা কেবল পরীক্ষায় ভালো করছে না, তারা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, সরকারি চাকরির নিয়োগ এবং গবেষণাক্ষেত্রেও নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ছেলেদের সাফল্যের গতি অনেকটা থমকে গেছে। তারা পিছিয়ে পড়ছে কেবল পরীক্ষার ফলাফলেই নয়, শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, মনোযোগ এবং আত্মউন্নয়নের প্রবণতায়ও। এই বাস্তবতা একদিকে মেয়েদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও তাদের এগিয়ে যাওয়ার সাহসকে তুলে ধরছে, অন্যদিকে ছেলেদের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—ছেলেরা কেন পিছিয়ে পড়ছে? আমরা কি অজান্তে কোনো শ্রেণিকে অবহেলা করছি? নাকি তারা সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াই এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত দশকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় মেয়েদের জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার ছেলেদের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ৫৫-৬০% মেয়ে এবং ৪০-৪৫% ছেলে। মেডিকেল কলেজে ভর্তি শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬০% এখন মেয়ে। বুয়েটের মতো প্রতিযোগিতামূলক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েও মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিসিএস পরীক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ও উত্তীর্ণ হওয়ার হারও আগের তুলনায় অনেক বেশি, এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা মেধাতালিকায় শীর্ষস্থান অধিকার করছে। ইউনেসকোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ছেলেদের ড্রপআউট হার মেয়েদের তুলনায় দ্বিগুণ। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে, বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে, যেখানে মেয়েরা অগ্রগামী।
তবে এই অগ্রগতি শুধু মেয়েদের সাফল্যের গল্প নয়; এর পেছনে ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার এক করুণ বাস্তবতাও রয়েছে। এই পিছিয়ে পড়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং একাধিক কারণের ফল।
প্রথমত, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মনোযোগের অভাব—বর্তমান প্রজন্মের ছেলেরা স্মার্টফোন, গেমিং এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি অস্বাভাবিকভাবে আসক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন কিশোর ছেলে দিনে গড়ে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় কাটায়, যেখানে মেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি সময় পড়ালেখায় ব্যয় করে। ভিডিও গেম, ইউটিউব ভিডিও, টিকটক, ফেইসবুকের লাইভ ভিডিও এবং অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং—এসবই তাদের মনোযোগ নষ্ট করছে এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ ছেলেদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি। অনেক পরিবারে ছেলে সন্তানদের উপার্জনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে শিক্ষার চেয়ে তাদের দ্রুত আয়-রোজগারে পাঠানোর প্রবণতা দেখা যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা হিসেবে শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও, ছেলেদের ক্ষেত্রে ওই মানসিকতা কাজ করে না। পরিবার অনেক সময় চায় ছেলে সন্তান কাজ শিখে, দোকানে বসে বা কারিগরি কোনো কাজে যুক্ত হয়ে কর্মব্যস্ত থাকুক—যার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে তারা বিচ্যুত হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনও ছেলেদের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। বর্তমান পাঠ্যক্রমে বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন, বর্ণনাধর্মী উত্তর এবং ক্রিটিকাল থিংকিংয়ের ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। মেয়েরা সাধারণত নিয়মিত পাঠ্যবই পড়ে এবং বিস্তারিতভাবে চিন্তা করে উত্তর দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। অন্যদিকে, ছেলেরা যেখানে সংক্ষিপ্ত, পদ্ধতিগত এবং গণিতনির্ভর প্রশ্নে ভালো করে, সেখানে তারা নতুন ধরনের এই প্রশ্নে পিছিয়ে পড়ে।
চতুর্থত, অনুপ্রেরণার অভাব। মেয়েদের জন্য বিভিন্ন উপবৃত্তি, মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম ও নেতৃত্ব বিকাশের উদ্যোগ রয়েছে, কিন্তু ছেলেদের জন্য এমন কার্যক্রম খুবই সীমিত। সমাজে এমন ধারণা গড়ে উঠেছে যে, ‘ছেলেরা নিজেরাই সামলে নিতে পারবে’। ফলে তাদের পিছিয়ে পড়া গুরুত্ব পায় না, যতক্ষণ না ফলা ফলাফল বিপর্যয় ঘটায়।
পঞ্চমত, পারিবারিক অবহেলাও এই সমস্যার একটি বড় দিক। অনেক অভিভাবক মনে করেন, ছেলে সন্তানেরা প্রাকৃতিকভাবেই মেধাবী হবে এবং তারা নিজেরা সামলে নিতে পারবে। এই ভুল ধারণার ফলে ছেলেদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই যথাযথ দিকনির্দেশনা ও তদারকি হয় না। তারা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারায়, ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে আর পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না।

এই সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা, নীতিনির্ধারকদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং পারিবারিক-সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।
শুরুতেই পরিবার এবং সমাজকে ছেলেদের শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে, ছেলেদেরকে সময় ব্যবস্থাপনা শেখাতে হবে এবং পড়াশোনায় উৎসাহ দিতে হবে। পরিবারে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার যে, ছেলে সন্তানেরও যত্ন, দিকনির্দেশনা এবং মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।
পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচিত ছেলেদের জন্য বিশেষ মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করা, যেখানে তারা নিয়মিত কাউন্সেলিং ও দিকনির্দেশনা পাবে। খেলাধুলা ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্কুলমুখী করা যেতে পারে। কারণ অনেক সময় ছেলেরা পড়াশোনায় আগ্রহ না পেলেও এক্সট্রা-কারিকুলার কার্যক্রমের মাধ্যমে স্কুলে যুক্ত থাকতে আগ্রহী হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে ছেলেদের জন্য বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা উচিত। কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যেখানে পড়াশোনা এবং স্কিল অর্জনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হবে। এতে তারা পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশায় না গিয়ে শিক্ষিত ও দক্ষ কর্মজীবী হিসেবে বেড়ে উঠতে পারবে।
স্কুল ও কলেজে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। বর্তমান প্রজন্ম নানা মানসিক চাপে রয়েছে—পারিবারিক প্রত্যাশা, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, আত্মমর্যাদার প্রশ্ন, প্রেম-ভালোবাসার জটিলতা, আত্মপরিচয়ের সংকট—এইসব মানসিক চাপ থেকে বের হয়ে আসতে ছেলেদেরকে সহায়তা করা প্রয়োজন। স্কুল কাউন্সেলর, মনোবিজ্ঞানী এবং সহানুভূতিশীল শিক্ষক—এদের সক্রিয় ভূমিকা ছেলেদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে পারে।
মেয়েদের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আমাদের দেশের জন্য একটি আশার আলো; একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। তবে তা যেন ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষায় লিঙ্গসমতা তখনই অর্জিত হবে, যখন ছেলে-মেয়ে উভয়েই সমান সুযোগ, সমান মনোযোগ এবং সমান সহায়তা পাবে। একটি জাতি উন্নত হতে পারে তখনই, যখন তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিটি সদস্য আলোকিত হয় জ্ঞানের আলোয়। এখনই সময় এই সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান খোঁজার, সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়ার এবং এমন একটি সমাজ গঠনের—যেখানে প্রতিটি শিশু, ছেলে হোক কিংবা মেয়ে, সমানভাবে শিখবে, বেড়ে উঠবে এবং নিজেদের সেরা রূপে গড়ে তুলবে। শুধু পারিবারিক পর্যায়ে এই সমস্যা সমাধানযোগ্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বের সঙ্গে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।