রাজনৈতিক অস্থিরতার ‘ভরকেন্দ্র’ ও বিএনপির ক্ষমতার ভবিষ্যৎ
একই ভুল বারবার হলে শুরু হতে পারে রাজনৈতিক সংকটের নতুন চক্র। অর্থনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি—কোথায় আঘাত হানতে পারে বিরোধীরা?
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে, যেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনের পর পরই একটি বিস্তারিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে শাসনের পাঁচ বছরের সংকটময় দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে এরপর নিজেদের দুটি স্পষ্ট কৌশলপত্র তৈরি করা—একটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার, অন্যটি প্রশাসনিক ভারসাম্যের কৌশলপত্র। আজ বিএনপি সরকার গঠনের পর ২২৭তম দিনে সেই কৌশলপত্র তৈরি না করে থাকে, তবে তারা সুসংহতভাবে শাসনের ক্ষেত্রে ২২৭ দিন পিছিয়ে আছে।
যেকোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পর তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত পূর্ববর্তী সরকারের শাসনকাল এবং নিজেদের অতীত শাসনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা। সেই বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হয় কোন ভুল পদক্ষেপগুলো দেশের পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে, যেকোনো সরকারের ব্যর্থতার বড় প্রমাণ হলো দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা; কারণ সরকারের করা সেই ভুল সিদ্ধান্তগুলোই শেষ পর্যন্ত সব অস্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
কৌশলগত পরিভাষায় এই কেন্দ্রবিন্দুকে বলা হয় ভরকেন্দ্র (সেন্টার অফ গ্রাভিটি)। যেকোনো রাজনৈতিক সরকার যদি সেই ভরকেন্দ্রকে সুরক্ষা দিয়ে তাদের রাজনৈতিক পরিকল্পনা, আইনগত সংস্কার এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম দিয়ে নিজেদের শাসনপদ্ধতি সাজায়, তবে শুধু যে দলটির শাসনকালই স্থিতিশীল থাকে তা নয়; দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়, প্রশাসন গতিশীল হয়, সরকার হয়ে ওঠে কল্যাণমুখী। তখন কোনো ধরনের অসৎ উদ্দেশ্যমূলক ছলচাতুরির আশ্রয় না নিয়েই সরকার নির্বাচনে জিতে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে পারে। ক্ষমতাসীন দলকে মনে রাখতে হবে, শাসকেরা যেমন এই ভরকেন্দ্র রক্ষা করতে ব্যস্ত থাকেন, তেমনি বিরোধীরাও সেই ভরকেন্দ্রকে আঘাত করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার সুযোগ খোঁজে। রাজনৈতিক কৌশলের আসল রহস্য তো এখানেই।
বিএনপির দুটি শাসনকালের প্রথম মেয়াদে শেষ দুই বছর আর দ্বিতীয় মেয়াদে প্রায় তিন বছর দেশে হরতাল, অবরোধ ও অস্থিতিশীলতা ছিল। যেমন—প্রথম মেয়াদে ইয়াসমিন হত্যা ও মাগুরা নির্বাচন, আর দ্বিতীয় মেয়াদে জেএমবি এবং বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার কারণে দেশে এই অস্থিরতার সৃষ্টি করে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। বিএনপি একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে কেন তারা এসব অস্ত্র বিরোধীদের হাতে তুলে দিয়েছিল; রাজনীতিতে এই ধরনের পদক্ষেপগুলোকেই মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল বলা হয়। এসব কারণেই ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আগমন ঘটে, যার ফলে বিএনপি চরমভাবে নির্যাতিত হয়—এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিরতরে পঙ্গু করে দিয়ে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে জিয়াউর রহমানের পরিবারকে চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা চালানো হয়। বস্তুত, বিএনপির দ্বিতীয় মেয়াদের সেই ভুলগুলোর পথ ধরে বাংলাদেশে হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথ সুগম হয়। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় জনগণ তখন ‘গুম’ ও ‘আয়নাঘর’-এর মতো অত্যাচারের নতুন দুই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। ফলে ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে যে চশেস্কু ধাঁচের শাসন চলছিল, আজকের নতুন প্রজন্ম (জেন জি) ও সাধারণ মানুষ তার অবসান ঘটায়। শুধু তাই নয়, ২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশের গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষমতা যদি কোনো শাসক সরকারের না থাকে, তবে তাদের চরম মূল্য দিতে হবে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টারা যদি অস্থিতিশীলতার ভরকেন্দ্র চিহ্নিত করতে না পারেন, তবে মহা বিপদ খুব দূরে নেই।
সেন্টার অফ গ্রাভিটির ধারণাটি সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলে গভীরভাবে ব্যবহৃত হয়, যা মূলত সেই সব মূল উপাদানকে নির্দেশ করে যেগুলো রক্ষা বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে দেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব। বিএনপির দৃষ্টিকোণ থেকে এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণের আলোকেও বলা যায়—নির্বাচন-পরবর্তী নানা অস্থিতিশীলতা (যেমন: অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অশান্তি ও আন্তর্জাতিক চাপ) সামাল দিতে হলে সর্বাগ্রে এমন কিছু প্রধান ভরকেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি, যা দেশের স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে; কারণ সম্ভাব্য সব সংকটই প্রকৃতপক্ষে এই ক্ষেত্রগুলো থেকেই দানা বাঁধে।
সর্বাগ্রে প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন—আরও নির্দিষ্ট করে বললে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি তরুণ সমাজের মনে যেন ভুল করেও এই ধারণা তৈরি না হয় যে বৈষম্যের কারণে তারা চাকরি বঞ্চিত হচ্ছে। ভুললে চলবে না, হাসিনার পতনের চূড়ান্ত ঘণ্টা কিন্তু বেজে উঠেছিল এই দলীয়করণ ও বৈষম্যমূলক নিয়োগকে কেন্দ্র করেই, যার পরিণতি হয়েছে নির্মম পতন। বিএনপির ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে অর্থনৈতিক নীতিগুলোকে শক্তভাবে সুরক্ষিত করতে হবে। যেকোনো অস্থিতিশীলতা রোধে সবার আগে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতি দমন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। অর্থনীতি যদি একবার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তবে সামাজিক অশান্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেই।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং আইনের শাসনকেও অগ্রাধিকার দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে? ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার (যেমন: প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ) বিএনপির জন্য বাস্তবায়ন করা মোটেই কঠিন কিছু নয়। এর চেয়েও কঠোর সংস্কার সাধন করার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে; সুতরাং দেশের শাসন অন্য কোনো গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। একটি রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছুই হতে পারে না; আর সরকার যত স্বচ্ছ হবে, তার শক্তিও ততটাই বৃদ্ধি পাবে। তাই বিএনপির মতো এত বড় দলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষমতা প্রকৃতপক্ষে কেবল বিএনপির নিজেরই আছে। তাদের নিজেদেরই উচিত নিজেদের এভাবে চ্যালেঞ্জ করা—‘আমরা আর কত কঠিন জবাবদিহিতার আওতায় এনে নিজেদের শাসন পরিচালনা করতে পারি?’ অতীত শাসনকালে বিএনপির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ছিল, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার নিখুঁত পথ কিন্তু তাদের নিজেদেরই সবচেয়ে ভালো জানা আছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার একটি প্রধান উপাদান হলো ‘সামাজিক সম্প্রীতি এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা’র বার্তা। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু নির্যাতনের একটি ধারণা দিয়ে প্রভাবিত। একই সঙ্গে বিএনপির শাসনকাল মানেই একশ্রেণির বিদেশী সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে ‘উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থান ও মৌলবাদের মাথাচাড়া দেওয়া’র চটকদার নেতিবাচক প্রচারণার ডামাডোল। এই প্রেক্ষাপটে সকল ধর্মের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর একজন অত্যন্ত আস্থাশীল, অভিজ্ঞ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনৈতিক উপদেষ্টার (যিনি মন্ত্রিসভার সদস্য নন) মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি; যাতে সার্বক্ষণিক দেশের পক্ষে সত্য বর্ণনা ও প্রতিচ্ছবি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা সম্ভব হয়।
এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকারের সবচেয়ে সফল ক্ষেত্রটি হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈদেশিক নীতির অঙ্গন। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই আন্তর্জাতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশসমূহ ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যের কূটনীতি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সংযোগ ও সম্পর্ক দুটি কারণে অপরিহার্য—প্রথমত জ্বালানি চাহিদা পূরণ, আর দ্বিতীয়ত প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা ও রেমিটেন্সের প্রবাহ নিশ্চিত রাখা। তবে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা রোধ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা অর্জন করা যেমন সম্ভব হবে না, তেমনি বৈদেশিক বিনিয়োগও আসবে না। তাই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা, ভারতের সঙ্গে ন্যায্য পানিবণ্টন না হলে দ্রুত একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণ, পূর্বমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরও সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
দলের অভ্যন্তরীণ মেধাশক্তিকে বলীয়ান করা এবং ‘সংঘাত নয়, সমঝোতার রাজনীতি’র নীতি অনুসরণ করা। ১৭ বছর আওয়ামী লীগের হাতে দ্বারা নির্যাতিত হওয়ায় দল হিসেবে বিএনপি মেধাবীদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। এখনই সেই কাজ শুরু করার উপযুক্ত সময়। কারণ দলের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি মজবুত করতে মেধাবী তরুণ নেতা সংগ্রহ ও তাদের গড়ে তোলার কাজে দ্রুত হাত দিতে হবে; নয়তো কেবল লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে প্রতিপক্ষের জ্ঞানভিত্তিক রাজনীতিকে মোকাবেলা করা যাবে না। পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতাদের রাষ্ট্রের জাতীয় ইস্যুতে যুক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট মাধ্যম বা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। ‘সমঝোতার রাজনীতি’ অনুসরণ করা না হলে এই অভ্যন্তরীণ বিভেদই চূড়ান্ত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে।
এই ভরকেন্দ্রগুলো রক্ষা করতে পারলে বিএনপি দেশকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারবে; তবে মনে রাখতে হবে, স্থিতিশীলতা আসবে বাস্তবভিত্তিক কাজের মাধ্যমে, শুধু ফাঁকা ঘোষণায় নয়। বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন এক নতুন ধারার রাজনীতি চর্চা করা অপরিহার্য, অন্যথায় রাজনৈতিক সংকটের নতুন চক্র শুরু হয়ে যেতে পারে। যার অশনি সংকেত ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের আকাশে উঁকিঝুঁকি মারছে; সুতরাং সাধু সাবধান।
এ টি এম জিয়াউল হাসান: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, আর সি ডি এস, পি এস সি (অব.)। ই-মেইল: zhasansohel241@gmail.com
