গুম প্রতিরোধ আইন: শাস্তির চেয়ে বড় প্রশ্ন তদন্তের স্বাধীনতা
গুমের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি পৃথক, স্বাধীন ও বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা থাকা উচিত।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে গুমের অভিযোগ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নটি বাংলাদেশের মানবাধিকার আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে। ওই বাস্তবতায় গুমকে একটি স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল।
প্রস্তাবিত বিলের বেশ কিছু দিক তাই ইতিবাচক। গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা, এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান, গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ বা পরিচালনা, গুমের প্রমাণ নষ্ট করা কিংবা অপরাধে সহায়তা করার মতো কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য করা, এসবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও পরিবারের সত্য জানার অধিকার, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানার সুযোগ, আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, সাক্ষী ও তথ্যদাতার সুরক্ষা এবং গুমের ঘটনা নিয়ে একটি জাতীয় ডেটাবেজ তৈরির মতো বিধানও রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আইনটির শক্তিশালী দিক।
তবে একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, গুমের অভিযোগ উঠলে তদন্ত করবে কে?
প্রস্তাবিত বিলের একটি ইতিবাচক দিক হলো, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে ওই বাহিনীকে তদন্তের দায়িত্ব না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। অর্থাৎ অভিযুক্ত বাহিনীর পরিবর্তে অন্য কোনো বাহিনী বা প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তঃবাহিনী তদন্তের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার কথাও বলা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আগের ব্যবস্থার তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়, একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত অন্য একটি বাহিনী করলে সেটিকে কি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন তদন্ত বলা যাবে?
একজন নাগরিক হিসেবে আমার বিবেচনায়, সব ক্ষেত্রে নয়। তদন্তের স্বাধীনতা শুধু এই অর্থে নয় যে অভিযুক্ত বাহিনী নিজে তদন্ত করবে না। স্বাধীনতার প্রশ্নটি আরও গভীর। তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক, পেশাগত বা কমান্ড কাঠামোর কোনো প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে কি না, তাও বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো একটি নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত যদি আরেকটি একই ধরনের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে দেওয়া হয়, তাহলে আইনগতভাবে তদন্তটি নিরপেক্ষ হলেও ভুক্তভোগী পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মনে তার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।
গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে এই আস্থার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে অভিযোগকারী অনেক সময় এমন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন, যার হাতে গ্রেপ্তার, আটক, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা বলপ্রয়োগের মতো ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। ফলে ওই ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তও যদি একই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তাহলে তদন্তের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হিসেবে বলা যায়, গুমের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি পৃথক, স্বাধীন ও বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা থাকা উচিত।
এই সংস্থাটি কোনো বাহিনী বা মন্ত্রণালয়ের অধীন না থেকে আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এর নিজস্ব তদন্ত ক্ষমতা, পর্যাপ্ত জনবল ও আর্থিক স্বাধীনতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ, সাক্ষ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ, আটক বা গোপন স্থাপনা পরিদর্শন এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার মতো সুস্পষ্ট ক্ষমতা থাকতে হবে।
এ ধরনের একটি স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা শুধু বাংলাদেশের বাস্তবতা থেকেই আসে না; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডও গুমের অভিযোগের তদন্তকে কার্যকর, দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়।
এখানে মেক্সিকোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কিছুটা শিক্ষণীয় হতে পারে। সেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধানের জন্য জাতীয় পর্যায়ে পৃথক অনুসন্ধান কাঠামো রয়েছে এবং গুমের মতো অপরাধের ফৌজদারি তদন্তের জন্য বিশেষায়িত প্রসিকিউশন ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ একজন নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা, এই দুই কাজকে এক করে দেখা হয়নি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব এবং একটি অপরাধের তদন্ত একই বিষয় নয়। নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান একটি মানবিক ও জরুরি দায়িত্ব; অন্যদিকে ফৌজদারি তদন্তের উদ্দেশ্য হলো অপরাধের ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, কমান্ড কাঠামো, প্রমাণ এবং দায় নির্ধারণ করা। দুটি প্রক্রিয়াই সমান্তরালভাবে এবং স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়া দরকার।
প্রস্তাবিত আইনে গুমকে চলমান অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন ব্যক্তি কোথায় আছেন, তার ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পরিবারের অনিশ্চয়তা শেষ হয় না। একজন নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার বছরের পর বছর অপেক্ষা করে থাকে তিনি জীবিত কি না, কোথায় আছেন, তার সঙ্গে কী ঘটেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য। তাই গুমের ক্ষেত্রে শুধু অপরাধ সংঘটনের সময় নির্ধারণ নয়, ভুক্তভোগীর ভাগ্য ও অবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়টিও আইনে আরও স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিলটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভুক্তভোগী ও পরিবারের সত্য জানার অধিকার। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সত্য জানার অধিকার শুধু আইনের একটি ধারায় স্বীকৃত হলেই বাস্তবে নিশ্চিত হয় না। পরিবারের তদন্ত প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পাওয়া, প্রাসঙ্গিক নথি ও তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং তদন্তের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকতে হবে।
একই সঙ্গে সাক্ষী, অভিযোগকারী, ভুক্তভোগী পরিবার এবং মানবাধিকারকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গুমের মতো অপরাধের তদন্তে সাক্ষী বা তথ্যদাতারা ভয়ভীতি, চাপ কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কায় তথ্য দিতে অনাগ্রহী হতে পারেন। তাই তাদের সুরক্ষার জন্য সাধারণ ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষ ও কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
শাস্তির বিষয়েও একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। প্রস্তাবিত বিলে গুমের ফলে মৃত্যু কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ থাকার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গুমের ভয়াবহতা বিবেচনায় কঠোর শাস্তির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু একটি কার্যকর আইনের সাফল্য শুধু শাস্তির সর্বোচ্চ মাত্রা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধীকে শনাক্ত করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা, স্বাধীন তদন্ত করা, ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করা এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্তির সুযোগ না দেওয়া।
কারণ শাস্তি যত কঠোরই হোক, তদন্ত যদি স্বাধীন না হয় এবং বিচার যদি বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে আইনের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গুমবিরোধী আইন শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার আইন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের আইন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে বলতে হবে, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের হাতে আটক হওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে গেলে তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; কোনো বাহিনী বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে ওই অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হতে হবে; এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
এই বিবেচনায় প্রস্তাবিত বিলটি প্রত্যাখ্যানের প্রয়োজন নেই; বরং এটিকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনায় বিশেষভাবে স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার বিষয়টি যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তির অনুসন্ধান ও ফৌজদারি তদন্তের দায়িত্বের মধ্যে প্রয়োজনীয় পৃথকীকরণ, ভুক্তভোগী পরিবারের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং সাক্ষী ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে গুমের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের লক্ষ্য শুধু ‘গুমের শাস্তি’ হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্য উদঘাটন, ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ আর না ঘটার নিশ্চয়তা।
তাই আন্তঃবাহিনী তদন্তের বিধানকে একটি প্রাথমিক সুরক্ষা হিসেবে রেখে তার পাশাপাশি একটি স্বাধীন, বিশেষায়িত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিবেচনা করার দাবি জানাচ্ছি। এতে শুধু ভুক্তভোগী পরিবার নয়, অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচারের অধিকারও সুরক্ষিত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের গুমবিরোধী আইন তখন কেবল একটি কঠোর দণ্ডবিধি হবে না; এটি হয়ে উঠবে সত্য, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর আইন।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির মানবাধিকারকর্মী। ই-মেইল: aafk76@yahoo.com
