‘লজ্জার বিষয়ে তখন আমি কিভাবে বলতাম?’

“আমি ধীরে ধীরে ডাক্তারের পরামর্শে এবং নিজের চেষ্টায় এই সমস্যাকে ওভারকাম করি,” বলেন পলিসিস্টিক ওভারি রোগে ভোগা এক নারী।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 Dec 2022, 07:47 PM
Updated : 3 Dec 2022, 07:47 PM

নারীদের পলিসিস্টিক ওভারি রোগ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়ে গেল গল্প বলার প্ল্যাটফর্ম ‘স্বয়ং’ এর ব্যতিক্রমী টকশো ‘আঙুর ফল টক’ এর নবম পর্বে।

‘সিস্টারহুড ক্যাম্পেইন’ এর অংশ হিসেবে শনিবার ঢাকার ধানমণ্ডির ইএমকে সেন্টারে ‘ওভারি-অ্যাক্টিং! বিয়েই কি তবে মেডিসিন?’ শীর্ষক এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পিসিওএসজনিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বললেন ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞরা।

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রম বা পিসিওএস আক্রান্ত হলে অনিয়মিত মাসিক থেকে শুরু করে ওজন বেড়ে যাওয়া কিংবা শরীরে অবাঞ্ছিত লোমের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মত উপসর্গ দেখা দেয়। এর পরও রোগটি নিয়ে দেশে সচেতনতা যে খুবই কম- তা উঠে এল আলোচকদের কথায়।

'স্বয়ং' প্রতিষ্ঠাতা স্বাতীল বিনতে মাহমুদ পিসিওএস নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত লোকজনেরও যে তেমন ধারণা নেই, সে কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আমি যখন এই প্রোগ্রামের জন্য স্পন্সর খুঁজছিলাম, অনেকেই আমায় বললো- আপা, পিসিওএস আবার কী? তারা বলল, আপনি পিরিয়ড নিয়ে ইভেন্ট করেন, আমরা স্পন্সর করব।”

এই রোগ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে তা বলতে গিয়ে নিজের ছেলেবেলায় ফিরে গেলেন সাইকোলজিস্ট মোবাসসিরা জামান সিনথিয়া।

তিনি বলেন, “আমার মা বিকালে একদিন ‘সানন্দা’ (নারী বিষয়ক সাময়িকী) পড়ছিলেন। তখন আমি ওখান থেকে সর্বপ্রথম এই টার্ম সম্বন্ধে জানতে পারলাম। পরবর্তীতে গুগল থেকে এ সম্বন্ধে আমি আরও জানার চেষ্টা করি। দেখছিলাম যে যা বলা হচ্ছে, সবই প্রায় আমার সাথে মিলে যাচ্ছে।

“আমার চুল পাতলা হয়ে গিয়েছিল তখন। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলাম, আমি ইনসিকিউরড ফিল করতাম ছবি তুলতে বা কোথাও বন্ধুদের সাথে যেতে। আমার মুড সুইং হত। আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না। পরে আমি ধীরে ধীরে ডাক্তারের পরামর্শে এবং নিজের চেষ্টায় এই সমস্যাকে ওভারকাম করি।”

কালিনারি এনিথিজিয়াস্ট ও কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট কাজরিয়া কায়েস বলছিলেন, যখন তার ১৫ বছর বয়স, তখন তার প্রথম পিরিয়ড হয়েছিল; কিন্তু তারপর থেকে অনিয়মিত পিরিয়ডই তার ‘নিত্য সঙ্গী’।

“কিন্তু যেহেতু পিরিয়ড নিয়ে কথা বলাটা লজ্জার বিষয়, তাই আমি এ বিষয়ে কথা বলতাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলাম যখন, তখন নিজেকে প্রেজেন্ট্যাবল রাখতে চাইতাম। সেজন্য আমি ডায়েট করা শুরু করলাম, যা আমার মেটাবোলিজমকে পুরা ওলটপালট করে দিল। যখন আমার ২৩ বছর বয়স, তখন আমার মুখে লোম উঠতে শুরু করল। কিন্তু কেন উঠত, তা তখনও বুঝি নাই। এটা নিয়ে যে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত, তখনও তা মাথায় আসে নাই।”

এরপর কাজরিয়ার কেটে যায় আরও ৫ বছর, তারপর একদিন শরণাপন্ন হন পুষ্টিবিদের কাছে।

“আমার জব, সারাউন্ডিংস ততদিনে পরিবর্তন হয়ে গেছে। তখন আমি আমার নিজের দিকে মনোযোগ দিলাম। আমার মনে হলো, আমার নিজের শরীরকে বোঝা উচিত। আমি তখন আমি একজন পুষ্টিবিদের কাছে যাই। এরপর আমার একবারে ১৫ কেজি ওজন কমে যায় এবং আমার আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে।”

কাজরিয়া যোগ করলেন, “ওজন কমানোর জন্য যে কম খেতে হবে, বিষয়টা তা না। যতটা প্রয়োজন, ততটাই খাওয়া যাবে; কিন্তু স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে হবে।”

কৈশোরের সংকোচের কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, “আমার বয়স তখন পনেরোর শেষের দিকে, আমার সব বান্ধবীর মাসিক শুরু হয়ে গিয়েছিল। বাদ পরেছিলাম শুধু আমি। কিন্তু এগুলো তো লজ্জার বিষয়, আমি কিভাবে সেটি নিয়ে কথা বলতাম?"

নারীদের ৪ থেকে ১০ শতাংশই পিসিওএস আক্রান্ত বলে জানালেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ফজলে তাওহিদা।

“অনেকে বলে, বিয়ে করলেই এই সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা না। এটা বিয়ে করলেও থাকবে, না করলেও থাকবে। কিন্তু বিষয়টা হল, এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব চাইলে।”

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে গিয়ে যোগব্যায়াম শিক্ষক এজা চৌধুরী বললেন, যখন তার এই সমস্যা ধরা পড়েছিল, চিকিৎসক তাকে পিরিয়ড সাইকেল স্বাভাবিক করার জন্য জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল খেতে বলেছিল।

“কিন্তু আমি তাতে রাজি হইনি, কারণ তারা (চিকিৎসক) এটা বলেছিলো যে পিরিয়ড স্বাভাবিক হলেও আর্লি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকবে (পিল খেলে)। তাই তারপর আমি একটা পর্যায়ে ইয়োগা করা শুরু করি এবং হেলদি খাবার খাওয়া শুরু করি। ফলাফল, আজকের আমি।”

মোবাইলে আর্থিক সেবা ‘নগদ’ এর অর্থায়নে গত ২৩ নভেম্বর ‘সিস্টারহুড ক্যাম্পেইন’টি শুরু হয়েছে।

টকশো অনুষ্ঠানের ফুড পার্টনার ছিল ম্যাডশেফ, মিডিয়া পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, আর গিফট পার্টনার অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক