Published : 05 Apr 2026, 03:21 AM
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বে থাকার সময় মাহবুব মোর্শেদ নিজের একটি গাড়ি আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংবাদমাধ্যমেই ভাড়া দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
‘রেন্ট-এ-কার’ নামের গাড়ি ভাড়া দেওয়া এ প্রতিষ্ঠান ওই গাড়ি ভাড়ার জন্য মাসে দেড়লাখ টাকা করে পেয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারীর দাবি, ভাড়ার টাকার পুরোটাই মাহবুব মোর্শেদ নিয়েছেন। তিনি কোনো কমিশন রাখেননি।
এ বিষয়ক এক নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বরের এক চিঠিতে পরের মাস ১ ডিসেম্বর থেকে এ গাড়ি ভাড়ার কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে রেন্ট এ-কার সার্ভিসের স্বত্ত্বাধিকারী মো. আব্দুল কাদের মীনার দাবি, গাড়ি ভাড়ার চুক্তি অনুযায়ী দুই মাসে তিন লাখ টাকার পুরোটাই মাহবুব মোর্শেদ নিয়েছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন তিনি বলেন, “এখানে আমার মাধ্যমে গাড়ি দেওয়ার কারণে আমার কোনো কমিশন ছিল না, আমি এক টাকাও নেইনি। বিলটা আমার নামে পাস হইতো, কিন্তু পুরো টাকাই তিনি নিয়েছেন।”
ভাড়া পরিশোধের নথিতেও তার প্রতিষ্ঠানের আরেকটি গাড়ি বাসসে ভাড়া দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তবে সেই গাড়ির ভাড়া মাহবুব মোর্শেদের গাড়ি ভাড়ার অর্ধেকেরও কম-মাসপ্রতি ৭০ হাজার টাকা করে পরিশোধ করা হয়।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদকে ওই বছরের ১৮ অগাস্ট দুই বছর মেয়াদে বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদক করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পরদিনই বাসসে গিয়ে কর্মীদের ‘বিক্ষোভের’ মুখে পড়েন মাহবুব মোর্শেদ। সেদিনই অফিস থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আর সেখানে ফেরেননি তিনি।
পরে এ বিষয়ে ফেইসবুক পোস্টে তিনি ‘মব তৈরি করে’ তাকে ‘অপসারণের’ জন্য চাপ তৈরির অভিযোগ আনেন।
এর পরদিন তার বিরুদ্ধে ওঠা ‘দুর্নীতির’ অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। কমিটির কাছে তার বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়ার কথা বলেন বাসসের কর্মীদের কয়েকজন।
সবশেষ ১ এপ্রিল বুধবার এক প্রজ্ঞাপনে তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
মাহবুব মোর্শেদের নামে থাকা গাড়ি বাসসে ভাড়া দেওয়া বিষয়ক নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর বাসস থেকে একটি কার্যাদেশ দিয়ে ‘রেন্ট-এ-কার সার্ভিস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে গাড়ি চাওয়া হয়। ১৬টি শর্ত জুড়ে দিয়ে পরবর্তী পহেলা ডিসেম্বর থেকে ‘প্রধান সম্পাদকের সার্বক্ষণিক দাপ্তরিক কাজের জন্য’ গাড়িটি চাওয়া হয়েছিল।
সে অনুযায়ী একটি টয়োটা ব্র্যান্ডের এলিয়ন মডেলের গাড়ি বাসসকে দিয়েছিল ‘রেন্ট-এ-কার সার্ভিস’। জ্বালানি, চালক, অন্যান্য ব্যয়সহ মাসপ্রতি ওই প্রতিষ্ঠানকে দেড় লাখ টাকার বিল মেটানোর নথিতে গাড়ির নম্বরও রয়েছে। বিআরটিএর নথি বলছে, গাড়িটির মালিক মাহবুব মোর্শেদ।
চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি ও ২ ফেব্রুয়ারি বাসস থেকে ওই গাড়িটির ভাড়া বাবদ দেড় লাখ করে তিন লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
রেন্ট এ-কার সার্ভিসের স্বত্ত্বাধিকারী মো. আব্দুল কাদের মীনা স্বীকার করেছেন, গাড়িটি দুই মাস তার প্রতিষ্ঠানের অধীনে বাসসের কাছে ভাড়ায় চলেছিল।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পরে উনিইতো চলে গেলেন, তার গাড়ির চুক্তিও বাতিল হয়ে গেছে। আমার আরেকটা গাড়ি আগে থেকেই চলছে, সেটা এখনো আছে।”
কোন প্রক্রিয়ায় মাহবুব মোর্শেদের ব্যক্তিগত গাড়ি তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাসসকে দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে মীনা বলেন, “এটা প্রতিষ্ঠান ভালো জানে। সেখানে একটা গাড়ি চলছে আমার, এখন তাদের আরেকটা গাড়ি প্রয়োজন। তো দুইটা কোম্পানির গাড়ি নেওয়া ঝামেলার, তাই তারা আমার মাধ্যমেই গাড়িটি নিয়েছে।
“এখন একটা প্রতিষ্ঠানের এমডি ডেকে যদি বলে এই গাড়িটা তুমি দেও, স্বাভাবিকভাবেই আমি এটা করতে বাধ্য।”
এ বিষয়ে শনিবার একাধিকবার মাহবুব মোর্শেদের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি কল ধরেননি। একপর্যায়ে তার ব্যবহৃত নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসীনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুপারিশসহ তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তবে বাসসের সাবেক এমডির বিরুদ্ধে প্রতিবেদনে কী বল হয়েছে তা এখনও প্রকাশ পায়নি।
নাম প্রকাশ না করে কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন, তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।
প্রতিবেদনের সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রধান সুপারিশ ছিল সেখানে যদি কোনো অনিয়ম ঘটে থাকে, সেটা চিহ্নিত করার জন্য আরেকটা কমিটি করা।”
তার ভাষ্য, বাসসের পরিচালনা কমিটিকে এ কাজ করার কথা বলা হয়েছে।
কমিটির ওই সদস্য বলেন, “আমরা মোটা দাগে কিছু অনিয়ম হয়েছে, এরকম বলেছি। কিন্তু স্পেসিফিকভাবে কিছু চিহ্নিত করে দিইনি।
“আমাদের টাইমটাও আসলে ওরকম ছিল না। এটা খুব সূক্ষ্মভাবে দেখে করতে হলে আরও সময় দরকার।”
এ বিষয়ে জানতে কমিটির প্রধান মো. ইয়াসীনকে একাধিকবার ফোন করে ও বার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।