১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শ্রেণি বিভক্ত সমাজে সাংবাদিকতা কীভাবে নিরপেক্ষ হতে পারে, প্রশ্ন নূরুল কবীরের

“সাধারণ মানুষের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করলে সমাজের মধ্যে ধনী এবং গরিবের এই অশ্লীল ধরনের বৈষম্য কীভাবে জারি থাকে?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Aug 2026, 05:43 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা’র মোড়কে আসলে জনস্বার্থবিরোধী ব্যবস্থাই টিকে থাকে বলে মনে করেন ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীর।

এর বদলে তরুণদের ‘লিপ্ততার সাংবাদিকতা’ বা মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়াকু সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ দিবস উপলক্ষে রোববার ‘রাজনীতি, ক্ষমতা ও আন্তঃসংশ্লেষ: তত্ত্ব, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছিলেন প্রবীণ এ সাংবাদিক। মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

নূরুর কবীর বলেন, “যখন সাংবাদিকতা করি, কার জন্য করি? কী ধরনের সাংবাদিকতা করি? এই যে একটা কথা প্রচলিত আছে ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা’, এই বস্তুটা কী? এই প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের, অধ্যাপকদের, শিক্ষার্থীদের মাথায় নিরন্তরভাবে কার্যকর থাকা দরকার। 

“যেমন ধরুন কথাটা শুনতে খুব ভালো লাগে যে—ওই পত্রিকাটি বা ওই সংবাদমাধ্যমটি খুব নিরপেক্ষ। হোয়াট ডাজ ইট মিন?”

নিউ এইজ সম্পাদক বলেন, “একটা সমাজে যদি বিভিন্ন শ্রেণি থাকে, সমাজে যদি শ্রেণি বিভক্তি থাকে, সেই সমাজের মধ্যে যদি অন্যায় থাকে, জনস্বার্থবিরোধী অর্থনীতি চালু থাকে, জনস্বার্থবিরোধী আইন-কানুন যদি থাকে, তাহলে এইরকম একটা সময়ের মধ্যে সাংবাদিকতা বা যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা কীভাবে নিরপেক্ষ হতে পারে? 

“আর এই নিরপেক্ষতার অর্থ তো আসলে একটা জনস্বার্থবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করা। এই নিরপেক্ষতার অর্থই হচ্ছে—একটা বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে, প্রতিবাদ না করে সেটাকে নিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণে পারপেচুয়েট (জিইয়ে রাখা) করতে দেওয়া, বয়ে দিতে চাওয়া।”

বাংলাদেশ কি বৈষম্যহীন সমাজে পরিণত হয়েছে কি না, এ প্রশ্ন তুলে সাংবাদিক নূরুল কবীর বলেন, “বাংলাদেশ রাষ্ট্র, তার ম্যানেজার যেকোনো রাজনৈতিক দলই থাকুন না কেন, তারা কি সাধারণ মানুষের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করে কি না? 

“যদি করে, তাহলে সমাজের মধ্যে ধনী এবং গরিবের এই অশ্লীল ধরনের বৈষম্য কীভাবে জারি থাকে?”

নিউ এইজ সম্পাদক বলেন, “সাংবাদিকতার একটা কাজ তো অবশ্যই পরিষ্কারভাবে তথ্য প্রদান করা। কিন্তু কেবলমাত্র তথ্য প্রদান করা নয়। তথ্য মানেই আমি ধরে নিচ্ছি যে—তথ্য আর অপতথ্য বলে কিছু নেই। যা কিছু তথ্য, তার বাইরে সবকিছুই অপ। 

“তথ্যের যে বস্তুনিষ্ঠতা, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাংবাদিকতার সেটা তো একটা প্রথম পর্ব। আপনার রিডারকে, ভিউয়ারকে, দর্শককে আপনি নিশ্চয়ই তথ্য দেবেন এরকমভাবে—যাতে ইনফর্মড ওপিনিয়ন (সুচিন্তিত মতামত) গড়ে উঠতে পারে গোটা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে ওপিনিয়ন গড়ে তুলতে সাহায্য করে। 

“কিন্তু সেগুলো ইন্টারপ্রেট (ব্যাখ্যা) করারও তো ব্যাপার আছে। সাংবাদিকতার সেটাও একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিদ্যমান বস্তুনিষ্ঠ তথ্যকে আপনার বৈষম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে, কোন শ্রেণি শাসন-শোষণ করছে, কারা শাসিত-শোষিত হচ্ছে; সেটা পরিষ্কারভাবে ধারণা দেওয়া এবং প্রয়োজনে পরিষ্কারভাবে পক্ষালম্বনের প্রশ্নে একটা অবস্থান গ্রহণ করা আমি মনে করি সাংবাদিকতার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।”

প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত আছেন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে। এর আগে আশির দশকে সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি পালন করেছেন নেতৃত্বমূলক ভূমিকা।

নূরুল কবীর বলেন, “যারা নিরপেক্ষতা সাংবাদিকতা বলেন, এটাকে আমরা বলি নির্লিপ্ততার সাংবাদিকতা। অর্থাৎ সমাজের অধিকাংশ মানুষের জীবনের সাথে তারা নির্লিপ্ত। তথ্য দিয়েই যেন তারা মুক্তি লাভ করেন, দায়িত্ব খালাস মনে করেন। 

“আর বাকিটা যেটা—সেই তথ্যকে জনস্বার্থের পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করতে চান, প্রভাবিত করাকে কর্তব্যপরায়ণ একটা কাজ মনে করেন, সেটা হচ্ছে লিপ্ততার সাংবাদিকতা।”

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা লিপ্ততার সাংবাদিকতার সঙ্গে থাকেন। লিপ্ততার সাংবাদিকতা মানে এটা ভিশনলি পলিটিকাল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক একটা তৎপরতা। তাহলে যখনই সাংবাদিকতার কথা বলব, পুরো ব্যাপারটা একটা পলিটিক্যাল ব্যাপার। 

“কারণ সাংবাদিকতা যে কোনো শাস্ত্র অধ্যয়ন ডিফারেন্ট স্টেট অ্যাপারেটাস (রাষ্ট্রযন্ত্র) এর অংশ; সেটা পুরো ব্যাপারটাই রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত হয়। সে জায়গায় আপনি যখন ইন্টারভিন (মধ্যস্থতা) করবেন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে, এটাকে একধরনের রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা ছাড়া সাংবাদিকতাকে আর কীভাবে অভিহিত করা যায়?”

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পথে অন্তরায় হিসেবে ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা বিভিন্ন ‘কালো আইন’ ও ‘মুচলেকা’ ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন নিউ এইজ সম্পাদক।

নূরুল কবীর বলেন, “১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালে দুবার স্বাধীন হওয়ার পরও আমরা এখনো সেই ঔপনিবেশিক আইন মাথায় নিয়ে সাংবাদিকতা করছি। এখনো প্রকাশনার লাইসেন্স নিতে গিয়ে সরকারকে মুচলেকা দিতে হয় যে, তাদের বিরুদ্ধে কিছু লেখা হবে না; এটি গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থি।”

সেমিনারে উপস্থিত তথ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিউ এইজ সম্পাদক বলেন, “ব্যক্তিগত সম্পর্ক যাই হোক, জনগণের স্বার্থে এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার খাতিরে অবিলম্বে এসব কালো আইন বাতিল করা প্রয়োজন।”

অনুষ্ঠানে ১৯৭৩ সালের ‘ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন’র সংস্কারের বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ আইনের সংশোধন করার কথা বলেছেন। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে লেখার পরিবর্তে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু লেখা হবে না—এমনটাই করতে বলেছেন। আমরা এ বিষয়ে কাজ করব।”

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “যেখানে সাংবাদিকতা নেই, সেখানে আসলে রাষ্ট্র আদৌ আছে কি না—সেই প্রশ্ন দেখা দেয়। সাংবাদিকতাবিহীন রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রবিহীন সাংবাদিকতার মধ্যে যদি কোনো একটিকে বেছে নিতে বলা হয়, তবে কোনো সভ্য মানুষ রাষ্ট্রবিহীন সাংবাদিকতাকেই বেছে নেবে। সাংবাদিকতা সভ্যতার এক অনিবার্য অনুষঙ্গ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ।”

অপতথ্যকে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী। 

“আমরা আগে দেখেছি, তথ্যের একমুখী প্রবাহ। তখনও অপতথ্য ছড়ানোর বেশ সুযোগ ছিল। তবে এখন ডিজিটাল সময়ে এসে অপতথ্য ছড়ানোর ব্যপ্তি অনেকগুণ বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে অপতথ্য মোকাবেলায় আমরা অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছি। সরকারও এ বিষয়ে আগ্রহের সাথে কাজ করে যাচ্ছে,” বলেন স্বপন। 

তথ্যমন্ত্রী বলেন, “সাংবাদিকতার জন্য সত্য উদ্ঘাটন এবং বস্তুনিষ্ঠতা যেমন বড় দায়িত্ব, তেমনই জনকল্যাণ বা ‘অ্যাক্টিভিজম’ও একটি বড় কাজ। কিন্তু যখনই একজন সাংবাদিকের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য কাজ করে, তখনই বস্তুনিষ্ঠতা বিকৃত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। 

“তথ্যের উপস্থাপনা যদি কেবল লক্ষ্য অর্জনের জন্য হয় এবং আবিষ্কৃত সত্য যদি সেই লক্ষ্যের সাথে না মেলে, তখন সত্য ও আকাঙ্ক্ষা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। এই দ্বন্দ্বে বস্তুনিষ্ঠতা অনেক সময় বিসর্জন দেওয়া হয়।”

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন কাজী মাহবুবুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।