২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ঘরের সাজে দেশীয় কারুকাজ

পুরোনো কাপড়ের নকশা, লোকজ চিত্র, কাঠের কারুকাজ বা হাতে বোনা উপকরণ ঘর সাজানো যায় দেশীয় আমেজে।

রিফাত পারভীন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 03 Sep 2026, 05:33 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

জসীমউদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ-এ কবি বাংলার গ্রামীণ বাড়িতে শীতল পাটি আর বাঙালির আবেগ ভালোবাসায় নকশিকাঁথার প্রভাবকে তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ ঘরে দেশীয় উপকারণের সাজসজ্জাও ছিল সাধারণ বিষয়।

আধুনিক সময়েও ঘরসজ্জায় নকশীকাঁথা, রিক্সাপেইন্ট, প্যাচওয়ার্ক, শীতলপাটির আবেদন ধরে রাখেন অনেকেই।

কারণ ঘরের একঘেয়ে সাজের বাইরে দেশীয় কারুকাজের আসবাব তাই শুধু ব্যবহারের জিনিস নয়, হয়ে উঠতে পারে গ্রামীণ গল্প বলার মাধ্যম।

আসবাবে যখন বাংলার গল্প

বসার আসন কি শুধু বসার জন্যই তৈরি? তার গায়ে নকশিকাঁথার রঙিন নকশা, পুরানো কাপড়ের টুকরো জোড়া বা প্যাচওয়ার্ক করা কিংবা কাঠের গায়ে দেশীয় কারুকাজে সেটি ভিন্নধর্মী আসবাবে রূপ নেয়।

“দেশীয় কারুকাজ ব্যবহারে একই নকশা বা একই ধরনের বিন্যাসেও ভিন্নতা আসতে পারে”, বলেন ফ্যাশন ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেডিয়েন্ট ইনস্টিটিউট অব ডিজাইন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও অন্দরসজ্জাবিদ গুলশান নাসরিন।

এছাড়া দেশীয় নকশার এমন আসবাবে সামান্য অসম্পূর্ণতা, রংয়ের পার্থক্য কিংবা নকশার নিজস্বতা থাকতে পারে। আর সেই ভিন্নতাই আলাদা আবেদন আনে।

নকশিকাঁথার সেলাইয়ে নতুন রূপ

বাংলার নকশিকাঁথা একসময় ছিল ব্যবহারিক প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি লোকজ শিল্প। পুরানো শাড়ি, কাপড়ের টুকরো কিংবা ব্যবহৃত কাপড়কে সেলাই করে নতুন রূপ দেওয়ার কাঁথা এখন ঘর সাজানোর নানান উপকরণেও জায়গা পেয়েছে।

বসার আসনের গদি, পিঠের কুশন কিংবা ছোট টুলে নকশিকাঁথার কাজ ব্যবহারে করলে সাজে উষ্ণতা তৈরি হয়।

“কাঠের স্বাভাবিক বাদামি রংয়ের সঙ্গে লাল, বেগুনি, সবুজ, নীল কিংবা হলুদের মতো উজ্জ্বল কাঁথার কাজ মানাবে”, বলেন গুলশান নাসরিন।

তবে একসঙ্গে অনেক রং ও নকশা ব্যবহার না করে, একটি বা দুটি প্রধান রংকে ঘরের সাজের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া পরামর্শ দেন তিনি।

নকশিকাঁথার আরেকটি সৌন্দর্য হল, এর বুননে থাকা গল্প। ফুল, পাখি, লতা, জ্যামিতিক রেখা কিংবা বিভিন্ন প্রতীক— প্রতিটি নকশাই ঘরের সাজে লোকজ অনুভূতি যোগ করতে পারে।

রিকশাচিত্রের রংয়ে ঘরসজ্জা

দেশীয় ঘরসজ্জায় রিকশাচিত্র আলাদা আমেজ তৈরি করতে পারে। উজ্জ্বল রং, ফুল, পাখি, গাছপালা ও নানান উপকরণে ভরা এই শিল্পরীতি ঘরের নিরস পরিবেশেও প্রাণ যোগ করতে পারে।

“তবে রিকশাচিত্রের আসবাব বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে, ঘরের অন্য সাজের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি বলেন”, এই অন্দরসজ্জাবিদ।

আসবাবের রং যদি খুব উজ্জ্বল হয়, তাহলে দেয়াল তুলনামূলক চোখের জন্য শান্ত ও হালকা রং রাখা যেতে পারে। সাদা, হালকা মাটির রং, হালকা ধূসর কিংবা মৃদু বাদামি দেয়ালের সামনে উজ্জ্বল দেশীয় নকশার আসবাব বেশি স্পষ্ট লাগে।

অন্যদিকে দেয়াল, পর্দা, কার্পেট ও অন্যান্য উপকরণেও যদি অনেক বেশি নকশা থাকে, তাহলে পুরো ঘর ভারী দেখাতে পারে।

তাই অনেক কারুকাজ করা আসবাবকে ঘরের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে রেখে, বাকি সাজ অপেক্ষাকৃত সরল রাখাই ভালো।

এখন খাবার টেবিলে, চেয়ারে, বসার লম্বা টুলে, ছোট আলমারিতে রিক্সা পেইন্ট করা হয়। এমন রিক্সায় ব্যবহার করা চকচকে ও রঙিন উপাদান দিয়েও টুল, চেয়ার নকশা করা হয়।

কেমন দেয়ালের রং ভালো

দেশীয় কারুকাজের আসবাবের সৌন্দর্য অনেকটাই নির্ভর করে তার চারপাশের রংয়ের ওপর।

গুলশান নাসরিন বলেন, “উজ্জ্বল নকশার আসবাব থাকলে দেয়ালের রং খুব বেশি চড়া না হওয়াই ভালো। মাটির কাছাকাছি রং, হালকা সাদা, মৃদু হলুদ, ধূসর, হালকা সবুজ বা কোমল বাদামি, এ ধরনের আসবাবকে সামনে নিয়ে আসতে পারে।

আবার ঘরে একেবারে আলাদা আমেজ আনতে দেয়ালে মাটির প্রলেপ দিয়ে নকশাও করা যায়। এতে অনেক বেশি দেশীয় আবেদন তৈরি হবে।”

যদি আসবাবের প্রধান রং গাঢ় হয়, তাহলে দেয়ালে হালকা রং ব্যবহার করলে ভারসাম্য তৈরি হবে। আবার কাঠের আসবাব বেশি থাকলে দেয়ালের উষ্ণ রং পুরো ঘরে স্বাভাবিক আবহ তৈরি করতে পারে।

আলোর দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। দিনের আলো প্রবেশ করে এমন জায়গায় রঙিন কাপড় ও কাঠের আসবাব রাখলে নকশার সূক্ষ্মতা ভালোভাবে ফুটে ওঠে।

রাতে খুব তীব্র আলো না দিয়ে কোমল আলো ব্যবহার করলে দেশীয় আসবাবের উষ্ণতা আরও বাড়ে।

সবকিছু একসঙ্গে নয়?

দেশীয় কারুকাজের প্রতি ভালোলাগা থেকে ঘরের প্রতিটি জায়গা নানান নকশার আসবাবে ভরে ফেললে, সেটা ভারি দেখাবে।

এতে আলাদা আলাদা জিনিসের সৌন্দর্যও হারিয়ে যেতে পারে। বরং একটি ঘরে একটি বড় কারুকাজকে প্রধান করে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছোট কয়েকটি উপকরণ যোগ করা যায়।

বসার ঘরে নকশিকাঁথার কাজ করা বড় আসন থাকলে পাশে সাধারণ কাঠের ছোট টেবিল রাখা যেতে পারে।

টেবিলের ওপর হাতে আঁকা পাত্র বা ছোট দেশীয় উপাদান থাকলেই যথেষ্ট।

আবার খাবার ঘরে কাঠের টেবিলের সঙ্গে রঙিন আসন ব্যবহার করা হলে, দেয়াল ও পর্দায় অতিরিক্ত নকশা না রাখার বিষয়ে মত দেন, এই অন্দরসজ্জাবিদ।

ছোট ঘরেও সম্ভব

দেশীয় কারুকাজের আসবাব মানেই বড় ঘর প্রয়োজন, এমন ধারণার প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

ছোট ঘরে একটি ছোট কাঠের টুল, হাতে কাজ করা কুশন, ছোট টেবিল বা বোনা ঝুড়িও যথেষ্ট হতে পারে।

জায়গা কম হলে বড় আসবাবের বদলে ছোট কিন্তু দৃষ্টিনন্দন জিনিসকে ঘরের প্রধান আকর্ষণ করা যায়।

ছোট বারান্দাতেও কাঠের চেয়ার ও রঙিন প্যাচওয়ার্ক কাপড়ের আসন রাখা সম্ভব। পাশে কয়েকটি গাছ থাকলে পুরো জায়গাটি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে।

এভাবে অল্প জায়গার মধ্যেই তৈরি হবে আলাদা বসার কোণ।

যত্নে টিকে থাকবে দীর্ঘদিন

দেশীয় কারুকাজের আসবাব যত্নের ক্ষেত্রেও একটু মনোযোগ চায়। কাঠের অংশ নিয়মিত শুকনো নরম কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করা ভালো। অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করলে কাঠের ক্ষতি হতে পারে।

কাঠের ওপর দীর্ঘ সময় ভেজা জিনিস রাখা উচিত নয়।

নকশিকাঁথা বা কাপড়ের অংশে ধুলো জমতে না দেওয়াই ভালো। খুব জোরে ঘষে পরিষ্কার না করে প্রয়োজন অনুযায়ী আলতোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

সরাসরি তীব্র রোদে দীর্ঘ সময় রাখলে কাপড়ের রং ম্লান হয়ে যেতে পারে। তাই জানালার পাশে রাখলেও আলো ও তাপের তীব্রতা বিবেচনা করা দরকার।

কেন বেছে নেবেন এমন আসবাব?

দেশীয় কারুকাজের আসবাব বেছে নেওয়ার বড় কারণ স্বতন্ত্রতা। একই ধরনের তৈরি আসবাবের ভিড়ে হাতে তৈরি আসবাব সহজেই আলাদা হয়ে ওঠে।

এ ধরনের আসবাব ঘরের সাজে সৌন্দর্য যোগের পাশাপাশি দেশীয় শিল্প ও কারুশিল্পের প্রতিও আগ্রহ তৈরি করে।