ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি
ভুল নিয়মে ওজন কমাতে গেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে।
আধুনিক ফিটনেস দুনিয়ায় মেদ ঝরানো এবং দ্রুত ওজন কমানোর জন্য আলোচিত ডায়েট পদ্ধতির একটি হল, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং।
চটজলদি শারীরিক পরিবর্তন আনার জন্য অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই সাময়িক উপবাসের নিয়মটি অন্ধের মতো বেছে নিচ্ছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি কোনো সুনির্দিষ্ট খাবারের তালিকা নয়, বরং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কখন খাবার খাওয়া হবে এবং কতক্ষণ খাবার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা হবে—তার একটি কঠোর সময়সূচি।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ওজন নিয়ন্ত্রণে দারুণ ভূমিকা রাখলেও, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার এই তীব্র ধকল সবার শরীরের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়।
শরীরের অভ্যন্তরীণ মেটাবলিজম ও হরমোনের ভারসাম্য না বুঝে ‘ফাস্টিং’ বা উপবাস করলে, ওজনের ভারসাম্য রক্ষা তো করেই না, উল্টো স্নায়ুতন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রকে অবশ করে দিতে পারে।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের ৫টি প্রচলিত পদ্ধতি
ফাস্টিং বা উপবাসের সময় সাধারণত ক্যালরিহীন পানীয় বা বিশুদ্ধ পানি পানের অনুমতি থাকে। প্রচলিত ৫টি কৌশল হল
১৬:৮ পদ্ধতি: এটি সবচেয়ে সাধারণ নিয়ম, যেখানে দিনে একটানা ১৬ ঘণ্টা সম্পূর্ণ উপবাস থেকে বাকি ৮ ঘণ্টার একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দিনের প্রয়োজনীয় খাবার খেতে হয়।
১৮:৬ বা ২০:৪ পদ্ধতি: এগুলো অত্যন্ত কঠোর ও উন্নত পদ্ধতি, যেখানে যথাক্রমে ১৮ বা ২০ ঘণ্টা না খেয়ে থেকে মাত্র ৬ বা ৪ ঘণ্টার মধ্যে পুষ্টির জোগান নিতে হয়।
৫:২ ডায়েট: সপ্তাহের ৫ দিন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সুষম খাবার খাওয়া হয় এবং বাকি ২ দিন শরীরে ক্যালরির পরিমাণ মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ তে নামিয়ে আনা হয়।
একদিন পর পর উপবাস: একদিন স্বাভাবিক খাবার খেয়ে, পরের দিন পুরোপুরি উপবাস বা নামমাত্র ক্যালরি গ্রহণ করা হয়।
২৪ ঘণ্টার উপবাস: সপ্তাহের যেকোনো এক বা দুই দিন একটানা ২৪ ঘণ্টা সমস্ত খাবার গ্রহণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
ভুল নিয়মে উপবাসের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
শুরুর দিকে এবং ভুল খাদ্যাভ্যাসের সমন্বয়ের কারণে শরীরে নিচে উল্লেখিত জটিলতাগুলো দ্রুত প্রকাশ পেতে পারে।
রক্তে গ্লুকোজের ঘাটতি ও তীব্র ক্ষুধা: দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে যায়, যা মস্তিস্কের ‘হাইপোথ্যালামাস’কে অতি-সক্রিয় করে তীব্র ক্ষুধা ও অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি করে।
মাথা ঘোরা ও কর্টিসল হরমোনের আধিক্য: গ্লুকোজের অভাবে মগজের ‘মেমোরি’ কোষে অক্সিজেনের প্রবাহ ধীর হয়ে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং তীব্র মাথাব্যথা দেখা দেয়।
খিটখিটে মেজাজ ও মনোযোগের অভাব: স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ বেড়ে যাওয়ার ফলে মস্তিস্কের জ্ঞানীয় ক্ষমতা কমে যায়, ফলে খিটখিটে মেজাজ ও কাজে তীব্র মনোযোগের অভাব ঘটে।
কোষ্ঠকাঠিন্য ও অন্ত্রের চলন স্তব্ধ হওয়া: দীর্ঘ সময় পরিপাকতন্ত্র অলস বসে থাকার কারণে অন্ত্রের স্বাভাবিক চলন বা মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায়, যা স্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট ফাঁপার সৃষ্টি করে।
পুষ্টির চরম ঘাটতি: খাওয়ার সময়গুলো অতিরিক্ত সংকুচিত করে ফেললে শরীর প্রয়োজনীয় প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং জরুরি ভিটামিন ও খনিজ শুষে নেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না।
ইনসুলিনের আধিক্য ও অতিরিক্ত খাওয়ার বাতিক: উপবাসের দীর্ঘ সময় শেষ হওয়ার পর ক্ষুধার চোটে অনেকেই একবারে প্রচুর পরিমাণে চর্বিযুক্ত জাঙ্ক ফুড খেয়ে ফেলেন। এই অতিরিক্ত খাবার রক্তে ইনসুলিনের তীব্রতা ঘটিয়ে পেটের চারপাশে জেদি চর্বি আরও বাড়িয়ে দেয়।
ইটিং ডিজঅর্ডারের গোপন ফাঁদ: এটি মানুষের স্বাভাবিক ক্ষুধা ও তৃপ্তির হরমোনাল চক্রকে বিকৃত করে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে খাবার নিয়ে এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর ও ক্ষতিকর মানসিক আচরণ তৈরি করে।
যাদের জন্য ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
- নিচে উল্লেখিত সংবেদনশীল শারীরিক অবস্থায় কোনো অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের লিখিত অনুমতি ও সরাসরি নির্দেশনা ছাড়া নিজের সিদ্ধান্তে উপবাস করা চরম বিপজ্জনক:
- গর্ভবতী নারী এবং স্তন্যদানকারী মা, কারণ ভ্রূণ ও শিশুর পুষ্টির জোগান বিঘ্নিত হয়।
- ক্রমবর্ধমান শিশু ও কৈশোর বা বাড়ন্ত বয়সের তরুণ-তরুণী।
- ডায়াবেটিসের কড়া ওষুধ বা নিয়মিত ইনসুলিন ব্যবহারকারী রোগী, কারণ এতে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার মতো প্রাণঘাতী ঝুঁকি থাকে।
- যাদের আগে থেকেই মারাত্মক অপুষ্টি, হরমোনের বিকৃতি কিংবা অতিরিক্ত কম ওজনের সমস্যা রয়েছে।
- অ্যানোরেক্সিয়া বা বুলিমিয়ার মতো গুরুতর ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’- এর ইতিহাস থাকলে।
শুধু না খেয়ে ভুঁড়ি কমে না
মনে রাখা জরুরি, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কোনো অলৌকিক বা জাদুকরী চর্বি কাটার মেশিন নয়। উপবাসের সময়টুকু পার করার পর প্লেটে কী রাখছেন— সেটিই ওজনের ভারসাম্য রক্ষার আসল চাবিকাঠি।
দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে ফাস্টফুড পুরোপুরি বর্জন করে খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, সবুজ শাকসবজি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ফলমূল রাখতে হবে। পাশাপাশি শরীরের কোষে কোষে আর্দ্রতা সচল রাখতে এবং লিভার-কিডনির ছাঁকন ক্ষমতা উন্নত রাখতে উপবাসের সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা বাধ্যতামূলক।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।
আরও পড়ুন
