গোয়াংজু: এক বিমানবন্দরেই আস্ত আধুনিক শহর
যে বিমানবন্দরে মানবশক্তির ঘাটতি মেটায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
আধুনিকতা, উন্নত প্রযুক্তির উৎকর্ষ, ঐতিহ্য এবং ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার এক অনন্য স্থাপনা গোয়াংজু বিমানবন্দর। কী নেই এখানে? চীনের এই বিমানবন্দর ঘুরে দেখার পর অবশ্য যে কেউ বলতে পারেন, এখানে কর্মী নেই! আসলেই তাই! অর্থাৎ সচরাচর বিমানবন্দরে যেমন প্রতিটি বিভাগে প্রচুর জনবলের উপস্থিতি (অন্তত দক্ষিণ এশিয়ার বিবেচনায়) দেখা যায়, এখানে তা একেবারেই নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার এতটাই বেশি যে, জনশক্তি খরচের প্রয়োজনই পড়ে না!
আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস-২০২৬ কাভার করতে জাপানে যাওয়ার আগে ইচ্ছে করেই চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স বেছে নেওয়া। কারণ, গোয়াংজু বিমানবন্দর। এটার আনুষ্ঠানিক নাম অবশ্য ‘গোয়াংজু বাইয়ুন এয়ারপোর্ট’। চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স, ফেডেক্স এক্সপ্রেস, নাইনএয়ার, হাইনান এয়ারলাইন্স এবং শেনঝেন এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম মূলত চলে এখানে। বোধহয় ‘চলে’ না বলে ‘ছোটে’ বলাই ভালো।
এখানে বিমানগুলো যেন খেলনার মতো সাজানো, গুনে শেষ করা কঠিন। একটু পরপরই উড়াল দিচ্ছে, অবতরণ করছে। ইন্টারনেটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এ বছরের প্রথম ছয় মাসে এই বিমানবন্দর দিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেছে ৪ কোটি ৩৩ লাখেরও বেশি যাত্রী। এত যাত্রীর উপস্থিতি সত্ত্বেও জটলা হয় না। জটলা জমবে কীভাবে? কাচে ঘেরা টার্মিনালের ভেতর থেকে দেখলাম, চারপাশে বিমান ওড়াউড়ি করছে পাখির মতো। দল বেঁধে মানুষ আসছে; ফিসফিস শব্দ আর ট্রলির চাকার ঘূর্ণনের মৃদুমন্দ শব্দে মুখরিত হয়ে উঠছে চারদিক, এরপর মুহূর্তেই বিমানবন্দর ফাঁকা!
এয়ারলাইন পর্যালোচনা প্রতিষ্ঠান ‘স্কাইট্র্যাক্স’-এর দৃষ্টিতে গোয়াংজু বিমানবন্দর চার তারকা মানের, যদিও এর দ্বিতীয় টার্মিনাল পেয়েছে পাঁচ তারকার স্বীকৃতি। ২০০০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত এ বিমানবন্দরটি ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ ও ‘এয়ার সিল্ক রোড’-এর আওতাধীন। বর্তমানে দুটি টার্মিনাল ও চারটি রানওয়ে দিয়ে ৮০টিরও বেশি এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম চলে। ২০২০ সালে এর তৃতীয় পর্যায়ের সম্প্রসারণ প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
তৃতীয় পর্যায়ের সম্প্রসারণে ডিজিটাল নির্মাণ ও ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ (আইওটি) থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (বিএইএম), আইটিউইন এবং সিমুলেশনের মতো উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে চালকবিহীন যান চলাচল ও স্মার্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিখ্যাত রোলস-রয়েসের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বেন্টলে’।
এই সম্প্রসারণ প্রকল্প সম্পন্ন হলে এখানে পাঁচটি রানওয়ে ও দুটি টার্মিনাল হবে। এর ফলে ১৪ কোটি যাত্রী এবং ৬০ লাখ টনেরও বেশি কার্গো ও ডাক পরিবহনের সক্ষমতা অর্জন করবে বিমানবন্দরটি। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের ব্যস্ততম ১০টি বিমানবন্দরের মধ্যে এটি নবম।
এতদিন এই বিমানবন্দরের গল্প পড়েছি বিভিন্ন লেখায়, শুনেছি অনেকের মুখে। সেই থেকে আগ্রহ। তাই জাপানের ওসাকায় যাওয়ার আগে এখানে বিরতি থাকা ফ্লাইট বেছে নেওয়া। সেই সুবাদে ২০ সেপ্টেম্বর ঘণ্টা চারেকের বিরতিতে হালকা ধারণা পাওয়ার সুযোগ মিলল। ফেরার দিন ২ অক্টোবরের বিরতি ছিল ১২ ঘণ্টারও বেশি। ফলে উৎসুক, কৌতূহলী চোখ ভরে ঘুরে দেখার সুযোগ ও সময় সবই পাওয়া গেল।
প্রথম দিন ভোররাতে যখন এলাম, প্রথম ভাবনা ছিল—এই বিশাল আঙিনায় হারিয়ে যাব না তো! ধারণাটা উবে গেল বিমান থেকে নামতেই। প্রতিটি পদক্ষেপে তিরচিহ্ন দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে গন্তব্য কোথায়। কোথাও কোথাও এক-দুজন দাঁড়িয়ে আছেন যাত্রীদের পথ দেখিয়ে দিতে। মাইকে তো বেজেই চলেছে জাপানে গেলে কোন দিকে যেতে হবে, কিংবা মস্কোগামী বিমান ধরার রাস্তা কোন দিকে।
প্রতিটি পদক্ষেপে পরিচ্ছন্নতার ছাপ, কোথাও এক টুকরো ময়লাও পড়ে নেই। খুঁজতে গেলে অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগবে। তিরচিহ্নিত দাগগুলো (বোর্ডে ও মেঝের টাইলসের ওপর থাকা) দেখে, মাঝে মাঝে এস্কেলেটরে চেপে এবং বাকিটা হেঁটে পৌঁছানো গেল ইমিগ্রেশনের প্রথম ধাপে। সেখানে বিমানবন্দরের কর্মী দেখা গেল বেশ কয়েকজন। প্রযুক্তির ভেলকি শুরু হলো এবার। বোর্ডিং পাস ও পাসপোর্ট মেলাতে সময় লাগল মাত্র ১০-১৫ সেকেন্ডের মতো! অবিশ্বাস্য মনে হয়।
দ্বিতীয় ধাপে সম্ভবত দেখা মিলল দুই-তিনজন কর্মীর। অথচ এই ধাপে গেটই ১০-১২টার মতো, আর যাত্রীর সংখ্যা হাজারখানেক! কিন্তু কফি পান করতে লাইনে যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তেমন কিছুই হলো না। বোর্ডিং পাস স্ক্যানারের ওপরের দিকে দিন, পাসপোর্ট রাখুন নিচের ধাপে; ব্যস, স্ক্যান কমপ্লিট! অটোমেটিক ছবি উঠে গেল। সবুজ বাতি জ্বলে উঠল এবং বিপ-বিপ আওয়াজ দিয়ে দুয়ার খুলে গেল। এক-দুজন ঠিকঠাক মেশিনে বোর্ডিং পাস ও পাসপোর্ট বসাতে পারছিলেন না, সহযোগিতার জন্য কর্মীরা এগিয়ে এলেন তা দেখিয়ে দিতে। হাতে গোনা কয়েকজনের কাজ হলো ম্যানুয়ালি। ইমিগ্রেশন শেষ চোখের পলকেই।
বিমানবন্দরে চেকিংয়ের বিড়ম্বনায় পড়েননি, এমন যাত্রী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ল্যাপটপ এক ট্রেতে রাখো, বেল্ট-মোবাইল-মানিব্যাগ আরেক ট্রেতে, জুতো আরেক ট্রেতে—এভাবে চার-পাঁচটা ট্রে নিয়ে ছুটতে হয় পাগলের মতো। কিন্তু এখানে সেই বালাই নেই। একটা ট্রেতে ল্যাপটপ আর পাওয়ার ব্যাংকের মতো বস্তু রাখা, ব্যাগপত্র ট্রেতে রাখা কিংবা জুতো-বেল্ট খোলার প্রয়োজনই নেই; চেকিং শেষ মুহূর্তেই!
তাই বলে বিষয়টা এমন নয় যে, নিরাপত্তার কমতি আছে একবিন্দু। এই জায়গায় ছবি তোলা কড়াভাবে নিষেধ। এত ক্যামেরা যে গুনে শেষ করা কঠিন। আকাশভরা তারার মতো ছাদভরা ক্যামেরা—সামনে, পেছনে, চারদিকে। প্রতিটি পদক্ষেপ যন্ত্রের চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্ক্যানারের পরীক্ষা হতেও বেশি দেরি হলো না। এক হাতে প্যান্ট আঁকড়ে ধরে আরেক হাতে ট্রে নিয়ে বিব্রতকরভাবে ছুটতে হলো না। স্ক্যান হওয়ার পর ল্যাপটপটা ব্যাগে আর মানিব্যাগ-মোবাইল পকেটে ভরে এবার বোর্ডিং গেটের দিকে আসার পালা।
আলোঝলমলে বিমানবন্দর দেখার শুরু। চারদিকে বাতি জ্বলে আছে—ছাদে, দেয়ালে, সবখানে। সারি সারি দোকান, সবই নামিদামি ব্র্যান্ডের। কাঠ ও ইস্পাতের মিশেলে তৈরি। কোথাও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চীনা ঐতিহ্য। এগুলো অবশ্য সব বিমানবন্দরেই কম-বেশি থাকে। তবে গোয়াংজুতে বাড়তি কিছু দেখার সুযোগ মিলেছে। যেমন: ওয়াশরুমের একটি ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা, অন্যটি পরিবারের জন্য। অর্থাৎ, আপনি স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে নিজের বাড়ির মতো তা ব্যবহার করতে পারবেন! নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর পানি পানের বন্দোবস্ত রয়েছে।
ধরুন, এই আলিশান বিমানবন্দরে আপনার বোর্ডিং গেট নম্বর ‘এ-১৩৪’, কিন্তু আপনি তা খুঁজে পাচ্ছেন না। চিন্তার কিছু নেই। নির্দিষ্ট দূরত্বেই বাক্সের মতো বসানো আছে। সেখানে স্ক্রিনে বিভিন্ন ভাষার ব্যবস্থা করা আছে। আপনাকে শুধু ম্যানুয়াল অনুযায়ী জানতে চাইতে হবে বোর্ডিং গেট কোনটি, বাথরুম কিংবা স্মোকিং রুম কোথায়। ব্যস, আঙুলের চাপে স্ক্রিনে মুহূর্তেই ভেসে উঠবে আপনার প্রয়োজনীয় স্থানে যাওয়ার মানচিত্র ও তথ্য। একপাশে লেখাও উঠবে কোন দিকে কত মিটার যেতে হবে। ফলে ‘এ-১৩৫’ থেকে ‘এ-৫০’ খুঁজে পেতে কাউকে তেমন বেগ পোহাতে হবে না।
বিশ্রামের জন্য প্রতিটি ফ্লোরে ও ব্লকে পর্যাপ্ত চেয়ার সারি সারি সাজানো তো আছেই, পাশাপাশি আছে আরামদায়ক সোফাও। এর চেয়ে বেশি আরাম করতে চাইলে ছোট্ট ঘরের মতো ব্যবস্থা আছে, যার নাম ‘পেইড ন্যাপ কেবিন’। সেখানে আপনি টাকা দিয়ে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত স্লিপিং চেয়ারে আরাম-আয়েশ করতে পারবেন। শিশুদের জন্য আছে ছোটোখাটো পার্ক এবং নার্সারি রুম। কোথাও কোথাও সবুজের ছোঁয়াও রাখা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন টবে। প্রতিটি ফ্লোরে এত অলিগলি, কিন্তু দারুণ গোছানো; হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় ঘুরে বেড়াতেও ক্লান্তি লাগে না।
ওসাকা যাওয়ার দিন বাসে করে সম্ভবত আরেক টার্মিনালে নেওয়া হলো। মিনিট দশেকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও হয়ে গেল। এত বিশাল বিমানবন্দর যে দৃষ্টিসীমায় ধরে না। ফেরার দিন ঘুরেফিরে সবচেয়ে বেশি দেখার সুযোগ হলো। এর মধ্যে ভোরের দিকে অন্যরকম এক দৃশ্য চোখে পড়ল। তখনও সূর্যের আলো ফোটেনি। আঁধার ফুঁড়ে চারধারে জোনাকি পোকার মতো বিজলি বাতি জ্বলছে। বিমানবন্দরে কর্মীদের ব্যস্ততা বাড়ছে। এতক্ষণ চেয়ারে, সোফায় ও মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঘুমিয়ে থাকা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত যাত্রীরা আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে। ভেসে আসছে পাইলট, কেবিন ক্রু ও বিমানবালাদের কণ্ঠ। এরই মাঝে সিঁড়ির নিচে নামাজ আদায় করছেন দুজন পুরুষ ও একজন নারী। গোয়াংজু যেন এই অল্প সময়ে প্রযুক্তি, শৈল্পিকতা ও আধুনিকতার বাইরেও অনেক কিছু দেখাল! তৃষ্ণার্ত চোখ দুটোও জুড়াল।
কিন্তু ঢাকায় ফিরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। কারণগুলো কারও অজানা নয়। মনে হচ্ছিল, আলাদিনের দৈত্য থাকলে তাকে বলতাম—গোয়াংজু বিমানবন্দরটা তুলে এনে ঢাকায় বসিয়ে দাও!
