Published : 17 Aug 2026, 02:45 AM
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন এক প্রজন্মের জন্ম হয়েছে, যারা কখনো ‘অফলাইন’ শব্দটির অর্থ বুঝতে শিখবে না। যাদের জীবনের প্রথম ছবিটি তোলা হয়েছে সম্ভবত তাদের জন্মের আগেই, মায়ের আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে। তারা যখন কথা বলতে শেখেনি, তার আগেই শিখে গেছে কীভাবে ইউটিউবে ‘স্কিপ অ্যাড’ বাটনে চাপ দিতে হয়। আমরা তাদের ডাকছি ‘জেন আলফা’ বা জেনারেশন আলফা বলে।
কিন্তু চারপাশের এই ছোট ছোট মানুষগুলোকে আমরা কি সত্যিই চিনি? নাকি তারা আমাদের চোখের সামনেই এক অচেনা ডিজিটাল জগতের বাসিন্দা হয়ে উঠছে?
এই প্রজন্মের গল্পটা শুরু করতে হলে আমাদের একটু অতীতে ফিরতে হবে। ২০০১ সালে শিক্ষাবিদ মার্ক প্রেনস্কি ‘অন দ্য হরাইজন’ সাময়িকীতে একটা প্রবন্ধ লিখলেন—‘ডিজিটাল নেটিভস, ডিজিটাল ইমিগ্র্যান্টস’। তার যুক্তি ছিল পরিষ্কার: যারা প্রযুক্তির ভেতরে জন্মেছে তারা ‘ডিজিটাল নেটিভ’ বা জন্মসূত্রে ডিজিটাল নাগরিক। আর আমরা যারা পরে প্রযুক্তি শিখেছি, তারা হলাম ‘ডিজিটাল ইমিগ্র্যান্ট’ বা অভিবাসী।
অভিবাসীরা নতুন ভাষা শিখলেও তাদের কথায় যেমন আগের ভাষার টান বা ‘অ্যাকসেন্ট’ থেকে যায়, আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনেও তা স্পষ্ট। আমরা আজও ইমেইল প্রিন্ট করে পড়ি কিংবা মেসেজ পাঠিয়ে ফোন করে নিশ্চিত হই, ‘পেয়েছ তো?’। জেন আলফার কাছে আমাদের এই আচরণগুলো রীতিমতো বিস্ময়কর!
এরপর আসা যাক ২০০৮ সালে। অস্ট্রেলীয় সমাজ-গবেষক মার্ক ম্যাককরিন্ডল ভাবলেন, জেন জেড-এর পরের প্রজন্মকে কী নামে ডাকা যায়? জরিপের পর সিদ্ধান্ত হলো, যেহেতু ল্যাটিন বর্ণমালা এক্স, ওয়াই, জেড দিয়ে শেষ হয়ে গেছে, তাই নতুন শুরুটা হবে গ্রিক বর্ণমালা দিয়ে। জন্ম নিল ‘জেন আলফা’। ২০০৯ সালে প্রকাশিত তার বই ‘দ্য এবিসি অব এক্সওয়াইজেড’-এ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রজন্মের পরিচয় তুলে ধরেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জার্নাল নয়, বরং মানুষের আকাঙ্ক্ষা থেকেই এই নামের উৎপত্তি।
২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যারা জন্মেছে, তারাই জেন আলফা। এই ২০১০ সালটি কিন্তু নিছক কোনো ক্যালেন্ডারের পাতা নয়। এই বছরটি ছিল প্রযুক্তির এক মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০১০ সালের এপ্রিলে স্টিভ জবস বাজারে আনলেন প্রথম ‘আইপ্যাড’। একই বছরের অক্টোবরে যাত্রা শুরু করল ‘ইনস্টাগ্রাম’। অর্থাৎ, একটি নতুন যন্ত্র আর একটি নতুন সামাজিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেই পৃথিবীর বুকে পা রাখল এই নতুন প্রজন্ম। ২০২৫ সালে যারা জন্ম নিয়েছে, তারা হলো ‘জেন বিটা’। জেন আলফার অধ্যায় ওই বছরই শেষ হয়ে গেছে।
তারা কেন আলাদা? জেন আলফাদের বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা আগের সব প্রজন্মের চেয়ে মৌলিকভাবে আলাদা। তাদের কাছে ডিজিটাল প্রযুক্তি কোনো আলাদা ‘টুল’ নয়, বরং তা অক্সিজেনের মতো স্বাভাবিক। একটি নতুন ফোন হাতে পেলে তারা ম্যানুয়াল খোঁজে না, বরং অবলীলায় আঙুল চালিয়ে সব বের করে ফেলে। তারা ‘গ্লোবাল’।
সিউলের কোনো মিউজিক ট্রেন্ড কিংবা প্যারিসের কোনো ভাইরাল ভিডিও একই দিনে ঢাকার কোনো শিশুর টাইমলাইনে চলে আসে। তারা ঘরকুনো নয়, বরং সামাজিকভাবে অনেক বেশি সক্রিয়, তবে সেই সমাজটা গড়ে ওঠে অনলাইনের কোনো গেমিং প্ল্যাটফর্মে। তারা যখন ঘরে একা বসে হেডফোন লাগিয়ে কথা বলে, তখন আসলে সে তার কয়েকশ মাইল দূরের কোনো বন্ধুর সঙ্গে ভার্চুয়ালি খেলছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তাদের শেখার ধরনে। তারা পড়ার চেয়ে ‘দেখতে’ বেশি ভালোবাসে। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে তারা এখন আর গুগলে টেক্সট খোঁজে না, বরং ইউটিউব বা টিকটকে ভিডিও দেখে শিখে নেয়। নানা গবেষণায় অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের মনোযোগ, ঘুম ও আচরণগত নানা সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নার্সিং গবেষণায় দেখা গেছে, এই শিশুদের সেবা দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, কারণ তাদের সংবেদনশীলতা আর পরিবেশে সাড়া দেওয়ার ভঙ্গি আগের প্রজন্মের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন।
বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা হলো সাড়ে ৪ কোটি ‘আলফা’। পরিসংখ্যানের শুষ্ক পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চমকপ্রদ সত্য। ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এর মধ্যে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশই শিশু, যাদের বয়স শূন্য থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। এর মানে হলো, আমাদের দেশে জেন আলফার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি! অর্থাৎ, বাংলাদেশের প্রতি চারজন মানুষের একজন এই ডিজিটাল প্রজন্মের সদস্য।
ঠিক দশ বছর পর, ২০৩৪ সালে এই সাড়ে ৪ কোটি মানুষ হবে তরুণ-তরুণী। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যাবে তাদের হাতে। কিন্তু আমরা কি তাদের জন্য প্রস্তুত? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সিদের প্রায় ৫৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে এবং ৩০ দশমিক ৬৮ শতাংশ ইন্টারনেটে অভ্যস্ত। দেশের ৭০ শতাংশ পরিবারে এখন অন্তত একটি স্মার্টফোন আছে। আর এই ফোনগুলোই হয়ে উঠছে শিশুদের একমাত্র খেলার মাঠ।
খবরের কাগজের একটি সত্য ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। ধানমন্ডির এক নামী স্কুলে কেজি শ্রেণিতে পড়ে সাড়ে চার বছরের এক শিশু। সকালের স্কুল শেষ করে বাসায় ফিরেই তার প্রথম দাবি, স্মার্টফোন। ফোন ছাড়া সে মুখে খাবার তোলে না। ইউটিউবের রঙিন ভিডিও দেখতে দেখতে সে ঘোরের মধ্যে খেয়ে নেয়। কিন্তু সমস্যা বাধে যখন মা ফোনটা সরিয়ে নিতে চান। শিশুটি তখন এমনভাবে চিৎকার করে, যেন তার প্রাণের কোনো অঙ্গ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তার মা আর্তনাদ করে বলেন, “এক সময় এই ফোন দিয়েই ওকে শান্ত রাখতাম, আজ এই ফোনটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।”
ইউটিউবের ‘কোকোমেলন’ চ্যানেলটির কথাই ধরুন। ১৯ কোটি ১০ লাখের বেশি সাবস্ক্রাইবার নিয়ে এটি জেন আলফার মগজে রাজত্ব করছে। একদিকে সাড়ে চার বছরের একটি অবুঝ শিশু, আর অন্যদিকে ১৯ কোটি সাবস্ক্রাইবারের বিশাল এক ইন্ডাস্ট্রি, এই অসম যুদ্ধে আমাদের শিশুরা আজ একা।
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘দ্য আটলান্টিক’-এর প্রচ্ছদে সাংবাদিক হানা রোজিন একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন, “এই প্রযুক্তি শিশুদের মস্তিষ্কে কী করছে?” তার ছেলে গিডিয়ন তখনো ঠিকঠাক কথা বলতে শেখেনি, ন্যাপি পরে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু সে অবলীলায় টাচস্ক্রিন চালাত। হানা রোজিন লক্ষ্য করেছিলেন, কোনো নির্দেশ ছাড়াই শিশুরা কীভাবে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে স্ক্রিন নিয়ন্ত্রণ করে। সাত হাজার শব্দের সেই দীর্ঘ প্রতিবেদনে রোজিন স্বীকার করেছিলেন, এর শেষ কোথায় তা কারো জানা নেই। কারণ ২০১০ সালের আগে পৃথিবীতে কোনো শিশুই টাচস্ক্রিন নিয়ে জন্মায়নি।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক স্যান্ড্রা কালভার্ট মনে করেন, প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো কাজে লাগানো জরুরি, কিন্তু এর সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ না করলে ফলাফল হতে পারে ‘ভয়াবহ’। আবার মার্ক প্রেনস্কি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আমাদের এই ভয়টা অনেকটা ‘বদলে যাওয়ার ভয়’। নতুনকে গ্রহণ করতে না পারার ভয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে জেন আলফা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। আমরা পশ্চিমা দেশের গবেষণা পড়ে আমাদের সন্তানদের বিচার করি। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর পারিবারিক কাঠামো, সংস্কৃতি আর আমাদের অর্থনীতি এক নয়। আমাদের দেশের শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ আলাদা। এই প্রায় সাড়ে ৪ কোটি শিশুর ঘুম, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভাষার বিকাশ কীভাবে ঘটছে, তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এখন সময়ের দাবি।
আমরা কি তবে প্রস্তুত এই জেন আলফাদের অভিভাবক হতে? কারণ তাদের হাতে থাকবে আগামীর বাংলাদেশ। তারা আমাদের চেয়ে বেশি তথ্য জানে, দ্রুত অ্যাপ ডাউনলোড করতে পারে, হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে গল্প করে রাত পার করে দেয়। কিন্তু তাদের আবেগ, তাদের মূল্যবোধ আর সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাটা তো যন্ত্র শেখাতে পারবে না।
আমাদের বুঝতে হবে, জেন আলফারা প্রযুক্তির শত্রু নয়, তারা প্রযুক্তিরই সন্তান। তাদের থেকে স্ক্রিন কেড়ে নেওয়া হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু তাদের সঙ্গে স্ক্রিনের বাইরেও যে এক বিশাল পৃথিবী আছে—ঘাস, মাটি আর রোদ্দুরের পৃথিবী—সেটা পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। আমরা কি পারব এই ডিজিটাল সন্তানদের জন্য এক চিলতে অফলাইন আকাশ উপহার দিতে? উত্তরটা সময়ের কাছে তোলা রইল, কারণ ২০৩৪ সাল আর খুব বেশি দূরে নয়।