১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিড়াল নিয়ে ঘোরাঘুরির হাজার বছরের ইতিহাস

আগেকার দিনে বিড়ালরা কীভাবে মানুষের সঙ্গে ঘুরত?

বিড়াল নিয়ে ঘোরাঘুরির হাজার বছরের ইতিহাস
বিড়াল পোষ মানানোর ইতিহাস অন্তত সাড়ে ৯ হাজার বছরের পুরনো, ছবি: সংগৃহীত।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jul 2026, 07:12 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

জানলার ধারের নরম রোদ আর বিকেলের অলস ঘুম, গৃহপালিত বিড়ালের কথা ভাবলে আমাদের চোখে এমন একটি ছবিই ভেসে ওঠে। অনেকের ধারণা, বিড়াল মানেই ঘরকুনো, অলস আর সমাজবিমুখ এক প্রাণী। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। 

আজকের এই যে আয়েশি বিড়াল, এরা একদিন মানুষের সঙ্গে পাড়ি দিয়েছিল দিগন্তের ওপারে, লড়াই করেছিল রণক্ষেত্রে, এমনকি টিকে ছিল ধর্মীয় উন্মাদনার কালবেলায়।

গল্পটা শুরু করা যাক আজকের প্রেক্ষাপট দিয়ে। রাজধানী ঢাকার বনানীর মেয়ে নাফিসা তারান্নুম। তার তিন বছর বয়সী বিড়ালটি সারাটা দিন জানলার পাশে কাটিয়ে দেয়। বাইরের গাছের ডালে পাখিদের ওড়াউড়ি আর কাঠবিড়ালির ছোটাছুটি সে মন দিয়ে দেখে। চোখেমুখে বুনো আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়, যেন সেও বাইরের ওই বিশাল জগতের অংশ হতে চায়। 

কিন্তু সাততলার ফ্ল্যাটে বন্দি বিড়ালকে চাইলেই বাইরে ছেড়ে দেওয়া যায় না। তাই সমাধান হিসেবে নাফিসা তাকে একটি ‘লিশ’ বা গলায় বাঁধার দড়ি কিনে দেয়। এখন রোজ বিকেলে তাকে নিয়ে সে কাছের গুলশান লেকের পাড়ে যায়। লোকে অবাক হয়ে দেখে, কুকুরের মতো বিড়ালকেও দড়ি ধরে ঘোরানো যায়! আসলে বিড়ালকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া কোনো নতুন ফ্যাশন নয়, বরং এটি হাজার বছরের পুরনো এক অভ্যাসেরই ফিরে আসা।

লরা মস নামে এক লেখক তার ‘অ্যাডভেঞ্চার ক্যাটস’ বইতে দেখিয়েছেন যে, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আমরা পাহাড়ে চড়া বা সমুদ্রে সার্ফিং করা বিড়ালের দেখা পাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু মানুষ ও বিড়ালের এই যৌথ ভ্রমণের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। 

মেল ও ফিওনা সানকুইস্ট তাদের ‘ওয়াইল্ড ক্যাটস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইতে লিখেছেন, মানুষ যেখানেই গেছে, সেখানেই তাদের সঙ্গে গেছে বিড়াল। নদী বা সমুদ্র, যা কি না অন্য প্রাণীদের জন্য চলাচলের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বিড়ালের জন্য তা ছিল বিশ্বভ্রমণের পথ। জাহাজ যখনই এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পণ্য নিয়ে যেত, সেই জাহাজের নাবিক দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বিড়াল।

বিড়াল পোষ মানানোর ইতিহাস অন্তত সাড়ে ৯ হাজার বছরের পুরনো। তবে এর সবচেয়ে বেশি দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন মিশরে। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের মিশরীয় চিত্রে বিড়ালকে লিশ বা দড়িতে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। তখন বিড়াল ছিল মহামূল্যবান এক ‘পেস্ট কন্ট্রোল’ বা আপদ দমনকারী যোদ্ধা। গুদামঘরের ইঁদুর মারার জন্য বিড়াল ছিল অপরিহার্য। 

মিশরীয়রা এই বিড়ালদের এতই ‘শ্রদ্ধা’ করত যে তারা বিড়ালকে দেবতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এমনকি ৫২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্য যখন মিশর আক্রমণ করে, তখন তারা এক বিচিত্র কৌশল অবলম্বন করেছিল। পারস্যের সৈন্যরা বিড়ালদের সঙ্গে নিয়ে রণক্ষেত্রে নামে। মিশরীয়রা তাদের দেবতা সমতুল্য প্রাণীর কোনো ক্ষতি করতে চায়নি বলে যুদ্ধ না করে পলায়ন করে।

মিশর থেকে লুকিয়ে বিড়াল বিদেশে পাচার করার মাধ্যমেই মূলত এদের বিশ্বভ্রমণ শুরু হয়। ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি গ্রিক মার্বেল খোদাইয়ে দেখা যায়, লিশে বাঁধা বিড়াল কুকুরের সঙ্গে লড়াই করছে। কিন্তু বিড়ালের এই সুসময় খুব বেশিদিন থাকেনি। মধ্যযুগে খ্রিস্টধর্মের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে বিড়ালের ভাগ্য বদলে যায়। 

১২৩৩ সালে পোপ নবম গ্রেগরি একটি ফরমান জারি করেন, যেখানে বিড়ালকে, বিশেষ করে কালো বিড়ালকে ‘শয়তানের প্রতীক’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী চারশ বছর ইউরোপে বিড়ালের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। ‘ডাইনি’ অপবাদ দিয়ে হাজার হাজার বিড়ালকে হত্যা করা হয়।

এত কিছুর পরও বিড়ালের ভ্রমণ কিন্তু থেমে থাকেনি। এর মূল কারণ ছিল তাদের ইঁদুর শিকারের অসামান্য দক্ষতা। সমুদ্রগামী জাহাজগুলোতে ইঁদুরের উপদ্রব কমানোর জন্য নাবিকরা গোপনে বিড়াল পুষতেন। এই বিড়ালরা শুধু ইঁদুরই মারত না, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় নাবিকদের একাকীত্ব দূর করত। ইতিহাসের বিখ্যাত অভিযাত্রী আর্নেস্ট শ্যাকলটনের অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের অন্যতম সঙ্গী ছিল ‘মিসেস চিপি’ নামক একটি বিড়াল। 

যদিও পরে জানা যায় সেটি ছিল পুরুষ বিড়াল, কিন্তু নামটা রয়ে যায়। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, শ্যাকলটনের জাহাজ বরফে আটকে যাওয়ার পর খাবারের অভাব দেখা দিলে মিসেস চিপিকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। আজও নিউ জিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে মিসেস চিপির একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি রয়ে গেছে সেই ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে।

শুধু সমুদ্রযাত্রায় নয়, বিড়ালরা রণক্ষেত্রেও সমান পারদর্শী ছিল। ভাইকিং নাবিকরা তাদের দীর্ঘ যাত্রায় বিড়াল সঙ্গে রাখতেন। ভাইকিং পুরাণে প্রেমের দেবী ফ্রেজার রথ টানত দুটি বিশাল বিড়াল। পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইঁদুর মারার জন্য এবং সৈন্যদের সঙ্গ দিতে প্রায় ৫ লাখ বিড়ালকে পরিখায় ও যুদ্ধজাহাজে রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় খোদ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের প্রিয় সঙ্গী ছিল ‘ব্ল্যাকি’ নামের একটি কালো বিড়াল। ১৯৪১ সালে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় চার্চিল ব্ল্যাকিকে নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন।

১৮ শতকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপে বিড়াল আবার তার হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে শুরু করে। ব্রিটেনের রানি মারিয়া বিড়ালকে উচ্চবিত্তের ফ্যাশন হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলেন। ১৮৭১ সালে লন্ডনের ক্রিস্টাল প্যালেসে হ্যারিসন উইয়ার প্রথম সমকালীন ‘ক্যাট শো’ আয়োজন করেন। বিড়ালকে নিয়ে মানুষের মধ্যে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। ফটোগ্রাফার হ্যারিসন পয়েন্টার তার তোলা বিড়ালের মজার মজার সব ছবির মাধ্যমে মানুষের মনে বিড়ালের জন্য এক কোমল জায়গা তৈরি করে দেন।

কিন্তু বিড়াল কেন কুকুরের মতো এত সহজে লিশে অভ্যস্ত হয় না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানে। কুকুর পোষ মেনেছে হাজার হাজার বছর আগে এবং তাদের বিশেষভাবেই মানুষের সঙ্গী হওয়ার জন্য ব্রিড বা প্রজনন করানো হয়েছে। কিন্তু বিড়ালরা এখনো ‘সেমি-ডোমেস্টিকেটেড’ বা আধা-গৃহপালিত। তারা নিজেদের বুনো সত্তাকে পুরোপুরি বিসর্জন দেয়নি। 

জিম ডেভিসের বিখ্যাত কমিক ‘গারফিল্ড’-এ বারবার দেখা যায় যে গারফিল্ড লিশ পরতে অস্বীকার করছে। আমাদের সমাজেও একটি ধারণা ছিল যে বিড়াল মানেই ‘মেয়েলি’ বা ঘরের কোণায় থাকার প্রাণী। ১৯২০-এর দশকে মস্কোর রাস্তায় যখন বিড়ালকে লিশে বেঁধে ঘোরানো হতো, তখন বিদেশিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। অথচ তখন বিড়ালের এত অভাব ছিল যে ইঁদুর মারার জন্য এই মূল্যবান প্রাণীদের বাইরে একা ছাড়া হতো না।

বিড়ালের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৪৭ সালে ‘ক্যাট লিটার’ বা বিড়ালের শৌচাগারের বালু আবিষ্কারের মাধ্যমে। এর ফলে বিড়ালকে আর ইঁদুর শিকারের জন্য বাইরে রাখতে হতো না, তারা হয়ে উঠল পুরোদস্তুর অন্দরের প্রাণী। তবে বর্তমানে ‘অ্যাডভেঞ্চার ক্যাটস’ মুভমেন্ট সেই পুরনো প্রথাকেই ফিরিয়ে আনছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভ্লাদিমির’ নামের একটি বিড়ালের কথা জানা যায়, যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব কটি ন্যাশনাল পার্কে ভ্রমণ করেছে। আছে ‘স্কাটি’ নামের এক বিড়াল, যে আটলান্টিক মহাসাগরে সার্ফিং করে বেড়ায়।

মূল লেখা: জ্যাকি ম্যানস্কি, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, ১৪ অগাস্ট ২০১৭।