২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

নিউটনের মাথায় সত্যিই কি আপেল পড়েছিল?

বিজ্ঞানের ইতিহাসে মোড় ঘোরানো ঘটনা এটি।

নিউটনের মাথায় সত্যিই কি আপেল পড়েছিল?
অলংকরণ: ডেনিশ চিত্রশিল্পী ও গল্পকার ফ্রিৎস আলফেল্ডট

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2026, 12:56 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:31 PM

ছোট্ট আইজ্যাক গাছের নিচে বসে আছেন, হঠাৎ টুপ করে একটি আপেল এসে সরাসরি তার মাথায় পড়ল, আর অমনি বেরিয়ে এল মহাকর্ষ সূত্রের মতো যুগান্তকারী কোনো ধারণা। 

শুনতে বেশ নাটকীয় মনে হলেও, বাস্তবে ঘটনাটি অবিকল এমনভাবে ঘটেনি। ইতিহাসের পাতা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য ঘাঁটলে আসল সত্যটা অন্যরকম এক মোড় নেয়, যা বিজ্ঞানপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছেও কৌতূহলোদ্দীপক।

১৬৪২ সালে ইংল্যান্ডের গ্রান্থামের কাছাকাছি এক কৃষক পরিবারে নিউটনের জন্ম। ১৬৬১ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন। কিন্তু এর চার বছর পর, অর্থাৎ ১৬৬৫ সালের দিকে দেশজুড়ে গুটিবসন্ত বা বুবনিক প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিল। তখন কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করল। 

এই আকস্মিক ছুটির কারণে তরুণ নিউটন নিজের শৈশবের বাড়ি উলসথর্প ম্যানরে ফিরে যেতে বাধ্য হন। ঐতিহাসিকদের মতে, এই উলসথর্পেই কাটানো দিনগুলোতেই তার জীবনের সেই বিখ্যাত মুহূর্তটির বীজ রোপিত হয়েছিল। ১৬৬৭ সালে নিউটন আবার কেমব্রিজে ফিরে যাওয়ার আগে এই গ্রামেই তার জীবনের মোড় ঘোরানো ঘটনাটি ঘটেছিল।

তবে প্রচলিত ধারণার মতো সেই আপেলটি যে সরাসরি নিউটনের মাথায় সজোরে আঘাত করেছিল, তার সপক্ষে কোনো ঐতিহাসিক বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। আসল ঘটনা হলো, উলসথর্প ম্যানরের বাগানে বসে নিউটন গাছের নিচে একটি আপেল মাটিতে পড়তে দেখেছিলেন। গাছ থেকে ফলটি খসে পড়ার দৃশ্যটি তার মনে কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। 

তিনি ভাবতে শুরু করেন, আপেলটি কেন সবসময় সোজাসুজি নিচের মাটির দিকেই পড়ে? সেটি কেন বাঁকা পথে বা সোজা আকাশের দিকে মহাশূন্যে ভেসে যায় না? এই সাধারণ অথচ গভীর পর্যবেক্ষণটিই তাকে পরবর্তীতে মহাকর্ষের সার্বজনীন সূত্র আবিষ্কারের পথে অনুপ্রাণিত করেছিল। প্রকৃতির সাধারণ একটি ঘটনা কীভাবে মানুষের চিন্তার দিগন্ত চিরতরে বদলে দিতে পারে, এটি তারই উদাহরণ।

দীর্ঘ সাধনা ও গবেষণার পর, ১৬৮৭ সালে নিউটন তার ‘প্রিন্সিপিয়া’ বইটি প্রকাশ করেন। এই ঐতিহাসিক বইটিতেই তিনি প্রথম মহাকর্ষের মূল সূত্রটি সবার সামনে নিয়ে আসেন। তার এই সূত্রে বলা হয়, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে নিজ নিজ দিকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণের বল বস্তু দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। 

শুধু তাই নয়, এই একই বইয়ে গতি নিয়ে তার বিখ্যাত তিনটি সূত্রও স্থান পায়, যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছিল। আপেল পড়ার সেই সামান্য পর্যবেক্ষণটি যে মানবসভ্যতাকে কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছিল, তা সত্যিই কল্পনাতীত।

তাহলে মাথায় আপেল পড়ার এই জনপ্রিয় গল্পটি কীভাবে এল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ঘটনার বহু বছর পর। ১৬২৬ সালের দিকে নিউটন এই আপেল সংক্রান্ত স্মৃতির কথা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু উইলিয়াম স্টুকলেকে জানান। পরবর্তীতে স্টুকলে তার ‘মেমোয়ার্স অব স্যার আইজ্যাক নিউটন্স লাইফ’ নামক জীবনীবইয়ে এই ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেন, যা ১৭৫২ সালে প্রকাশিত হয়। 

স্টুকলে তার লেখায় উল্লেখ করেছিলেন যে, একদিন দুপুরের খাওয়ার পর আবহাওয়া বেশ গরম থাকায় তারা দুজনে বাগানের ভেতর আপেল গাছের ছায়ায় বসে চা পান করছিলেন। সে সময় নিউটন তাকে বলেন যে, অতীতে যখন তিনি ঠিক এরকম এক মননশীল ও চিন্তিত পরিস্থিতিতে একটি আপেল গাছের নিচে বসেছিলেন, ঠিক তখনই মহাকর্ষের ধারণাটি তার মাথায় প্রথম এসেছিল। বন্ধুর এই জবানবন্দি থেকেই পরবর্তী সময়ে মানুষের মুখে মুখে কথাটি পরিবর্তিত হতে হতে এমন রূপ নেয় যে, আপেলটি সরাসরি বুঝি তার মাথায় এসেই পড়েছিল!

ইতিহাসের মহান গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন ১৭২৭ সালে মারা যান এবং তাকে সম্মানজনকভাবে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে সমাহিত করা হয়। নিউটনের জীবনের সেই ঐতিহাসিক আপেল গাছটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে উলসথর্প ম্যানরের বাগানে দিব্যি বেঁচে আছে এবং বেড়ে উঠছে। 

আমাদের সমাজে অনেক সময় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনের সাধনাকে একটু রোমাঞ্চকর ও রূপকথার মোড়ক দিতে এমন সব গল্প তৈরি করা হয়। মাথায় আপেল পড়ার বিষয়টি হয়তো পুরোপুরি সত্য নয়, কিন্তু সেই আপেলের পতন যে মানবজাতির বিজ্ঞানমনস্কতার দুয়ার চিরতরে খুলে দিয়েছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বিজ্ঞান সাধনার পেছনের এই সত্যটুকু জানা আমাদের বৈজ্ঞানিক ইতিহাসকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, হিস্ট্রি ডটকম