Published : 12 Sep 2026, 02:04 PM
আজকের দিনে আমরা যখন বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিই, তখন পকেটে থাকা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে একবার চোখ বুলিয়ে জেনে নিই আজ বৃষ্টি হবে নাকি রোদ উঠবে। স্যাটেলাইট, রাডার আর সুপারকম্পিউটারের এই যুগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া একদম ডালভাত। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের আগে মানুষ কীভাবে জানত যে কালকের আবহাওয়া কেমন হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কয়েক শতাব্দী। যখন কোনো আধুনিক আবহাওয়া দপ্তর ছিল না, তখন মানুষ আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান, মেঘের রং, এমনকি ব্যাঙ বা গরুর মতো প্রাণীদের আচরণের ওপর নির্ভর করে আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করত। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির আগে পর্যন্ত প্রকৃতি আর মহাবিশ্বই ছিল মানুষের আবহাওয়ার খবর জানার একমাত্র ভরসা।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৮৬১ সালের পহেলা অগাস্ট এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কর্মকর্তা রবার্ট ফিটজরয় সেদিন ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকায় প্রথমবারের মতো সর্বসাধারণের জন্য আধুনিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রকাশ করেছিলেন। তার সেই ঐতিহাসিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল যে, লন্ডনের তাপমাত্রা হবে ৬২ ডিগ্রি ফারেনহাইট, আকাশ থাকবে পরিষ্কার এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস বইবে।
শুধু লন্ডন নয়, যুক্তরাজ্যের আরও বেশ কয়েকটি শহর এবং ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসের আবহাওয়ার খবরও অন্তর্ভুক্ত ছিল সেই তালিকায়। রবার্ট ফিটজরয় ১৮৫৪ সাল থেকে লন্ডনের মেটিওরোলজিক্যাল অফিসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং আবহাওয়ার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতেন। সাত বছর পর তার দেওয়া এই পূর্বাভাসটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি আবহাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক আবহাওয়াগত পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন।
তবে ফিটজরয়ের এই আধুনিক পদ্ধতির উদ্ভাবনের বহু আগে থেকেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার কৌতূহল মানুষের মাঝে বিদ্যমান ছিল। আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার ওপর যেহেতু প্রাচীনকালের মানুষের কৃষিকাজ, নৌযাত্রা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল, তাই তারা চারপাশের পরিবেশ থেকে আগাম বার্তা পড়ার চেষ্টা করত। মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি থেকে শুরু করে আকাশের রং বদলানো, এমনকি পুকুর পাড়ের ব্যাঙ বা গোয়ালের গরুর আচরণের মতো সাধারণ বিষয়গুলোও হয়ে উঠেছিল তাদের পর্যবেক্ষণের প্রধান হাতিয়ার।
অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে ইউরোপীয় এবং আরব বিজ্ঞানীরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য সাধারণত ‘অ্যাস্ট্রোমেটিওরোলজি’ বা জ্যোতিষ-আবহাওয়াবিদ্যার আশ্রয় নিতেন। এই প্রাচীন চর্চাটির মূল ভিত্তি ছিল একটি বিশ্বাস—মহাকাশের অন্যান্য গ্রহ পৃথিবীর পরিবেশ ও আবহাওয়ার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অ্যাস্ট্রোমেটিওরোলজিস্টরা বিশ্বাস করতেন যে, মহাকাশে গ্রহগুলোর চলাচলের পথ এবং তাদের অবস্থান নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে পৃথিবীর আবহাওয়ার আগাম বার্তা পাওয়া সম্ভব।
ইউনিভার্সিটি অব রিডিং-এর ইতিহাসের অধ্যাপক অ্যান লরেন্স-ম্যাথারস, যিনি ২০১৯ সালে ‘মিডিয়াভাল মেটিওরোলজি’ নামের একটি বই লিখেছেন, এই সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছেন। তার মতে, এই জ্যোতিষ-আবহাওয়াবিদ্যার চর্চা শুরু হয়েছিল আনুমানিক দ্বিতীয় শতাব্দীতে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় পণ্ডিত টলেমির হাত ধরে। এরপর এ ধারণাটি পশ্চিম ইউরোপে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত প্রবলভাবে রাজত্ব করেছিল। সুদীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা এ বিদ্যাটি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে যখন আধুনিক বিজ্ঞানের আলো ফুটতে শুরু করল, তখন তার আবেদন হারাতে থাকে। সমাজের ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একসময় এটিকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার বদলে রীতিমতো হাসাহাসি ও উপহাসের পাত্রে পরিণত করেছিলেন।
টলেমি মূলত গ্রিক জ্যোতির্বিদ্যা এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আবহাওয়ার ওপর গ্রহের প্রভাব সম্পর্কিত তার তত্ত্বগুলো দাঁড় করিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে আরব জ্যোতির্বিদরা টলেমির সেই ধারণাগুলোর ওপর ভিত্তি করে আরও নতুন তত্ত্ব যোগ করেন এবং তাদের লেখা ও গবেষণাগুলো আবার পশ্চিম ইউরোপের চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করেছিল।
অ্যাস্ট্রোমেটিওরোলজির অন্যতম প্রধান একটি ধারণা ছিল যে, প্রতিটি গ্রহের পৃথিবীর ওপর আলাদা আলাদা এবং অনন্য প্রভাব রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শনি গ্রহ মহাকাশে তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে চলাচল করে, তাই বিজ্ঞানীরা মনে করতেন শনির প্রভাবে পৃথিবীতে শীত বা তীব্র ঠান্ডা নেমে আসে। অন্যদিকে বুধ গ্রহ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে বলে একে উষ্ণতা বা গরম আবহাওয়ার প্রতীক হিসেবে ধরা হতো।
টলেমির অ্যাস্ট্রোমেটিওরোলজিক্যাল মডেলে পৃথিবীকে সমগ্র মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে পোলিশ জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপারনিকাস তার যুগান্তকারী ‘সূর্যকেন্দ্রিক’ তত্ত্ব দিয়ে টলেমির এ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। কোপারনিকাস প্রমাণ করেন যে, পৃথিবী নয়, বরং সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা কোপারনিকাসের এ সূর্যকেন্দ্রিক মডেল মেনে নেওয়ার পরও জার্মান জ্যোতির্বিদ জোহানেস কেপলারের মতো অনেক বিজ্ঞানী অ্যাস্ট্রোমেটিওরোলজি বা গ্রহ-নক্ষত্র দিয়ে আবহাওয়া পূর্বাভাসের ধারণাকে সমর্থন করে গেছেন।
তবে এর মানে এই নয় যে সবাই এর যথার্থতা অন্ধভাবে বিশ্বাস করত। সে যুগে ‘অ্যালমানাক’ বা পঞ্জিকাগুলো অ্যাস্ট্রোমেটিওরোলজির ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস ছাপত। এই পঞ্জিকাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে যেমন জনপ্রিয় ছিল এবং প্রচুর পঠিত হতো, তেমনি শিক্ষিত মহলে এগুলো সমালোচিত ও উপহাসের শিকারও হতো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানীদের কাছে অ্যাস্ট্রোমেটিওরোলজি তার সমস্ত বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর পরও পঞ্জিকাগুলো এই পদ্ধতি ব্যবহার করে পূর্বাভাস দেওয়া চালিয়ে যায় এবং অবাক করা বিষয় হলো, বিশ্বের কিছু কিছু জায়গায় আজও এই প্রথার প্রচলন রয়ে গেছে।
গ্রহ-নক্ষত্র বা মহাকাশ পর্যবেক্ষণের চাইতেও আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার আরও একটি প্রাচীন পদ্ধতি ছিল, যা আধুনিক আবহাওয়া বিজ্ঞানের বিকাশের পরও দীর্ঘ সময় ধরে টিকে ছিল—আর তা হলো স্থানীয় লোকজ বিশ্বাস বা ফোকলোর। নিজের চারপাশের পরিবেশ এবং প্রাণীদের আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার এই চেষ্টা মানব ইতিহাসের অন্যতম পুরনো একটি অভ্যাস। প্রথম শতাব্দীতে রোমান লেখক এবং সামরিক কমান্ডার প্লিনি দ্য এল্ডার তার বই ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’-তে লিখেছিলেন যে, মানুষ সূর্য, সমুদ্র, মেঘ এবং প্রাণীর আচরণের মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে সক্ষম।
ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে যেমন আবহাওয়া এবং জলবায়ুর পরিবর্তন হয়, ঠিক তেমনি আবহাওয়া সম্পর্কিত লোকজ বিশ্বাস বা প্রবাদগুলোও অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের কিছু অংশে একটি অদ্ভুত লোকজ বিশ্বাসের প্রচলন ছিল। সেখানকার মানুষ কাচের বয়ামের ভেতর একটু পানি আর ছোট একটি কাঠের মই দিয়ে সেখানে একটি গেছো ব্যাঙ পুষত। তারা বিশ্বাস করত, এই ব্যাঙটির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে নিখুঁতভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। জার্মান ভাষায় এই ব্যাঙকে বলা হতো ‘ওয়েটারফ্রশ’ বা ‘আবহাওয়ার ব্যাঙ’।
বয়ামের ভেতরের সেই ব্যাঙটি যদি কাঠের মই বেয়ে ওপরের দিকে উঠত, তবে ধরে নেওয়া হতো যে সামনের দিনগুলোতে আবহাওয়া রৌদ্রোজ্জ্বল এবং পরিষ্কার থাকবে। আর ব্যাঙটি যদি মই বেয়ে নিচে নেমে পানিতে ডুব দিত, তবে তা আসন্ন বৃষ্টি বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সুস্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতো।
এই প্রথাটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জার্মান ভাষার বিভিন্ন ক্যাটালগে এই ব্যাঙ রাখার জন্য বিশেষ মই দেওয়া পাত্রের বিজ্ঞাপনও ছাপা হতো। মজার ব্যাপার হলো, জার্মান ভাষাভাষী মানুষ আজও কখনো কখনো আবহাওয়াবিদদের একটু হাস্যরস করে বা মজা করে ‘ওয়েটারফ্রশ’ বলে ডাকেন।
ইউনিভার্সিটি অব লিমেরিকের ইতিহাস ও ভূগোলের সহযোগী অধ্যাপক ক্যারল মুলানি-ডিগনাম তার একটি গবেষণার জন্য আয়ারল্যান্ডের ‘ন্যাশনাল ফোকলোর কালেকশন’ ঘাঁটতে গিয়ে আবহাওয়া সংক্রান্ত এমন অসংখ্য লোকজ বিশ্বাসের সন্ধান পান। এর মধ্যে বেশ কিছু বিশ্বাস সরাসরি প্রাণীদের আচরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যেমন, কোনো বিড়াল যদি আগুনের দিকে পিঠ দিয়ে বসে থাকে, তবে বুঝতে হবে যে খুব শিগগিরই বড় ধরনের কোনো ঝড় আসছে। আবার গরু যদি মাঠে ঘাস খাওয়ার বদলে ঘাসের ওপর শুয়ে বিশ্রাম নেয়, তবে তা নিশ্চিত বৃষ্টির পূর্বাভাস হিসেবে ধরা হতো। অধ্যাপক লরেন্স-ম্যাথারস স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি তার দাদির মুখে গরুর আচরণ সম্পর্কিত এই প্রবাদটি বহুবার শুনেছেন।
অধ্যাপক মুলানি-ডিগনাম ফোকলোর কালেকশনে এমন অনেক প্রবাদ খুঁজে পেয়েছেন যেগুলো তিনি নিজের ছোটবেলায়ও শুনে বড় হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত প্রবাদটি হলো: “রাতে লাল আকাশ মেষপালকের জন্য আনন্দের, কিন্তু সকালে লাল আকাশ মেষপালকের জন্য সতর্কবার্তা।” এই বহুল প্রচলিত প্রবাদটির অবশ্য অঞ্চলভেদে নানা রূপভেদ রয়েছে। কোথাও কোথাও ‘মেষপালক’-এর জায়গায় ‘নাবিক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, কারণ সমুদ্রযাত্রায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস ছিল জীবন-মরণের প্রশ্ন।
তবে এই প্রবাদটির সবচেয়ে প্রাচীন উৎস খুঁজে পাওয়া যায় বাইবেলের গসপেল অব ম্যাথিউ-তে। কিং জেমস বাইবেলে যিশুখ্রিস্টের একটি উক্তিতে বলা হয়েছে: “সন্ধ্যাবেলায় যখন আকাশ লাল হয়ে ওঠে, তখন তোমরা বলো আবহাওয়া ভালো থাকবে। আর সকালে যখন আকাশ লাল এবং মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তখন তোমরা বলো আজ আবহাওয়া খারাপ হবে।”
মুলানি-ডিগনাম বলেন, তার ক্লাসের অনেক শিক্ষার্থীই হয়তো আবহাওয়া নিয়ে এসব লোকজ প্রবাদের কথা কখনো শোনেনি। তবে যতগুলো প্রবাদ বা প্রথা প্রচলিত রয়েছে, তার মধ্যে এই ‘লাল আকাশ’ বা রেড স্কাই-এর ধারণাটিই তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত এবং অনেকেই এটি সহজে চিনতে পারে। আধুনিক যুগে রাডার আর স্যাটেলাইটের নিখুঁত পূর্বাভাসের ওপর আমরা যতই নির্ভরশীল হয়ে পড়ি না কেন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই নিবিড় পর্যবেক্ষণ আর লোকজ বিশ্বাসগুলো আজও ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য এবং আকর্ষণীয় অংশ হয়ে টিকে আছে।
সূত্র: হিস্ট্রি ডটকম