Published : 04 Aug 2026, 01:29 PM
প্রাচীন রোমানদের বিশাল সব অট্টালিকা, গ্ল্যাডিয়েটরদের রোমাঞ্চকর লড়াই, জুলিয়াস সিজারের বীরত্বগাথা কিংবা শৌর্যবীর্যের অনেক গল্পই আমরা জেনেছি। কিন্তু এসব জমকালো ইতিহাসের আড়ালে এমন কিছু দৈনন্দিন জীবনের গল্প লুকিয়ে আছে, যা শুনলে আজকের দিনের যেকোনো মানুষের চোখ কপালে উঠতে পার। বিশেষ করে সেই আমলের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের একটি জরুরি বিষয়, তাদের শৌচাগার বা টয়লেট ব্যবহারের নিয়মকানুন।
এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন অ্যান ওলগা কোলোস্কি-অস্ট্রো নামের এক মার্কিন নৃবিজ্ঞানী। দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে তিনি প্রাচীন রোমের ধ্বংসাবশেষের নর্দমা আর শৌচাগার নিয়ে কাজ করছেন। তার কাজের ধরন এতই ব্যতিক্রমী যে, গবেষক মহলে তিনি ‘কুইন অব ল্যাট্রিনস’ বা ‘শৌচাগারের রানি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
তার মতে, কোনো সভ্যতার মানুষ কীভাবে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করত, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে সেই সমাজ সম্পর্কে অনেক অজানা আর চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। সাংবাদিক ও লেখক লিনা জেলদোভিচ তার ‘দ্য আদার ডার্ক ম্যাটার’ নামের বইটিতে প্রাচীন রোমের এই শৌচাগার ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছেন, যা আজকের দিনের আধুনিক মানুষের কাছে বিস্ময়করই ঠেকবে।
প্রাচীন রোমানদের শৌচাগার কেমন ছিল, তার একটি বাস্তব উদাহরণ দেখতে চাইলে আধুনিক তুরস্কের ইফেসাস শহরের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে যেতে হবে। দ্বিতীয় শতাব্দীর দিকে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন শহরে একসময় প্রায় তিন থেকে চার লাখ মানুষের বসবাস ছিল। ধ্বংসাবশেষের ভেতরে প্রবেশ করলে পর্যটকদের চোখে আজও এমন এক স্থাপনা ধরা পড়ে, দেখলে প্রথমে বিশ্বাসই হতে চায় না যে এটি একটি পাবলিক টয়লেট।
সেখানে একটি বড় খোলা জায়গায় লম্বা এক সারি সাদা মার্বেল পাথরের বেঞ্চ বাঁধানো রয়েছে। সেই বেঞ্চের ওপর নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর আধুনিক কমোডের মতো গোল গোল গর্ত করা। পেছনে এরকম আরও দুটো সারি রয়েছে। এই পুরো জায়গাটিতে চাইলে ছোটখাটো একটা দল অনায়াসেই একসঙ্গে বসে যেতে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই গর্তগুলো একে অপরের এত কাছাকাছি অবস্থিত যে পাশাপাশি বসা দুজনের মাঝে কোনো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি বজায় রাখার কোনো উপায়ই ছিল না। মাঝখানে কোনো আড়াল, দেওয়াল বা পার্টিশন দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল না। অর্থাৎ, ডজনখানেক অচেনা মানুষের ঠিক গা ঘেঁষে বসেই সবাইকে নিজেদের এই একান্ত ব্যক্তিগত কাজটি সারতে হতো!
আধুনিক যুগের মানুষের কাছে এমন দৃশ্য কল্পনা করাও যেন অস্বস্তিকর। শৌচাগারে সবার সামনে উন্মুক্ত অবস্থায় বসে থাকার কথা ভাবলেই আমাদের গা গুলিয়ে আসে। কিন্তু রোমানদের কাছে বিষয়টি মোটেও অস্বস্তিকর ছিল না। তাদের এই শৌচাগারগুলোকে ল্যাটিন ভাষায় বলা হতো ‘ফোরিকে’, যা সাধারণত সাধারণ স্নানাগার বা পাবলিক বাথের সঙ্গে যুক্ত থাকত। স্নানাগারের ব্যবহৃত পানি দিয়েই এই শৌচাগারের বর্জ্য ফ্লাশ করে নর্দমায় ফেলা হতো। আসনের ঠিক নিচে পাথর বাঁধানো একটি গভীর নালা বা ড্রেন থাকত, যা দিয়ে শহরের বর্জ্য ভেসে শহরের বাইরে চলে যেত।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, মানুষের কি বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ ছিল না? আসলে রোমান সাম্রাজ্য টিকে ছিল প্রায় দুই হাজার বছর। আফ্রিকা থেকে শুরু করে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল সাম্রাজ্যে জায়গা ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শৌচাগার ব্যবহারের ধরনেও কিছুটা ভিন্নতা ছিল। তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে, বর্তমান যুগের মানুষের মতো রোমানদের কোনো জড়তা বা সংকোচ ছিল না। তারা গায়ে গা ঘেঁষে বসতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। রোমান থিয়েটারে যেমন তারা খুব কাছাকাছি বসে নাটক দেখত, তেমনি দলবেঁধে একসঙ্গে শৌচকর্ম করতেও তাদের অস্বস্তি হতো না।
এর পেছনে তাদের পোশাকের একটি বড় ভূমিকা ছিল। প্রাচীন রোমানরা ‘টোগা’ নামের একধরনের ঢিলেঢালা লম্বা পোশাক পরত। আজকাল শৌচাগারে গেলে মানুষের যেমন প্যান্ট খুলতে হয়, রোমানদের টোগা পরার কারণে সেই সমস্যা ছিল না। তারা কেবল টোগাটি কিছুটা গুটিয়ে আসনে বসে পড়ত। ফলে তাদের সেই লম্বা পোশাকটাই চারপাশ থেকে একটা ছোট্ট তাঁবুর মতো প্রাকৃতিক আড়াল বা পর্দা তৈরি করত। কেউ চাইলে অন্যদের মাঝে বসেও বেশ গোপনীয়তার সঙ্গেই নিজের কাজ সেরে উঠে চলে আসতে পারত।
শৌচকর্ম তো হলো, কিন্তু এখন পরিষ্কার হওয়ার উপায় কী? আধুনিক যুগের মতো নরম আর সুগন্ধি টয়লেট পেপারের চল তখনো শুরু হয়নি। রোমানরা শৌচকর্মের পর নিজেদের পরিষ্কার করার জন্য একধরনের যন্ত্র ব্যবহার করত। মার্বেল পাথরের বেঞ্চের ঠিক নিচ দিয়ে মেঝের ওপর দিয়ে অগভীর নালা বয়ে যেত, যেখানে সবসময় পরিষ্কার পানির স্রোত থাকত। রোমানরা লাঠির মাথায় একটি সামুদ্রিক স্পঞ্জ আটকে নিয়ে সেটি ব্যবহার করত। ওই ছোট নালায় বয়ে চলা পরিষ্কার পানিতে স্পঞ্জটি ভিজিয়ে নিয়ে তারা পরিচ্ছন্নতার কাজ সারত। নরম ও আরামদায়ক এই বস্তুটিকে বলা হতো ‘টেরসোরিয়াম’, যার আক্ষরিক অর্থ ‘মোছার জিনিস’।
শুনতে বেশ উদ্ভাবনী মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল স্বাস্থ্যঝুঁকি। রোমানরা হয়তো বেশ আয়েশ করেই শৌচকর্ম সারত, কিন্তু পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে তারা একেবারেই উদাসীন ছিল বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপারটি হলো, লাঠির মাথায় লাগানো ওই একটিমাত্র স্পঞ্জ শৌচাগারে আসা সবাই বারবার ব্যবহার করত! কাজ শেষে হয়তো তারা সেটা একটু পানিতে ধুয়ে আবার রেখে দিত পরবর্তী মানুষের ব্যবহারের জন্য।
অর্থাৎ, কোনো একজন মানুষের পেটে যদি কৃমি বা কোনো সংক্রামক রোগ থাকত, তবে ওই একই স্পঞ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে তা শৌচাগারে আসা বাকি সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। রোগবালাই বা জীবাণু কীভাবে ছড়ায়, সে সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞানের মতো কোনো ধারণা তখনো মানুষের ছিল না। তাই রোমানদের এই শৌচাগার ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই ‘ ‘স্বাস্থ্যসম্মত’ বলার উপায় নেই।
আজকের দিনে ইফেসাস বা রোমের ধ্বংসাবশেষে ঘুরতে গেলে রোদে চকচক করা সাদা মার্বেল পাথরের আসনগুলো দেখে প্রাচীন শৌচাগারগুলোকে বেশ ছিমছাম আর সুন্দর মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যবহারের সময় পরিস্থিতি মোটেও এমন ছিল না। এই পাবলিক টয়লেটগুলো মোটেও বিলাসবহুল কোনো জায়গা ছিল না। ছাদ ছিল খুবই নিচু, আর জানালা বলতে গেলে ছিলই না। ফলে ভেতরে আলো-বাতাস প্রায় ঢুকতই না বললেই চলে।
স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার পরিবেশের কারণে মানুষ অনেক সময় ঠিক গর্তের ভেতর কাজ না সেরে বাইরেও ময়লা ফেলে রাখত। ফলে মেঝে আর আসনগুলো নোংরা হয়ে থাকত। চারপাশ গন্ধে ম-ম করত। মার্বেল পাথরগুলো যে কেউ নিয়মিত ঘষেমেজে পরিষ্কার করে রাখবে, সেই ব্যবস্থাও ছিল না। পরিবেশ এতটাই বৈরী ও অস্বাস্থ্যকর ছিল যে, অভিজাত রোমানরা নিতান্ত দায়ে না পড়লে বা খুব বেশি বিপদে না পড়লে ভুলেও এসব জায়গায় পা রাখত না। নারী বা শিশুরাও সাধারণত এই শৌচাগার ব্যবহার করতে আসত না, কারণ অন্ধকার পরিবেশে চুরি বা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের ভয় ছিল।
রোমের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, ওস্টিয়া অ্যান্টিকায় থাকা প্রাচীন রোমান শৌচাগার, সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন।
তাহলে এই শৌচাগারগুলো কাদের জন্য বানানো হয়েছিল? উত্তর হলো, দরিদ্র মানুষ আর দাসদের জন্য। তবে মজার ব্যাপার হলো, উচ্চবিত্ত রোমানরাই নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে এই শৌচাগারগুলো তৈরি করে দিতেন। কিন্তু মোটেও দয়া বা মানবতার খাতিরে এই কাজ করতেন না, এগুলো বানাতেন কেবল নিজেদের স্বার্থে। শহর যত বড় হচ্ছিল, সাধারণ মানুষের সংখ্যা তত বাড়ছিল। এই বিশাল জনসংখ্যার বর্জ্য ফেলার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা না থাকলে সবাই হয়তো রাস্তাঘাটেই ময়লা ফেলা শুরু করত।
অভিজাত লোকেরা যখন ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বা পায়ে হেঁটে শহরে বের হবেন, তখন তাদের যেন এসব ময়লার স্তূপ ডিঙিয়ে চলতে না হয়, রাস্তার পরিবেশ যেন দুর্গন্ধে ভরে না যায়, কেবল সেই উদ্দেশ্যেই তারা দরিদ্রদের জন্য পাবলিক টয়লেট বানিয়ে দিতেন। অভিজাতরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পাশে বসে শৌচকর্ম করতে চাইতেন না, যাদের গায়ে উকুন, খোসপাঁচড়া বা নানা রকম চর্মরোগ ছিল।
পাবলিক টয়লেট এড়িয়ে চলার পেছনে অভিজাতদের আরও একটি বড় কারণ ছিল ড্রেনের পরিবেশ। মূল শৌচাগারের নিচে যে অন্ধকার গর্ত বা নর্দমা থাকত, তা ছিল ইঁদুর, বিষাক্ত সাপ আর মাকড়সার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যেকোনো সময় নিচ থেকে এগুলো উঠে এসে শৌচাগার ব্যবহারকারীর ওপর হামলা করতে পারত। এখানেই শেষ নয়, মলমূত্র দীর্ঘদিন ধরে পচে ওই গর্তের ভেতর প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস তৈরি হতো। মিথেন একটি দাহ্য গ্যাস। অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত গ্যাসের কারণে বা ছোট্ট কোনো আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে হঠাৎ করেই শৌচাগারের গর্ত থেকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠত!
এসব বিপদ থেকে বাঁচতে অভিজাত নাগরিকরা নিজেদের বিলাসবহুল বাড়িতে ব্যক্তিগত শৌচাগার তৈরি করে নিতেন। কিন্তু দুর্গন্ধ ও কীটপতঙ্গের ভয়ে তারা নিজেদের সেই ব্যক্তিগত শৌচাগারকে শহরের মূল নর্দমার সঙ্গে যুক্ত করতেন না। এর বদলে তারা বাড়ির ভেতরে চেম্বার পট বা বিশেষ পাত্র ব্যবহার করতেন। পরে বাড়ির দাসরা সেই পাত্রের ময়লা বাগানে ফেলে আসত বা গর্তে পুঁতে রাখত। যারা আরও বেশি ধনী ছিল, তারা টাকা দিয়ে মলমূত্র পরিষ্কার করার জন্য লোক রাখত, যাদের বলা হতো ‘স্টেরকোরারি’। এরা পাত্র বা গর্ত থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে কৃষকদের কাছে সার হিসেবে বিক্রি করে দিত।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই রোমের বিখ্যাত নর্দমা ব্যবস্থার কথা মাথায় আসছে। রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতার চূড়ান্ত শিখরে থাকাকালীন খোদ রোম শহরকে প্রতিদিন প্রায় দশ লাখ মানুষের বর্জ্য সামলাতে হতো। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রোমানরা নির্মাণ করেছিল সুবিশাল ভূগর্ভস্থ নর্দমা ব্যবস্থা, যার নাম ছিল ‘ক্লোয়াকা মাক্সিমা’ বা 'মহান নর্দমা'। এটি প্রাচীন বিশ্বের প্রকৌশলবিদ্যার এক অন্যতম বিস্ময়।
প্রথমে এই নর্দমা মূলত শহরের নিচু এলাকার জলাভূমি সেঁচতে এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটি শহরের সমস্ত পাবলিক টয়লেট, স্নানাগার এবং রাস্তার বর্জ্য অপসারণের প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়। নর্দমাগুলো এতটাই প্রশস্ত এবং গভীর ছিল যে, ইতিহাসবিদদের মতে এর ভেতর দিয়ে ছোট নৌকায় চড়ে পরিদর্শকরা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনায়াসে ঘুরে বেড়াতে পারতেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, শহরের বেশিরভাগ অভিজাত বা সাধারণ মানুষের বাড়ির ব্যক্তিগত শৌচাগারগুলো এই মূল নর্দমার সঙ্গে যুক্ত ছিল না; এটি মূলত ব্যবহৃত হতো পাবলিক বাথহাউস এবং রাস্তার ময়লা নিষ্কাশনের কাজেই।
রোমের এই সুপরিকল্পিত নর্দমা ব্যবস্থা শহরের ভেতরের রাস্তাঘাট হয়তো পরিষ্কার রেখেছিল, কিন্তু পরিবেশের জন্য তা মোটেও ভালো কিছু বয়ে আনেনি। কারণ, ক্লোয়াকা মাক্সিমা শহরের সমস্ত বর্জ্য সরাসরি ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলত রোমের বুক চিরে বয়ে চলা টাইবার নদীতে। ফলে পানিবাহিত রোগ সবসময় লেগেই থাকত। মানুষের গড় আয়ুও সে যুগে বেশ কম ছিল।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন।