Published : 30 Jun 2026, 02:50 PM
সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কথাসাহিত্যিক ওরহান পামুক। ১৯৫২ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে জন্ম নেওয়া এই লেখক ২০০৬ সালে প্রথম তুর্কি নাগরিক হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তার বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘দ্য হোয়াইট ক্যাসেল’, ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’, ‘মাই নেম ইজ রেড’ এবং ‘স্নো’ অন্যতম।
পামুকের উপন্যাসে রাজনৈতিক জটিলতা, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন আর দর্শন যেভাবে উঠে আসে, ঠিক তেমনি তার ব্যক্তিগত স্মৃতিকথায় মিশে আছে শৈশবের ইস্তাম্বুল- যার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ জুড়ে ছিল ফুটবল ও তার রূপকথা। মূলত মানুষের চেনা আবেগ আর সমাজের গভীর ক্ষতগুলোকে শব্দের ফ্রেমে বন্দি করার কারিগর তিনি।
২০০৮ সালের ইউরো কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে এ সাহিত্যিকের মুখোমুখি হয়েছিলেন দুই জার্মান সাংবাদিক ও ক্রীড়া বিশ্লেষক- ক্রিস্টফ বিয়ারম্যান ও লোথার গরিস। ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী জার্মান সংবাদ ম্যাগাজিন ‘স্পিগেল ইন্টারন্যাশনাল’-এ নেওয়া এ সাক্ষাৎকারে পামুক মেলে ধরেছেন তার শৈশবের ফুটবল-উন্মাদনা, তুরস্কের সমাজ-রাজনীতি এবং ফুটবলের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক। সেই ঐতিহাসিক আড্ডাটির কিছু অংশ বাংলায় রূপান্তর করা হল:
স্পিগেল: আপনি কি ফুটবলের উগ্র ভক্ত বা ফ্যান?
পামুক: শৈশবে অন্তত তা-ই ছিলাম। আমাদের বাড়িতে তখন যা চলত, তাকে আজকের দিনে নির্দ্বিধায় ‘ধর্মান্ধতা’ বলা যায়। আমার এক চাচা ছিলেন গ্যালাটাসারাই ক্লাবের সমর্থক, আরেক চাচা বেসিকতাসের ফ্যান; আর আমার বাবা এবং আমাদের ঘরের অংশটা ছিল ফেনাহবাচের অন্ধ ভক্ত (গ্যালাটাসারাই, বেসিকতাস ও ফেনাহবাচ- তিনটিই তুর্কি ফুটবল ক্লাব)।
স্পিগেল: আপনার বাবা কি আপনাকে স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতেন?
পামুক: হ্যাঁ, প্রায়ই নিয়ে যেতেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, স্টেডিয়ামের সেই বড় মুহূর্তগুলোর কথা বললে আমার কোনো গোলের দৃশ্য মনে পড়ে না। আমার চোখে আজও ভাসে- খেলা শুরুর ঠিক আগে ফেনাহবাচের খেলোয়াড়রা যখন মাঠে ঝড় তুলে ঢুকত, সেই দৃশ্যটা। হলুদ জার্সির কারণে ওদের ‘ক্যানারি পাখি’ বলা হতো। আমার মনে হতো, একটা খাঁচার ছোট ফুটো দিয়ে একঝাঁক ক্যানারি ডানা ঝাপটে মাঠে উড়ে আসছে। দৃশ্যটা দারুণ কাব্যিক ছিল, আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
স্পিগেল: কিন্তু ‘ফেনাহবাচে’ ক্লাবটিকেই কেন বেছে নিলেন?
পামুক: এটা অনেকটা ধর্মের মতো। এখানে কোনো ‘কেন’ বা যুক্তির জায়গা নেই। আমি আজও ১৯৫৯ সালের ফেনাহবাচে দলের পুরো লাইনআপ কবিতার মতো হুবহু মুখস্থ বলে দিতে পারি। অবশ্যই এর পেছনে বাবার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার একটা ব্যাপার ছিল। আমরা সবসময় ভিআইপি গ্যালারির পাশে মেইন স্ট্যান্ডে বসতাম। পাশের সেই ভিআইপিদের দেখতে অবিকল বের্টোল্ট ব্রেখটের নাটকের পুঁজিপতিদের মতো লাগত। পুরো ম্যাচ জুড়ে তারা চুরুট ফুঁকতেন- যা তখন বড়লোকির লক্ষণ ছিল।
বসফরাস থেকে আসা বাতাসে সেই চুরুটের ধোঁয়া এসে আমার চোখে লাগত আর আমার চোখ দিয়ে জল পড়ত। ম্যাচের সময় তারা খেলোয়াড়দের এমনভাবে গালিগালাজ করতেন, যেন কোনো কারখানার মালিক তার বোকা শ্রমিকদের বকছেন। আমার ভীষণ খারাপ লাগত তা দেখে।
স্পিগেল: কেন? ফুটবল স্টেডিয়ামে তো এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক!
পামুক: না, একজন হতাশ ভক্ত যেভাবে গালি দেয়, তা তেমন ছিল না। তারা খেলোয়াড়দের মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন না, আমার মতো বীরের চোখে দেখতেন না। মাঝেমধ্যে তো তারা ম্যাচের মাঝেই ব্যবসার আলাপ জুড়ে দিতেন! আমার মনে হতো, এতে আমার নায়কদের অপমান করা হচ্ছে।
স্পিগেল: আপনার সেই ‘নায়ক পূজার’ ধরনটা কেমন ছিল?
পামুক: আমি চুইংগামের সঙ্গে পাওয়া ফুটবলারদের ভিউকার্ড জমাতাম। প্রতি সোমবার পত্রিকা থেকে ফেনাহবাচের খবর আর ছবি কেটে রাখতাম। আসলে গোলপোস্টের পেছন থেকে তোলা গোলকিপারের সেই অসহায় ছবি আর জালের ভেতর বল- এইসব দেখেই আমার পুরো শৈশব কেটেছে।

স্পিগেল: আপনি নিজে কখনো ফুটবল খেলেছেন?
পামুক: কোনো ক্লাবে কখনো খেলিনি। তবে স্কুলের আগে-পরে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে জমিয়ে খেলতাম।
স্পিগেল: কেমন খেলতেন? ভালো ছিলেন?
পামুক: বানিয়ে বানিয়ে বিনয়ী হতে চাই না, আমার প্রতিভা ছিল। তবে আমি খুব একটা শক্তপোক্ত বা পেশিবহুল ছিলাম না। আসলে খেলার চেয়ে খেলা নিয়ে মনে মনে গল্প ফাঁদাটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শৈশবের সেই কল্পনাগুলোই মানুষের জীবনের ধরন ঠিক করে দেয়। আমি আমার কল্পনায় নিজেকে ফুটবলের মস্ত হিরো ভাবতাম। প্রায়ই ভাবতাম- ফেনাহবাচে কোনো ইউরোপিয়ান কাপের ম্যাচ খেলছে, আর আমি এক শিশু, ম্যাচের ৮৯ মিনিটে আমাকে মাঠে নামানো হলো। আর নেমেই শেষ মুহূর্তে আমি জয়সূচক গোলটি করে ফেললাম!
স্পিগেল: জার্মান সাংস্কৃতিক সমালোচক ক্লাউস দ্যভেলেইট একবার লিখেছিলেন, ফুটবল তার জন্য ‘পৃথিবীর দুয়ার’ খুলে দিয়েছিল। আপনার ক্ষেত্রে কেমন ছিল?
পামুক: আমি তার কথা বুঝতে পারছি। তবে আমার ক্ষেত্রে ফুটবল খুলে দিয়েছিল ‘ঐক্যের দুয়ার’। প্রথমত, আমার চেয়ে মাত্র ১৮ মাসের বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমার একাত্মতা তৈরি হয়েছিল ফুটবলের মাধ্যমে। ঘরের কার্পেটে মার্বেল বিছিয়ে আমরা গোটা তুর্কি চ্যাম্পিয়নশিপ বা ইউরোপিয়ান কাপের ম্যাচ নতুন করে খেলতাম। আমাদের একজন রেডিওর ধারাভাষ্যকার সাজত, আর কাল্পনিক শ্রোতাদের কাছে ম্যাচের বিবরণ দিত। প্রতিটি মার্বেল ছিল একেকজন বিখ্যাত খেলোয়াড়। ভাই ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় কোনো খেলোয়াড়ের নাম ভুল বললে, আমি ইশারায় ওকে শুধরে দিতাম- যাতে রেডিওর ওপারে থাকা কোটি কোটি শ্রোতার মনোযোগ নষ্ট না হয়!
স্পিগেল: রেডিওর মাধ্যমটা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল কেন?
পামুক: কারণ রেডিওই এই খেলাটাকে আমাদের ড্রয়িংরুমে নিয়ে এসেছিল। রেডিওর ধারাভাষ্যকাররা আমাদের শিখিয়েছিলেন- কীভাবে একইসঙ্গে কোনো কিছু শুনতে শুনতে মনে মনে তার দৃশ্যটা কল্পনা করে নিতে হয়। আঠারো শতকের শেষে গ্যোটে যখন ইতালি ভ্রমণে গিয়ে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘দ্য লাস্ট সাপার’ চিত্রকর্মটি দেখেন, তখন জার্মানিতে মানুষ এর নাম জানলেও চোখে দেখেনি। গ্যোটে ফিরে এসে শব্দের মাধ্যমে সেই ছবির বিবরণ লিখেছিলেন।
গ্রিক শাস্ত্রে একে বলা হয় ‘একফ্রাসিস’, অর্থাৎ কোনো দৃশ্য বা চিত্রকে শব্দের সুতোয় বুনে প্রকাশ করা। রেডিওর ফুটবল ধারাভাষ্যও ঠিক তা-ই। তবে এটাও সত্যি, ধারাভাষ্যকারকে সবসময় মাঠের ঘটনার পেছনে ছুটতে হয় এবং প্রতি মুহূর্তে নিজের শব্দ সম্পাদনা করতে হয়। কারণ, ফুটবল শব্দের চেয়েও অনেক বেশি দ্রুতগতির।
স্পিগেল: আপনার সাহিত্যে কখনো ফুটবলকে নিয়ে আসার কথা ভাবেননি?
পামুক: স্টেডিয়াম তো আসলে একটা জলজ্যান্ত মঞ্চ, যেখানে প্রাচীন গ্রিক নাটকের মতো নাটকীয়তা উন্মোচিত হয়। একটা ম্যাচেই যেন লুকিয়ে থাকে গোটা বিশ্ব। কিন্তু ফুটবল মূলত দেখার বিষয়, আর সাহিত্য হলো শব্দের কারবার। তাই দুটোকে মেলানো বেশ কঠিন। তাছাড়া ফুটবলের ভেতরের মাফিয়া চক্র বা দুর্নীতির মতো সাংবাদিকতাসুলভ বিষয় নিয়ে লিখতে আমার ভালো লাগে না। আমি আমার শৈশবের রূপকথাটাকেই বিশ্বাস করতে চাই, ফুটবল কতটা কলুষিত তা জানতে ইচ্ছে করে না।
তবে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত আমার ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’ উপন্যাসে ফুটবলের একটা বড় ভূমিকা থাকার কথা ছিল। উপন্যাসের একটা চরিত্র আশির দশকের শুরুতে ইস্তাম্বুলের গলিতে গলিতে তার নিখোঁজ স্ত্রীকে খুঁজছিল। মূল খসড়ায় ছিল- সে হাঁটতে হাঁটতে রেডিওতে শুনছে কীভাবে তুরস্ক ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের কাছে একের পর এক গোল খেয়ে হেরে ভূত হচ্ছে।
আশির দশকে তুরস্ক সত্যিই ইংল্যান্ডের কাছে দুটো বাছাইপর্বের ম্যাচে ০-৮ গোলেই হেরেছিল। মাঠের ভেতর ইংরেজ খেলোয়াড়রা আমাদের টিটকারি দিয়েছিল, আর লন্ডনের পত্রিকাগুলো ব্যঙ্গ করে লিখেছিল যে ইস্তাম্বুলের মাঠে নাকি ঠিকঠাক সবুজ ঘাসও ছিল না! আমার কাছে সেই পরাজয়গুলো ছিল তৎকালীন দেশের সার্বিক দুরবস্থা আর জাতীয় হীনম্মন্যতার এক মোক্ষম রূপক। কিন্তু পৃষ্ঠা বড্ড বেড়ে যাচ্ছিল বলে পরে বই থেকে ওই অংশটা কেটে বাদ দিই। আজ অবশ্য সেই সিদ্ধান্তের জন্য আফসোস হয়।
স্পিগেল: আজকের তুর্কি ফুটবল দেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কী বার্তা দেয়?
পামুক: পর্তুগালের সাবেক একনায়ক সালাজার ফুটবলকে দেশের মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন। তিনি একে ভাবতেন ‘জনগণের আফিম’, যা দিয়ে শান্তি বজায় রাখা যায়। আমাদের দেশেও যদি ফুটবল শুধু বিনোদন বা আফিম হতো, তবে ভালোই হতো। কিন্তু এখানে ফুটবল হলো উগ্র জাতীয়তাবাদ, পরবিদ্বেষ আর কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা তৈরির এক আস্ত কলকব্জা। আর আমার বিশ্বাস- কোনো জয় নয়, বরং বড় বড় পরাজয়ই মানুষের ভেতর এই উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়।
স্পিগেল: সেটা কীভাবে?
পামুক: জাতীয়তাবাদের জন্ম হয় বড় কোনো বিপর্যয় থেকে; তা সে ভূমিকম্পই হোক কিংবা যুদ্ধে পরাজয়। তলস্তয় তার উপন্যাসে দেখিয়েছেন, নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কীভাবে রাশিয়ানদের জাতীয় পরিচয় গঠনে সাহায্য করেছিল। আজকাল তুর্কি ফুটবল শুধু উগ্র জাতীয়তাবাদের সেবা করছে, দেশের কোনো কল্যাণ করছে না।
স্পিগেল: ফুটবল থেকে আসলে মানুষ কী শিখতে পারে?
পামুক: অনেক কিছু শেখা সম্ভব। যেমন- পৃথিবীতে অন্য দেশও আছে, অন্য চামড়ার মানুষও আছে, যারা আমাদের মতোই সমান মর্যাদার এবং যাদের আমাদের শ্রদ্ধা করা উচিত। ফুটবল শেখায়, দলের খেলোয়াড়রা আলাদাভাবে দুর্বল হলেও বুদ্ধি খাটিয়ে সম্মিলিতভাবে সফল হওয়া যায়। কিংবা কোনো হতাশাজনক পরাজয়ের পরও কারও ওপর চড়াও হতে নেই।
আমার শৈশব আমাকে শিখিয়েছে, সামাজিক মেলবন্ধন ছাড়া ফুটবল উপভোগ করা অসম্ভব। কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন সেই সমাজ নিজের পরিচয় সংকটে ভুগতে থাকে। তখনই উগ্র জাতীয়তাবাদের বাড়াবাড়ি রূপগুলো সামনে চলে আসে, যা আজকের তুরস্কে অহরহ ঘটছে।
স্পিগেল: ফুটবল কি তবে আপনার থেকে দূরে সরে গেছে?
পামুক: আমি এখনো আমার ক্লাবকে সমর্থন করি, তবে সেটা এক ধরনের অবচেতন ‘পাভলভীয় প্রতিক্রিয়া’র মতো- ফেনাহবাচের জার্সি দেখলেই মনের ভেতর টান অনুভূত হয়। আসলে ফুটবল উপভোগ করার বিষয়টি জড়িয়ে থাকে চারপাশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে। আর আমি সেই সামাজিক সততার ওপর থেকে দিন দিন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি।
স্পিগেল: আলবেয়ার ক্যামু তার গোলকিপার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একবার বলেছিলেন, “নৈতিকতা আর দায়িত্ববোধ সম্পর্কে আমি সবচেয়ে নিশ্চিতভাবে যা কিছু জেনেছি, তা ফুটবলের কাছেই ঋণ।” এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?
পামুক: আরে রাখুন তো! ১৯৩০-এর দশকে আলজেরিয়ার প্রেক্ষাপটে হয়তো কথাটা সত্যি ছিল, কিন্তু আজকের দিনে এটা স্রেফ একটা আদিখ্যেতা বা বোকামি। আজকের ফুটবল থেকে আপনি আর যা-ই শিখুন না কেন, ‘নৈতিকতা’ শব্দটা শেখার আশা না করাই ভালো।