Published : 29 Jul 2025, 03:54 PM
আজকের চিড়িয়াখানায় আমরা যতটা প্রকৃতি খুঁজি, তার পেছনের ইতিহাসটা ঠিক ততটাই অস্বস্তিকর। আধুনিক ‘ন্যাচারাল হ্যাবিটাট’-নির্ভর চিড়িয়াখানার ধারণা চালু করেছিলেন এক জার্মান, নাম কার্ল হ্যাগেনবেক। তবে তিনি আগে একই কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন মানুষের ওপর। ইতিহাস একে বলে ‘হিউম্যান জু’।
উনিশ শতকের শেষে, ইউরোপ ও আমেরিকায় এক ধরনের নেশা তৈরি হয়েছিল অজানা জাতিগোষ্ঠী আর তার অভ্যন্তরীণ প্রকৃতি দেখার। একপাশে রেইনডিয়ার, গন্ডার আর জিরাফ, অন্য পাশে সামি, ইনুয়িট আর কাওয়েস্কার মানুষেরা। তাদের আনা হতো ইউরোপে, দেখানো হতো এমনভাবে যেন তারা প্রাগৈতিহাসিক যুগের অবশিষ্ট প্রজাতি।
এই ভয়ঙ্কর বিনোদনের কাণ্ডারি ছিলেন জার্মান পশুব্যবসায়ী কার্ল হ্যাগেনবেক। পরে তিনিই আবার পশুদের জন্য এমন এক প্রাকৃতিক পরিবেশ নির্মাণ করলেন, যা আধুনিক চিড়িয়াখানার মডেল হয়ে ওঠে।
পশুপ্রেমে জন্ম, ব্যবসার হাত ধরে সাম্রাজ্য
হ্যাগেনবেকের গল্প শুরু হয়েছিল ছোটবেলায়। তার বাবা ছিলেন মাছ বিক্রেতা। একদিন স্থানীয় জেলেরা উপহার দেয় ছয়টি সীল, জালে ধরা পড়েছিল। বাবা তৈরি করেন দুটি বিশাল কাঠের টব, সেখানে সীল রেখে ১ শিলিং টিকিটে প্রদর্শনী শুরু করলেন, দর্শক আসতে লাগলো। এখান থেকেই শুরু, ছোট্ট এক পশুশালা থেকে বিশাল প্রাণী সাম্রাজ্য।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে কার্ল পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেন এবং আফ্রিকা, এশিয়া, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বাণিজ্য বিস্তার করেন। ইউরোপের চিড়িয়াখানায় তখন তার পাঠানো প্রাণীর ছড়াছড়ি। এক পর্যায়ে আমেরিকার বিখ্যাত বিনোদন উদ্যোক্তা পি. টি. বার্নাম তার কাছ থেকে কিনে নেন লাখ টাকার পশু।
মানুষের চিড়িয়াখানা: নরম মাটির নিচে নির্মমতা
ব্যবসা বড় হচ্ছিল। কিন্তু হ্যাগেনবেক বুঝেছিলেন, শুধু পশুতে দর্শক সন্তুষ্ট হয় না। মানুষ চায় আরও রহস্যময় কিছু। ১৮৭৫ সালে তিনি ইউরোপে নিয়ে এলেন সামি জনগোষ্ঠীর দুটি পরিবার। সঙ্গে ৩১টি রেইনডিয়ার, তাঁবু, চামড়ার পোশাক আর রান্নার জিনিসপত্র। নিজের বাড়ির উঠোনেই তৈরি করলেন ছোট্ট ল্যাপল্যান্ড। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে দেখল- রেইনডিয়ার দুধ দোয়ানো, তাঁবু খাটানো আর রান্নার দৃশ্য। হ্যামবার্গ ছুটে গেল দেখতে।
এই সফলতার পরই হ্যাগেনবেক গড়ে তোলেন এমন এক জার্মান প্রদর্শনী যার আধুনিক প্রতিশব্দ ‘হিউম্যান জু’। ১৮৭৬ সালে তিনি নিয়ে আসেন সুদানি মানুষ, উটসহ এক বিশাল কাফেলা। এরপর গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা থেকে আসে ইনুয়িট জনগোষ্ঠী। ১৮৮০ সালে গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় পুরো ইনুয়িট দল, কারণ তাদের টিকা দেওয়া হয়নি।
যাদের বিবস্ত্র করে দেখানো হতো ‘আদিম প্রমাণ’ হিসেবে
১৮৮১ সালে চিলির দক্ষিণ প্রান্ত থেকে হ্যাগেনবেক নিয়ে আসেন কাওয়েস্কার জনগোষ্ঠী। তাদের রাখা হয় প্রায় নগ্ন অবস্থায়, কোনও পোশাক বা গৃহপালিত পশু ছাড়াই; যাতে দর্শকদের মনে হয়, তারা আদিম যুগের মানুষ। পাঁচজন কাওয়েস্কার মারা যায়, মৃতদেহ হ্যাগেনবেক দিয়ে দেন গবেষণার জন্য এক সুইস বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বেঁচে থাকা মানুষদের ফেরত পাঠানো হয় চিলিতে। কিন্তু তাদের একজন পথেই মারা যায়। ২০১০ সালে, বহু বছর পর, কাওয়েস্কারদের দেহাবশেষ ফেরত দেওয়া হয় চিলি সরকারের হাতে।
মানব-প্রদর্শনী যখন ব্যবসা হারাতে শুরু করে
১৮৮০ দশকের শেষদিকে হ্যাগেনবেক অভিযোগ করেন, ‘মানুষের প্রদর্শনীতে’ এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতা, আর আগের মতো মুনাফা নেই। ফলে আবার তিনি মন দেন পশু ব্যবসা, প্রশিক্ষণ আর এমন চিড়িয়াখানা গড়ায়, যেখানে প্রাণী থাকবে খাঁচাহীন পরিবেশে। ছায়া, খাদ, জলাধার আর প্রকৃতির অনুকরণে গড়ে তোলা জায়গায়।
‘ন্যাচারাল হ্যাবিটাট’ ধারণার সূচনা
১৯০৭ সালে হ্যামবার্গে তিনি চালু করেন বিশ্বের প্রথম প্রাকৃতিক পরিবেশে চিড়িয়াখানা। এই মডেল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ ও আমেরিকায়। খাঁচার বদলে খাদ, কৃত্রিম গুহা, জলাশয়, যেখানে প্রাণীরা যেন নিজস্ব আচরণ করতে পারে। এই ভাবনা থেকেই পরবর্তীতে তৈরি হয় আধুনিক চিড়িয়াখানার দর্শন: শুধু বিনোদনের জন্য নয়, সংরক্ষণের জন্য।
উত্তরাধিকার: সম্মান না বিতর্ক?
হ্যাগেনবেক কি তাহলে পশুপ্রেমী উদ্ভাবক? নাকি মানুষের অমানবিক প্রদর্শনীতে বিশ্বাসী এক নির্মম ব্যবসায়ী? উত্তর হয়তো মাঝামাঝি কোথাও। তিনি ছিলেন এমন একজন, যিনি প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন, প্রাণীকে ‘বস্তু’ নয়, চেতনা ও প্রয়োজনবিশিষ্ট জীব হিসেবে ভাবা উচিত। আবার তিনিই এমন পরিবেশ গড়েছিলেন, যেখানে আদিবাসী মানুষদের পণ্য করে তোলা হয়েছিল দর্শকদের আনন্দের জন্য।

ইতিহাসবিদ নাইজেল রথফেলস লিখেছেন, “হ্যাগেনবেকের আগে চিড়িয়াখানা বললেই বন্দিত্বের ছবি ভেসে উঠত। কিন্তু তার পর থেকে আমরা বিশ্বাস করতে শিখি, চিড়িয়াখানায় প্রাণী রাখা মানেই নির্মমতা নয়, বরং নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের মাধ্যম।”
কার্ল হ্যাগেনবেক চিড়িয়াখানাকে বদলে দিয়েছেন। কিন্তু তার আগে তিনি বদলে দিয়েছিলেন মানুষ দেখার চোখ। সম্ভবত ইতিহাস আমাদের এখানেই শেখায়—যা আমরা দেখি, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তা কীভাবে দেখি।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন ডটকম