১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নোলানের ‘দ্য ওডিসি’: হোমারের মহাকাব্যের সঙ্গে কতটা মিল

ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সের শাখাগুলোতে দেখানো হচ্ছে চলচ্চিত্রটি।

নোলানের ‘দ্য ওডিসি’: হোমারের মহাকাব্যের সঙ্গে কতটা মিল
নোলানের চলচ্চিত্রের একটি পোস্টার ও হোমারের মহাকাব্য ‘দ্য ওডিসি’।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Aug 2026, 03:08 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:51 PM

গ্রিক কবি হোমারের লেখা ‘দ্য ওডিসি’ বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রাচীনতম মহাকাব্য। এটি মূলত পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। বীরত্ব, বুদ্ধি, দেব-দেবীর লীলাখেলা এবং এক অদম্য যোদ্ধার ঘরে ফেরার আকুলতা নিয়ে বোনা হয়েছে এই কালজয়ী গল্প। 

তিন হাজার বছরের পুরনো এই ধ্রুপদী মহাকাব্য নিয়েই নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’। ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সের শাখাগুলোতে দেখানো হচ্ছে এটি। কী আছে এই চলচ্চিত্রে? হোমারের ওডিসির সঙ্গে এর কতটুকু মিল-অমিল?

হোমারের মহাকাব্যটি শুরু হয় ট্রয় যুদ্ধের ঠিক পর থেকে। হোমারের অন্য এক মহাকাব্য ‘দ্য ইলিয়াড’-এ সেই যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। স্পার্টার রানি হেলেনকে ট্রয়ের রাজকুমার প্যারিস অপহরণ করলে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে গ্রিকদের (অ্যাকিয়ান) জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ইথাকার রাজা অডিসিউসের। তিনি তার বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে ‘ট্রোজান হর্স’ বা কাঠের ঘোড়ার ফাঁদ তৈরি করেছিলেন, যা গ্রিকদের বিজয় এনে দেয়। যুদ্ধ শেষে অডিসিউস তার দলবল নিয়ে ইথাকার উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু করেন। আর এই যাত্রাই হলো ‘দ্য ওডিসি’-র মূল উপজীব্য।

অডিসিউসের ঘরে ফেরার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এক চোখা দানব সাইক্লপস, যার নাম পলিফেমাস। সে ছিল সমুদ্রদেবতা পসেইডনের সন্তান। পলিফেমাস অডিসিউস এবং তার সঙ্গীদের একটি গুহায় আটকে ফেলে এবং একে একে তাদের খেতে শুরু করে। অডিসিউস তখন এক চতুর কৌশল আঁটেন। তিনি পলিফেমাসকে প্রচুর মদ পান করিয়ে মাতাল করে তোলেন। পলিফেমাস যখন তার নাম জানতে চায়, অডিসিউস বলেন তার নাম ‘নোবডি/নোম্যান’ (কেউ না)। 

দানবটি ঘুমিয়ে পড়লে অডিসিউস এবং তার সঙ্গীরা জ্বলন্ত কাঠের সুচালো টুকরো দিয়ে তার একমাত্র চোখটি অন্ধ করে দেয়। যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা পলিফেমাসের চিৎকারে অন্য দানবরা ছুটে এসে জিজ্ঞেস করে, কে তোমার এই হাল করেছে? পলিফেমাস উত্তর দেয়, “কেউ না!” ফলে অন্য দানবরা ফিরে যায়।

পরদিন সকালে গুহার ভেড়াদের পেটের নিচে লুকিয়ে অডিসিউস ও তার সঙ্গীরা পালিয়ে যায়। কিন্তু জাহাজে ওঠার পর অডিসিউসের মনে অহংকার জেগে ওঠে। তিনি চিৎকার করে দানবকে নিজের আসল নাম ও পরিচয় জানিয়ে দেন। ক্ষুব্ধ পলিফেমাস তখন তার পিতা সমুদ্রদেবতা পসেইডনের কাছে প্রার্থনা করে যেন অডিসিউস কখনোই ইথাকায় ফিরতে না পারে। আর যদি ফেরেও, তবে যেন তার সমস্ত সঙ্গী মারা যায়। পসেইডনের অভিশাপেই অডিসিউসের ১০ দিনের যাত্রা ১০ বছরে পরিণত হয়।

পথে অডিসিউসকে অসংখ্য অলৌকিক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। জাদুকরী সার্সি তার সঙ্গীদের জাদুবলে শুকরে পরিণত করে, যদিও অডিসিউস পরে তাদের মুক্ত করেন। সমুদ্রপথে তাদের মোকাবিলা করতে হয় স্কিলা এবং চ্যারিবডিস নামক ভয়ংকর দানবের। মায়াবিনী সাইরেনদের জাদুকরী গান থেকে বাঁচতে অডিসিউস সঙ্গীদের কানে মোম দিয়ে নিজের শরীরকে জাহাজের মাস্তুলের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। দেবী ক্যালিপসোর দ্বীপে অডিসিউস দীর্ঘ ৭ বছর বন্দি থাকেন, কারণ ক্যালিপসো তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। অবশেষে দেবী আথেনার হস্তক্ষেপে এবং দেবতাদের রাজা জিউসের নির্দেশে তিনি সেখান থেকে মুক্তি পান।

দীর্ঘ ২০ বছর পর (১০ বছর যুদ্ধ এবং ১০ বছর সমুদ্রযাত্রা) অডিসিউস যখন ইথাকায় ফেরেন, তখন তার রাজ্য একদল লোভী এবং উদ্ধত অনুপ্রবেশকারীর দখলে। তারা অডিসিউসকে মৃত ভেবে তার স্ত্রী পিনেলোপিকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল এবং প্রাসাদের সম্পদ নষ্ট করছিল। দেবী আথেনার সাহায্যে অডিসিউস এক বৃদ্ধ ভিখারির ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তিনি দেখতে পান তার ছেলে টেলেমেকাস এখন যুবক। বাবা ও ছেলে মিলে এক ভয়ংকর প্রতিশোধের পরিকল্পনা করেন।

পিনেলোপি ঘোষণা করেন, যে ব্যক্তি অডিসিউসের ভারী ধনুকে জ্যা পরিয়ে ১২টি কুঠারের ছিদ্রের ভেতর দিয়ে তীর ছুঁড়তে পারবে, তিনি তাকেই বিয়ে করবেন। সব অনুপ্রবেশকারী ব্যর্থ হওয়ার পর ভিখারিবেশী অডিসিউস অনায়াসেই সেই কাজ সম্পন্ন করেন। এরপরই শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ পর্ব। অডিসিউস ও টেলেমেকাস মিলে প্রাসাদের সমস্ত লোভী অনুপ্রবেশকারীকে হত্যা করেন। অবশেষে দীর্ঘ ২০ বছর পর স্ত্রী পিনেলোপি ও সন্তান টেলেমেকাসের সঙ্গে মিলিত হন অডিসিউস।

ক্রিস্টোফার নোলানের পরিচালিত ‘দ্য ওডিসি’ হোমারের এই জাদুকরী মহাকাব্যের সরাসরি কোনো অনুবাদ নয়, বরং এটি আধুনিক মনস্তত্ত্বের আদলে তৈরি একটি বিনির্মাণ বা ডিকনস্ট্রাকশন বলা চলে। মূল গল্পের সঙ্গে নোলানের চলচ্চিত্রের পার্থক্যগুলো বেশ স্পষ্ট: হোমারের মহাকাব্য পুরোটাই দেবতা ও অতিপ্রাকৃত শক্তিনির্ভর। কিন্তু নোলানের চলচ্চিত্রে জাদুকরী বা অলৌকিক কিছু নেই। এখানে দেবতাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। দেবী আথেনাকে (জেন্ডায়া অভিনীত) দেখানো হয়েছে অডিসিউসের মনের এক অপরাধবোধ বা হ্যালুসিনেশন হিসেবে। পলিফেমাস বা অন্যান্য দানবদের উপস্থিতি থাকলেও নোলান সেগুলোকে এমনভাবে দেখিয়েছেন যা একজন যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মানসিক ট্রমার প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়।

হোমারের অডিসিউস ছিলেন বাকপটু, ধুরন্ধর, আত্মবিশ্বাসী এবং বীর দর্পে পূর্ণ। তিনি তার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গর্ব করতেন। অন্যদিকে, নোলানের চলচ্চিত্রে ম্যাট ডেমন অভিনীত অডিসিউস নীরব, বিষণ্ন এবং অপরাধবোধে ভোগা এক মানুষ, যিনি মূলত পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে ভুগছেন। হোমারের গল্পে ট্রোজান হর্স বা কাঠের ঘোড়ার কৌশলটি ছিল অডিসিউসের মেধার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এবং বীরত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু নোলানের চলচ্চিত্রে এটিকে অনৈতিক কাজ হিসেবে দেখানো হয়েছে। 

প্রাচীন গ্রিসে ‘জেনিয়া’ বা অতিথি পরায়ণতার নিয়ম খুব পবিত্র ছিল। ট্রয়বাসীরা কাঠের ঘোড়াটিকে উপহার হিসেবে গ্রহণ করেছিল, আর সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের হত্যা করাটাকে নোলানের অডিসিউস ‘পাপ’ বলে মনে করেন। এই অনুশোচনাই তাকে পুরো চলচ্চিত্রে তাড়িয়ে বেড়ায়।

হোমারের মহাকাব্যে পিনেলোপি ছিলেন স্বামীর অপেক্ষায় থাকা আদর্শ, অনুগত ও অপেক্ষমাণ নারী। কিন্তু নোলান পিনেলোপি (অ্যান হ্যাথাওয়ে) চরিত্রটিতে আধুনিক নারীবাদী ছোঁয়া দিয়েছেন। চলচ্চিত্রে পিনেলোপি তার ২০ বছরের একাকিত্ব এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতি তার ক্ষোভ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। একইভাবে হেলেনকেও কেবল এক রূপসী নারী হিসেবে না দেখিয়ে একজন যুদ্ধবিধ্বস্ত ও প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

হোমারের মহাকাব্যটি যুদ্ধকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ এবং বীরত্ব প্রমাণের জায়গা হিসেবে দেখে। কিন্তু নোলানের চলচ্চিত্রটি মূলত একটি অ্যান্টি-ওয়ার বা যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র। এখানে যুদ্ধের ভয়াবহতা, ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানুষের পাশবিক হয়ে ওঠাকেই বেশি ফোকাসড করা হয়েছে।

হোমারের ‘দ্য ওডিসি’ এবং ক্রিস্টোফার নোলানের চলচ্চিত্র রূপান্তর, উভয়ই নিজ নিজ সময়ের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উপস্থিত। হোমার যেখানে প্রাচীন গ্রিসের বীরত্ব, দেবতাদের অলৌকিক ক্ষমতা এবং অদম্য সাহসিকতার বন্দনা করেছেন, নোলান সেখানে মানুষের অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, অপরাধবোধ এবং যুদ্ধের ভয়াবহতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রাচীন মহাকাব্য আর আধুনিক মনস্তত্ত্বের এই মেলবন্ধন চলচ্চিত্রটিকে কেবল বিনোদনের গণ্ডিতে আটকে না রেখে, পরিণত করেছে দার্শনিক অভিজ্ঞতায়।

তথ্যসূত্র: দ্য নিউ ইয়র্কার, টাইম ম্যাগাজিন, দ্য গার্ডিয়ান।