১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

তলস্তয় কেন বুড়ো বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন

ট্রেনের যাত্রাপথেই ঠান্ডা লেগে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তার নিউমোনিয়া ধরা পড়ে।

তলস্তয় কেন বুড়ো বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন
অসুস্থ শরীরে তিনি আস্তাপোভো নামে এক অখ্যাত রেলওয়ে স্টেশনে নামতে বাধ্য হন।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 16 Aug 2026, 01:21 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

চারদিকে হাড়কাঁপানো শীত। ১৯১০ সালের ১০ নভেম্বরের এক গভীর রাত। রাশিয়ার ইয়াসনায়া পলিয়ানা এস্টেটের নিস্তব্ধতা ভেঙে ৮২ বছরের এক বৃদ্ধ নিঃশব্দে ঘর ছাড়লেন। সঙ্গে কোনো জাঁকজমক নেই, নেই কোনো দেহরক্ষী। সামান্য কিছু জিনিসপত্র নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন অনিশ্চিত এক যাত্রায়। 

এই বৃদ্ধ আর কেউ নন, বিশ্বসাহিত্যের কিংবদন্তি লিও তলস্তয়। নিজের স্ত্রী, সন্তান এবং সাজানো সংসার ফেলে কেন মাঝরাতে চোরের মতো পালিয়ে যেতে হলো এই মহীরুহকে? কেনই বা এর মাত্র ১০ দিন পর এক অখ্যাত রেলওয়ে স্টেশনে তাকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে হলো?

তলস্তয়ের এই ‘পালিয়ে যাওয়া’ কোনো সাময়িক আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা মানসিক যন্ত্রণা, আদর্শিক লড়াই এবং নিঃসঙ্গতা। তিনি এমন এক জীবন চেয়েছিলেন যা তার দর্শনের সঙ্গে মেলে, কিন্তু আভিজাত্যের শেকল তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছিল।

তলস্তয় ছিলেন যশ ও খ্যাতির বন্দিশালায় এক নিঃসঙ্গ সম্রাট। তিনি তার জীবনের শেষ দিনগুলোতে যেভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন, সেভাবে পারছিলেন না। তিনি চাইতেন সাধারণ মানুষের মতো সাদামাটা জীবন কাটাতে। আভিজাত্যের চাকচিক্য ছেড়ে কোনো এক নিভৃত প্রান্তে মাটির মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে। নিজের শ্রম দিয়ে অন্ন সংস্থান করা, নিরিবিলি আলাপচারিতা আর ইশ্বরের সান্নিধ্যে শান্তিতে দিন পার করাই ছিল তার স্বপ্ন। 

কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস হলো, জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন একজন অভিজাত জমিদার, আর কর্মগুণে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বখ্যাত লেখক। এই দুই পরিচয়ের টানাপোড়েন তাকে স্বস্তি দেয়নি।

সেই সময়ে তলস্তয় ছিলেন বর্তমান সময়ের পরিভাষায় প্রথম সারির ‘গ্লোবাল সেলিব্রিটি’। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সংবাদপত্রের শিরোনাম। তার একটি হাঁচি দেওয়ার খবরও সাংবাদিকরা সংগ্রহ করতেন। ইয়াসনায়া পলিয়ানায় তার বাড়ির সামনে সবসময় ভিড় লেগে থাকত—কেউ আসত সাহায্যের আশায়, কেউ আসত একপলক দেখতে, আবার কেউ আসত নিছক কৌতূহলে। বস্তা বস্তা চিঠি আসত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। তলস্তয়-গবেষকদের মতে, এই অতি-জনপ্রিয়তা তার ব্যক্তিগত জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিল।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল তার ঘনিষ্ঠজনদের আচরণ। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এমনকি অনুসারীরাও তাকে শান্তিতে থাকতে দিতেন না। সবাই যেন তার জীবনের ওপর নিজেদের মালিকানা দাবি করতেন। তার আধ্যাত্মিক সংকট, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া—সবই জনসমক্ষে চলে আসত। কাছের মানুষরা নিজেদের ডায়েরিতে তলস্তয়ের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি লিখে রাখতেন এবং সেগুলো একে অপরকে পড়ে শোনাতেন। নিজের বাড়িতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক জনাকীর্ণ খাঁচার বন্দি পাখি।

১৮৮১ সালের পর তলস্তয়ের জীবনদর্শনে আমূল পরিবর্তন আসে। তিনি ভোগবাদী জীবন আর ব্যক্তিগত সম্পত্তির মোহ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। সমাজ ও ধর্মের প্রচলিত কাঠামোর প্রতি তার বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। ১৮৯৪ সালে তিনি তার জমিদারি এবং নিজের বই থেকে অর্জিত সমস্ত রয়্যালটি বা আয় ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন।

তলস্তয় ছিলেন যশ ও খ্যাতির বন্দিশালায় এক নিঃসঙ্গ সম্রাট, ছবি: সংগৃহীত।

তলস্তয় ছিলেন যশ ও খ্যাতির বন্দিশালায় এক নিঃসঙ্গ সম্রাট,

কিন্তু সমস্যা দেখা দিল তার পরিবার নিয়ে। তলস্তয় যখন নিজের আরাম-আয়েশ ছেড়ে সাধারণ কৃষকের মতো জীবন যাপন করতে চাইছেন, তখন তার পরিবার সেই বিলাসিতা ছাড়তে নারাজ। নিজের ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন, “চারপাশে এত দারিদ্র্য, আর আমি বাস করছি এক বিলাসবহুল প্রাসাদে যেখানে ডিনার টেবিলে ভৃত্যরা খাবার পরিবেশন করে—এ এক অসহ্য যন্ত্রণা।” 

এই নৈতিক দহন তাকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছিল। তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করতেন। তার মনে হতো, তিনি যা প্রচার করছেন, নিজে তা পালন করতে পারছেন না।

তবে তলস্তয়কে সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল তার স্ত্রী সোফিয়া আন্দ্রেয়েভনা এবং তার প্রধান সহযোগী ভ্লাদিমির চের্তকভের মধ্যকার বিরোধ। তলস্তয়ের মৃত্যুর আগেই তার পাণ্ডুলিপি এবং সৃজনশীল কাজের উত্তরাধিকার নিয়ে যেন এক যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল।

তলস্তয়ের স্ত্রী সোফিয়া চাইতেন সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সমস্ত সম্পত্তির অধিকার নিজের কাছে রাখতে। অন্যদিকে, চের্তকভ চাইতেন তলস্তয়ের সমস্ত কাজ উন্মুক্ত করে দিতে যাতে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে তার বই পড়তে পারে। এই দুই মেরুর মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছিলেন বৃদ্ধ তলস্তয়। পরিবারের সদস্যরা এমন আচরণ শুরু করেছিলেন যেন তলস্তয় ইতোমধ্যেই মৃত! তারা তার ডায়েরি চুরি করা, কাটছাঁট করা কিংবা লুকানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন।

তলস্তয় ছিলেন নরম স্বভাবের মানুষ। কখনো স্ত্রীর চাপে তিনি বন্ধুর সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করে দিতেন, আবার বন্ধুর চাপে স্ত্রীর অগোচরে গোপনে উইল লিখে রাখতেন। এই দ্বিমুখী জীবন তার মতো সত্যনিষ্ঠ মানুষের পক্ষে বয়ে বেড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তিনি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলেন না, আবার প্রিয়জনদের এই ঝগড়া থামানোর শক্তিও তার ছিল না।

তলস্তয়ের ঘর ছাড়ার পেছনে সোফিয়া আন্দ্রেয়েভনাকে অনেক সময় ‘খলনায়িকা’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু তার দিকটাও তলস্তয় সহমর্মিতার সঙ্গে বিচার করতেন। ১৯ বার গর্ভধারণ এবং ১৩ জন সন্তানের জননী সোফিয়াকে পোহাতে হয়েছিল অকল্পনীয় কষ্ট। তার ৬টি সন্তান শৈশবেই মারা যায়। একজন খামখেয়ালি প্রতিভাধরের সঙ্গে ঘর করা, বিশাল সংসার সামলানো এবং স্বামীর অবাস্তব আবদার সহ্য করা সহজ ছিল না। শেষ বয়সে এসে সোফিয়া মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। স্বামীর প্রতি তার অতিরিক্ত অধিকারবোধ এবং সন্দেহপ্রবণতা শেষ পর্যন্ত তলস্তয়কে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করে।

সেই রাতে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তলস্তয় সঙ্গে নিয়েছিলেন তার বিশ্বস্ত ডাক্তার মাকোভিৎস্কিকে। তিনি চেয়েছিলেন কোনো মঠে বা নিভৃত গ্রামে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চিঠিপত্রে ছদ্মনাম ব্যবহারেরও পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম।

বাড়ি ছাড়ার পর তিনি শামোর্দিনো মঠে তার বোন মারিয়ার কাছে যান। সেখানেও শান্তি মেলেনি। সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরা তার পিছু নিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি ওডেসা হয়ে কনস্টান্টিনোপল যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু ট্রেনের যাত্রাপথেই ঠান্ডা লেগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার নিউমোনিয়া ধরা পড়ে।

অসুস্থ শরীরে তিনি আস্তাপোভো নামে এক অখ্যাত রেলওয়ে স্টেশনে নামতে বাধ্য হন। স্টেশন মাস্টারের ছোট্ট ঘরে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। খবর ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। সারা রাশিয়ার চোখ তখন সেই ছোট্ট স্টেশনের দিকে। যে একাকিত্বের খোঁজে তিনি ঘর ছেড়েছিলেন, মৃত্যুকালেও তা জুটল না। ক্যামেরার লেন্স আর সাংবাদিকদের ভিড় স্টেশনের বাইরে সারাক্ষণ অপেক্ষা করছিল।

বিছানায় শুয়ে তলস্তয় শুধু একটিই প্রার্থনা করছিলেন—তাকে যেন একা থাকতে দেওয়া হয়। তিনি কোনো ওষুধ খেতে চাইছিলেন না, চাইছিলেন না মরফিন নিতে। শুধু চেয়েছিলেন শান্তিতে চলে যেতে। এমনকি তার শেষ ইচ্ছানুসারে, তার স্ত্রীকে কামরায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি যতক্ষণ না তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন।

১৯১০ সালের ২০ নভেম্বর, সেই ছোট স্টেশন মাস্টারের ঘরেই ইতিহাসের মহানায়কের জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি হয়তো সেই মুক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন, যা তিনি তার জীবদ্দশায় শত চেষ্টা করেও পাননি। আজও ইয়াসনায়া পলিয়ানার সেই শূন্য ঘর আর আস্তাপোভো স্টেশনের দেয়ালগুলো যেন সেই রাতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

তথ্যসূত্র: গেইটওয়ে টু রাশিয়া।