চিরতরে হারিয়ে যাওয়া ৫ পাখির করুণ ইতিহাস
এই ইতিহাসে রয়েছে ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান এক শিক্ষা।
আকাশে ডানার ঝাঁপানি আর বনে বনে সুরের ঝঙ্কার একসময় পৃথিবীর সৌন্দর্যকে আরও রহস্যময় এবং প্রাণবন্ত করে রাখতো। কিন্তু মানুষের অপরিনামদর্শী কর্মকাণ্ড, নির্বিচার বাসস্থান ধ্বংস, শিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় বহু প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে গেছে আমাদের পৃথিবী থেকে।
তেমনই পাঁচটি জানা ও অজানা পাখির বিলুপ্তির করুণ কাহিনি আর তাদের রেখে যাওয়া শিক্ষা নিয়ে তৈরি এ নিবন্ধ।
১. ব্যাচম্যানস ওয়ার্বলার (Bachman's Warbler)
ব্যাচম্যানস ওয়ার্বলার ছিল আকারে বেশ ছোট ও লাজুক স্বভাবের একটি পাখি। এদের চেনার মূল উপায় ছিল জলপাই-সবুজ ডানা, পেটের দিকে উজ্জ্বল হলুদ রঙ এবং গলায় কালো ছোপ। সাধারণত বনের গহীনে ঝোপঝাড়ের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে ভালোবাসতো এরা। দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রের নদী অববাহিকার ঘন বন এবং জলাভূমি ছিল এদের পছন্দের প্রজননস্থল, আর শীতকালে এরা পাড়ি জমাতো কিউবার চরাঞ্চলে।
বিজ্ঞানীদের কাছে এরা সবসময়ই এক রহস্যময় পাখি হিসেবে বিবেচিত হতো, কারণ সহজে মানুষের চোখে পড়া এদের স্বভাব ছিল না। তবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে এদের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। পরিবেশবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের ঘন উপকূলীয় বন কেটে কৃষি জমি ও জনবসতি গড়ে তোলা এবং কিউবায় এদের শীতকালীন বাসস্থান ধ্বংস হওয়াই ব্যাচম্যানস ওয়ার্বলারের বিলুপ্তির প্রধান কারণ ছিল।
পাখিটিকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে ২০০২ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে দক্ষিণ ক্যারোলিনার কনগ্যারি ন্যাশনাল পার্কে অনুসন্ধান অভিযান চালানো হয়। একদল বিজ্ঞানী ও স্বেচ্ছাসেবী প্রায় ৩ হাজার ৯০০ একর বনজুড়ে টানা ১৬৬ ঘণ্টা তল্লাশি চালান। প্রতি ৪০০ ফুট পরপর তারা ব্যাচম্যানস ওয়ার্বলারের সুনির্দিষ্ট ডাক ‘জিপ-জিপ’ ধ্বনির অডিও রেকর্ড বাজিয়ে পাখির সাড়ার অপেক্ষা করতেন।
কিন্তু দীর্ঘ অনুসন্ধানেও কোনো পাখির দেখা পাওয়া যায়নি। এর অনেক আগেই, অর্থাৎ ১৯৪৯ সালে মিসিসিপিতে এই পাখির শেষ শারীরিক নমুনা সংগৃহীত হয়েছিল এবং ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চার্লসটনের আশপাশে এদের শেষবারের মতো প্রত্যক্ষ করা যায়।
অবশেষে দীর্ঘ কয়েক দশকের অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার পর, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস ব্যাচম্যানস ওয়ার্বলারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। আজ কেবল মিউজিয়ামের কাচের দেয়ালের ওপর রাখা ট্যাক্সিডার্মি করা বন্ধ ডানা জোড়াই জানান দেয় এই চপল পাখির অস্তিত্বের কথা।
২. প্যাসেঞ্জার পিজন বা যাযাবর পায়রা (Passenger Pigeon)
প্যাসেঞ্জার পিজনের গল্পটি প্রকৃতি সংরক্ষণের ইতিহাসে সবচেয়ে ট্র্যাজিক এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হিসেবে পরিগণিত হয়। একসময় উত্তর আমেরিকা তো বটেই, হয়তো পুরো পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে জনসংখ্যাবহুল পাখি ছিল এই প্যাসেঞ্জার পিজন। ইতিহাসবিদদের মতে, এদের ঝাঁক যখন আকাশের ওপর দিয়ে উড়ে যেত, তখন সূর্যের আলো ঢেকে গিয়ে দিনের বেলাতেও অন্ধকার নেমে আসতো। কোটি কোটি পাখির এই অবিরাম উড্ডয়ন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলতো।
কিন্তু এত বিপুল সংখ্যাও এই প্রজাতিকে মানুষের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। উনিশ শতকের শেষের দিকে শিল্পায়নের প্রয়োজনে এদের প্রাকৃতিক বাসস্থান বনাঞ্চল কাটতে শুরু করে মানুষ। তার সঙ্গে যুক্ত হয় অনিয়ন্ত্রিত ও নির্বিচার বাণিজ্যিকভাবে শিকার। মাংস ও পালকের জন্য কোটি কোটি যাত্রী পায়রাকে হত্যা করা হয়। বলা হয়ে থাকে, মানুষ এত দ্রুতগতিতে এদের শিকার করতে শুরু করেছিল যে পাখিগুলোর স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। কয়েক দশকের ব্যবধানে শত কোটি পাখির বিশাল জনসংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
বন্য পরিবেশ থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য হওয়ার পর, প্রজাতিটিকে টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে খাঁচায় কৃত্রিম প্রজননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ১৯১০ সালে সিনসিনাটি চিড়িয়াখানায় শেষ পুরুষ যাযাবর পায়রাটি মারা যায়। এরপর বাকি ছিল কেবল ‘মার্থা’ নামের এক স্ত্রী পায়রা। জীবনের শেষ চার বছর মার্থা ছিল পৃথিবীর বুকে তার প্রজাতির একমাত্র জীবিত প্রতিনিধি।
১৯১৪ সালে সিনসিনাটি চিড়িয়াখানার খাঁচায় মার্থার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। মার্থার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই চিরতরে নিভে যায় প্যাসেঞ্জার পিজনের অস্তিত্বের প্রদীপ। মৃত্যুর পর তার দেহ বরফের ব্লকে জমাট বাঁধিয়ে তৎক্ষণাৎ ওয়াশিংটন ডি.সির স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনে পাঠানো হয় সংরক্ষণের জন্য।
৩. কাউয়াই ওও (Kauai oo)
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কাউয়াই দ্বীপের ঘন বনাঞ্চলের এক সময়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল কাউয়াই ওও পাখিটি। এটি ছিল হাওয়াইয়ান হানিইটার প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। এরা ছিল সুরেলা ও চমৎকার গায়ক পাখি। কাউয়াই দ্বীপের স্থানীয় অধিবাসীদের সংস্কৃতির সঙ্গে এই পাখির মিষ্টি ডাক গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। বলা হতো, কাউয়াই ওও-এর গান ছাড়া দ্বীপের বন যেন একদম নিস্তব্ধ ও প্রাণহীন।
কিন্তু দ্বীপাঞ্চলের বাস্তুসংস্থান সবসময়ই সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর হয়ে থাকে। কাউয়াই ওও পাখিটির বিলুপ্তির পেছনে একাধিক ঘাতক উপাদান একসঙ্গে কাজ করেছিল। প্রথমত, মানুষের আগমন ও বসতি স্থাপনের ফলে বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে এদের প্রাকৃতিক আবাসন সংকুচিত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, বহিরাগত মানুষের মাধ্যমে দ্বীপে প্রবেশ করে ক্ষতিকর ইঁদুর, বিড়াল ও শুয়োরের মতো শিকারি স্তন্যপায়ী প্রাণী, যারা পাখির ডিম ও ছানা খাওয়া শুরু করে।
তবে সবচেয়ে মারাত্মক আঘাতটি আসে মশার মাধ্যমে। মানুষের জাহাজে করে আসা বহিরাগত মশা দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা বহন করে আনে এভিয়ান ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগ। দ্বীপের স্থানীয় পাখি হওয়ায় কাউয়াই ওও-এর শরীরে এই রোগের বিরুদ্ধে কোনো রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। পাহাড়ি উঁচু অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েও এরা মশার কামড় ও রোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি।
ধীরে ধীরে এদের সংখ্যা কমতে কমতে এক পর্যায়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। ১৯৮০-র দশকে কাউয়াই ওও-এর একটি মাত্র পুরুষ পাখির উপস্থিতি রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে এক গবেষক সেই শেষ পুরুষ পাখিটির একটি করুণ প্রেমের গান টেপে রেকর্ড করেন, যেখানে সে তার সম্ভাব্য সঙ্গীকে ডাকছিল—যে সঙ্গী ইতোমধ্যে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। সেই গানটির পর আর কখনোই কাউয়াই ওও-এর সুর শোনা যায়নি। বনের সেই মিষ্টি সুর আজ শান্ত, নিস্তব্ধ ইতিহাসে পরিণত হয়েছে।
৪. হিথ হেন (Heath Hen)
হিথ হেন ছিল গ্রেটার প্রেইরি-চিকেন বা বড় তৃণভূমির মুরগির একটি বিশেষ উপপ্রজাতি। উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলীয় বনাঞ্চল ও ঝোপঝাড়পূর্ণ এলাকায় একসময় এদের প্রচুর পরিমাণে দেখতে পাওয়া যেতো। বলা হয়ে থাকে, আমেরিকার প্রারম্ভিক বসতি স্থাপনকারীদের খাবারের প্রধান উৎস ছিল এই পাখি। কম খরচে সুস্বাদু মাংস পাওয়ার জন্য মানুষ নির্বিচারে হিথ হেন শিকার করতে শুরু করে।
অতিরিক্ত শিকার এবং একইসঙ্গে এদের বসবাসযোগ্য জমি চাষাবাদ ও নগর উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করার ফলে আঠারো শতকের শেষভাগেই এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ১৯ শতকের শেষের দিকে পুরো মূল ভূখণ্ড থেকে হিথ হেন পুরোপুরি হারিয়ে যায়। কেবল একটি শেষ আশ্রয়স্থল বাকি ছিল—ম্যাসাচুসেটসের ‘মার্থাস ভিনইয়ার্ড’ নামের একটি ছোট দ্বীপ।
সেখানে প্রকৃতিপ্রেমী ও স্থানীয়দের যৌথ প্রচেষ্টায় পাখিটিকে বাঁচানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রথম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হয়। শতেক থেকে বেড়ে পাখির সংখ্যা প্রায় দুই হাজারে পৌঁছেছিল এবং বিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন হিথ হেন হয়তো বেঁচে যাবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একটার পর একটা বিপর্যয় নেমে আসে এই ছোট্ট দ্বীপটিতে।
প্রথমত, একটি ভয়াবহ দাবানলে এদের অধিকাংশ প্রজননক্ষেত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এরপর এক শীতে প্রচুর পাখি মারা যায়। বেঁচে যাওয়া অল্প কিছু পাখির মধ্যে আক্রমণ করে পোল্ট্রি রোগ এবং শিকারি বাজপাখির উপদ্রব বেড়ে যায়। একের পর এক দুর্যোগের আঘাত সহ্য করতে না পেরে দ্বীপের এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি জিনগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৯৩২ সালে মার্থাস ভিনইয়ার্ডে ‘বুম বস্টার’ নামে পরিচিত শেষ হিথ হেনটি মারা যায়, এবং এর সঙ্গেই পৃথিবীর বুক থেকে নিঃশেষ হয়ে যায় এই প্রজাতিটি।
৫. ক্যারোলিনা প্যারাকিট (Carolina Parakeet)
ক্যারোলিনা প্যারাকিট ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের একমাত্র দেশীয় বা স্থানীয় তোতাপাখি। এদের মাথার উজ্জ্বল হলুদ ও লাল রঙ এবং শরীরের গাঢ় সবুজ পালক পুরো বনকে এক রঙিন ও দৃষ্টিনন্দন রূপ দিতো। নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে মেক্সিকো উপসাগরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত বনাঞ্চল ও নদী অববাহিকায় দলবদ্ধভাবে বাস করতো এরা।
এই সুদৃশ্য তোতাপাখিটির বিলুপ্তির ইতিহাস মানুষের নির্মমতা ও অসচেতনতার দলিল। কৃষকরা ক্যারোলিনা প্যারাকিটকে ফসল ও ফলের বাগানের জন্য এক বড় ‘শত্রু বা ক্ষতিকারক প্রাণী’ মনে করতো, কারণ এরা ক্ষেতের শস্য ও ফলের বীজ খেতো। তাই দলবদ্ধ তোতাগুলোকে বনের মধ্যে বা বাগানে দেখলেই ঢালাওভাবে গুলি করে হত্যা করা হতো। ক্যারোলিনা প্যারাকিটের একটি আচরণগত বৈশিষ্ট ছিল—দলের কোনো একটি পাখি গুলি খেয়ে নিচে পড়ে গেলে বাকি পাখিরা তাকে ছেড়ে না পালিয়ে তার চারপাশে উড়তে থাকতো। ফলে শিকারিরা খুব সহজেই একযোগে পুরো দলকে মেরে ফেলতে পারতো।
এছাড়া, নারীদের টুপির সৌন্দর্য বর্ধনে এই তোতার উজ্জ্বল পালকের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয় ফ্যাশন শিল্পে। পোষা পাখি হিসেবে বিক্রির জন্য এদের বেপরোয়াভাবে ধরা হতো এবং সেইসঙ্গে বন উজাড় তো চলছিলই। এই বহুমুখী চাপের মুখে দাঁড়িয়ে ক্যারোলিনা প্যারাকিটের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পায়।
১৯০৪ সালে বুনো পরিবেশে শেষ ক্যারোলিনা প্যারাকিটটিকে গুলি করে মারা হয়। আর ১৯১৮ সালে সিনসিনাটি চিড়িয়াখানায় ‘ইনকা’ নামক শেষ বন্দী ক্যারোলিনা প্যারাকিটটি মারা যায়—উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যাযাবর পায়রা ‘মার্থা’ যে খাঁচায় মারা গিয়েছিল, ইনকাও ঠিক সেই একই খাঁচাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এভাবেই চিরতরে হারিয়ে যায় উত্তর আমেরিকার একমাত্র উজ্জ্বল তোতাপাখিটি।
এ পাঁচটি পাখির বিলুপ্তির পথ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী মানুষের হস্তক্ষেপ। বাসস্থান ধ্বংস, অতিরিক্ত শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্ষতিকর বহিরাগত প্রজাতির অনুপ্রবেশ—এই মানবসৃষ্ট কারণগুলোই একে একে প্রাণ কাড়ছে সুন্দর সুন্দর সব প্রজাতির।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন।
