১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

শত শত ‘শামুকখোলের’ আবাস উলিপুর, অভয়ারণ্য গড়ার উদ্যোগ

“জায়গাটিকে কিভাবে পাখির অভয়ারণ্য করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু হয়েছে।”

ইসরাইল হোসেন বাবু

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Oct 2026, 09:45 AM

Updated : 14 Oct 2026, 09:45 AM

ভোরের আলো ফুটতেই ডানা মেলে উড়তে শুরু করে শামুকখোলের দল। কেউ খাবারের খোঁজে যায়, কেউ ফিরে আসে বাসায়। দীঘিপাড়ের গাছের ডালে ডালে তাদের আনাগোনা। ছানাদের কিচিরমিচির আর পাখির ডানার শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রামের এমন দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। স্থানীয়দের কাছে গ্রামটি এখন ‘পাখির গ্রাম’ নামে পরিচিত। তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে চলনবিলের পূর্বপাশে উলিপুর গ্রামের অবস্থান।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের একটি দীঘিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গ্রামটি। গত কয়েক বছর ধরে দীঘিপাড়ের বটগাছসহ বিভিন্ন গাছে বাসা বেঁধেছে শত শত শামুকখোল পাখি।

জায়গাটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান।

শামুকখোলের পাশাপাশি গ্রামটিতে দেখা মেলে ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির, কোড়া, লালশির, বড় সরালি ও ছোট সরালিসহ নানা প্রজাতির পাখির। গ্রামের মাঠজুড়েও চোখে পড়ে ডাহুক, গাঙচিল, বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, চখাচখি, কাদাখোঁচা, মাছরাঙা ও সারস। এ ছাড়া রয়েছে আরও অনেক নাম না জানা পাখি।

সরেজমিনে দেখা যায়, দীঘিপাড়ের গাছগুলোতে বসতি গড়েছে শত শত শামুকখোল। কোনোটি গাছের কচি পাতায় ঠোকর দিচ্ছে, কোনোটি ডালে বসে ছানাদের আগলে রাখছে, খাওয়াচ্ছে খাবার। আবার কোনোটি উড়ে যাচ্ছে এক ডাল থেকে অন্য ডালে। গাছের নিচে দাঁড়ালে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় একের পর এক পাখি।

উলিপুরের বাসিন্দা তফিজ উদ্দিন বলেন, “তিন-চার বছর আগে অল্প কিছু শামুকখোল এখানে এসে বসবাস ও বাসা বাঁধতে শুরু করে। প্রতি বছর ডিম ফুটে বাচ্চা জন্ম নেওয়ায় পাখির সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। এখন পাখি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন।”

রাঙ্গা সরকার নামে স্থানীয় এক যুবক বলেন, “গ্রামের কেউ পাখিদের ওপর অত্যাচার করেন না, শিকারও করেন না। পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামবাসীকে সতর্ক করা হয়েছে।”

একই গ্রামের সজীব সরকার বলেন, “প্রতিটি বাড়ির আশপাশের গাছগুলোতে পাখিরা বাস করে। দিন-রাত তাদের বিচরণ দেখতে ভালো লাগে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পাখি দেখতে আসেন। ছবি তোলেন, ভিডিও করেন। পাখিদের নিরাপত্তায় সরকার আরও ব্যবস্থা নিলে ভালো হবে।”

ভূমি অফিসের কর্মচারী আবুল কালাম বলেন, “প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার পথে পাখি দেখতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় দেই। পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সবার উচিত পাখিদের ভালোবাসা।”

পাখি দেখতে আসা দর্শনার্থী ফরহাদ হোসেন বলেন, “একসঙ্গে এত শামুকখোল আগে কখনো দেখেননি। পাখিদের অবাধ বিচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। পাখির ছবি ও ভিডিও করেছি, এগুলো ফেইসবুকে পোস্ট করব।”

পাখি সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন ‘দ্য বার্ড সেফটি হাউস’এর চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস বলেন, “উলিপুরের পাখিগুলো এশীয় শামুকখোল। প্রজাতিটি সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকাভুক্ত।

“পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ থাকায় পাখিগুলো এখানে বসবাসের পাশাপাশি বংশবিস্তারও করছে। উঁচু গাছগুলো তাদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করছে। তাই পাখিদের আবাসস্থল রক্ষায় গাছগুলো কাটা থেকে বিরত থাকা উচিত।”

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, “মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণী শামুকখোলের প্রধান খাবার। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ পাখি দেখা যায়।

“উপযুক্ত আবহাওয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ পেলে শামুকখোল সাধারণত একই এলাকায় থাকে। চলনবিল অঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার থাকায় পাখিগুলো এখানে বসবাস করছে।”

এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, “উলিপুরে পাখির উপস্থিতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জায়গাটিকে কিভাবে পাখির অভয়ারণ্য করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ যেন পাখি নিধন বা শিকার করতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে।”