উমবের্তো একোর ‘বোমা আর সেনাপতি’: শিশুদের জন্য যুদ্ধবিরোধী বয়ান
জি এইচ হাবীবের অনুবাদে বইটি প্রকাশ করেছে ‘গপ্পো-সপ্পো’।
বই: বোমা আর সেনাপতি, মূল: উমবের্তো একো, অনুবাদ: জি এইচ হাবীব, অলংকরণ: ইউজেনিও কারমি, প্রকাশক: গপ্পো-সপ্পো, মূল্য: ৪০০ টাকা
উমবের্তো একো (১৯৩২–২০১৬) ছিলেন ইতালীয় ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক এবং সংকেতবিজ্ঞানী (সেমিওটিশিয়ান)। ‘দ্য নেম অব দ্য রোজ’ এবং ‘ফুকো’স পেন্ডুলাম’-এর মতো উপন্যাসের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তাত্ত্বিক কাজ ও উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি শিশুদের জন্যও চিন্তাশীল অথচ সহজবোধ্য বেশ কিছু বই লিখেছেন। ‘দ্য বম্ব অ্যান্ড দ্য জেনারেল’ তেমনই একটি। যুদ্ধবিরোধী বয়ানের এ গল্পটিই বাংলায় অনুবাদ করেছেন জি এইচ হাবীব।
বোমা যখন ফুলদানি হয়ে যায়, তখন সেটা আর ভয়ের জিনিস থাকে না। উমবের্তো একোর শিশু-কিশোর উপযোগী বই ‘বোমা আর সেনাপতি’র সবচেয়ে মনে রাখার মতো ছবি এটাই। শহরের ওপর বোমা পড়ছে, কিন্তু একটাও ফাটছে না। মানুষ সেগুলো ঘরে নিয়ে যায়, তাতে ফুল রাখে। যুদ্ধের অস্ত্র গেরস্তের ঘরের সাধারণ জিনিস হয়ে ওঠে।
লেখক বইটি লিখেছিলেন ১৯৬৬ সালে, ইতালীয় ভাষায়। ছবি এঁকেছিলেন ইউজেনিও কারমি। তখন ঠান্ডা যুদ্ধের কাল। দুই শিবির পাল্লা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র জমাচ্ছে। প্রায় ছয় দশক পরে জি এইচ হাবীবের অনুবাদে বইটি পড়তে গিয়ে একে পুরোনো গল্প মনে হয় না। পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ চলছে। পারমাণবিক হুমকির কথা আবার খোলাখুলি শোনা যাচ্ছে। অস্ত্রের বাজেট বাড়ছে। এমন সময়ে শিশুদের হাতে এই বই তুলে দেওয়ার মানে আছে।
গল্পের শুরু পরমাণু দিয়ে। একো প্রথমেই বুঝিয়ে দেন, পরমাণু খুব ছোট, আর সবকিছু তা দিয়েই তৈরি। মা, দুধ, বাতাস, আগুন, আমরা সবাই। বিজ্ঞানের এই সহজ পাঠটুকুই গল্পের ভিত। কারণ এরপরই আসে আসল কথা। পরমাণুদের মধ্যে ভাব থাকলে জগৎ টিকে থাকে। একটাকে ভাঙলে তার টুকরো অন্যদের আঘাত করে, সেগুলো আবার অন্যদের। শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মতো কঠিন ধারণা এখানে শিশুর বোঝার মতো করে বলা। সঙ্গে একটা নৈতিক ইঙ্গিতও থেকে যায়। একজনের ওপর আঘাত শেষে সবার ওপর গিয়ে পড়ে।
তারপর আসে সেনাপতি। তার উর্দিতে সোনার ফিতা, চিলেকোঠায় বোমার স্তূপ। সে চায় আরও বোমা, তারপর বড় একটা যুদ্ধ। লেখক এখানে একটা প্রশ্ন রেখে যান, যা শিশুকেও ভাবায়। হাতের কাছে এত বোমা থাকলে মন্দ না হয়ে উপায় কী? অস্ত্র জমানোই যে মানুষকে যুদ্ধের দিকে টানে, এই সত্যটা তিনি এক বাক্যে বলে দেন।
বইয়ের সবচেয়ে ধারালো অংশ সম্ভবত সেই দৃশ্য, যেখানে কয়েকজন লোক সেনাপতিকে চাপ দেয়। এত টাকা খরচ করে বানানো বোমা পড়ে থেকে কি গায়ে দুর্বো গজাবে? সেনাপতিও মেনে নেয়, যুদ্ধ না হলে তার ক্যারিয়ার শেষ। যুদ্ধ যে অনেক সময় রাগ বা আদর্শ থেকে নয়, টাকা আর চাকরির হিসাব থেকে আসে, সে কথা এত সরল ভাষায় শিশুসাহিত্যে কমই বলা হয়। বড়রা এই পাতায় এসে থামবেন। অস্ত্রের ব্যবসা, প্রতিরক্ষার খরচ, যুদ্ধের পেছনের লাভক্ষতি, সবই এখানে আছে। কোনো তত্ত্বের নাম নেওয়ার দরকার পড়েনি।
পরমাণুদের বিদ্রোহ গল্পের মোড় ঘোরায়। তারা লড়াই করে না। এক রাতে চুপচাপ বোমা থেকে বেরিয়ে মাটির নিচের ঘরে লুকিয়ে পড়ে। এই প্রতিরোধ নীরব, কিন্তু যথেষ্ট। যারা যন্ত্রের সবচেয়ে ছোট অংশ, তারা হাত গুটিয়ে নিলে যন্ত্র আর চলে না। শিশু এখান থেকে একটা সহজ কথা শেখে। না বলার শক্তি ছোটদেরও আছে।
সাধারণ মানুষের দায়ও লেখক এড়িয়ে যাননি। যুদ্ধের খবর শুনে লোকে আফসোস করে, আগে যদি সেনাপতিদের বোমা বানাতে বাধা দিত! তখন দেরি হয়ে গেছে। এই আফসোস বইয়ের সবচেয়ে বড়দের উদ্দেশে লেখা লাইন। শিশুরা পরমাণুর বিদ্রোহে খুশি হবে। বড়রা এই আফসোসে নিজেদের মুখ দেখবেন।
শেষটা লেখকের নিজস্ব কৌতুকে ভরা। সেনাপতির চাকরি যায়। উর্দি আর ফিতা কাজে লাগাতে সে হোটেলের দারোয়ান হয়। যাদের ওপর একদিন খবরদারি করত, সেই সৈন্যরাই এখন অতিথি। সে কুর্নিশ করে, তারা মুখ কালো করে হোটেলের নিন্দা করে। কোনো জেল নেই, রক্ত নেই, প্রতিশোধ নেই। আছে শুধু মূল্য হারানোর লজ্জা। যুদ্ধবাজের সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো এমন এক পৃথিবী, যেখানে তাকে আর কারো দরকার নেই। শিশুর জন্য এই সমাপ্তি সহনীয়, আবার অর্থপূর্ণও।
অনুবাদের ভাষা ঝরঝরে। জি এইচ হাবীব মূল গল্পের ছোট ছোট বাক্যের ছন্দ ধরে রেখেছেন। ‘গাদাগুচ্ছের টাকা’, ‘গায়ে দুর্বো গজানো’, ‘জবর একটা যুদ্ধ’ এমন কথ্য শব্দ গল্পটাকে বাংলার ঘরোয়া আবহে বসিয়ে দেয়। জোরে পড়ে শোনানোর মতো বই এটা।
গল্পের সরলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। বাস্তবে পরমাণু বিদ্রোহ করে না। যুদ্ধ থামলেই সবাই সুখে থাকে, এমনও নয়। কিন্তু রূপকথা বাস্তবের হুবহু ছবি দেয় না, একটা সম্ভাবনার ছবি দেয়। একো শিশুকে জানাতে চেয়েছেন, যুদ্ধ অনিবার্য নয়। কেউ তা বানায়, কেউ তা চায়। আর মানুষ চাইলে তা থামানোও যায়। যে সময়ে বড়রাই এ কথা ভুলতে বসেছে, সে সময়ে শিশু-কিশোরদের এই বই পড়ানো জরুরি।
