১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কবীর চৌধুরী: থিয়েটার স্কুল ও প্রথম বইয়ের স্মৃতি

থিয়েটার স্কুলের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেও ক্লাস নিতেন তিনি।

কবীর চৌধুরী: থিয়েটার স্কুল ও প্রথম বইয়ের স্মৃতি
কবীর চৌধুরী (১৯২৩-২০১১)

মাসুম মাহমুদ মাসুম মাহমুদ

Published : 15 Sep 2026, 03:10 PM

Updated : 17 Sep 2026, 03:00 AM

পড়ছিলাম ‘রাজা আর্থার ও এক্সক্যালিবার’। বইটির অনুবাদক শিক্ষাবিদ, সাহিত্য-সমালোচক ও অনুবাদক কবীর চৌধুরী (১৯২৩-২০১১)। পড়তে পড়তে সেই ছোটবেলার বিস্ময়ের কথাই মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, স্যার বুঝি এখনো আমাদের হাত ধরে গল্পের সেই আশ্চর্য জগতে নিয়ে যাচ্ছেন। সেইসঙ্গে মনে পড়ছিল স্যারের সান্নিধ্যে কাটানো কিছু মধুর স্মৃতির কথা।

নাহ্! আজ কবীর চৌধুরী স্যারের জন্মদিন নয়, প্রয়াণদিবসও নয়। তবু আজ হঠাৎ স্যারকে নিয়ে লিখতে বসেছি। লিখতে বসে ফিরে গেলাম ফেইসবুকে আমার পুরনো অ্যালবামে। খুঁজে বের করলাম স্যারের সঙ্গে তোলা আমার একমাত্র ছবিটি। সেই চেনা মুখ—চোখেমুখে জ্ঞানের দীপ্তি, অথচ কী আশ্চর্য শিশুসুলভ সরলতা! ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, বড় মানুষ হওয়ার মানেই যে গম্ভীর হয়ে যাওয়া, তা তো নয়। বরং সত্যিকারের বড় মানুষদের ভেতরে, চোখেমুখে একজন শিশু থাকে। যেমনটি স্যারের মাঝেও দেখেছিলাম।

ভাবতে ভালো লাগে, যে মানুষটি এত জ্ঞানী ছিলেন, তিনিই আবার শিশু-কিশোরদের জন্য বই লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন। পৃথিবীর নানা প্রান্তের গল্প ছোটদের হাতে তুলে দিয়েছেন। আজকের শিশুরা হয়তো একদিন বড় হয়ে সেই বইগুলোর পাতা উল্টাবে। গল্প পড়তে পড়তে তারা হয়তো ভাববে—এত সুন্দর করে এই গল্পটি বাংলায় কে নিয়ে এলেন? তখন হয়তো তারা জানবে কবীর চৌধুরী নামের একজন মানুষকে। যে মানুষটির সঙ্গে আমার বেশ কিছু স্মৃতি আছে। এবার বরং সেই স্মৃতির পাতাগুলোই একটু উল্টে দেখা যাক।

তখন আমি স্নাতকের ছাত্র। পাশাপাশি লেখালেখিও করি। তখন আরেকটি জগতের সঙ্গেও বেশ জড়িয়ে পড়েছিলাম—থিয়েটার। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেই ঢাকার নাট্যদল ‘সময়’-এ যোগ দিয়েছিলাম। সেখান থেকেই একদিন জানতে পারলাম, ঢাকায় এমন একটি স্কুল আছে যেখানে থিয়েটার নিয়ে পড়ানো হয়। স্কুলটির নাম—‘থিয়েটার স্কুল’। নামটা শুনেই কেমন যেন কৌতূহল হলো। জানতে পারলাম, এই স্কুলে পড়ান দেশের খ্যাতিমান সব নাট্যজন ও শিক্ষাবিদ। তাদের মধ্যে আছেন কবীর চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল মামুন, আতাউর রহমান, এস এম মহসীন, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আবদুস সেলিম, নিরঞ্জন অধিকারী, ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো গুণী মানুষজন। ব্যস! আমার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল।

কবীর স্যার থিয়েটার স্কুলের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেও নিয়মিত ক্লাস নিতেন। সরাসরি অভিনয়, বিশ্বনাটক ও নাট্যতত্ত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি পড়াতেন। আমি সেই থিয়েটার স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলাম। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এল—কবীর চৌধুরী স্যার আমাদের ক্লাস নিতে এলেন! যাকে বইয়ের পাতায় পড়েছি, যার নাম নানা লেখায় দেখেছি, সেই মানুষটি এবার আমাদের সামনে বসবেন! স্যারকে সামনে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, এত বড় একজন মানুষ অথচ কী সহজ, কী স্বাভাবিক! আমরা মন দিয়ে শুনতে লাগলাম।

স্যার আমাদের পড়াতেন বিশ্বনাটকের নানা গল্প। শেক্সপিয়র থেকে শুরু করে ইবসেন, বার্নার্ড শ, মলিয়ের—বিশ্বনাট্যের কত নাম, কত গল্প, কত চরিত্রের সঙ্গে যে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন! অ্যাবসার্ড নাটকের রূপরেখা ও ইতিহাসও স্যারের কাছ থেকেই জানতে শুরু করি। স্যার কঠিন বিষয়গুলোও কী সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন। কোনো নাটকের লেখা কীভাবে মন দিয়ে পড়তে হয়, একটি সংলাপের ভেতরের আসল কথাটি কীভাবে বুঝতে হয়, আর সেই ভাব কীভাবে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে হয়—এসবও স্যার আমাদের শেখাতেন। 

চরিত্র হয়ে মঞ্চে দাঁড়ানোর সময় একজন অভিনেতার মনের ভেতর কী ধরনের ভাবনা কাজ করা উচিত, চরিত্রটির আনন্দ, দুঃখ, ভয় কিংবা রাগকে কীভাবে অনুভব করতে হয়—এসব নিয়েও স্যার ক্লাসে কথা বলতেন। তখন মনে হতো, আমরা শুধু নাটক শিখছি না; নাটকের ভেতর দিয়ে মানুষকেও চিনতে শিখছি।

যেদিন কবীর চৌধুরী স্যারের ক্লাস থাকত, সেদিন আমি সবার আগে থিয়েটার স্কুলে পৌঁছে যেতাম। আমাদের ক্লাস হতো দোতলায়। কিন্তু আমি দোতলায় উঠতাম না। নিচে সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম—স্যার কখন আসবেন, সেই অপেক্ষায়। একসময় দূর থেকে স্যারের গাড়ি দেখা যেত। আমার অপেক্ষারও তখন শেষ হতো। গাড়ি এসে থামলেই আমি ছুটে গিয়ে নিজের হাতে দরজা খুলে দিতাম। তারপর স্যারকে ধরে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করতাম। ধীরে ধীরে স্যারের সঙ্গে হেঁটে দোতলায় উঠতাম। ক্লাসে গিয়ে স্যার যে চেয়ারটায় বসতেন, তার একেবারে সামনের বেঞ্চিতে গিয়ে বসতাম। উদ্দেশ্য স্যারের বলা একটি কথাও যেন বাদ না যায়। দুচোখ ভরে স্যারকে দেখতাম, আর দুকান ভরে শুনতাম তার প্রতিটি কথা।

আমাদের অন্য ক্লাসগুলোর বেশিরভাগই ছিল ব্যবহারিক বা প্র্যাকটিক্যাল। সেসব ক্লাসে আনন্দ হতো খুব। অভিনয়, মহড়া, নানা রকম অনুশীলন—এসবের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই অনেকের আগ্রহ ছিল বেশি। ফলে সেসব ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিও থাকত বেশ ভালো। কবীর চৌধুরী স্যারের ক্লাস ছিল মূলত তাত্ত্বিক। তাই অনেকেই কখনো কখনো সেই ক্লাসে আসত না। কিন্তু আমি? আমাকে দিয়ে স্যারের ক্লাস মিস করানো ছিল প্রায় অসম্ভব। 

মনে আছে, এক বছরের পুরো কোর্সে আমি কবীর চৌধুরী স্যারের একটি ক্লাসও মিস করিনি। স্যার নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবতেন—ছেলেটা বোধহয় একটু বেশিই পাগল! সেই ‘পাগলামি’তে স্যারেরও যেন খানিকটা মায়া ছিল। তিনি আমাকে বাড়তি স্নেহে কাছে টেনে রাখতেন।

তখন আমার অনার্সের ক্লাস চলছে, থিয়েটার চলছে, থিয়েটার স্কুল চলছে। এর পাশাপাশি লেখালেখিও চলছে বেশ জোরেশোরে। লিখতে লিখতে একদিন হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার লেখার সংখ্যা তো কম হলো না! একসঙ্গে করে দেখি আস্ত একটা পাণ্ডুলিপি হয়ে গেছে। পত্রসাহিত্যের পাণ্ডুলিপি। মনে হলো, এবার একটি বই করা যেতে পারে। বইটির নাম—‘শব্দের ঘ্রাণ’। জীবনের প্রথম বই। বন্ধুরা আমার লেখা বইটি নিয়ে বেশ উৎসাহ দেখাল। তাদের আবদার—বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান করতে হবে। কিন্তু আমার মতো অচেনা একজনের প্রথম বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কে আসবেন—এই ভাবনাটা মাথায় ঘুরতে লাগল। যত ভাবি, ততই হতাশ হই।

কবীর স্যারের হাত থেকে আমার পুরস্কার গ্রহণ।

কবীর স্যারের হাত থেকে আমার পুরস্কার গ্রহণ।

হঠাৎ একটা দারুণ ভাবনা এল—স্যারকে যদি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি করা যায়! মনটা আনন্দে ভরে উঠল। একদিন সুযোগ বুঝে স্যারকে আমার বইয়ের কথা বললাম। বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের কথাও জানালাম। আশ্চর্যের ব্যাপার, স্যার একবারও জানতে চাইলেন না বইটির বিষয় কী, কোন প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে, অনুষ্ঠানে আর কারা থাকবেন—এমন কিছুই নয়। শুধু অনুষ্ঠানের দিন, সময় ও সম্ভাব্য স্থানটি জেনে নিয়ে খুব সহজভাবেই সম্মতি দিলেন। বললেন, তিনি থাকবেন।

আমি তো খুশিতে আত্মহারা! মনে হলো, আমার প্রথম বইয়ের আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। প্রবল আনন্দের ঘোরের মধ্যেই অনুষ্ঠানের দাওয়াতপত্র তৈরি করে ফেললাম। স্যারের সঙ্গে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকার সম্মতি দিলেন অভিনেতা ও লেখক খায়রুল আলম সবুজ, কবি সমুদ্র গুপ্ত, কবি নাসির আহমেদ, নাট্যজন আক্তারুজ্জামান, কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমান এবং গনি হায়দার। এরই মধ্যে আমার বইটিও হাতে এসে গেছে।

দাওয়াতপত্র আর ‘শব্দের ঘ্রাণ’ বইটি স্যারের হাতে তুলে দিতে একদিন তার নয়াপল্টনের বাসায় গেলাম। রিসিপশনে নিজের পরিচয় দিতেই দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ফোন করে স্যারকে আমার আসার কথা জানালেন। কিছুক্ষণ পর ওপরে যাওয়ার অনুমতি পেলাম। লিফটে করে তেরো তলায় পৌঁছে দরজা খুলতেই দেখি—স্যার নিজেই লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন! প্রায় ৯০ বছর বয়সি একজন মানুষ ঘর থেকে হেঁটে লিফট পর্যন্ত এসেছেন শুধু আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে। দৃশ্যটি দেখে আমি যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলাম। কী বলব, বুঝতে পারছিলাম না। 

স্যার আমাকে সঙ্গে করে ঘরে নিয়ে গেলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, নাস্তা খেতে দিলেন, নানা বিষয়ে গল্প করলেন। বিদায় নেওয়ার আগে দাওয়াতপত্র আর ‘শব্দের ঘ্রাণ’ বইটি স্যারের হাতে তুলে দিলাম। স্যার বইটি উল্টেপাল্টে দেখলেন। দাওয়াতপত্রটি দেখলেন। তারপর আমি স্যারের থেকে বিদায় নিয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। স্যারও এলেন আমার সঙ্গে দরজা পর্যন্ত। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলেন যতক্ষণ না অবধি লিফট উপরে আসছে।

লিফটে করে নিচে নামতে নামতে মনে হচ্ছিল—আমার জীবনে এখনো কত কিছু শেখার বাকি! কবীর চৌধুরীর মতো একজন মানুষের কাছাকাছি থাকলে শেখার যেন কোনো শেষ নেই। তার জ্ঞান থেকে শেখার আছে, তার বিনয় থেকে শেখার আছে, শেখার আছে মানুষের প্রতি তার মমতা আর সুন্দর ব্যবহারের থেকেও। 

শেষ পর্যন্ত স্যার আমার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। অনুষ্ঠানের দিন হঠাৎ স্যারের স্ত্রী মেহের কবীর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই স্যারকে তখন হাসপাতালে স্ত্রীর পাশে থাকতে হয়েছিল। সেদিনের আরেকটি ঘটনা আজও আমার খুব মনে পড়ে। হাসপাতাল থেকেই স্যার নিজে ফোন করেছিলেন। অনুষ্ঠানে আসতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করলেন। তারপর বললেন, “মাসুম, অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের বলবে, স্যারের স্ত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় স্যারকে হাসপাতালে স্ত্রীর পাশে থাকতে হচ্ছে। তাই স্যার আসতে পারেননি। তোমার এবং তোমার লেখা বইটির জন্য শুভকামনা রইল।”

কথাগুলো আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। সেদিন মনে হয়েছিল, আমার মতো একজন ছোট্ট মানুষের কথা মনে না রাখলেও তার কিছুই এসে-যেত না। কিন্তু তিনি রেখেছেন। কারণ তিনি শুধু বড় মানুষ ছিলেন না, বড় মনের মানুষও ছিলেন। পরবর্তী ক্লাসে দেখা হলে স্যার আমার বইটির অনুষ্ঠানের খোঁজখবর নিয়েছিলেন। কেমন হলো, কে কে এসেছিলেন—সব জানতে চেয়েছিলেন। 

স্যারের সঙ্গে আমার সর্বশেষ সাক্ষাৎ এক বছর মেয়াদি থিয়েটার স্কুল কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানের দিন। আমরা সেদিন মঞ্চস্থ করেছিলাম ‘য্যায়সা ক্যা ত্যায়সা’ নাটকটি। নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় স্যার। সমাপনী অনুষ্ঠান ও নাট্যপ্রদর্শনের মধ্য দিয়ে সেদিন আমাদের থিয়েটার স্কুলের ১৮তম ব্যাচের এক বছরের কোর্স শেষ হয়। সেদিন অনুষ্ঠানে কবীর চৌধুরী স্যারসহ অন্য অতিথিরা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মঞ্চে বসে আছেন। হলভর্তি দর্শক। একে একে সবার নাম ঘোষণা করা হচ্ছে সনদ নেওয়ার জন্য। কেউ সনদ নিচ্ছে তৎকালীন সংস্কৃতি সচিবের হাত থেকে, কেউ নাট্যজন আতাউর রহমানের হাত থেকে, কেউ নাট্যজন রামেন্দু মজুমদারের হাত থেকে। আবার কেউ নিচ্ছে থিয়েটার স্কুলের অধ্যক্ষ কবীর চৌধুরী স্যারের হাত থেকে।

তখনো আমার নাম ডাকেনি। কিন্তু মনে মনে খুব চাচ্ছিলাম আমার সনদটা যেন কবীর চৌধুরী স্যারের হাত থেকেই নিতে পারি। চাইলেই তো আর সব চাওয়া পূরণ হয় না! আমারও হলো না। সেদিন ঠিক কার হাত থেকে সনদ নিয়েছিলাম আজ আর মনে নেই। কবীর চৌধুরী স্যারের সঙ্গে হাত মেলানোর আশা যখন ছেড়ে দিয়েছি, ঠিক তখনই মাইকে আবার আমার নাম শুনতে পেলাম। এবার পুরস্কার দেওয়ার পালা। ভালো ফলাফলের জন্য পুরস্কার। আবার বুকের ভেতর আশাটা জেগে উঠল—এবার কি তাহলে স্যারের সঙ্গে হাত মেলানো হবে?

মাইকে ঘোষণা করা হলো, “মাসুম মাহমুদ পুরস্কারটি গ্রহণ করবে থিয়েটার স্কুলের অধ্যক্ষ, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর কাছ থেকে।” মনে যে কী আনন্দ! পুরস্কার নিতে আবার মঞ্চে উঠলাম। স্যারের হাত থেকে পুরস্কার নিলাম, স্যারের সঙ্গে করমর্দন করলাম। বুকভরা আনন্দ নিয়ে ফিরে গেলাম গ্রিনরুমে। ফিরে এসেই মনে হলো—আরে! স্যারের সঙ্গে ছবি তো তোলা হলো না! তখনো অনুষ্ঠানের অনেক আনুষ্ঠানিকতা বাকি। এরই মধ্যে নাটক শুরুর সময়ও হয়ে এসেছে। কিন্তু সেসব নিয়ে আমার কোনো ভাবনাই নেই। স্যারের সঙ্গে একটা ছবি না তুলে চলে যাব—এটা কী করে হয়! কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে আবার মঞ্চে উঠে গেলাম। সোজা স্যারের কাছে। হাতে থাকা পুরস্কারটি আবার স্যারের হাতে দিয়ে বললাম, “ছবি তুলতে ভুলে গেছি, স্যার।”

আমার কথা শুনে ফটোগ্রাফার হেসে উঠলেন, হাসলেন নব্বই ছুঁইছুঁই বয়সের প্রকৃতিপ্রেমী আধুনিক মানুষটি। শিশুর মতো হেসে বললেন, “ছবি তুলতে এসে খুব ভালো করেছো।” স্যারের সঙ্গে তোলা সেই ছবিটি আজও আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতিগুলোর একটি। বরং বলতে পারি, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবিগুলোর একটি।