২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগী ভর্তি, ডেঙ্গু ঠেকানোর দায় কার?

“শুধু মশাকে লক্ষ্য করে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালালে হবে না, এইডিস মশাকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানেই আমাদের ভুল হচ্ছে।”

আব্দুস সবুর লোটাস আব্দুস সবুর লোটাস

সাখাওয়াত সুপন কৌশিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 27 Oct 2026, 01:25 AM

Updated : 27 Oct 2026, 01:29 AM

চলতি বছর ডেঙ্গু যে ভয়াবহ দিকে যেতে পারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এমন অনুমান আর সতর্কবার্তা ছিল আগে থেকেই। তবুও যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এ রোগে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ২৬ বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অক্টোবর শেষের আগেই এইডিস মশাবাহিত এ রোগে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৩৮০ জনের বেশি। ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির এ সংখ্যা ২৬ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

এর আগে ২০২৩ সালে ৩ লাখের বেশি রোগী ভর্তি হয় এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের প্রাণ যায় ডেঙ্গুতে। পরের বছর ডেঙ্গু নিয়ে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হলেও এবার অক্টোবর শেষ হওয়ার আগেই সেটি ছাড়িয়ে গেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে নগর কর্তৃপক্ষের গতানুগতিক পদ্ধতি কিংবা উদাসীনতার কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এর বিপরীতে নগর কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা তুলে ধরে নগরবাসীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নিজেদের ভূমিকার চেয়ে তারা আঙুল তুলছেন নগরবাসীর দিকে; বলছেন, জনগণের সচেতনতার অভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগী আর মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েও যারা হাসপাতালে ভর্তি হন না, তারা থেকে যান হিসাবের বাইরে। ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই চিত্র কেবল সরকারি নথির হিসাব। এর বাইরে থেকে যায় অনেক মানুষ।

প্রতি বছর বর্ষার আগেই এইডিস মশার প্রজনন ও ঘনত্বের ওপর জরিপ চালিয়ে ডেঙ্গুর পূর্বাভাস দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞরা।

চলতি বছরের জরিপে নেতৃত্ব দেওয়া কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলছেন, তিন জরিপেই ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় অন্য বছরের চেয়ে বেশি মাত্রায় এইডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অতীতের জরিপগুলোতে প্রতি ১০০ প্রজনন উৎসের মধ্যে সাধারণত ১০ বা এর কাছাকাছি সংখ্যায় মশার লার্ভা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এ বছর সেটি কয়েকগুণ বেড়েছে।

চলতি বছরের ৬ জুন ডেঙ্গু প্রতিরোধে চালানো এক অভিযানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, “চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই শুরু থেকেই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

দুই থেকে তিন দিন পরপর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “যে প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনায় ডেঙ্গুবাহী মশার লার্ভা পাওয়া যাবে, সেখানে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জরিমানা করা হবে।”

কী করছে সরকার

দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান গত ১২ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানো, এইডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং সরকারি, বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগকে সমন্বিত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়। আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে এ কর্মসূচি চলবে।

এর অধীনে রাজধানীতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সব জেলা-উপজেলায় একযোগে সচেতনতামূলক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সেবা বিভাগের সচিব এ এন এম বজলুর রশীদ বলেন, “রাজধানী থেকে উপজেলা পর্যায়ে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হয়েছে।”

সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল ফগার মেশিনে ধোঁয়া দেওয়াই মশা নিয়ন্ত্রণের মূল কাজ নয়। তারা এখন লার্ভা ধ্বংস ও মশার উৎস নির্মূলে বেশি জোর দিচ্ছেন।

রাজধানীর মহাখালী এলাকায় মশা নিধন নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের প্রশ্নে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, “ওই এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে একটি দল নিয়মিত কাজ করে। দুদিন আগেও প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াত উপলক্ষে সেখানে ব্যাপক কাজ করেছি। ওই জায়গায় নিয়মিত কাজ না করলে মশা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।

“মানুষের ধারণা, সেখানে কাজ হয় না। কিন্তু আমরা এখন যে কাজগুলো করি, তার মধ্যে বেশি গুরুত্ব পায় সোর্স রিডাকশন ও লার্ভিসাইডিং। এসব কাজে কোনো শব্দ হয় না, ধোঁয়া হয় না। ফলে মানুষ বুঝতে পারে না যে সেখানে একটি দল কাজ করছে। ফগার মেশিন ব্যবহার করলে চারদিক ধোঁয়ায় ভরে যায়, শব্দ হয়। তখন মানুষ বুঝতে পারে যে কাজ হচ্ছে। কিন্তু মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ মানেই তো ফগার চালানো নয়।”

ডেঙ্গুর হটস্পট চিহ্নিত করার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বছর তারা রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে ১০০টি হটস্পট চিহ্নিত করেছেন।

নাগরিকদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইমরুল কায়েস বলেন, “মশা কেন মরছে না, সেজন্য শুধু সিটি করপোরেশন বা আবহাওয়াকে দায়ী করলে হবে না। নাগরিকদেরও সম্পৃক্ত হতে হবে। এইডিস মশাতো বাসাবাড়ির ভেতরে থাকে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দেড় কোটি মানুষের ৬০ থেকে ৭০ লাখ বাসায় গিয়ে কাজ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

“গত সেপ্টেম্বর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখেছি, অনেক বাসার বেজমেন্টে লার্ভা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব জায়গায় আমাদের নিয়মিত যাওয়া সম্ভব হয় না, সেখানে সমস্যা বেশি। আমাদের মশককর্মীরা অনেক সময় বাসার বেজমেন্টে প্রবেশের অনুমতি পান না। ছাদে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার বিষয় থাকে।”

তিনি বলেন, নাগরিকরা সহযোগিতা না করলে শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

“আমরা বাসার ভেতরেও লার্ভা পেয়েছি। মানুষ থালাবাসন ধোয়ার পর যে স্ট্যান্ডে রাখে, তার নিচে থাকা প্লাস্টিক বা স্টিলের ট্রেতে পানি জমে থাকতে পারে। বেসিনের পাশে কলের গোড়ায় জমে থাকা পানিতেও লার্ভা পাওয়া যায়। বাসার ছাদ, কার্নিশ ও বেজমেন্টেও মশার প্রজনন হতে পারে। এসব জায়গায় পানি জমতে না দেওয়া জরুরি।”

তিনি বলেন, “বাড়ির ব্যবস্থাপক, নিরাপত্তাকর্মী ও বাসিন্দারা যদি একটু সচেতন হন, তাহলে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করা অনেক সহজ হয়।”

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকার কথা বলেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমানও।

তিনি বলেন, “এখনও বড় বড় ভবনে দেখা যায়, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) পানির পাইপ নিচ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। পাইপ মাঝপথে কেটে রাখা হয়েছে, সেখান থেকে পানি পড়ে। আমি নিজেও বাসার আশপাশে এমনটা দেখেছি। সামান্য জমে থাকা পানিও এইডিস মশার লার্ভা জন্মানোর জন্য যথেষ্ট। এ বিষয়গুলো আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।”

নগর কর্তৃপক্ষের কাজে সীমাবদ্ধতা থাকার কথাও বলেন তিনি। বলেন, “দেখা যাক, নভেম্বরে আরও বেশি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও নজরদারি চালিয়ে পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।”

‘যে পদ্ধতিতে চেষ্টা চলছে, তাতে কিছু হবে না’

এইডিস মশা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার।

“আমরা সাধারণভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করছি, কিন্তু এইডিস মশা অন্য মশার মতো নয়। এর আচরণ ও প্রজননের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। তাই, শুধু মশাকে লক্ষ্য করে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালালে হবে না, এইডিস মশাকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানেই আমাদের ভুল হচ্ছে।”

প্রজনন স্থল ধরে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “কোন কোন জায়গায় এইডিস মশার প্রজনন হচ্ছে, কী পরিমাণে হচ্ছে এবং ঠিক সেই জায়গাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কী হবে, তা চিহ্নিত করতে হবে।”

লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হলেও সরকার এই পরিস্থিতিকে ‘সেভাবে স্বীকারই করছে না’ বলে দাবি করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।

তিনি বলেন, “সরকার গতানুগতিকভাবে হাসপাতালে স্যালাইন, ওষুধপত্র বিতরণের কাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে যে জরুরিভাবে কাজ করতে হয়, সেটির ব্যাপারে তারা উদাসীন।”

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, “সরকার বর্তমানে বিমান, যুদ্ধ সরঞ্জাম কেনায় এখন ব্যস্ত, কিন্তু দেশে হাম-ডেঙ্গুতে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। বর্তমানে যে পরিস্থিতি এটিকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা ছাড়া কাজ করা কঠিন। কিন্তু সরকার সেটি বুঝতে পারছে না এবং আমরা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছি “

মশা নিধনের পদ্ধতিতেও ‘গলদ দেখছেন’ মুশতাক হোসেন। তার কথায়, “যে পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হচ্ছে, তাতে কিছু হবে না। কারণ মশা নিধন কার্যক্রমে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞসহ একটি কমিটি থাকা প্রয়োজন।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ বলেন, “২০০০ সালের পর থেকে জাতীয়ভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ না করার ফল এটি। এবার রোগীর পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, ভবিষ্যতে ডেঙ্গুর অবস্থা আরো ভয়াবহ হবে। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতীয় নীতিমালা এবং বিশেষজ্ঞ টিম প্রয়োজন।

“সারা বছরজুড়ে এইডিস মশার নজরদারি প্রয়োজন, যারা মশার সার্বিক বিষয় দেখে-শুনে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে কাজ করবে।”