Published : 10 Sep 2026, 05:17 PM
সিস্টিক ফাইব্রোসিস (সিএফ) একটি বংশগত রোগ, যা মূলত ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে আক্রান্ত করে। রোগটির কারণে শরীরে ঘন ও আঠালো শ্লেষ্মা তৈরি হয়, যা শ্বাসনালি ও বিভিন্ন অঙ্গের নালিতে জমে নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে।
প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব সিস্টিক ফাইব্রোসিস দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশেও এ উপলক্ষে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে রোগটি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি এবং রোগ শনাক্তের পরীক্ষার সীমিত সুযোগের কারণে অনেক রোগীই সঠিক সময়ে শনাক্ত হচ্ছেন না।
যেসব লক্ষণে সন্দেহ করা যায়
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম এস খালেদ বলেন, সিস্টিক ফাইব্রোসিসের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হওয়া কাশি, ঘন ও আঠালো কফ, বারবার ফুসফুসের সংক্রমণ বা নিউমোনিয়া, পায়খানার সঙ্গে অতিরিক্ত চর্বি বের হওয়া এবং পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণের পরও ওজন না বাড়া।
এ ছাড়া অস্বাভাবিকভাবে নোনতা ঘামও এই রোগের একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ।
রোগটি অনেক সময় শনাক্ত না হওয়ার কারণ সম্পর্কে ডা. খালেদ বলেন, “বাংলাদেশে এখনও সিস্টিক ফাইব্রোসিস নিয়ে তেমন সচেতনতা নেই। অনেক ক্ষেত্রে রোগটিকে কাশি বা অ্যাজমা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।”
তিনি বলেন, এই রোগ নির্ণয়ের যে পরীক্ষা সেটা দেশের খুব কম জায়গায় হয়। মূলত ঘাম পরীক্ষা করে রোগ শনাক্ত করা হয়।
ঘামে ক্লোরাইডের মাত্রা নির্ণয় করা হয়, যার পরিমাণ ৬০ মিলি মোল/লিটার হলে ব্যক্তি সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত বলে ধরে নেওয়া হয়।
তবে শুধু একটি পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে সব ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় করা হয় না; রোগীর উপসর্গ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষার ফলও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা অজানা
ডা. খালেদ বলেন, বাংলাদেশে সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত রোগীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনও জানা যায়নি। রোগটি বিরল বলে বিবেচিত হওয়া এবং রোগ শনাক্তের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক রোগীই শনাক্তের বাইরে রয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।
“ফলে রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তের পাশাপাশি সাশ্রয়ী চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”
বিশ্বব্যাপীও সিস্টিক ফাইব্রোসিসের প্রকৃত রোগীর সংখ্যা নির্ধারণে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ২০২২ সালের একটি বৈশ্বিক গবেষণায় ৯৪টি দেশে প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার ৪২৮ জনের সিস্টিক ফাইব্রোসিস থাকার হিসাব পাওয়া যায়।
এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৩৫২ জন শনাক্ত হয়েছিলেন এবং আনুমানিক ৫৭ হাজার ৭৬ জন শনাক্তের বাইরে ছিলেন।
পরবর্তী ২০২৪ সালের গবেষণায় ৯৬টি দেশে মোট রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৩৬ বলে অনুমান করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৭৬ হাজার ৫৬৯ জন শনাক্তের বাইরে রয়েছেন বলে গবেষকদের হিসাব।
চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
সিস্টিক ফাইব্রোসিস জেনেটিক রোগ হওয়ায় বর্তমানে এর স্থায়ী নিরাময় নেই। তবে রোগের ধরন ও জটিলতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন চিকিৎসা ও ওষুধের মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ, ফুসফুসের কার্যকারিতা ধরে রাখা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব।
ডা. খালেদ বলেন, দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চললে রোগী দীর্ঘদিন তুলনামূলক স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
আধুনিক চিকিৎসায় সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত মানুষের বেঁচে থাকার হারও আগের তুলনায় বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টিক ফাইব্রোসিস ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীদের ক্ষেত্রে বর্তমান চিকিৎসা অব্যাহত থাকলে প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৬৬ বছর হবে বলে ধারণা করা হয়।
চিকিৎসার সুযোগ
ডা. খালেদ বলেন, বাংলাদেশে সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে জানা না থাকায় রোগটির চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধ আগে সহজলভ্য ছিল না। তবে ইদানিং কিছু ওষুধ কম খরচে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সিস্টিক ফাইব্রোসিসের ক্ষেত্রে রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা, নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা সহজলভ্য করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।