০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

সোহরাওয়ার্দীতে ডেঙ্গুর চিকিৎসা চলে ‘অতি ছোঁয়াচে’ হামের পাশেই

‘আমাদের হাসপাতালে এত রোগী যে বাধ্য হয়ে এভাবে রাখা হয়েছে; কোনো উপায় নাই” বলেন হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক নন্দ দুলাল সাহা।

আব্দুস সবুর লোটাস আব্দুস সবুর লোটাস

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Aug 2026, 10:59 PM

Updated : 10 Sep 2026, 05:57 PM

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আর ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা চলছে পাশাপাশি ওয়ার্ডে রেখে, যা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, হাম ‘খুবই ছোঁয়াচে’ হওয়ায় তা সহজেই আশপাশে থাকা শিশু রোগীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদেরকে ‘বাধ্য হয়েই’ এভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে।

ডেঙ্গু নিয়ে এই হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়েছেন, তাদের একজন সানি আহমেদ। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর রোববার দুপুরে ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডে শয্যা পায় মোহাম্মদপুর থেকে আসা এ কিশোর।

এদিন সানির মা মালেকা বেগম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এক সপ্তাহ থেকে ছেলের জ্বর এবং শরীর ব্যথা। একাধিকবার হাসপাতালে আসছি। গতকাল ডেঙ্গু ধরা পড়ার পর ডাক্তাররা ভর্তি হতে বলে।”

এই হাসপাতালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ অগাস্ট পর্যন্ত তথ্য বলছে, ১ হাজার ৮৯০ জন রোগী ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৩৯ জন চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। মৃত্যু হয়েছে তিন জনের। বাকি ২৪৪ জন বর্তমানে ভর্তি আছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অগাস্টে মারা গেছেন ১৬ জন।

রোববার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, চার তলায় ডেঙ্গু এবং হাম রোগীদের জন্য আলাদা আলাদা ওয়ার্ড রয়েছে।

নারী ও পুরুষ ডেঙ্গু রোগীদের শয্যা আলাদা। ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডে কোনো শয্যা ফাঁকা নেই।

আল-আমিন নামের একজন ডেঙ্গু রোগী বলেন, ‘‘আমি একটি খাবার দোকান চালাই। গত এক সপ্তাহ ধরে জ্বর ছাড়ে না, আবার শরীর ব্যাথ্যা হয়। হাসপাতালে আসার পর দেখি ডেঙ্গু হয়েছে। পাঁচ দিন হলো শুইয়া আছি।’’

হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, চার তলার এক পাশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নারী রোগীদের চিকিৎসা চলছে। আরেক পাশে পুরুষ রোগীদের শয্যা। এরপরেই ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে চলছে হামের চিকিৎসা।

রোববারের নথি অনুসারে, এই হাসপাতালে ডেঙ্গুর জন্য বরাদ্দ করা ১৪০টি ডেঙ্গু শয্যার বিপরীতে ২৪৪ জন ভর্তি রয়েছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৭।

হাম-ডেঙ্গু রোগীর ওয়ার্ড পাশাপাশি থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘দেশের হামের রোগী এখনো কমছে না। আর মিজেলস ভাইরাস খুবই ছোঁয়াচে, দ্রুত আরেকজনের শরীরে প্রবেশ করে।

“তাই হাম এবং ডেঙ্গু রোগী যতটা দূরে রাখা যায়। নইলে অন্যদের হামে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘হামের রোগী কমানোর বিষয়ে স্বাস্থ্যে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে কাজ করা প্রয়োজন ছিল, সেটি হয়নি। দীর্ঘ সময়ে হামের রোগী কমেনি।”

এ বিষয়ে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক নন্দ দুলাল সাহা বলেন, ‘‘আমাদের হাসপাতালে এত রোগী যে বাধ্য হয়ে এভাবে রাখা হয়েছে। আমাদের হাতে কোনো উপায় নাই, রোগীদেরও ফিরিয়ে দিতে পারি না সেভাবে, তাই এ অবস্থা।”

ওয়ার্ডের ভেতরে নতুন করে শয্যা যোগ করার সম্ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘১৪০টি শয্যার বিপরীতে প্রায় ২৫০ জন ভর্তি রয়েছে। কীভাবে এত রোগীর জায়গা দেব। আমরা বাধ্য হয়ে যেভাবে পারি রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া বা ভর্তি নেওয়ার চেষ্টা করছি।”

তবে ডেঙ্গু রোগীরা মশারির মধ্যে থাকায় কিছুটা মিজেলস ভাইরাস ‘প্রটেক্ট’ হয় বলে মন্তব্য করেন নন্দ দুলাল।

যদিও তার এ ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন।

তিনি বলেন, “মশারির মাধ্যমে মিজেলস ভাইরাস ‘প্রটেক্ট’ হয় না।”

এবার ডেঙ্গুর ডিইএনভি-৩ ছড়াচ্ছে বেশি

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সম্প্রতি ৭১ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষায় ৬৫ জনের মধ্যে ডিইএনভি-৩ পাওয়া গেছে। বাকি ছয়জন আক্রান্ত ছিলেন ডিইএনভি-২-এ। এ বছর এখনো ডিইএনভি-১ এবং ডিইএনভি-৪ পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপ রয়েছে— ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪। প্রতিটি সেরোটাইপের আবার একাধিক জিনগত ধরন (জিনোটাইপ) আছে।

২০২৫ সালে রাজধানীর ২৪০ জনের নমুনা পরীক্ষায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি ১১৮ জনের নমুনায় পেয়েছিল ডিইএনভি-২। আর ৮৬ জনের নমুনায় ডিইএনভি-৩, ২১ জনের মধ্যে নমুনায় ডিইএনভি-১ এবং ১৫ জনের নমুনায় ডিইএনভি-৪ পাওয়া যায়।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকী বলেন, রোগ কত বেশি গুরুতর হবে, সেটি সেরোটাইপের ওপর শুধু নির্ভর করে না। তবে একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্যটায় হলে রোগীর অবস্থা বেশি খারাপ হয়। এছাড়া রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং তার আগে থেকে থাকা অন্যান্য রোগসহ নানা বিষয়ের ওপর রোগীর অবস্থা নির্ভর করে।

তিনি বলেন, ‘‘দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সেরোটাইপ পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা ও অন্যান্য শহরের হাসপাতাল থেকে পাওয়া নমুনা আর পার্বত্য অঞ্চল বা গ্রামীণ এলাকা থেকে সংগ্রহ করা নমুনার মধ্যে পার্থক্য আছে।”