Published : 24 Aug 2026, 05:12 PM
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানির উৎসে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া গেছে; যা আগামী দশ বছরে ওই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে উচ্চমাত্রার হৃদরোগে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিশেষ করে খুলনার কয়রা উপজেলায় জরিপ করা খাবার পানির ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। এর ফলে সেখানকার প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন হৃদরোগের ঝুঁকিতে আছেন বলে অনুমান গবেষকদের।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের একটি যৌথ গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীতে আইসিডিডিআর,বির সাসাকাওয়া মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে খাবার পানির লবণাক্ততা এবং স্বাস্থ্য: প্রমাণ, অভিযোজন এবং নীতিগত সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার ফল উপস্থাপন করা হয়।
আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিয়া নাহিদ গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়, গবেষণার আওতায় প্রথমে খুলনার কয়রা উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন এলাকার ১৭২টি গ্রাম এবং সাধারণ পরিচর্যা (তুলনামূলক) এলাকা হিসেবে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার খাবার পানির উৎসগুলো মূল্যায়ন করা হয়। গবেষকরা মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি (২৪.২ শতাংশ) উৎসের পানি পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
গবেষণায় কয়রা ও আশাশুনির ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির হৃদরোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় প্রতি ৫ জনে একজনের (২১.৬ শতাংশ) আগামী দশ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদরোগের ঝুঁকি (কমপক্ষে ১০ শতাংশ ঝুঁকি হিসেবে সংজ্ঞায়িত) আছে বলে অনুমান করা হয়েছে। এর হার কয়রায় ১৯.৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩.৬ শতাংশ।’’
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষণা দল পানি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ‘ইন্টারভেনশন প্যাকেজ’ তৈরি করেছে বলে সেমিনারে তথ্য দেওয়া হয়। তাদের ভাষ্য, পানিবিষয়ক কর্মসূচির লক্ষ্য- কমিউনিটি সচেতনতা বৃদ্ধি, পানির উৎসের সুষ্ঠু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন ও নজরদারি জোরদার করার মাধ্যমে কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো।
এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার এবং টিউবওয়েল, পাশাপাশি খাবার পানির উৎসের জন্য একটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ও তদারকি ব্যবস্থা।
সেমিনারে বলা হয়, গত প্রায় দুই দশক ধরে উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় খাবার পানিতে লবণাক্ততা, বিশেষ করে সোডিয়ামের আধিক্যের সঙ্গে রক্তচাপ বৃদ্ধির যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তবে গবেষণার এই ফলাফলকে লবণাক্ত পানি সরাসরি হৃদরোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছে না। গবেষকরা খাবার পানিতে সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদানের উপস্থিতি এবং এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিনেইস বলেন, “খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যভিত্তিক মাত্রা নির্ধারিত হয়নি। সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান স্বাস্থ্যের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা চলমান রয়েছে।”
খাবার পানির স্বাস্থ্যভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণে উপযুক্ত নির্দেশিকা প্রণয়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যগত প্রভাবের সম্পর্ক নিয়ে তথ্য-প্রমাণ এখনো সীমিত। নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণকে একসঙ্গে যুক্ত করে কার্যকর অভিযোজন কৌশল তৈরির কাজ চলছে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. লুৎফর রহমান বলেন, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার।