সিপিআরেও কেন ফেরানো গেল না নানা পাটেকরকে, ব্যাখ্যা দিলেন চিকিৎসক
“কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় কিছু না করার তুলনায় দ্রুত ও সঠিকভাবে সিপিআর শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
বাসা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো মাত্রই বলিউডের শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকরকে সিপিআর দেওয়া শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। মিনিট পাঁচেক দূরত্বের হাসপাতালে পৌঁছেও চলে চিকিৎসা; সব মিলিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে চেষ্টা চালিয়েও হতাশ হতে হয়েছে চিকিৎসকদের।
সর্বাত্মক চেষ্টার পরও কেন অভিনেতাকে বাঁচানো গেল না তার ব্যাখ্যা সংবাদমাধ্যম ওয়ালকে জানিয়েছেন কলকাতার চিকিৎসক সৌম্য গুহ।
এ কার্ডিয়াক সার্জন বলেন, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর সিপিআরের অন্যতম লক্ষ্য হল মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে কিছুটা হলেও রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া। যতক্ষণ না স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন ফিরে আসে, ততক্ষণ এই কৃত্রিম রক্তসঞ্চালন অঙ্গগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে সেই চেষ্টা সফল হয় না।
কেউ অচেতন হয়ে গেলে বা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে কিংবা হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বুকে বারবার চাপ দিয়ে এবং কৃত্রিম শ্বাস দেওয়ার জরুরি পদ্ধতিই সিপিআর নামে পরিচিত।
অভিনেতা নানা পাটেকরকে বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার বেসরকারি মণিপাল হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
তার এক বন্ধু চিকিৎসকদের জানিয়েছেন, ভোর সাড়ে ৩টার দিকে নানা পাটেকর ভালো বোধ করছেন না জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ৪টার দিকে বার্তাটি দ্রুতই তিনি পাটেকরের বাসায় ছুটে যান।
মণিপাল এরপর অভিনেতার সঙ্গে কেয়ারটেকার দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। সেখান থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয় তার বাসায়।
হাসপাতালের চিকিৎসক শেখর সালকার জানান, ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) দেওয়ার পরও নানা পাটেকরকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ভোর ৫টা ১০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪০ মিনিট) তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
চিকিৎসকের বরাতে ওয়াল লিখেছে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। হৃদ্যন্ত্রের ধমনিতে আগে থেকেই ব্লকেজ থাকলে কোনও সময় সেখানে হঠাৎ রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হতে পারে। ফলে হৃদ্যন্ত্রের একটি অংশে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছায় না। সেই অংশের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
ডা. সৌম্য গুহ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে হৃদ্যন্ত্রের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা আচমকা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। তখন শুধু বাইরে থেকে বুকে চাপ দিয়ে সেই হৃদ্যন্ত্রকে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানো সম্ভব হয় না।
এখানেই সিপিআর নিয়ে একটি ভুল ধারণা রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সিপিআর হৃদ্যন্ত্রকে স্বাভাবিকভাবে চালু করে দেওয়ার কোনও ‘সুইচ’ নয়। এটি মূলত বুকের উপর চাপ প্রয়োগ করে কৃত্রিমভাবে রক্তসঞ্চালন বজায় রাখার চেষ্টা করা মাত্র। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ অনুযায়ী ডিফিব্রিলেশন, ওষুধ, শ্বাসনালীর ব্যবস্থা বা অন্য জরুরি চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে। দ্রুত সিপিআর এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত ডিফিব্রিলেশন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ।
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট যত দীর্ঘ হয়, শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর ক্ষতির আশঙ্কাও তত বাড়ে। মস্তিষ্ক বিশেষভাবে অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সিপিআর চলাকালেও যদি পর্যাপ্ত রক্তচাপ ও রক্তসঞ্চালন বজায় রাখা না যায় এবং স্বতঃস্ফূর্ত হৃৎস্পন্দন ফিরে না আসে, তাহলে ধীরে ধীরে অঙ্গগুলো অকেজো হতে থাকে।
এ কারণে ৪৫ মিনিট, এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় সিপিআর চললেই যে নির্দিষ্ট একটি সময়ের পর তা ‘কার্যকারিতা হারায়’—এমন কোনও আদর্শ সময়সীমা নেই। রোগীর বয়স, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ, কখন সিপিআর শুরু হয়েছে, প্রথম ছন্দটি কী ছিল, ডিফিব্রিলেশন প্রয়োজন হয়েছিল কি না এবং চিকিৎসায় শরীর কীভাবে সাড়া দিচ্ছে—সবকিছুর ওপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করে বলে জানান ডা. সৌম্য গুহ।
তিনি বলেন, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় কিছু না করার তুলনায় দ্রুত ও সঠিকভাবে সিপিআর শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে সাময়িক রক্তসঞ্চালন বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
ওয়াল লিখেছে, কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণ কী ছিল, তা ময়নাতদন্ত বা চিকিৎসা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যায় না। নানা পাটেকরের ক্ষেত্রেও গোয়ার মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসক একই কথা জানিয়েছেন। তারা অভিনেতার দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছেন।
