‘মেরে আপনে’ থেকে ‘হু তু তু’: অনন্য প্রতিভায় ভাস্বর গুলজার

গুলজার এমন একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যিনি হাস্যরসের সিনেমা ‘আঙ্গুর’ এবং রাজনৈতিক সিনেমা ‘মাচিস’ সমান সাচ্ছন্দ্যে নির্মাণ করতে পারেন।

গ্লিটজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 August 2022, 06:01 PM
Updated : 18 August 2022, 06:01 PM

তিনি যাই লেখেন, তার প্রতিটি শব্দ ধরা দেয় জীবন্ত হয়ে; সাহিত্য, সঙ্গীত, চলচ্চিত্রে সমান সফল; বাংলা সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী, রবীন্দ্রভক্ত এক কবি। গুলজার একাধারে সাহিত্যিক, গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার। যেখানেই তিনি হাত দিয়েছেন, সাফল্য পেয়েছেন।

বহুমুখী প্রতিভাধর গুলজার জীবনের ৮৮ বছর পূর্ণ করেছেন বৃহস্পতিবার। তার জন্মদিন উপলক্ষে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ তুলে ধরেছে চলচ্চিত্রকার গুলজারকে।

ইনডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, গুলজার এমন একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যিনি হাস্যরসের সিনেমা ‘আঙ্গুর’ এবং রাজনৈতিক সিনেমা ‘মাচিস’ সমান স্বাচ্ছন্দ্যে নির্মাণ করতে পারেন।

প্রতিভাবান এই মানুষটির পুরো নাম সম্পূরণ সিং কালরা, যিনি গুলজার নামেই খ্যাত। জন্ম ১৯৩৪ সালের পাকিস্তানের ঝিলম জেলায়। সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে গুলজার চলে আসেন ভারত। প্রথমে পাঞ্জাবের অমৃতসরে বসত, তারপর জীবিকার খোঁজে ঠাঁই গড়েন বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই)।

কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকার জন্য একটি গাড়ির গ্যারাজে মেকানিকের কাজ শুরু করেন গুলজার। কিন্তু নেশা ছিলো সাহিত্য। লেখার নেশায় রাতজেগে লিখতেন কবিতা। শুরুর দিকে ছদ্মনাম ‘দেনভি’ নামে লিখলেও কিছুকাল পরেই গুলজার নামে লেখালেখিতে তার আত্মপ্রকাশ।

স্মৃতিচারণায় গুলজার বলেছেন, ষাটের শেষ থেকে সত্তরের দশকে বোম্বের সিনেমা জগতে বিচরণরত বাঙালিদের সঙ্গে তার দারুণ সখ্য গড়ে ওঠে। রবীন্দ্র সাহিত্য তাকে বেশ নাড়া দেয়। বই পড়ার নেশায় জীবনে জড়িয়ে যায় নজরুল, শরৎ, মানিক আর জীবনানন্দ দাশ।

গুলজার জানান, বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাতা বিমল রায়ের বিশেষ ভূমিকা ছিল তার চলচ্চিত্র জগতে আসার পেছনে। কাজ করেছেন ঋষিকেশ মুখার্জির সঙ্গে। গীতিকার গুলজারের অভিষেকও হয় কিংবদন্তি বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী শচীন দেববর্মনের সঙ্গে কাজ করে। বন্ধু ছিলেন খ্যাতনামা সঙ্গীতকার রাহুল দেব বর্মণ।

গুলজারের স্ত্রীও একজন বাঙালি, স্বনামধন্য অভিনেত্রী রাখী। তাদের একমাত্র মেয়ে মেঘনা গুলজারও একজন চলচ্চিত্র পরিচালক।

বাংলা সিনেমা নির্মাণেও জড়িয়েছেন গুলজার। নির্মাতা বিমল রায় এবং ঋষিকেশ মুখার্জির সহকারী হিসাবেও গুলজার কাজ করেছেন।

সত্তরের দশকেই চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে গুলজারের। একাত্তর সালে নির্মিত প্রথম সিনেমা ‘মেরে আপনে’ দিয়েই নিজেকে আলোয় নিয়ে আসেন এই নির্মাতা। ওই সময়ে ‘মারপিট’ এবং ‘নাচগান ‘সর্বস্ব হিন্দি সিনেমার ধাঁচ বদলে নতুন প্রেক্ষাপট উপহার দেন দর্শকদের। বলা হয়ে থাকে, ‘মেরে আপনে’ তপন সিনহা পরিচালিত বাংলা সিনেমা ‘আপনজন’র একটি সফল অনুকরণ।

‘মেরে আপনে’ সিনেমায় স্পষ্ট হয়ে যায় গুলাজর সাহিত্যের সৌন্দর্যে মোড়া বাস্তবধর্মী সিনেমা তৈরিতে প্রত্যয়ী। এই সিনেময়ায় মীনা কুমারী একজন বিধবা নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি নানা সামাজিক সহিংতার শিকার। বিনোদ খান্না ছিলেন সিনেমার নাম ভূমিকায়, অভিনয় করেছেন শত্রুঘ্ন সিনহাও।

পরের এক বছরেই ‘আচানক’, ‘পরিচয়’ এবং ‘কোশিশ’ পরিচালনা করেন। ‘আচানক’ গুলজার নির্মাণ করেন আবেগঘন থ্রিলার হিসাবে। এই সিনেমাতেও বেছে নেন বিনোদ খান্নাকে। ভারতীয় সিনেমার ধারায় ‘আচানক’ সিনেমাটিকে ব্যতিক্রমী ধরা হয়, কারণ পরিচালক এখানে কোনো গান রাখেননি।

গুলজারের আগ্রহ এবং ভালোবাসার জায়গা ছিল ব্যতিক্রমী কাজ করার। তেমনই একটি কাজ ‘কোশিশ’, যা দর্শকদের মনে দাগ কাটে। মূক ও বধিরদের কথা বলার জন্য সাংকেতিক ভাষার ব্যবহারে গুলজার অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় রাখেন ‘কোশিশ’-এ। এই সিনেমায় বাকশক্তিহীন দম্পতি জয়া ভাদুরী এবং সঞ্জীব কুমারকে গুলজার উপস্থাপন করেন অন্য মাত্রায়।

গুলজারের ঝোঁক ছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। নির্মাতা হিসেবে নিজেকে ভেঙেচুরে গড়াতেই তার পছন্দ। নানা ঘরানার কাজ নিয়ে বারবার উপস্থিত হয়েছে দর্শকদের কাছে। বিশেষ করে ‘আঁধি’, ‘আঙ্গুর’ এবং ‘মাচিস’ এই তিনটি সিনেমাই স্বতন্ত্র কণ্ঠের।

হলিউডের বিখ্যাত ‘সাউন্ড অব মিউজিক’ সিনেমাটি দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে গুলজার তৈরি করলেন ‘পরিচয়’। বাংলা উপন্যাস রঙিন উত্তরায়ণ অবলম্বনে নির্মিত ‘পরিচয়’কে ওই সময়ে পারাবারিক বিনোদনের মডেল ধরা হয়েছিল।

অভিনয় শিল্পীদের সিনেমায় ‘চরিত্র’ বাছাইয়েও স্বতন্ত্র ছিলেন গুলজার। যেমন ‘পরিচয়ে’ তিনি অভিনেতা সঞ্জীব কুমারকে নায়িকা জয়ার বাবার ভূমিকা আনেন। অথচ ‘পরিচয়’ মুক্তির পরের সপ্তাহেই সঞ্জীব কুমারের ‘কোশিশ’ মুক্তি পায়। সেখানে সঞ্জীব অভিনয় করছেন জয়ার স্বামীর ভূমিকায়। এই সিনেমায় গুলজার দেখিয়ে দেন, ধার করা গল্পে তৈরি সিনেমাও শক্তভাবে দাঁড়িয়ে যায়।

কাহিনী, সংলাপ, পরিচালনা এবং অভিনয়ে গুলজারের আরেকটি ক্ল্যাসিক ‘আঁধি’। এই সিনেমায় কিংবদন্তি সুচিত্রা সেনের বিপরীতে ছিলেন সঞ্জীব কুমার।

আঁধির মূল বিষয়বস্তু হল একং সফল রাজনৈতিক নেত্রী এবং তার ফিকে হয়ে যাওয়া প্রেম। রাজনীতির ঘোলাটে দিক, রাজনীতিকের আবেগ-অনুভূতির টানাপোড়েন এবং সামাজিক সমস্যায় আবর্তিত ‘আঁধি’ দিয়ে গুলজার উঠে আসেন অনন্য উচ্চতায়।

তবে সিনেমাটি বিতর্কের মুখে পড়ে সে সময় ভারতের ক্ষমতায় থাকা ইন্দিরা গান্ধীর জীবনের সঙ্গে কিছু মিল পাওয়ায়। ১৯৭৫ সালে মুক্তির পরপরই ‘আঁধি’ নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৭৯ সালে ‘মীরা’ সিনেমা দিয়ে ভগবান কৃষ্ণের প্রেমিকা মীরার মাধ্যমে তার জীবন ও সময়কে তুলে আনেন গুলজার। যেখানে উপকথা বা পৌরাণিক কাহিনীকে পাশ কাটিয়ে নারীর সংসার ও সামাজিক জীবনের পরাধীনতা ও সংগ্রাম তুলে ধরেন গুলজার।

চন্দ্রচূড় সিং ও টাবু অভিনীত রাজনৈতিক থ্রিলার ‘মাচিস’ নির্মাণ করেন ১৯৯৬ সালে। আশির দশকের পাঞ্জাবে শিখ বিদ্রোহের পটভূমিতে ‘মাচিসের’ গল্প। সমসাময়িক ‘প্রণয়’ নির্ভর সিনেমাগুলো থেকে আলাদা হওয়ায় ‘মাচিস’ পায় তুমুল জনপ্রিয়তা।

গুলজার ক্যামেরার পেছনের কাজের সমাপ্তি টানেন ১৯৯৯ সালে। ওই বছর ‘হু তু তু’ নির্মাণের পর আর কোনো সিনেমার পরিচালনার কাজে হাত দেননি তিনি।

কেন আর ফিরছেন না প্রশ্নে ২০১৯ সালে পিটিআইকে গুলজার বলেছিলেন, “আমার আর সিনেমায় ফিরে আসার দরকার নেই। কারণ আমার সামনে যারা হাঁটছেন যেমন তরুণ নির্মাতা শিল্পা রানাডে, মেঘনা গুলজার তারা ভালো কাজ করছে, প্রাসঙ্গিক কাজ করছে। আমি মনে করি তারা আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে। তাদের আঙুল ধরে আমি এখন হাঁটছি, এত দ্রুত তালে তাদের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারব না।”

নিজের কাজ নিয়ে এই গুণীর মূল্যায়ন, “আমার ফিল্ম গুলো এই প্রজন্মের নির্মাতাদের তুলনায় অনেক বেশি ‘সিনেমাটিক’ ছিল। আমারগুলোকে ঠিক ‘ভালো’ কাজ বলা যাবে না।”

নিজের সৃষ্টির যথেষ্ট স্বীকৃতিও পেয়েছেন গুলজার। ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন পাঁচবার। ঝুলিতে রয়েছে একুশটি ফিল্ম ফেয়ার। সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্রে সর্বোচ্চ পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার জয়ের পাশাপাশি একটি করে অস্কার ও গ্র্যামি পুরস্কারও আছে তার ক্যারিয়ারে। দুটিই এসেছে স্লামডগ মিলিওনিয়রের ‘জয় হো’ গানের জন্য।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক