নানা পাটেকর: নীরবতাতেও যার অভিনয় কথা বলত
পর্দায় তিনি ছিলেন অনবদ্য, ব্যক্তিজীবনে খামখেয়ালি আর বিতর্কিত। চার দশকের ক্যারিয়ারে নিজের এক আলাদা পরিচয় তৈরি করা এই দাপুটে অভিনেতার জীবনের যবনিকা নামল ৭৫ বছর বয়সে।
তার কোনো কিছুই অন্য সবার মত ছিল না। তার চেহারা, কণ্ঠ, অভিনয়, কিংবা ব্যক্তিত্ব, কোনো কিছুই নয়।
মুখ দেখা না গেলেও কণ্ঠস্বরেই দর্শক বুঝতে পারতেন, কে কথা বলছেন। আবার কখনও একটি দীর্ঘ নীরবতা, চোখের অগ্নিদৃষ্টি কিংবা সংলাপ বলার ভঙ্গিই হয়ে উঠত পুরো দৃশ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত।
তার অভিব্যক্তির তীব্র প্রকাশ আর পর্দায় উপস্থিতি ছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্র কেমন হত?
হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকর আর পর্দায় আসবেন না। বৃহস্পতিবার ভোরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার ৭৫ বছরের জীবন চলচ্চিত্রের যবনিকা নেমেছে।
এনডিটিভি জানিয়েছে, মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে আর ফেরানো যায়নি।
নানা পাটেকরকে হিন্দি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে প্রতিভাবান অভিনেতাদের একজন মনে করা হয়। আর নিজের ব্যক্তিত্বেও তিনি ছিলেন বলিউডের সবচেয়ে জটিল চরিত্রগুলোর একজন।
তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতীয় সিনেমা হারাল এমন এক অভিনয়শিল্পীকে, যাকে কোনো একটি চরিত্র, কোনো একটি ঘরানা কিংবা প্রচলিত তারকা-ছাঁচে আটকে রাখা কঠিন।
নানা পাটেকারের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকার। মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন।
তারও আগে থিয়েটারের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। চলচ্চিত্রে আসার পর ধীরে ধীরে তিনি এমন একটি অভিনয়ভাষা তৈরি করেন, যা সমসাময়িক অনেক অভিনেতার চেয়ে আলাদা।
গাল্ফনিউজ লিখেছে, সমসাময়িক অন্যান্য অভিনেতাদের চেয়ে আবেগের পরিমিতিবোধ তিনি অনেক ভালো বুঝতেন।
পর্দায় ভয় বা আতঙ্ক ফুটিয়ে তুলতে তার কোনো ভারী মেকআপ, ডিজাইনার পোশাক বা নাটকীয় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের প্রয়োজন হত না। মুখের সামান্য বিকৃতি, দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা কিংবা অস্বস্তিকর নীরবতাই তার জন্য যথেষ্ট ছিল।
চোখের দৃষ্টি বদলে ফেলা, গলার স্বর খানিক নিচু করে দেওয়া, কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকা—এসব দিয়েই তিনি অনেক সময় এমন আবহ তৈরি করতেন, যার জন্য অন্য অভিনেতার দীর্ঘ সংলাপ প্রয়োজন হত।
নানা পাটেকরের অভিনয়ে অতিরিক্ত সাজসজ্জা কিংবা বড়সড় অঙ্গভঙ্গির ওপর নির্ভরতা ছিল না। বরং সাধারণ একটি সংলাপকেও তিনি নিজের কণ্ঠ ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে স্মরণীয় করে তুলতে পারতেন।
১৯৮৯ সালের ‘পরিন্দা’ সেই অভিনয়শক্তির বড় উদাহরণ। বিধু বিনোদ চোপড়ার ওই সিনেমায় খলচরিত্র আন্না শেঠের ভূমিকায় নানা পাটেকারকে দেখা যায় এক ভয়ংকর গ্যাংস্টার হিসেবে। চরিত্রটির সবচেয়ে ভীতিকর দিক ছিল তার আচরণের অনিশ্চয়তা—এ মুহূর্তে শান্ত, পরের মুহূর্তেই ঘটত রাগের বিস্ফোরণ।
এই অপ্রত্যাশিত আচরণই হয়ে উঠেছিল তার সবচেয়ে বড় সিনেম্যাটিক অস্ত্র। ওই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার সম্মাননা পান।
এরপর আসে ১৯৯৪ সালের 'ক্রান্তিবীর'। দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তার জ্বালাময়ী সব সংলাপ যেন বলিউডের লোককথার অংশে পরিণত হয়েছে। এই সিনেমার জন্যই তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
পরে ১৯৯৬ সালের ‘অগ্নিসাক্ষী’ সিনেমার জন্যও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার সম্মান পান নানা পাটেকর। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সংখ্যা দাঁড়ায় তিনে।
'অগ্নি সাক্ষী' সিনেমায় মনীষা কৈরালার বিপরীতে তিনি অভিনয় করেন এক অত্যাচারী ও সন্দেহবাতিকগ্রস্ত স্বামীর চরিত্রে। তার অভিনীত 'বিশ্বনাথ' চরিত্রটি সাধারণ কোনো খল চরিত্র ছিল না; বরং এটি ছিল অধিকারবোধ, আধিপত্য এবং মানসিক নির্যাতনের এক অস্বস্তিকর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিচ্ছবি। কোনো ধরনের অতিরিক্ত নাটকীয়তা ছাড়াই তিনি চরিত্রটিকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছিলেন।
তবে নানা পাটেকার মানেই শুধু ক্ষোভ বা রাগের বিস্ফোরণ ছিল না। সঞ্জয় লীলা বানসালির 'খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল' সিনেমায় তিনি জোসেফ ব্রাগাঞ্জা নামের এক বধির বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন, যাকে তার মেয়ের স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সংগ্রাম করতে হচ্ছিল।
এ সিনেমায় তার অভিনয় ছিল অবিশ্বাস্য রকমের পরিমিত, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, ভালোবাসা ও অসহায়ত্বকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন শুধুই নীরবতার মাধ্যমে। যে অভিনেতাকে ‘পরিন্দা’য় রাগে অগ্নিশর্মা চেহারায় দেখা যায়, তিনিই এখানে চোখের ভাষা ও নীরবতার মধ্য দিয়ে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলেন হৃদয়ভাঙার কষ্ট।
এই বৈপরীত্যই ছিল নানা পাটেকারের অভিনয়ের বড় বৈশিষ্ট্য। 'আব তক ছাপ্পান' সিনেমায় এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট সাধু আগাশের স্থির ও শান্ত উপস্থিতি কিংবা 'অপহরণ' সিনেমায় এক দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকের চরিত্রে তার নৈতিক দ্বন্দ্ব–সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অনবদ্য।
নানা পাটেকর পরিচালনাতেও হাত দিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
তারপর এল ‘ওয়েলকাম’। গম্ভীর, তীব্র এবং ভয়ংকর চরিত্রের জন্য পরিচিত নানা পাটেকার সেখানে হাজির হলেন উদয় শেঠী হয়ে, যে কি না একজন মাফিয়া বস, কিন্তু একই সঙ্গে অসম্ভব হাসির এক চরিত্র।
অক্ষয় কুমার ও অনিল কাপুরের সঙ্গে নানা পাটেকরের দৃশ্যগুলো নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে তাকে অন্যভাবে পরিচিত করে তোলে।
উদয় শেঠী চরিত্রে নানা পাটেকর তার ভয়ংকর ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি বদলে ফেলেননি। বরং সেই কঠিন মুখ, গম্ভীর কণ্ঠ, আহত অহংকার আর উত্তেজনাকেই হাসির উপাদানে পরিণত করেছিলেন।
ফলে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠী হয়ে ওঠে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর একটি।
মারাঠি সিনেমা ও থিয়েটারের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল গভীর। ‘নটসম্রাট’-এ তার অভিনয় আবারও প্রমাণ করে, বয়স বাড়ার সঙ্গে তার অভিনয়ের শক্তি কমেনি। বরং জীবনের ক্লান্তি, স্মৃতি, একাকিত্ব ও ভাঙনের মত আবেগকে তিনি আরও গভীরভাবে পর্দায় তুলে ধরতে পেরেছিলেন।
সেই স্বীকৃতির সঙ্গে পুরস্কারও এসেছে। তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি তিনি চার বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। ২০১৩ সালে ভারতের পদ্মশ্রী সম্মানেও ভূষিত হন।
সিনেমার বাইরেও তার জীবন ছিল আলোচনায়। কৃষক ও কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ মানুষের জীবন ও কৃষিসংকটের প্রতি তার আগ্রহও ছিল দীর্ঘদিনের।
ফলে তার পরিচয় শুধু অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
তবে নানা পাটেকারের জীবনেও এসেছে বিতর্কের অধ্যায়। ২০১৮ সালে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রকাশ্যে আনেন।
তার ভাষ্য ছিল, ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ সিনেমায় একটি গানের শুটিংয়ের সময় নানা পাটেকর তার সঙ্গে ‘অশোভন আচরণ’ করেছিলেন।
নানা পাটেকর সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তবে ঘটনাটি সামনে আসার পর ভারতে জোরালো হয়ে ওঠে ‘মি টু’ আন্দোলন। তনুশ্রী দত্তের অভিযোগকে বলিউডে সেই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হয়।
২০১৯ সালে মুম্বাই পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দেয়। সেখানে বলা হয়, নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালে মুম্বাইয়ের একটি আদালত অভিযোগটি খারিজ করে দেয়।
পর্দায় নিজের অভিনয়ের ওপর নানা পাটেকরের নিয়ন্ত্রণ ছিল অসাধারণ; পর্দার বাইরের মানুষটিকে ঘিরে ছিল অনেক বেশি জটিলতা।
প্রচলিত অর্থে তিনি নায়ক ছিলেন না। কিন্তু পর্দায় তার উপস্থিতি অনেক সময় তথাকথিত নায়কের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠত।
একটি সংলাপ তিনি যেভাবে বলতেন, সেটি তার কণ্ঠে গিয়ে অন্য অর্থ পেত। তার তাকানোর ভঙ্গি দৃশ্যকে অন্য মাত্রা দিত। আবার কোনো কোনো দৃশ্যে তিনি কিছুই বলতেন না—শুধু তাকিয়ে থাকতেন। তাতেই দর্শক বুঝে যেতেন চরিত্রটির ভেতরে কী চলছে।
তিনি অভিনয়কে সবসময় দৃশ্যমান করে তোলার চেষ্টা করেননি; বরং কখনও কখনও অভিনয়কে অনুভব করিয়েছেন। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি হিন্দি ও মারাঠি সিনেমার একাধিক প্রজন্মের দর্শককে মুগ্ধ করে রেখেছেন অভিনয়শৈলী দিয়ে।
তার অভিনয় ভারতীয় সিনেমার স্মৃতিতে দীর্ঘদিন থাকবে। একই সঙ্গে তার জীবন ঘিরে যে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলোও থেকে যাবে।
