Published : 03 Sep 2026, 06:48 PM
জলবসন্তে বেশ ভুগেছিলেন উত্তম কুমার, সেরে উঠলেও বেশ কিছুদিন লাইট-ক্যামেরার সামনে দাঁড়াননি। বাড়িতে আসা অতিথি-আগুন্তক-কাউকেই দেখা দিতেন না। সে সময় তলব পান কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে।
মহানায়ক জানতে পারেন, তার দীর্ঘ দিনের ইচ্ছা পূরণ হতে চলেছে। তাকে নিয়ে ‘নায়ক’ নামের একটি সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা করেছেন সত্যজিৎ রায়। এক কথায় রাজি হয়ে গেলেও উত্তম কুমার পড়েন বিপাকে। সমস্যা দেখা দেয় জলবসন্ত থেকে সেরে ওঠা উত্তমের মুখের দাগ নিয়ে।
উত্তম কুমারের জন্মশত বার্ষিকীতে ‘টিভি নাইন বাংলা’র কাছে সেসব কথা তুলে ধরেছেন সত্যজিৎপুত্র পরিচালক সন্দীপ রায়।
তিনি বলেন, “'নায়ক' সিনেমার শ্যুটিং শুরু হবে, প্রথম দিনের প্রথম শট। বাবা (সত্যজিৎ রায়) জানিয়ে দিলেন উত্তম বাবুকে ‘নো মেকআপ’ লুকে আসতে হবে, এই কথা উত্তম কুমারের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, উত্তম কুমার ভাবলেন তা আবার হয় নাকি! তিনি সুপারস্টার, তার ;নো মেকআপ লুক; পর্দায় ভালো লাগবে না।”
নিজের মেকআপ নিয়ে উত্তম কুমার খুঁতখুঁতে ছিলেন বলে জানান সন্দীপ।
তার কথায়, অবশেষে সত্যজিৎ রায় বলেন, মেকআপ ছাড়া একটা শট নিয়ে উত্তম কুমারকে দেখানো হবে, পছন্দ না হলে আবার মেকআপ নিয়ে শুট হবে।
“তাতে রাজি হয়ে গেলেন উত্তম বাবু। শুট হল। দেখে উত্তম কুমার আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন। জানালেন, তাকে দারুণ দেখাচ্ছে নো মেকআপ লুকে, তা হলে খামোখা এত মেকআপ কেন করানো হয় তাকে! এর পর মেকআপ নিয়ে আর কোনওদিন সমস্যা হয়নি ‘নায়ক’ শুট এর সময়।”
সন্দীপ রায় বলেন, যে লুকটি দেখে উত্তম কুমার আপ্লুত হয়েছিলেন, সেটি ছিল ‘নায়ক’ সিনেমার সেই বিখ্যাত দৃশ্য, যেখানে তিনি হাতে টেলিফোন নিয়ে কথা বলছেন।
‘নায়ক’ সিনেমায় সত্যজিৎ দেখিয়েছেন প্রতিষ্ঠিত একজন তারকার ভেতর জগৎ।
প্রশংসা, করতালি, অর্থপ্রাপ্তির তাড়নার ভেতরে একজন তারকার যন্ত্রণা, বলতে না পারা কথা তুলে আনেন নির্মাতা।
‘নায়ক’ চিত্রনাট্যে কী ছিল
সিনেমায় সুপারস্টার নায়কের নাম অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিতে যাবেন অন্য শহরে, কিন্তু বিমানের টিকিট পাননি বলে রওনা দিয়েছেন রেলগাড়িতে।
রেলের কামরায় তার পরিচয় হয় অদিতি সেনগুপ্ত নামের এক নারী সাংবাদিকের সঙ্গে। শিক্ষিত, রুচিশীল, মার্জিত এই তরুণী ‘আধুনিকা’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
তার সংলাপ আর হাবভাব বুঝিয়ে দেয়, মূলধারার এ রকম তারকাদের তিনি তেমন পাত্তা দেন না। তবে পত্রিকার প্রসারের জন্য অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার পেতে চান।
নায়কের প্রতি তরুণীর স্বাভাবিক মুগ্ধতার বদলে অদিতি কৌতূহলী হন তার অন্দরের অনুভূতিগুলো জানতে। তিনি জানতে চান, “এই যে বেশি করে পাওয়া, এর মধ্যে একটা ফাঁক, একটা অভাববোধ, কোনো অনুতাপ নেই?”
নায়কও জবাব দেন, “আমাদের খুব বেশি কথা বলতে নেই। আমরা ছায়ার জগতে বিচরণ করি তো, কাজেই আমাদের রক্ত–মাংসের জ্যান্ত শরীরটা জনসাধারণের সামনে খুব বেশি করে তুলে না ধরাই ভালো।”
তবে তরুণীর কাছে ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরেন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। জানিয়ে দেন সফল নায়কের নানা অনুভূতি—জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়, নিঃসঙ্গতা, অপরাধবোধ, লোভের কথা!
অরিন্দমের প্রতি অদিতির সহানুভূতি জাগে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নায়কের কথা জনমানসে প্রকাশ করবেন না, ম্যাটিনি আইডল যাতে জনমানসে তার ভাবমূর্তি বজায় রাখতে পারেন, সেই বিষয়ে তিনি সাহায্য করবেন।
সিনেমায় সাতটি ফ্ল্যাশব্যাক এবং দু’টি স্বপ্নদৃশ্যের মধ্য দিয়ে নায়কের জীবন ও তার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের বিবর্তমান প্রবাহ প্রকাশিত হয়। মনে হয়, এই রেলযাত্রার মতোই নায়কের জীবন যাত্রা, কখনো দুরন্ত, কখনো ধীর লয়ে।
তরুণী সংবাদিকের চরিত্রে অভিনয় করেন শর্মিলা ঠাকুর।
১২০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রটি ভারতে মুক্তি পায় ৬ মে ১৯৬৬ তে। ৬৬তেই বার্লিন আন্তর্জতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বিশেষ জুরি পুরস্কার’ পায় এবং এই উৎসবেই ‘শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র’ বিভাগে মনোনয়ন পায়। ১৯৬৭তে শ্রেষ্ঠ বাংলা কাহিনিচিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
উত্তমকুমার এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ১৯৬৬ তে বি. এফ. জে. এ (বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোশিয়েশন অ্যাওয়ার্ড) পুরস্কার পান ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা’ হিসেবে।
উত্তমের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই সিনেমায় চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সত্যজিৎ। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে উত্তম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন নায়ক হিসেবে।
সন্দীপ রায় আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “বাবা তো উত্তমকুমারকে মাথায় রেখেই ‘নায়ক’ লেখেন। অরিজিনাল স্ক্রিপ্ট। কোনও গল্প থেকে নেওয়া নয়। ওকে বাদ দিয়ে কোনও বিকল্পও ভাবেননি। ভাবা যাবে না বলেই ভাবেননি নিশ্চয়।”
উত্তম কুমারের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। উত্তর কলকাতার আহিরিটোলায়, মামাবাড়িতে জন্মান তিনি। জীবনের শুরুতে তিনি উত্তম কুমার নন নামে পরিচিত ছিলেন না। তার মূল নাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়।
উত্তম কুমার ছিলেন একাধারে অভিনেতা, সুরকার, প্রযোজক ও পরিচালক। তার চলচ্চিত্রজীবন ৩০ বছরের। এই সময়ে অভিনীত সিনেমায় সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যায়। তার বিপরীতে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ৩৫ জন অভিনেত্রী।
তবে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের সঙ্গেই তার নাম উজ্জ্বল হয়েছে বেশি। এই জুটি চিরকালীন নামে পরিচিতি পায়। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তিনি অভিনয় করেছেন ২৯টি সিনেমায়।
মহানায়কের জনপ্রিয়তা কেবল বক্স অফিসে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির জীবন, ভাষা ও সংস্কৃতিতে।
মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান উত্তম কুমার।