১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জহির রায়হানের সিনেমার সূত্র ধরে 'এ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম'

“আমি বাবাকে জেনেছি তার সিনেমায়; তার বইয়ে,” বলেন জহির রায়হানের ছেলে তপু রায়হান।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Jan 2026, 09:55 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:32 PM

ঢাকার আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে নাঈম মোহায়মেনের 'এ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম' চলচ্চিত্রের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শুক্রবার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের চলচ্চিত্র কেন্দ্র এই প্রদর্শনী আয়োজন করে। প্রদর্শনীর শেষে পরিচালক ও দর্শকদের মধ্যে আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে গবেষক, শিক্ষার্থী ও চলচ্চিত্রকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

'এ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম' চলচ্চিত্রটি প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হানের চলচ্চিত্রিক উত্তরাধিকার ও ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিতে অনুসন্ধান করে; মূলত জহির রায়হানের নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহের সূত্র ধরে এগোয়।

জহির রায়হান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কালজয়ী প্রামাণ্যচিত্র 'স্টপ জেনোসাইড' নির্মাণের জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। 

অনুষ্ঠানে জহির রায়হানের ছেলে তপু রায়হান বলেন, “আমি বাবাকে জেনেছি তার সিনেমায়, তার বইয়ে। যখন তার ছবি দেখি কিংবা তার লেখা পড়ি, দৃশ্য আর শব্দের ভেতর বাবাকে খুঁজে পাই। 

“মানুষ শারীরিকভাবে চলে গেলেও কেউ কেউ গল্পে, প্রশ্নে ও শিল্পে থেকে যায়। আজ এই প্রিমিয়ারে দাঁড়িয়ে আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করছি— বাবা আসলে যাননি। তিনি আছেন তার গল্পে, তার ছবির ফ্রেমে।”

জহির রায়হানের রাজনৈতিক ও শিল্পীসত্তার প্রসঙ্গ টেনে তপু রায়হান বলেন, “বাবা প্রশ্ন করেছিলেন—আমরা কেন যুদ্ধ করি? তিনি বিশ্বাস করতেন, যুদ্ধ হয় সময়ের প্রয়োজনে। একজন শিল্পী কী দেখবে, কী বলবে এবং কীভাবে বলবে— তা সময়ই ঠিক করে দেয়। জহির রায়হান সময়কে দেখতেন, সময়কে ভয় পেতেন না। 'জীবন থেকে নেয়া' শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি ছিল বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের এক রূপক। একগুচ্ছ চাবির মধ্য দিয়ে তিনি একটি জাতির মুক্তির মানচিত্র দেখিয়েছিলেন। একটি পরিবারের স্বপ্নের ভেতর দিয়ে দেখেছিলেন একটি জাতির স্বপ্ন “

নির্মাতা নাঈম মোহায়মেন চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র ও প্রবন্ধের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যক্তিগত স্মৃতি ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের টানাপোড়েন নিয়ে কাজ করে থাকেন।

তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে জহির রায়হানকে স্মরণ করা হয়েছে মূলত জীবন থেকে নেওয়া ও স্টপ জেনোসাইড চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে। ফলে তার আগের দশকের বহু চলচ্চিত্র, বিশেষ করে উর্দু ভাষায় নির্মিত কাজগুলো প্রায় আড়ালেই থেকে গেছে। 

“রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা কারণে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই এসব ছবির প্রতি আগ্রহ কম।”

এই নির্মাতা মনে করেন, জহির রায়হানকে জানতে হলে তার কাজের ভেতরেই ফিরে যেতে হবে। ফলে নতুন ছবিটি নির্মিত হয়েছে মূলত জহির রায়হানের বিভিন্ন চলচ্চিত্রের দৃশ্য, শট ও কাটের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে।

একাধিক ছবির দৃশ্য কখনো পাশাপাশি, কখনো একই ফ্রেমে এনে তৈরি করা হয়েছে সংঘাত, প্রশ্ন ও নতুন অর্থ।

নির্মাতার ভাষ্য, এটি এক ধরনের ‘মেথডোলজিক্যাল ইন্টারভেনশন’, যেখানে মূল ছবির ধারাবাহিকতা ভেঙে ভিন্ন পাঠের সুযোগ তৈরি করা হয়।

৪৫ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্র কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় না। বরং এটি দর্শকের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কি একজন চলচ্চিত্রকারকে সত্যিই তার কাজ দিয়ে মনে রাখি, নাকি মৃত্যুর পর গড়ে ওঠা এক স্থির ও নিরাপদ লেজেন্ড দিয়ে?

নির্মাতার আহ্বান—ছবি দেখা শেষ হলেও আলোচনা যেন সেখানেই থেমে না যায়।