Published : 21 Aug 2025, 02:49 PM
দেশভাগের আগের বছর কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গায় হাজারো হিন্দু ও মুসলিমের প্রাণনাশের ঘটনা ঘটে। তবে দাঙ্গা কলকাতাতেই কেবল আটকে থাকেনি; ওই ঘটনার ঝড় আছড়ে পড়েছিল নোয়াখালীতে, সেখানেও রক্ত ঝরে। নোয়াখালী-কলকাতার দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে আসছে হিন্দি সিনেমা ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’।

বিবেক অগ্নিহোত্রী পরিচালিত এই সিনেমা আলোর মুখ দেখবে আগামী মাসে। তবে ট্রেইলার প্রকাশের আগে থেকেই ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ পক্ষ-বিপক্ষের জন্ম দিয়েছে। এমনকি কলকাতায় ট্রেইলার প্রকাশের অনুষ্ঠান পণ্ড হয়েছে পুলিশি বাধায়।
ইন্ডিয়া টুডে, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে এসেছে, ‘ইতিহাস’ তুলে ধরার নামে ওই সিনেমার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে ‘সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়ার’ চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে কিছু মহল থেকে। এই সিনেমা ঘিরে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার।
সিনেমা প্রদর্শনীতে নিষেধাজ্ঞা এসেছে পশ্চিমবঙ্গের খোদ মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে।
অভিনয়শিল্পীরা ‘ইতিহাস বিকৃতির অংশ হয়েছেন’ অভিযোগে সমালোচিত হচ্ছেন। সোশাল মিডিয়া ব্যবহারীরাও সিনেমাটি নিয়ে দুভাগে বিভক্ত হয়েছেন।
নির্মাতাদের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ বলছেন ‘সত্য সামনে আসুক’। কেউ বলছেন, ‘অসত্য ও বিকৃত তথ্য নির্ভর সিনেমা বানিয়ে বিবেক অগ্নিহোত্রী আগেও আলোচনায় এসেছেন, এবারো হয়ত সেটিই ঘটতে চলেছে।’
তবে 'তাসখেন্দ ফাইলস' ও 'দ্য কাশ্মীর ফাইলস' সিনেমার তৃতীয় কিস্তি ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ সমর্থন পাচ্ছে শাসক দল বিজেপির কাছে। এই দলটি জানতে চেয়েছে, সত্য ঘটনা প্রকাশ হলে তৃণমূলের সমস্যা কোথায়?
পরিচালক অগ্নিহোত্রী মাসখানেক ধরে সোশাল মিডিয়ায় সিনেমার প্রচার চালাচ্ছেন। ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে নোয়াখালীতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে একের পর এক পোস্ট করছেন তিনি।
একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, “১৯৪৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপূজার দিন গোলাম সারওয়ার ও তার ভাই ছোট মিয়া নোয়াখালীতে হত্যা ধর্ষণ এবং মানুষকে ধর্মান্তরিত করার কাজের নেতৃত্ব দেন।"

গোলাম সারোয়ার হুসেইনি ছিলেন নোয়াখালীর শ্যামপুর দায়রা শরীফের গদ্দিনশীর পীর এবং নোয়াখালি কৃষক সমিতির অত্যন্ত প্রভাবশালী মুসলিম নেতা।
বিবেক অগ্নিহোত্রী আর একটি পোস্টে লিখেছেন, “নোয়াখালীতে কংগ্রেস নেতার বাড়িতে হামলা করে তার ছেলেকে খুন, জ্বালিয়ে দেওয়া হলো দলের অফিস।"
অগ্নিহোত্রী এই সিনেমার প্রচারে সোশাল মিডিয়াকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চাইছেন বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।
সিনেমায় অভিনয় করেছেন মিঠুন চক্রবর্তী, অনুপম খের, পল্লবী জোশী, শাশ্বত চ্যাটার্জি, প্রিয়াংশু চ্যাটার্জি, দর্শন কুমারের মত তারকারা।
আর কলকাতায় 'গোপাল পাঁঠা' নামে যে চরিত্রটি দাঙ্গার সময় হাজার হাজার হিন্দুর ‘প্রাণ রক্ষা করেছিলেন’ বলে বলা হয়, সেই ভূমিকায় আছেন অভিনেতা সৌরভ দাস।
ট্রেইলার প্রকাশে বাধা
পরিচালক বিবেক অগ্নিগোত্রীর ‘ফালইস’ ট্রিলজির তৃতীয় সিনেমা ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ মুক্তি পাচ্ছে ৫ সেপ্টেম্বর।

বিবিসি বাংলা লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি, শিকাগো, সান হোসে, সানফ্রান্সিসকোসহ বিভিন্ন শহরে ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ সিনেমার প্রিমিয়ার হয়েছে ইতোমধ্যেই।
শিকাগোতে প্রিমিয়ারে ভারতের কনসাল জেনারেল সোমনাথ ঘোষও উপস্থিত ছিলেন, 'দ্য বেঙ্গল ফাইলসে'র দিকে 'সাহায্যের হাত' বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য অগ্নিহোত্রী তাকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদও জানিয়েছেন।
ভারতে সিনেমার আনুষ্ঠানিক ট্রেইলার প্রকাশ হয়েছে ১৬ অগাস্টে; ঊনআশি বছর আগে যে দিনটিতে অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় মুসলিম লীগ 'ডাইরেক্ট অ্যাকশনে'র ডাক দিয়েছিল। হিন্দু-মুসলিমের লাশ পড়েছিল ওই সময়ে নোয়াখালীতেও।
‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ সিনেমার ট্রেইলার প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল একটি প্রেক্ষাগৃহে। তবে আয়োজকরা ইন্ডিয়া টুডেকে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক চাপে’ ওই অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়। পরে একটি অভিজাত হোটেলে 'দ্য বেঙ্গল ফাইলস' এর ট্রেইলার প্রকাশের আয়োজন করা হয়।
তবে সেখানেও কলকাতা পুলিশ মাঝপথে ঢুকে বাধা দেয়। পর্দায় ট্রেইলার দেখানোর আগেই পাওয়ার কেবলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। জব্দ করা হয় নির্মাতাদের একটি ল্যাপটপও।
কলকাতা পুলিশের একজন কর্মকর্তা ইন্ডিয়া টুডেকে বলেছেন, অনুষ্ঠানটি করার জন্য আয়োজকরা প্রয়োজনীয় ‘বিনোদন লাইসেন্স দেখাতে পারেননি’ বলে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুমতি মেলেনি।
এই সিনেমাটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছেন অভিষেক আগরওয়াল এবং পল্লবী যোশী।
দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে পল্লবী জোশী বলেন, "যেহেতু গল্পটির শেকড় পশ্চিমবঙ্গে, তাই আমরা মনে করেছিলাম সেখানে সিনেমার ট্রেইলার মুক্তি দেওয়াটাই সবচেয়ে উপযুক্ত হবে, কিন্তু সরকার আমাদের চুপ করে রেখেছে। আমরা মনে করি এটি এমন একটি কাজ যা কেবল স্বেচ্ছাচারীই নয়, অসাংবিধানিকও।
"সেদিন যা ঘটেছিল তা কেবল চলচ্চিত্রের উপর আক্রমণ ছিল না, বরং গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ ছিল। মানুষের কণ্ঠস্বর দমন করা হয়েছিল। সরকার প্রমাণ করেছে যে আমাদের থিমটি সঠিক।”

দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সেখানে বিবেক অগ্নিহোত্রী অভিযোগ করে বলেন, “সত্যজিত রায়ের শহরে আসার পরেও এভাবে যে একজন চিত্র পরিচালকের কণ্ঠরোধ করা হতে পারে, তা তিনি দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেননি।
"আমরা দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে সংবিধান মেনে সামনে এগিয়ে চলব এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষও যাতে সিনেমায় দেখতে পারে তার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালাব।”
সামলোচনায় বিদ্ধ অভিনয়শিল্পীরা
বিবেক অগ্নিহোত্রী গেল বছর যখন সিনেমার কাজে হাত দেন, তখন নাম ছিল 'দিল্লি ফাইলস'। চিত্রনাট্যের পটভূমির জন্য নির্মাতা টিম পরবর্তীতে নাম বদলে রাখেন 'দ্য বেঙ্গল ফাইলস'।
'গোপাল পাঁঠা' চরিত্রের অভিনেতা সৌরভ দাস বলেছেন, এই সিনেমায় অভিনয় করার চুক্তির পর তিনি কেবল তার নিজের চরিত্রের অংশের চিত্রনাট্য হাতে পেয়েছিলেন।
“পুরো সিনেমার কাহিনী কী সেটা নিয়ে ধারণাই ছিল না।”
একই কথা বলেছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়।
“আমাকে শুধু আমার অভিনয়ের অংশের স্ক্রিপ্ট দেওয়া হয়। পুরো কাহিনী এখন অনেক সময় জানানো হয় না।”
নিজের ভূমিকার সমর্থনে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, “একজন অভিনেতা ভালো চরিত্র পেলে করবেনই, সিনেমার গল্পে ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে কী না, সেটা দেখা তার কাজ নয়।”
শাশ্বতর কথায়, তিনি ইতিহাসবিদ নন যে বলতে পারবেন এই সিনেমায় সত্য ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে নাকি হয়নি।
“একজন অভিনেতা হিসেবে সেটা আমার দায়িত্বও নয়। যারা মনে করছেন এই সিনেমায় ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে, অথবা বাংলার অমর্যাদা করা হয়েছে, তারা সিনেমার বিরুদ্ধে চাইলে আদালতে যেতে পারেন।”
সিনেমা প্রদর্শনে মমতার ‘না’
‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ এখন রাজনৈতিক দোষারোপ ও পাল্টা দোষারোপের একটি বিষয়।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে এই সিনেমার প্রদর্শনের অনুমতি ‘দেওয়া হবে না’।

এবং অগ্নিহোত্রীর বিরুদ্ধে সিনেমার ‘কাহিনী বিতর্কিত’ করার অভিযোগ এনে আইনি পদক্ষেপ নেবেন বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
আবার এই সিনেমায় এবং পরিচালকের পাশে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।
এই দলের ভাষ্য, দেশভাগের সময়ে কলকাতা বা নোয়াখালীতে ‘হিন্দুদের ওপর নির্মম অত্যাচার ও গণহত্যার’ যে ইতিহাস ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ সিনেমায় তুলে ধরা হয়েছে, তা এতদিন কেউ দেখানোর সাহস পায়নি।
বিবেক অগ্নিহোত্রীর সিনেমায় ভারত সরকারের সমর্থনের বিষয়টি নতুন নয়।
'দ্য কাশ্মীর ফাইলসের’ হয়ে 'প্রোমোশন করেছিলেন’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে।
তিনি দেশের মানুষকে সিনেমাটি দেখার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে বেঙ্গল ফাইলস দেখানো যাবে না। এর কারণ কারণ প্রোপাগান্ডা ফিল্ম বানিয়ে রাজ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যা রাজ্য সরকার কিছুতেই মেনে নেবে না।"
তিনি অগ্নিহোত্রীকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, তিনি যেন ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ বানানোর আগে উত্তর প্রদেশের নির্যাতিতাদের নিয়ে ‘ইউপি ফাইলস’ বানান।
দিল্লিতে দক্ষিণপন্থী চিন্তাবিদ আনন্দ রঙ্গনাথন এক্সে এক পোস্টে বলেন, “সিনেমা মুক্তির আগেই বেঙ্গল ফাইলসের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গে এত প্রতিরোধ! এ সিনেমা না কি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধারক ও বাহকরা এখন কোথায় গেলেন?"
পরিচালক গৌতম ঘোষ বলেন, “বাংলা ভাগের অনেক কারণ রয়েছে। কিন্তু সেই কারণগুলো নিয়ে যদি কাজ করতে হয়, তবে গবেষণা করতে হয়। এবং দাঙ্গা বা দেশভাগ কেন হয়েছিল, তা ভাবতে হয়।”

ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ কেন?
এই সিনেমার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র গোপাল পাঁঠার। এই ব্যক্তিকে দাঙ্গার সময় কলকাতায় 'হিন্দুদের রক্ষাকর্তা' হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বলে আভাস মিলেছে ট্রেইলারে।
অভিযোগ এসেছে গোপাল পাঁঠা ওরফে গোপাল মুখোপাধ্যায়ের পরিবার থেকেও। তার বর্তমান প্রজন্মের উত্তরাধিকারীরা অভিযোগ করেছেন, সিনেমায় তাকে একজন 'মুসলিম-বিদ্বেষী কসাই' হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা মানা যায় না।
গোপাল পাঁঠার পৌত্র শান্তনু মুখার্জি দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, “তার পিতামহ দাঙ্গার সময় বহু মুসলিমেরও প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন এবং বহু মুসলিম ব্যক্তির সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল।”
জবাবে অগ্নিহোত্রী শান্তনু মুখার্জীকে একজন 'তৃণমূলের নিজস্ব মানুষ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কোন কোনো সিনেমা বিশ্লেষক বলেছেন অগ্নিহোত্রীর অতীত নির্মাণের আলোকে ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যায়।
দেশভাগের সময়ে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার মত স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে আরো সতর্ককতার সঙ্গে কাজ করা যেত বলেও মনে করছেন অনেকে।
দিল্লিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুকল্যাণ গোস্বামী বলেন, "কাশ্মীর ফাইলসেও বহু জায়গাতেই তিনি সত্যের অপলাপ করেছেন, বা হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছেন।"
যখন একজন পরিচালক সমকালীন ইতিহাসের কোনো ঘটনা নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেন, তখন নির্মাতার স্বাধীনতার নামে তার এরকম তথ্য বিকৃতির অধিকার থাকে না বলেই গোস্বামী মন্তব্য করেছেন।

বিবেক অগ্নিহোত্রী দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে বলেন, "আমি হিন্দুদের ইতিহাস নিয়ে সিনেমা বানাই, কারণ ইসলাম বা খ্রিষ্টানদের ইতিহাস নিয়ে সিনেমা বানানোর ক্ষমতা ও দক্ষতা আমার নেই।”