Published : 03 Sep 2026, 02:01 PM
সুদর্শন চেহারা, অভিনয়ের সৃজনক্ষমতা আর কঠোর শ্রমের গুণে তিনি মহানায়ক, উত্তম কুমার। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তির অভিনেতা। মহানায়ক হিসেবে যার খ্যাতি আকাশছোঁয়া।
যার অভিনীত সিনেমায় সংখ্যা ২০০ ছাড়ানো। তার বিপরীতে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ৩৫ জন অভিনেত্রী।
তবে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের সঙ্গেই তার নাম উজ্জ্বল হয়েছে বেশি। এই জুটি চিরকালীন নামেও পরিচিতি পায়। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তিনি অভিনয় করেছেন ২৯টি সিনেমায়।
আনন্দবাজার জানিয়েছে, উত্তম-সুচিত্রা জুটি ছাড়া সে সময় কোনো সিনেমা ‘হিট’ হবে, এটা ভাবা নির্মাতাদের জন্য কঠিন হত।
উত্তম-সুচিত্রা জুটির সবচেয়ে প্রথম হিট সিনেমা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া হাসির এ সিনেমায় উত্তম কুমার কিংবা সুচিত্রা সেন কেউই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেননি। তবুও তারা জনপ্রিয়তা কুড়ান। জুটি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেন।
১৯৫৪ সালে একটি পোস্টার ঝড় তোলে উত্তম-সুচিত্রার সংসার জীবনে। সুচিত্রার সই দেওয়া ওই পোস্টারে লেখা ছিল ‘আমাদের প্রণয়ের সাক্ষী হল অগ্নিপরীক্ষা’। ভারতীয় পত্রিকাগুলোর খবর, সেই পোস্টার দেখে উত্তমকুমারের স্ত্রী গৌরী দেবী সারাদিন কেঁদেছিলেন। আর সুচিত্রাকেও সন্দেহ করতে শুরু করেন স্বামী দিবানাথ। অভিনয় ছেড়ে দিতেও চাপ দেন।
১৯৫৭ সালে উত্তম কুমার তার প্রযোজিত ‘হারানো সুর’ ছবিতে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দিলে সুচিত্রা বলেছিলেন, “তোমার জন্য সব ছবির ডেট ক্যান্সেল করব।”
এর পর, পথে হলো দেরী, মরণের পর, শাপমোচন, শিল্পী, সাগরিকা, হারানো সুর, সবার উপরে, সূর্যতোরণ, চাওয়া-পাওয়া, সপ্তপদী, জীবনতৃষ্ণা, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, ইন্দ্রাণী, চন্দ্রনাথ, আলো আমার আলোর মত সিনেমায় জুটি দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে। সিনেমা বিশ্লেষকরা বলেন সিনেমায় রোমান্টিসিজমের ধারাটাই তারা পাল্টে দেন সম্পূর্ণরূপে।
কেউ কেউ বলেন, “সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু উত্তম-সুচিত্রার জাদু আজও ফুরায়নি।”
উত্তম কুমার তার জীবদ্দশায় একটি সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, “সুচিত্রা পাশে না থাকলে আমি কখনোই উত্তম কুমার হতে পারতাম না। এ আমার বিশ্বাস। আজ আমি উত্তম কুমার হয়েছি, কেবল ওর জন্য।”
সুচিত্রা সেনের মতে, উত্তম ছিলেন অসাধারণ শিল্পী, যদিও তার প্রতিভার পুরোটা ব্যবহার করা হয়নি।
বৃহস্পতিবার মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবার্ষিকী। উত্তর কলকাতার আহিরিটোলায়, মামাবাড়িতে তার জন্ম। অবশ্য জীবনের শুরুতে তিনি উত্তমকুমার ছিলেনস না। বাবা-মায়ের দেওয়া নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার গিরিশ মুখার্জি রোডের বাসিন্দা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়ের বড় ছেলে।
১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করেন তিনি। ১৯৪৫ সালে বিকম স্ট্যান্ডার্ড পাস করে ভর্তি হলেন কলেজে। কিন্তু কলেজে পড়া আর বেশি দূর এগোল না। টানাপোড়েনের সংসার, শুরু হয় চাকরির সন্ধান।
তবে স্কুলের নাটক থেকে শুরু করে থিয়েটারের মহড়া-সবখানেই ছিল উত্তম কুমারে নিয়মিত যাতায়াত। সেই ভালোবাসাই একদিন তাকে নিয়ে যায় রুপালি পর্দায়।
উত্তমকুমার ছিলেন একাধারে অভিনেতা, সুরকার, প্রযোজক ও পরিচালক। তার চলচ্চিত্রজীবন ৩০ বছরের।
তিনি প্রথমবার ১৯৪৭ সালে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান ‘মায়াডোর’ ছবিতে। কিন্তু প্রথম সিনেমা মুক্তিই পায়নি।
ফ্লপও হয় বেশ কটি। বিদ্রুপ করে অনেক ডাকতেন ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বলেও।
কিন্তু ব্যর্থতাই তাকে দৃঢ়তা দিয়েছে।
এই কঠিন সময়েই উত্তমে আস্থা রাখেন অভিনেতা পাহাড়ী সান্যাল। নির্মাতা নির্মল দে নতুন ছবি ‘বসু পরিবার’-এর নায়ক খুঁজছিলেন। নির্মাতা প্রথমে আপত্তি জানালেও পাহাড়ী সান্যালের অনুরোধে উত্তমকে সিনেমায় নেওয়া হয়। আশ্বস্ত করেন। শুধু তা-ই অরুণ কুমারের বদলে ‘উত্তম’ নামটি ব্যবহারের পরামর্শও দেন পাহাড়ী সান্যাল।
এই সিনেমা মহানায়কের জীবনে বাঁক বদলে দেয়। ‘বসু পরিবার’ সফল হয়।
আর ১৯৫৩ সালে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে মুক্তি পাওয়া ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তাকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শিখরে। জন্ম নেয় বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি। নায়ক উত্তমকুমার হয়ে ওঠেন মহানায়ক উত্তমকুমার।
তিন দশকে অভিনীত ছবির সিনেমার সংখ্যা ২০০ ছাড়ায়। তার বিপরীতে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ৩৫ জন অভিনেত্রী।
‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘নায়ক’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’, ‘গৃহদাহ’, ‘অমানুষ’ ও ‘আনন্দ আশ্রম’সহ বহু চলচ্চিত্রে উত্তমের অভিনয় আজও বাংলা চলচ্চিত্রের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
নিজের অভিনয় সম্পর্কে উত্তমকুমার বলেছিলেন, “ধরাবাঁধা ছকে অথবা সাজানো কিছুতে অভিনয় করার ইচ্ছা আমার কোনো দিনই ছিল না। আমি তাই নিজস্ব ধারায় সহজ অভিনয় করতাম। আমরা যেমন করে কথা বলি, রাগ করি, ঠিক তেমনি সহজ অভিনয়। অভিনয় নয়, ভাবেই চরিত্র রূপাপন করার চেষ্টা করেছি।”
চলচ্চিত্র ছাড়াও উত্তম কুমার অভিনয় করেছেন মঞ্চে ও যাত্রায়। পাঁচটি সিনেমা পরিচালনা করেছেন।
তিনি সুরকারও ছিলেন, সুরারোপ করেছেন দুটি সিনেমায়, প্রযোজনা করেছেন সাতটি সিনেমা।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মারা যান উত্তম কুমার।