১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট বাড়ি: শিল্পী ভাই নেই, জেগে আছে 'পারুল-বাউল-ষাঁড়'

একপাশে শুয়ে আছে একটি ষাঁড়ের শরীর, ভেতরটা ফাঁপা, ষাঁড়টি যেন অপেক্ষায় আছে তার প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা মনোয়ারের জন্য।

নিফাত সুলতানা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 Sep 2026, 03:00 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:56 PM

ধানমণ্ডির যে বাড়িতে মুস্তাফা মনোয়ার থাকতেন, তার দোতলায় একটি ঘরে থাকে তার তৈরি করে যাওয়া অর্ধশত পাপেট। ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে দেয়াল জুড়ে সার বেঁধে ঝোলানো মুখ। কারও চোখ কোটরাগত, কারও ঠোঁটে হাসি, কারও মুখ হাঁ হয়ে আছে যেন এখনই কথা বলে উঠবে। কারো হাত-পা আবার ঝুলছে নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে। 

দেয়ালের আরেক পাশের নীল রঙের একটি বোর্ড জুড়ে সাজানো আছে অন্তত পঞ্চাশটি পাপেট-মুখ। আছে শিশু, বৃদ্ধ কিংবা পশু-পাখির মুখ। কেউ রাগী, কেউ হাস্যোজ্জ্বল, কেউবা বিস্মিত। রঙের বাহারে একেকজনের একেক রূপ।

টেবিলে ছড়িয়ে আছে পুরনো ছেনি, তুলি, রঙের কৌটা, সেলাই কাটার সরঞ্জাম। একপাশে শুয়ে আছে একটি ষাঁড়ের শরীর, ভেতরটা ফাঁপা, ষাঁড়টি যেন অপেক্ষায় আছে তার প্রাণ প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা মনোয়ারের জন্য।     

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে নিজের বাসভবনেই এই 'পাপেট বাড়ি' গড়ে তুলেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। সেখানে একান্নটি সম্পূর্ণ ও তিরিশটি অসম্পূর্ণ পাপেট রয়েছে। তবে নির্মাতা আর নেই।  

দীর্ঘদিন নানা রোগে ভুগে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ জুন মারা যান এই সব্যসাচী শিল্পী। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।  

তিনি চলে যাওয়ার পর তার পাপেটের ঘরটি এখনো একই রকম আছে। ঘরের একপাশে সারি করে রাখা কাঠের র‌্যাকে সাজানো অসংখ্য হাতল ও যন্ত্রাংশ, স্ক্রু-ড্রাইভার, ছোট ছোট প্যাঁচানো তার। দেয়ালে ঝোলানো পুরনো প্লায়ার্স, কাঠ কাটার নানা যন্ত্র। ঘরের এক কোণে একটা পুরনো লেদ মেশিন। তার ওপর ঝুঁকে আছে কমলা রঙের একটি পুরনো ডেস্ক-ল্যাম্প।    

মাথার ওপরের তাকে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কাপড়ের বান্ডেল, কাঠের ছোট ছোট গুঁড়ি। পাপেট তৈরির নানা সরঞ্জাম। 

মঙ্গলবার মুস্তাফা মনোয়ারের ৯২তম জন্মবার্ষিকী, দিনটি ঘিরে তার এই সৃষ্টি এগিয়ে যাবে কার হাত ধরে, তা জানতে এ ঘরটির দায়িত্বে ও রক্ষণাবেক্ষণে থাকা পাপেট শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলেছে গ্লিটজ।

কথা হয়েছে শিশুদের জন্য মুস্তাফা মনোয়ারের শিক্ষামূলক পাপেট অনুষ্ঠান 'মনের কথা'র সেই পারুল ও বাউল ভাইদের সঙ্গেও। 

তারা জানিয়েছেন, শিল্পকে সঙ্গী করে যে জীবন কাটিয়েছেন মুস্তাফা মনোয়ার, তিনি বেঁচে থাকবেন সে পথ ধরেই। 

পাশাপাশি পাপেট শিল্পের বিকাশে সরকার ও তার শিক্ষার্থীদের সহায়তা চেয়েছেন ছেলে সাদাত মনোয়ার। 

১৯৯৪ সালে মুস্তাফা মনোয়ার শুরু করেন শিক্ষামূলক পাপেট অনুষ্ঠান 'মনের কথা'। সেখানে তার তৈরি পাপেট চরিত্র 'পারুল' এর সম্বোধনে তিনি ছিলেন 'শিল্পী ভাই'। সেই থেকে কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন 'শিল্পী ভাই'।

মুস্তাফা মনোয়ারের 'পারুল' হয়ে ওঠা তামান্না তিথি এই ঘরেই দাঁড়িয়ে স্মৃতি হাতড়ান। তিনি বলেন, "পারুল আসলে স্যারের অনুভূতিরই এক প্রাণবন্ত রূপ। চরিত্রটি তৈরির পেছনে স্যারের ভাবনাটাই ছিল এমন যে মেয়েটি যেন পুরো বাংলাদেশের ঘুম ভাঙাবে; যেখানে ফুটে উঠবে বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর ইতিবাচক দিকগুলো। 

“সহজ-সরল কথা দিয়ে গড়ে তোলা এই পারুল যেন ছিল পুরো বাংলাদেশেরই এক প্রতিনিধি।"  

মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিথি বলেন, "তিনি এমন এক আলোকিত মানুষ ছিলেন, যিনি প্রতি মুহূর্তেই নতুন কিছু সৃষ্টি করতেন। শুধু পাপেট তৈরি নয়; পাপেটের কণ্ঠ প্রদান, সুর সংযোজন, মঞ্চ তৈরি কিংবা চিত্রনাট্য তৈরি প্রতিটি বিষয়েই তার দক্ষতা ও দূরদর্শিতা আমাদের বিস্মিত করত। 

“স্যার বিশ্বাস করতেন পাপেট কেবল আনন্দের বস্তু নয়, বরং এর মধ্যে থাকবে গভীর জীবনবোধ ও অর্থ। তিনি নিজে তা যেমন লালন করতেন, তেমনি প্রকাশও করতেন।"   

তিথি বলেন, "বর্তমানে আমরা স্যারের গড়ে যাওয়া এই পাপেট টিমের সদস্য হিসেবেই কাজ করছি। স্যার আমাদের একটা কথা বলতেন, 'বলা যাবে না শিল্প এখানেই শেষ, কোনো নিয়ম নেই, নিয়ম ভাঙাটাই শিল্প।' আমরা তার কথা ধরেই চেষ্টা করব এই শিল্প এগিয়ে নিয়ে যেতে।" 

অসম্পূর্ণ রয়ে গেল যে স্বপ্ন 

বাউল চরিত্রের শিল্পী অনুকূল দাস ছাত্রজীবন থেকেই মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গী।  

তিনি বলেন, "৩০ বছরের বেশি সময় আমি স্যারের সঙ্গে ছিলাম। চারুকলায় পড়ার সময় থেকেই পাপেট নিয়ে তার সঙ্গে কাজ শুরু করি। স্যারের অবর্তমানে এসব কাজ আমিই দেখেশুনে রাখতাম। 

“তিনি তো ছিলেন পুরোদস্তুর কাজপাগল মানুষ, আমরাও চেষ্টা করছি তার সেই কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে।" 

পাপেট ভরার পুরো ঘরটি ঘুরিয়ে দেখালেন অনুকূল দাস। দেয়ালের একটি অংশ দেখিয়ে বললেন, “স্যারের এই স্বপ্নটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল।” 

যেখানে দেখা যায়, কাঠের আলমারির দরজায় সাঁটা আছে হাতে লেখা কয়েকটি কাগজ, লেখা 'চলচ্চিত্র বীরপুরুষ', পাপেট অংশগ্রহণ নির্ধারণ, 'চিত্রনাট্য' শিরোনামে দাগ টানা তালিকা, চরিত্রের নাম-সংখ্যা-বয়স ধরে ধরে হাতে লেখা পরিকল্পনা।   

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বীরপুরুষ' কবিতা অবলম্বনে পাপেট ও মানুষের যৌথ অভিনয়ে একটি সিনেমা নির্মাণ করার ইচ্ছে ছিল মুস্তাফা মনোয়ারের।  

অনুকূল বলেন, “স্ক্রিপ্ট তৈরি থেকে শুরু করে পাপেট ক্যারেক্টার তৈরির কাজ আমরা অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্যার আর কাজটি শেষ করে যেতে পারেননি। সেগুলোও এখানে পড়ে আছে। যদি কেউ উদ্যোগ নেয়, তাহলে আমাদের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ হতে পারে।" 

তিনি বলেন, "একটু চলাফেরার মত শারীরিক অবস্থা থাকলেই স্যার স্টুডিওতে চলে আসতেন, কাজ করতেন। উনার তৈরি একশর বেশি পাপেট আর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এখনো এখানে রয়েছে। 

"উনি কাজ নিয়ে শতভাগ নিখুঁত হতে চাইতেন, মনোপূত না হলে আবার নতুন করে শুরু করতেন। স্যার চলে গেলেও আমরা চাই উনার এত আদরের এই প্রতিষ্ঠানটি যেন চিরতরে বন্ধ না হয়ে যায়, এটি যেন সচল থাকে।"

'আমি এই শিল্পকে বন্ধ হতে দেব না'  

শারীরিক অসুস্থতার কারণে মুস্তাফা মনোয়ার যখন সব কাজ নিজে করতে পারতেন না, তখন তার কাছ থেকে শেখা অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অনেক দায়িত্বই পালন করেছেন পাপেট রুমের দায়িত্বে থাকা পাপেটশিল্পী সোহেল।

তিনি বলেন, "আমি এই শিল্পকে বন্ধ হতে দেব না। আমরা যারা উনার ছাত্র আছি, আমাদের উনি বিভিন্ন সময় এখানে ট্রেনিং ওয়ার্কশপ করিয়েছেন, আমাদেরকে শিখিয়েছেন। উনি তো মৃত্যুর আগেও অসুস্থ থাকায় প্রায় তিন বছর ধরে এটার দেখাশোনা বা দায়িত্ব নেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না, আমরা তিন বছর ধরেই উনার কাজ করেছি।"    

মুস্তাফা মনোয়ারের এই শিল্পের বিকাশে সরকার ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা চেয়েছেন তার ছেলে সাদাত মনোয়ার।

মৃত্যুর আগে মুস্তাফা মনোয়ার বিশেষ কিছু বলে গেছেন কিনা জানতে চাইলে সাদাত বলেন, "উনার নিজের তৈরি পাপেটের যে বিরাট সংরক্ষণশালা রয়েছে, তা নিয়ে সরাসরি শেষ মুহূর্তে নির্দিষ্ট কিছু উনি বলে যাননি। কারণ উনি সবসময় ভীষণ ইতিবাচক মানুষ ছিলেন; কখনো নিজের চলে যাওয়া বা কাজের 'শেষ' নিয়ে কোনো কথা বলতেন না। 

“তবে আমাদের ইচ্ছা আছে উনার জীবনের পুরোটা সময় জুড়ে তৈরি করা এই পাপেটগুলোর মধ্য থেকে অন্তত কয়েকটি কোনো উপযুক্ত মিউজিয়ামে (জাদুঘরে) সংরক্ষণ করার, যাতে ভবিষ্যতে সবাই উনাকে মনে রাখতে পারে।” 

সাদাত বলেন, "আমরা চাই উনার তৈরি পাপেটের এই শিল্প ও তৈরির প্রযুক্তিগুলো যেন হারিয়ে না যায়। উনার তৈরি পাপেটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিষ্যদের কাছে এসব কাজ ও কৌশলগুলো সঠিকভাবে হ্যান্ডওভার করে দেওয়া দরকার, যেন তারা কাজটি প্রতিনিয়ত চালিয়ে যেতে পারে।" 

শিক্ষা ব্যবস্থায় এই শিল্পের ব্যবহারে কাজ লাগানোর প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আনন্দের মাধ্যমে শেখার যে ঘাটতি রয়েছে, পাপেট সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মাধ্যম বা লার্নিং টুল হিসেবে কাজ করতে পারে। বাচ্চারা যদি আনন্দের সাথে শেখে, তবে তা অনেক বেশি কার্যকর হয়। সরকার বা সংশ্লিষ্টদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, উনার এই দীর্ঘ দিনের মেধা ও শিল্পকে যেন সংরক্ষণ করা হয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।"

মুস্তাফা মনোয়ারকে ছোটবেলায় গ্রামবাংলার পুতুলনাচ আকৃষ্ট করেছিল। তাকেই বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনী সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের পুরোধা বলা হয়।

কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেন। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার আছে।

প্রথমবার তিনি তার নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাসখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট দারুণ প্রশংসিত হয়।

১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফী তার একটি ডকুমেন্টারিতে মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেটকে অন্তর্ভুক্ত করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত মলিন চেহারা মুস্তাফা মনোয়ারকে ব্যথিত করে। তাই বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সেই শরণার্থীশিবিরেই আয়োজন করেন পাপেট শো।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশের শিল্পজগতে মুস্তাফা মনোয়ার মেলে ধরেন পাপেটের এক নতুন রূপ। তার সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ দেখে ইউনিসেফের র‌্যাচেল কার্নেগি উৎসাহিত হন; তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি।

টেলিভিশনে 'আজব দেশে' অনুষ্ঠানে নিয়মিতভাবে প্রদর্শনী হয় মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট চরিত্র 'বাঘা' ও 'মেনি'।

দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ জুন এই সব্যসাচী শিল্পীর মৃত্যু হয়।