চিরহরিৎ বৃক্ষ ‘লতা’র জন্মদিন

৯১ বছরের শিল্পী লতা মুঙ্গেশকরের জন্ম ১৯২৯ সালে। এরপরের যাত্রাটা তার হয়েছে সুরে আর ছন্দে। এসেছে নানা প্রতিবন্ধকতা, ছাড় ছাড় রব! কিন্তু লতার বাগান হয়নি কখনও বিবর্ণ!

গ্লিটজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 Sept 2020, 09:26 AM
Updated : 28 Sept 2020, 09:26 AM

চিরহরিৎ এই লতার জীবন নিয়ে লিখেছেন আরাফাত শান্ত।

লতা মুঙ্গেশকরকে নিয়ে একটা জায়গায় সুন্দর কথাটা শুনেছিলাম বিখ্যাত গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতারের মুখে।

জাভেদ আখতার বলেছিলেন, “মাইকেল অ্যাঞ্জেলো মানেই যেমন চিত্রকলা, শেক্সপিয়ার মানেই যেমন ইংরেজি সাহিত্য তেমনই ভারতীয় সিনেমার গান মানেই লতা মুঙ্গেশকর।”

লতা মুঙ্গেশকরের জন্য আমার বারবার মনে পড়ে কবীর সুমনের গান, “তোমার তুলনা আমি খুঁজি না কখনও, বহু ব্যবহার করা কোনো উপমায়।”

আসলেই তো লতা মুঙ্গেশকরকে কোন উপমায় ডাকলে তাকে সফল ভাবে চিত্রায়ন করা যাবে। ভারতের লোকজন তার নাম দিয়েছেন, 'নাইটেঙ্গেল অফ ইন্ডিয়া'। সেটাও মনে হয় না যথেষ্ট।

পিতা দীনানাথ মুঙ্গেশকর পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন, মারাঠি থিয়েটারের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি ও ক্লাসিক্যাল গাইতেন। গান শেখাতেন। একদিন দেখেন তার বাচ্চা মেয়েই এক গানের শিক্ষার্থীর ভুল ধরিয়ে দিচ্ছেন। উনি দরজায় দাঁড়িয়ে শুনে অবাক।

লতা মুঙ্গেশকরের বাবা তার মাকে বললেন, “ঘরের আলো ফেলে আমি অন্যের ঘরে বাতি দিচ্ছি।”

পরের দিন থেকেই লতাকে গান শেখানো শুরু করেন। শৈশবে বাড়িতে থাকাকালীন কে.এল সায়গল ছাড়া আর কিছু গাইবার অনুমতি ছিল না তার। বাবা চাইতেন ও শুধু ধ্রপদী গান নিয়েই থাকুক।

জীবনে প্রথম রেডিও কেনার সামর্থ্য যখন হল, তখন তার বয়স আঠারো। কিন্তু রেডিওটা কেনার পর নব ঘোরাতেই প্রথম যে খবরটি তাকে শুনতে হয় তা হচ্ছে, কে.এল সায়গল আর বেঁচে নেই। সঙ্গে সঙ্গেই রেডিওটা ফেরত দিয়ে দেন তিনি।

লতা মুঙ্গেশকরের নাম ছিল হেমা। তবে মৃত বড় বোনের নাম লতিকা হওয়ার কারণে তার নাম হয়ে যায় লতা।

মাত্র বারো-তেরো বছর বয়সেই তার বাবা অকালে প্রয়াত হন। তিনি গান শেখা ছাড়েননি।

এক নাটকের প্রতিষ্ঠানে গাইতেন। ‘কিটি হাসাল’ নামে এক মারাঠি সিনেমায় তার প্লেব্যাক ক্যারিয়ার শুরু। ওস্তাদ আমান আলী খানের কাছে ক্লাসিকাল শিখতেন।

সেই এতটুকু বয়সেই তার স্কুল ছেড়ে দিতে হয়েছে। কারণ বোন আশাকে নিয়ে বের হতে হয়। স্কুল প্রশাসন এই অনুরোধ মানতে নারাজ। সেই সময়টা কে.এল সায়গল, শামশাদ বেগম ও নুরজাহানদের যুগ।

তাই প্রাথমিকভাবে লতা মঙ্গেশকরকে শুনতে হয়েছিল যে তার কণ্ঠস্বর একটু বেশিই পাতলা। তাকে প্রথম সুযোগ দেন মাস্টার গুলাম হায়দার। তার পরেই আসে ‘মহল’-এর সেই বিখ্যাত গান ‘আয়েগা আনেওয়ালা’।

সেই ছবি ১৬ বছরের মধুবালা ও ২০ বছরের লতা, দুজনের কাছেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। নায়িকা ও গায়িকার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এই ছবি থেকে। যে কণ্ঠস্বরকে একদিন যথেষ্ট ভারী নয় বলে অভিহিত করেছিল বলিউড, পরবর্তীকালে সেই কণ্ঠস্বরই হয়ে ওঠে বলিউডের গোল্ডেন ভয়েস।

যতীন মিশ্রর বই, ‘লতা সুর গাঁথা’তে লতাজি বলেছেন, “প্রায়ই রেকর্ডিং করতে করতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়তাম আমি। আর ভীষণ খিদে পেত আমার। তখন রেকর্ডিং স্টুডিওতে ক্যান্টিন থাকতো, তবে নানান রকম খাবার পাওয়া যেত কি-না, সে বিষয়ে আমার মনে নেই। তবে চা-বিস্কুট খুঁজে পাওয়া যেত তা বেশ মনে আছে।”

“এক কাপ চা আর দু চারটে বিস্কুট খেয়েই সারাদিন কেটে যেত। এমনও দিন গেছে যে দিনে শুধু জল খেয়ে সারাদিন রেকর্ডিং করছি, কাজের ফাঁকে মনেই আসেনি যে ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খাবার খেয়ে আসতে পারি। সারাক্ষণ মাথায় এটাই ঘুরতো যেভাবে হোক নিজের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে আমাকে।”

বলিউডে লতা মঙ্গেশকরকে নিজের ছোট বোনের মতো দেখতেন নায়ক দিলীপ কুমার। আবার লতাও দিলীপ কুমারকে সব থেকে কাছের মানুষ মনে করতেন ইন্ডাস্ট্রিতে।

একবার দিলীপ কুমার লতার ওপর খুব রেগে গিয়েছিলেন।

১৯৭৪ সালে লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে লতা নিজের প্রথম প্রোগ্রাম করছিলেন, যেখানে অনুষ্ঠান শুরু করার জন্য দিলীপ কুমারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দিলীপ কুমার নিজের কাজ ভীষণ মন দিয়ে করতেন এবং ছোট ছোট বিষয়ে খুব গুরুত্ব দিতেন।

পাকিজা ছবির গান ‘ইনহি লোগো নে লে লি দুপাট্টা মেরা’ এই গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করতে নিমরাজি ছিলেন তিনি।

লতাজিকে দিলীপ কুমার প্রশ্ন করেছিলেন, ‘অনুষ্ঠানের শুরুতেই এই গান কেন করতে চাইছেন আপনি?”

লতা তখন দিলীপ কুমারকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন যে এই গান অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গান এবং মানুষ এটি শুনতে চাইছেন। কিন্তু তখন দিলীপ কুমারকে কোনোভাবেই বোঝানো যায়নি। তিনি ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন।

যতীন্দ্র মিশ্রর বই ‘লতা সুর গাঁথা’তে লতা বলেছেন.. তাকে ভেবে, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’য়ের চিত্রনাট্য লিখেছিলেন রাজ কাপুর।

“অনেক আগে উনি চেয়েছিলেন মুখ্য ভূমিকায় আমি অভিনয় করি। আমার ইচ্ছে না থাকায় না করে দিয়েছিলাম ওই প্রস্তাবে। যদি ছবি তৈরিতে কোনো বাধা হয়নি। অনেক পরে ৮০’র দশকে যখন আবার ছবিটি বানাবার কথা ভাবেন তখন জিনাত আমান কে নেন ছবিতে।”

দশকের পর দশক টানা সিনেমায় প্লেব্যাক করা কতটা ডিসিপ্লিন আর পরিশ্রমের ব্যাপার সেটা এ যুগের লোকজন কল্পনাই করতে পারবেন না। এর ভেতরেই তিনি পড়াশোনাও করতেন। যখন শরৎচন্দ্রের উপন্যাস থেকে সিনেমা হবে তিনি হিন্দি অনুবাদ পড়ে নিতেন।

বলিউডের সে সময়ের দিকে উর্দু হিন্দির শুদ্ধ উচ্চারণের ব্যাপার ছিল। কারণ সব বড় বড় উর্দু হিন্দি কবিরা সিনেমায় গান লিখতেন। কিছুটা মারাঠি টান তার হিন্দিতে থাকার জন্য কেউ কেউ তার সমালোচনা করতেন। এজন্য তিনি গৃহশিক্ষক রেখে হিন্দি আর উর্দু পাকাপাকি ভাবে শিখে ফেলেন।

লতা মুঙ্গেশকরের এসব নিষ্ঠার গল্প অনেক। তিনটা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন। দ্বিতীয় সংগীত শিল্পী হিসাবে ভারতরত্ন পেয়েছেন। অনান্য যা পুরষ্কার লোকজন পায় দেরিতে, উনি পেয়ে গেছেন আগেভাগেই।

ভারত সরকার গত বছর ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে ‘ডট্যার অব দ্য নেইশন’ খেতাবে ভূষিত করেন।

সবচেয়ে বড় পুরষ্কার তো জনগনের অকুন্ঠ ভালোবাসা। ভারতের বিভিন্ন প্রজন্মের পার্থক্য থাকবে কিন্তু মিল একটাই সব প্রজন্মের প্রিয় শিল্প লতা মুঙ্গেশকর।

তবুও লতা মুঙ্গেশকর আমাদের দূরের মানুষই থাকতেন যদি না তিনি বাংলা গান না গাইতেন। তিনি ৩৬ ভাষাতে গান গেয়েছেন বলে শোনা যায়। এর ভেতরে বাংলার স্থান নিঃসন্দেহে শীর্ষে।

আমাদের মা খালাদের কন্ঠে যেসব গান শুনে আমরা বড় হয়েছি এর ভেতরে বেশির ভাগ গানই সন্ধ্যা আর লতার। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রথম তাকে নিয়ে প্লেব্যাক করান। কি দুর্দান্ত সেই গান, ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে’।

এরপর ভূপেন হাজারিকা তাকে দিয়ে গাওয়ান, ‘রঙ্গিলা বাঁশিতে’। যে গান শুনলে এতদিন পর এখনও মন ভরে ওঠে।

এরপর সলীল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত হেমন্তের সুরে অগনিত হিট গান। স্বীকৃতি হিসেবে ১৫ বার বেঙ্গল ফিল্ম সাংবাদিক অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন।

‘নিঝুম সন্ধ্যায়’, ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘যা রে উড়ে যারে পাখি’, ‘বলছি তোমার কানে’ আরও অজস্র যে গান- এসব ছাড়া বাংলা ছবির গান কল্পনা করা যায় নাকি।

তিনি বাংলা সিনেমাতেই গান গেয়েছেন প্রায় দুশোর কাছাকাছি।

এত কথা বলার কারণ আজ তার জন্মদিন। নব্বই পার হয়ে একানব্বইতে এসে পড়লো। কিছুদিন আগে অসুস্থ হয়েছিলেন, এখন মোটামুটি সুস্থ। তাও এই মহামারীর কালে তাকে নিয়ে চিন্তা হয়। তার বেঁচে থাকাটা জরুরি।

বিখ্যাত ক্রিকেটার টেন্ডুলকার বলেছিলেন, “লতা মুঙ্গেশকর আমাকে অনুপ্রাণিত করে সবসময়, একটা মানুষ সাফল্যের চূড়ায় বসেও কীভাবে এত বিনয়ী হয় এটা আমি শিখেছি লতাজীর থেকে। কাজের প্রতি যে আত্মনিবেদন এটা বিশ্বের যে কেউ শিখতে পারে তার থেকে।”

জন্মদিনে শুভেচ্ছা হে গুণী। আরও অনেকদিন আপনি সুস্থ থাকুন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক