Published : 10 Apr 2026, 02:26 PM
বর্ণাঢ্য আয়োজনে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় শুরু হয়েছে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের চুয়াল্লিশতম বার্ষিক অধিবেশন।
সম্মেলনের উদ্বোধন করেন এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
এ সময় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, "সংস্কৃতি হল মায়ের মতো, স্নেহ দেয়। সংস্কৃতি হচ্ছে খোলা জানালা। সভ্যতা যদি হয় পিতৃতান্ত্রিক, তবে সংস্কৃতি মায়ের মত লালন করে।"
রাষ্ট্রের পিতৃতান্ত্রিক চরিত্র, স্বৈরাচারী চরিত্র নিয়েও সমালোচনা করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, "সভ্যতার ভেতরেও যে নিষ্ঠুরতা, রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন তার বিরুদ্ধেই সংগ্রাম করেছেন।"
"ঔপনেসিক শক্তি সব সময় চায়, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে। কারণ সংস্কৃতিকে ধ্বংস করলেই মানুষ রাজনৈতিকভাবে পরাধীন থাকতে সম্মত হবে। আজকের বাংলাদেশে আমরা বিস্ময়করভাবে দেখতে পাচ্ছি, মৌলবাদী শক্তিগুলোর অভ্যুথান ঘটছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বুর্জুয়া শাসকেরা কেমন করে সংস্কৃতির বিরোধিতা করছে।"
দেশের বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতির সমালোচনা করে সিরাজুল ইসলাম বলেন, "দেশে আমরা তিন ধারার শিক্ষা পদ্ধতি দেখছি, যা সমাজকে বিভক্ত করছে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের শ্রমে অর্জিত সম্পদ শাসকরা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের হাতে আজ কোনো সম্পদ নেই।"
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের দাবিকে 'সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্ববিরোধী' বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রথযাত্রা’ নাটকের উদাহরণ টেনে এই শিক্ষাবিদ বলেন, "রথ তখনই চলে যখন মেহনতি মানুষ রশি ধরে টান দেয়। সভ্যতার অগ্রগতি এই মেহনতি মানুষের ওপরই নির্ভর করছে।"
পুঁজিবাদী উন্নয়নে সভ্যতা নিষ্ঠুর রূপ নিচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, "আমাদের ভাববার সময় এসেছে, পৃথিবী কি ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকবে নাকি সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে? পুঁজিবাদকে বিদায় দিয়ে সামাজিক মালিকানার নতুন পৃথিবী গড়তে না পারলে মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে না।"
এবারের রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন দেশের নানা অঞ্চলের সাতশতাধিক শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক। সকাল ১০টায় বোধন সঙ্গীত 'আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’ এই গানের মধ্য দিয়ে আয়োজনের সূচনা হয়। সঞ্চালনা করেন অভিনয়শিল্পী ও নাট্যনির্দেশক ত্রপা মজুমদার।
সূচনা বক্তব্যে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সহসভাপতি বুলবুল ইসলাম বলেন, "১৯৮১ সন থেকে আমরা পথ চলছি। এই পথচলা সহজ ছিল না। এই চলার পথের অনেক কাণ্ডারিকে আমরা হারিয়েছি। তাদেরকে স্মরণ করছি।
"পুরো পৃথিবীই আজ বিপদগ্রস্ত। এই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ মানুষকেই খুঁজে বের করতে হবে। আমরা আশা করবো পৃথিবীর মানুষ যেন মানবিক হয়। দেশের প্রতি সমাজের প্রতি, মাটির প্রতি ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যান।"
পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লিলি ইসলাম বলেন, "সমাজে যখন মূল্যবোধের অবক্ষয় বেড়েছে, তখন সংস্কৃতির শক্তিই আমাদের পথ দেখিয়েছে। বিশ্বায়নের এই সংকটময় সময়ে নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করছে।"
সভাপতির বক্তব্যে পরিষদের সভাপতি মফিদুল হক বলেন, "এখনো অনানুষ্ঠানিকভাবেই সঙ্গীতের শিক্ষা চলে, কিভাবে শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গীতকে আনুষ্ঠানিকভাবে আরো নিবিড়ভাবে যুক্ত করা যায় এবং সেটাকে বাস্তবায়ন করা যায়। সেখানে সমাজ কিভাবে তার দায়িত্ব এবং অংশিদারিত্ব গ্রহণ করতে পারে। সেই চেষ্টা অব্যহত রাখতে হবে। আমাদের সম্মেলন পরিষদ শুরু থেকেই চেষ্টা করছে, বাঙালি সংস্কৃতির সমগ্রতাকে তুলে ধরার।"
এর আগে বৃহস্পতিবার হবে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতার বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি শাখায় প্রতিযোগিতার পর প্রায় চারশতাধিক প্রতিযোগী ঢাকার বাছাই পর্বে অংশগ্রহণ করেন।
এখান থেকে চূড়ান্ত প্রতিযোগী বাছাই করা হয়। জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত প্রতিযোগিতার কিশোর ও সাধারণ বিভাগের চূড়ান্তপর্ব শুক্রবার উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতার পর অনুষ্ঠিত হয়।
দুই দিনের আয়োজনে যা থাকছে
দুই দিনেরই সান্ধ্য-অধিবেশন সাজানো হয়েছে গুণীজনের সুবচন, গীতিআলেখ্য, আবৃত্তি, নৃত্য ও গান দিয়ে। সম্মেলনের সমাপনী সন্ধ্যায় রবীন্দ্রপদক দিয়ে গুণি-সম্মাননা জানানো হবে অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেনকে।
৪৪তম অধিবেশনের সমাপনী দিন শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় থাকবে সেমিনার।
এবারের বিষয়: ‘‘বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সঙ্গীত’’। সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সভাপতি মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন অধ্যাপক কৃষ্টি হেফাজ, অধ্যাপক সন্তোষ ঢালি, ফেরদৌস আরা লিপি ও স্বতন্ত্রা বুলবুল।
প্রথম দিনের সান্ধ্যকালীন অধিবেশনের একটি পর্ব থাকছে নজরুল সঙ্গীতের। থাকছে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের এ যাবৎকাল পরিচালিত কার্যক্রমের উপস্থাপনা। বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষে যথারীতি প্রকাশিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির নানা দিক নিয়ে বিশিষ্টজনদের লেখা প্রবন্ধের সংকলন 'সঙ্গীত সংস্কৃতি'।
১৯৭৯ সালে শিল্পী জাহিদুর রহিমের প্রয়াণ-দিবসে কাজ শুরু হয়েছিল 'জাহিদুর রহিম স্মৃতি পরিষদ'-এর। দেশব্যাপী বৃহত্তর পরিসরে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার লক্ষ্য নিয়ে পরবর্তীকালে বাঙালির চিরকালের সঙ্গী রবীন্দ্রনাথের নাম যুক্ত করে সংগঠনের নাম করা হয় জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ্।"
বর্তমানে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সক্রিয় শাখা রয়েছে ৮২টি। সংগঠনের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতা দূর করে বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতির সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক বিকাশের ধারাকে সমৃদ্ধ ও গতিশীল করে তোলার উদ্দেশ্যে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করা।
নাম পরিবর্তন হলেও অব্যাহত আছে প্রয়াত স্মরণীয় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী জাহিদুর রহিমের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য 'জাহিদুর রহিম স্মৃতি পুরস্কার' প্রতিযোগিতার আয়োজন। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকের বার্ষিক অধিবেশনগুলো কেবল রাজধানী ঢাকাতেই হত।
শাখাগুলিকে উদ্বুদ্ধ করতে এবং সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপকতর প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বার্ষিক অধিবেশন হচ্ছে- এক বছর ঢাকায়, পরের বছর অন্য জেলায়। সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে এক বছর পর পর, কেবল ঢাকার অধিবেশনে। প্রতি অধিবেশনেই দেশের সেবাব্রতী গুণীদের সম্মাননা জানিয়ে নির্বাচিত গুণীকে রবীন্দ্র-পদক ও সাধ্যমত অর্থ দেওয়া হয়ে থাকে।