১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মুস্তাফা জামান আব্বাসী স্মরণে গান, স্মৃতি আর সাংস্কৃতিক দায়বোধের কথা শিল্পীদের

"আব্বাসী ভাইয়ের স্মরণসভায় কথা বলার জন্য তোকে আর আমাকে পাচ্ছে এখনো। আমরা দুজন মারা গেলে কথা বলার জন্য আর কাউকে পাওয়া যাবে না।"

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 May 2026, 05:04 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:35 PM

“আমরা দুজন মারা গেলে আর কাউকে পাওয়া যাবে না”–মুস্তাফা জামান আব্বাসীর স্মরণসভায় এসে সংগীত শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরার উদ্দেশ কথাটি বললেন আরেক শিল্পী শেখ সাদী খান।

প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী, সুরকার, সংগ্রাহক, গবেষক ও লেখক মুস্তাফা জামান আব্বাসীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার 'মুস্তাফা জামান আব্বাসী স্মারক বক্তৃতা' শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সাহিত্য সংসদ কাঠ পেন্সিল।

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে এ আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন শেখ সাদী খান। আর ফাতেমা তুজ জোহরা ছিলেন বিশেষ অতিথি। 

স্মরণসভার মঞ্চে পাশে বসা ফাতেমা তুজ জোহরাকে শেখ সাদী খান বলেন, "আব্বাসী ভাইয়ের স্মরণসভায় কথা বলার জন্য তোকে আর আমাকে পাচ্ছে এখনো। আমরা দুজন মারা গেলে কথা বলার জন্য আর কাউকে পাওয়া যাবে না।" 

তার ভাষায়, মুস্তাফা জামান আব্বাসী ছিলেন একজন ‘সত্যিকারের সুফি মানুষ’। 

“সুফি বলতে শুধু নামাজ-কালামে নয়, জীবনযাপন, চলাফেরা ও কথাবার্তায়; সব মিলিয়ে যে মানুষ সুফিয়ানা ভাব ধারণ করেন, আব্বাসী ছিলেন ঠিক সেরকম। তার পিতাও ছিলেন সুফি এবং ভাওয়াইয়া সংগীতের সম্রাট। সেই পরম্পরা বহন করেই আব্বাসী সংগীতজগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।" 

মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সঙ্গে পরিচয়ের শুরুর দিকের কথাও অনুষ্ঠানে স্মরণ করেন শেখ সাদী খান। বলেন, তাদের পরিচয় ১৯৬৭ সালে, বাংলাদেশ টেলিভিশনে কাজের সূত্রে। 

শেখ সাদী তখন ক্লাসিকাল বেহালা বাজাতেন। পরে জীবিকার তাগিদে বাণিজ্যিক সংগীতে আসেন। সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই দীর্ঘ পথচলায় ফেরদৌসী রহমান, মুস্তাফা জামান আব্বাসীর মত মানুষগুলোর সঙ্গে কাজের স্মৃতি তার জীবনের ‘অমূল্য সম্পদ’। 

‘এত বড়’ একজন সংগীতজ্ঞ ও সুফি সাধকের স্মরণসভায় হাতে গোনা দর্শকের উপস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন শেখ সাদী খান।

তিনি বলেন, “যার এত সৃষ্টি, এত অবদান—তার স্মরণে এই স্বল্প উপস্থিতি আমাদের সামাজিক চরিত্রের একটি দুঃখজনক প্রতিফলন। এই স্মরণসভাগুলো শিল্পকলা থেকে বড় পরিসরে আয়োজন হওয়া উচিত।" 

সংগীতশিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা অনুষ্ঠানে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সঙ্গে দীর্ঘ ব্যক্তিগত ও শৈল্পিক সম্পর্কের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন আবেগভরা কণ্ঠে।

তিনি বলেন, "উনার সাথে আমার এত ভালো সম্পর্ক ছিল। শুধুমাত্র শিল্পী হিসেবে নয়, কেন যেন উনাদের পুরো পরিবার আমাকে অনেক আদর করতেন। অনেক বেশি আদর-সম্মান করতেন। ভাইয়ের মা খালাম্মা, উনার বাসায় আমার অনেক সময় কেটেছে, অনেক খাওয়া হয়েছে, অনেক স্নেহ-আদর উনারা দিয়েছেন আমাকে।"

আব্বাসী একটি গানের ডায়েরি উপহার দিয়েছিলেন, যেখানে লিখেছিলেন 'বিশ্বনন্দিনী ফাতেমা তুজ জোহরা'। সেই সম্বোধনটি আজও ‘বুকে গেঁথে আছে’ এই শিল্পীর। 

তিনি বলেন, “কোন অঞ্চলের গানে হকারান্ত করা উচিত, কোন পল্লী গীতিতে করা উচিত না, এটা আমি উনার কাছে শিখেছি।" 

ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, "আব্বাসী ভাই হচ্ছেন একটা ডিকশনারি। ওনার মত একজন মানুষ যেমন সুপুরুষ দেখতে, তেমন তার জ্ঞান, তার গরিমা, তার বংশপরিচয়। এমন মানুষ আবার কখন পাব? উনি মানুষকে কতটুকু ভালোবাসতেন তা বুঝিয়ে বলা যাবে না।" 

বক্তব্যের শেষে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি যে আমরা সংস্কৃতি চর্চা যেভাবে করতাম, সম্মানিত মানুষকে যেভাবে আমরা মহীরুহ হিসেবে ধরে রাখতাম, আদর্শ হিসেবে ধরে রাখতাম, ঠিক সেভাবে আমরা যেন চলি। আপনারা অনেকেই এখানে কম বয়সী আছেন। বিভাজনটা না করি সংস্কৃতিতে। 

“তাহলে সংস্কৃতির কিছুই থাকবে না, আমাদের অস্তিত্বের কোনো পরিচয় থাকবে না। কারণ আমরা যদি হালকা হয়ে যাই, তখন সব বাইরের জিনিস এসে ভিড় করে আমাদেরকে গ্রাস করবে। গ্রাস করতে তো পেরেছে, আপনারা দেখছেন।"

লেখক ও গবেষক অনুপম হায়াৎ এবং গীতিকার ও কবি জাকির আবু জাফরও উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।

আব্বাসীর নামে একাডেমি গড়ার দাবি তুলে অনুপম হায়াৎ বলেন, “সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হোক, যাতে তার স্মৃতি ও অবদান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকে।" 

স্মরণসভায় মুস্তফা জামান আব্বাসীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সংগীত পরিবেশন করেন ফাতেমা তুজ জোহরা। তিনি তিনটি গান গেয়ে শোনান। এছাড়া শিল্পী আবু বকর সিদ্দিক ও ইয়াসমিন মুশতারী গান করেন। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শরীফ বায়জীদ মাহমুদ ও সীমা ইসলাম।

অনুষ্ঠান শেষে রঞ্জন মল্লিক নির্মিত 'ভাওয়াইয়া শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী' শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন।

বড় মেয়ে সামিরা আব্বাসীর সঙ্গে মুস্তাফা জামান আব্বাসী।

বড় মেয়ে সামিরা আব্বাসীর সঙ্গে মুস্তাফা জামান আব্বাসী।

২০২৫ সালের ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মুস্তাফা জামান আব্বাসী। তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

তিনি ভাওয়াইয়া সম্রাট কিংবদন্তি শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদের ছোট ছেলে। তার চাচা আব্দুল করিম ছিলেন পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া ভাটিয়ালি গানের শিল্পী।

তার বোন ফেরদৌসী রহমানও একজন প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী। বড় ভাই মোস্তফা কামাল ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। মোস্তফা কামালের মেয়ে নাশিদ কামাল একজন নজরুল সংগীত শিল্পী।

ভারতের কোচবিহার জেলার বলরামপুর গ্রামে ১৯৩৬ সালের ৮ ডিসেম্বর মুস্তাফা জামান আব্বাসীর জন্ম। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে কলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন।

পড়াশোনা করেছেন বলরামপুর হাই স্কুল, কোচবিহারের জেনকিনস্ স্কুল, পার্ক সার্কাসের মডার্ন স্কুলে। পরে ঢাকায় এসে সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুল আর ঢাকা কলেজের পাট চুকিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন ইতিহাসে।

আব্বাসউদ্দিন আহমদ চেয়েছিলেন, তার সুদর্শন ছেলেটি সিনেমার নায়ক হোক। কিন্তু বাবার মত সুরের সাম্পানই ভাসিয়েছিলেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ মুহম্মদ হোসেন খসরু এবং ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খাঁর কাছে নিয়েছেন সংগীতের তালিম।

ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদী, চটকা, মারফতী, বাউল, হাসনগীতিসহ গ্রামবাংলার নানা ঢঙের লোকগীতি শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর কণ্ঠে।

জীবনভর গানের সঙ্গে কাটানো মুস্তাফা জামান আব্বাসী গবেষক হিসেবেও দেশীয় সংগীতের বৈচিত্র্যের সন্ধান করে গেছেন। ইসলামি ও লোকধারার গান সংগ্রহ এবং তা জনপ্রিয় করতে কাজ করেছেন।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ‘কাজী নজরুল ইসলাম এবং আব্বাসউদ্দীন আহমদ গবেষণা ও শিক্ষা কেন্দ্রের’ গবেষক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগীত সম্মিলনে উপস্থাপন করে গেছেন এ দেশের সংগীত বৈভব।

বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভিতে ‘আমার ঠিকানা’ ও ‘ভরা নদীর বাঁকে’ শিরোনামে দুটি সংগীতবিষয়ক অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। একসময় পত্রিকায় নিয়মিত কলামও লিখতেন।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং জাতীয় সংগীত কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা একাডেমির এই সম্মানিত ফেলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য এবং বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।

সংগীতে অবদানের জন্য ১৯৯৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কাজের জন্য ২০১৩ সালে নজরুল মেলায় তাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।

কবি, লেখক ও গবেষক মুস্তফা জামান আব্বাসীর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫০। ভাওয়াইয়া গানের ওপর তার দুটি বই ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি’ এবং ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি-২’ এ ১২০০ গানের কথা বলা আছে।

পুরনো খবর

সংগীতজ্ঞ মুস্তাফা জামান আব্বাসীর চিরবিদায়