১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

অভিনেতা হওয়ার জন্য অভিনয় করি না: আড্ডানামায় আফজাল হোসেন

আফজালের কথায়, একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে যিনি অভিনয় করতে আসেন তিনি একজন বিশ্লেষকও বটে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Aug 2026, 06:12 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:03 PM

সবার চেয়ে আলাদা কিছু করার তাড়না ভেতরে কাজ করত শৈশব থেকে, তাই আর পাঁচজনের মত রাস্তায় নয়, ইচ্ছে হত দুচাকার বাহন নিয়ে ধানক্ষেতের আল ধরে চালাতে। 

ভিন্ন ধরনের কিছু করার ইচ্ছা ক্রমে ক্রমে তীব্র হয় তার, সেজন্য ঢাকার চারুকলায় পড়ার সময়ে হয়ে যান বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকিয়ে। সমসাময়িক শিল্পীরা যখন ধারাবাহিক নাটক করতে উন্মুখ থাকতেন, তিনি সুযোগ পেয়েও মনে করতেন নিয়মিত কাজে বাঁধা পড়লে জীবন বুঝি বৈচিত্র হারাবে। কারণ অভিনয় ততদিনে আর হৃদয়ে শক্ত আসন গেড়েছে। তিনি অভিনেতা আফজাল হোসেন।

গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ ‘আড্ডানামা’য় অতিথি হয়ে এসে আফজাল হোসেন শুনিয়েছেন আর্ট কলেজে রঙ-তুলির জীবন কীভাবে তার মগজে থেকে সবকিছুকে আলাদা করল। থিয়েটার খুলে দিল অভিনয়ের অচেনা দরজা। বুঝলেন, কেবল সংলাপ আউরে শিল্পী হওয়া যায় না।

টেলিভিশনে অভিনয়ের সেকাল আর একালের স্মৃতিও তুলে ধরেছেন আফজাল। বলেছেন তুমুল জনপ্রিয় থাকা অবস্থায় হ‌ুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘বহুব্রিহী’ ছাড়ার নেপথ্য কারণ। বিজ্ঞাপন নিয়ে মেতে ওঠার গল্পও করেছেন। তবে তার সংকল্প ছিল, অর্থকড়ির পেছনে ছুটবেন না। 

সত্তর পেরুনো আফজাল মনে করেন জীবন উপভোগ করা উচিত, আর সেই কাজটাই তিনি করছেন। 

আড্ডনামা সঞ্চালনা করেছেন অভিনেত্রী নিমা রহমান। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল।

বৃহস্পতিবার রাতে প্রচার হয়েছে ‘আড্ডানামা’র চতুর্থ পর্ব। এর আগের তিন পর্বে অতিথি হয়েছিলেন অভিনেতা আবুল হায়াত, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল। 

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।

‘সাইকেল চালাতে চাই ক্ষেতের আল দিয়ে’

পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সাতক্ষীরার পারুলিয়াতে জন্ম নেওয়া আফজাল হোসেন নিজের বেড়ে ওঠার গল্প শোনাতে গিয়ে বলেন, কিছুটা বড় হয়ে তার বোধগম্য হল, তিনি অন্য ‘পাঁচজনের মত না’।

তাহলে তিনি কেমন? আফজাল হোসেন বলেন, “কিছু কিছু কাজ যারা করে না, আমার ওগুলো করতে ইচ্ছা হয়। যেমন ইচ্ছা হচ্ছে বাবার সাইকেল চালাব। কিন্তু রাস্তা দিয়ে না, ধানক্ষেতের আল দিয়ে চালাতে পারি কিনা? যদি ওটা না পারি, সবাই তো রাস্তা দিয়েই চালায়, লাভ কি!”

স্কুলের নাম না জানিয়ে আফজাল বলেন, তিনি এমন এক জায়গায় পড়াশোনা করেছেন, যেখানে সেইসব ছেলেমেয়েদের ভর্তি করা হত, যাদের শাসন করার সাধ্য বাবা-মায়ের থাকে না। 

"তো ওখানে মোটামুটি একটা ভালো ছাত্র হিসেবে ভর্তি হলাম। বাবা-মা চায় যেন ভালোভাবে পাস-টাস করে যাই। পাস করলামও।"

রং-তুলি মগজ থেকে সব কিছু থেকে আলাদা করে দেয়

আফজাল হোসেনের শখ হল আর্ট কলেছে ভর্তি হওয়ার। ব্যাপারটা কেবল শখের গণ্ডিতে আটকে রইল না। ঢাকার আর্ট কলেজে তিনি ভর্তিও হলেন। আর তাতে তার জীবন ও দর্শন বদলে গেল।

সেই প্রথম তিনি বু্ঝতে পারলেন, পৃথিবীটা নেহাত ছোট নয়। বৃহৎ এই পৃথিবীতে অনেক কিছুই করার আছে। 

আর্ট কলেজের রংতুলির জীবনে আনন্দে ছিলেন কি না–নিমা রহমানের এমন প্রশ্নে আফজাল বলেন, "খুবই আনন্দের। কারণ এইটা এমনই একটা বিষয় যে অন্য সবকিছুকে নিজের মগজ থেকে আলাদা করে দেয়। মনে হয়, এটাই জগৎ, এটাই সবকিছু, সমস্ত ভালো লাগা যেন এর ভেতরেই আছে।"

‘প্রচ্ছদ আঁকিয়ে থেকে অভিনেতা’

আফজাল অভিনেতা হওয়ার আগে আর্ট কলেজে পড়ার সময় বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন, নিতান্তই অল্প বয়সে। 

আঁকাআঁকিতে না থেকে লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের দুনিয়ায় তার ঢুকে পড়া চিন্তাভাবনা করে, করা নাকি কাকতালীয়, তা জানতে চান নিমা রহমান।

আফজালের উত্তর, বেশিরভাগটাই কাকতালীয়; এছাড়া ভিন্নধর্মী কিছু করার ভাবনাও কাজ করেছে ভেতরে।

“ওই যে আমার একটা রোগ ছিল যে সবাই রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালায়, আমি ক্ষেতের আল দিয়ে চালাতে চাই। তো আমার মনে হয়েছিল যে ছাত্র অবস্থায় তো কেউ ইলাস্ট্রেশন বা বুক কাভার করে না সাধারণত, তো আমি ওটা করতে চাই এবং ওই চাওয়া দিয়ে এটা হচ্ছে শুরু।”

আর ছেলেবেলায় দুয়েকটা নাটকে অভিনয় করলেও, পরে অভিনয়ই করে যাবেন–এমন কোনো ভাবনা আফজালের ভেতরে ছিল না। 

আর্ট কলেজের একটি নাটকে অভিনয় করার সূত্রেই যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে। সেই অভিনয়ের পর নাট্যনির্দেশক নাসিরউদ্দিন ইউসুফ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি ‘সিরিয়াসলি’ থিয়েটার করতে চান কি না। ওই প্রশ্নেই অভিনয়ে কৌতুহলী হয়েছিলেন আফজাল।

তিনি বলেন, “এই যে থিয়েটারের আগে 'সিরিয়াসলি' শব্দটা উনি যোগ করে দিয়েছিলেন, আমার কৌতূহল বেড়েছিল যে সিরিয়াসলি থিয়েটার করা কাকে বলে!"  

নিমা রহমান জানতে চান, সিরিয়াসলি থিয়েটার করা নিয়ে আফজাল হোসেনের ভাবনা কী? 

এক্ষেত্রেও আর্ট কলেজের ভূমিকা আছে বলে জানালেন আফজাল হোসেন।

তিনি বলেন, "আর্ট কলেজে আমার যে ধারণাটা পাল্টেছিল প্রথম, আমি তো জানতাম না যে আর্ট কলেজে ছবি আঁকা শেখায়। ছবি আঁকা আবার শেখায় কী করে? এটা প্রশ্ন ছিল। তো শিক্ষক বলছেন, 'এই যে গাছটা দেখছ, যে কোনো মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে গাছের পাতা কী? সব মানুষ বলবে সবুজ। কিন্তু একজন শিল্পী তাকে আবিষ্কার করে নিতে হয় যে সবুজের ভেতরে অন্য রং আছে। 

"এই যে একটা বয়ান, একটা শিক্ষা, আমার মনে হয়েছে সমগ্র শিল্পকর্মের শিক্ষা হচ্ছে যা দেখছি তার ভেতর দেখা। আলাদা করে দেখে নেওয়ার চেষ্টা করা, দেখার চেষ্টা করা এবং মানুষ যদি চেষ্টা করে তাহলে দেখতে পাবে। যেটাই মানুষ ভেবে নিক। আমরা যে স্বপ্ন দেখি, আমরা যে চোখ বন্ধ করে দেখতে চাই যে এটা দেখতে চাই, ওটা তো দেখতে পাই।”

ওই শিক্ষা থেকে থিয়েটার বুঝতে চাইলেন আফজাল।

'থিয়েটার একজন মানুষকে আলাদাভাবে নির্মাণ করে' 

থিয়েটারে এসে কি বুঝলেন? আফজাল বলেন, সেখানে কর্মীদের অনুভূতিপ্রবণ ও সংবেদনশীল হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। তবে কাজটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলে। 

“যখন আমি থিয়েটারে আসছি, তখন আমাকে বোঝানো হল বা আমাদেরকে বোঝানো হল, আমরা যারা থিয়েটার করি, জীবন কী তুমি কতটা বোঝো। এই বুঝতে গেলে তোমার তো শুধু দেখাই যথেষ্ট না, তোমাকে অনুভূতিপ্রবণ হতে হবে, সংবেদনশীল হতে হবে। আর একটা প্রস্তুতি তো তোমার আছেই, দেখার যেটা। আর একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা, আমি কীভাবে চলব, কীভাবে বলব, কীভাবে দাঁড়াব।"  

অভিনয়ের সংজ্ঞা তাহলে কী? আফজাল বলেন, "আমরা মনে করি একটা চরিত্র অভিনয় করলেন, সেটাই ভালো অভিনয়। কিন্তু আমার বিবেচনায়, থিয়েটার একজন মানুষকে আলাদাভাবে নির্মাণ করে। একজন অভিনেতা শুধু সংলাপ বলে অভিনয় শিল্পী হন না, তাকে আলাদা করে সবকিছু। 

“মানে ঠিক এভাবে বললে বোধহয় সহজ হয় যে, লেখক একটা কাহিনী রচনা করেন, একটি চরিত্রকেও তিনি বর্ণনা দেন, আর অভিনেতাও কিন্তু আরেকটা নির্মাণ করেন, এটাও একটা রচনা। মানে যেটি লেখক লিখেছেন, তার রক্ত-মাংসটা মনে হয় যে অভিনেতাই।”

একজন অভিনয়শিল্পীর শুরুটা মঞ্চ দিয়ে না হলে ভিত দুর্বল থেকে যায় কি না, সেই প্রশ্নে আফজাল হোসেন একমত হলেও তিনি যোগ করেন নিজস্ব ধারণাও। 

নিমা রহমানকে সমর্থন করে আফজাল বলেন, "হ্যাঁ আমি মনে করি। তবে এর মানে এই না যে রবীন্দ্রনাথ কবিতা লেখা কোত্থেকে শিখলেন, বা পিকাসোকে ছবি আঁকা কে শিখিয়েছে। শিখলেই যে সবাই পারবে, তাও না।"

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি তুলে আনেন সাতক্ষীরার বন্ধু, অভিনেতা তারিক আনামের কথা, যিনি অভিনয় নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন ভারতের পুনেতে। 

আফজাল হোসেন বলেন, "তখন আমার প্রশ্ন জেগেছিল, অভিনয় আবার শিখতে হয় কী করে! কিন্তু পরে দেখেছি, তারিকের সঙ্গে কথা বলে, ওর ধ্যান-ধারণাই পাল্টে গেছে। আমি তারিকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি যে ও যেভাবে কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যাটা করে, সেই ব্যাখ্যাটা তো আমি করতে পারব না। কারণ হচ্ছে ওর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা রয়েছে। আমি একটা চরিত্র অভিনয় করে দিলাম আমার নিজের বোধ-বিচার দিয়ে একটা জায়গা দাঁড় করালাম।”

আফজালের কথায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে যিনি অভিনয় করতে আসেন তিনি একজন বিশ্লেষকও বটে।

সুবর্ণা-আফজাল জুটি: টেলিভিশনের এক সোনালি সময়  

১৯৮০–এর দশকে বিটিভির নাটকে অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে আফজাল হোসেনের জুটি দর্শকপ্রিয় হয়। ওই জনপ্রিয়তার পেছনে কেবল অভিনেতা-অভিনেত্রীকে কৃতীত্ব দিতে চান না আফজাল। 

নিমা রহমানের প্রশ্ন ছিল এই জুটির সাফল্যের পেছনের কারিগর কে? 

রসিকতা করে আফজাল বলেন, "তুমি জানো কারণ। তুমি সেই সময় টেলিভিশনে নিজেও অনেক বেশি জড়িত ছিলে। এখন উপস্থাপকের ভঙ্গিতে তুমি জানো না কিছুই- এভাবে প্রশ্ন করছ।"    

শুরুতেই বিটিভির সে সময়ের প্রযোজকদের কথা স্মরণ করে আফজাল হোসেন বলেন, তারা যেন কাজ করেই আনন্দ পেতেন। কাজ ভালো হওয়ার পেছনে প্রতিযোগিতাও একটা দিক বলে মনে করেন আফজাল। আর ওই কৃতি প্রযোজকরাই তাদেরকে অভিনয় শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছেন বলে মন্তব্য আফজালের।

তিনি বলেন, "এটা যখন হয়েছে তখন সবাই মিলেই হয়েছে। ওই সময়ের নাটকের নামগুলো দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি প্রযোজক, তাদের কর্মের আনন্দ ছিল হচ্ছে একটা নাটক বানিয়ে, এত অল্প নাটক হত, তার মধ্যে কে ভালো করবে! একটা প্রতিযোগিতা ছিল, যাক। সেই প্রতিযোগিতাটার খুব যে কোনো মন্দ দিক ছিল না।  

"ভালো দিক ছিল, কতটা সাহিত্য মানের হবে, কতটা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির হবে, একেকটা নাটক একেক রকমভাবে হয়েছে। অন্তত আটজন প্রযোজক ছিলেন যারা প্রত্যেকেই কৃতী। আরেকটা সুবিধা যেটা ছিল, আমরা এখন অভিনেতা, উনারাই তো আমাদেরকে অভিনেতা বানিয়েছেন। আমাদেরকে শিখিয়েছেন যে ক্যামেরার সামনের অভিনয়, থিয়েটার এক জিনিস আর ক্যামেরার সামনের অভিনয়টা বিষয়টা আলাদা। তাদেরকে পেয়ে আমাদের উপকার হয়েছে এক। চমৎকার নাট্যকাররা ছিলেন।"   

আফজাল হোসেন বলেন, সে সময় টেলিভিশনের কর্মীরা কাজটাকে চাকরি হিসেবে দেখতেন না।

"তারাও শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারা মনে করতেন এটাও আমার ডিউটি। প্রযোজক কী ভেবেছেন সেটা তো পরের কথা, কিন্তু আমি যখন ফ্লোরে ক্যামেরা নিয়ে আছি, আমার একটা রোল আছে। তখন আমরা স্টুডিওতে শুটিংয়ের আগে রিহার্সাল করতাম।" 

রিহার্সেলের গল্প বলতে গিয়ে আফজাল বলেন, "টেবিলে সাতদিন ধরে রিহার্সেল হত। স্টুডিওতে ড্রাই রিহার্সেলের সময় ক্যামেরাম্যানরা উপস্থিত থাকতেন, কে কী করে, কে কখন মুভ করে কোথায় দাঁড়ায়, কে কোন এক্সপ্রেশন দেয় এই তিনজন মিলে ঠিক করে নিতেন যেন স্ক্রিনে প্রপার যায়। অভিনেতার যত শক্তিই থাকুক, ক্যামেরাম্যানদের সহযোগিতার কারণেই আমার মত একটা মধ্যম মানের অভিনেতাও মনে করেছে, ও বাবা তাহলে ভালো অভিনয় করে ফেলছি! কারণ ক্যামেরাম্যান ওইভাবে উপস্থাপিত করেছেন।"

সেই সময়ের অভিনয়শিল্পীদের সততা নিয়েও কথা বলেন আফজাল। তিনি বলেন, "যারাই অভিনয় করেছেন প্রত্যেকের সততা ছিল একটা ওই চরিত্রটা হয়ে ওঠা। তখন কারোরই মনে হত না আমি অমুক হতে চাই, আমাকে এক জায়গায় পৌঁছাতে হবে। এসব ছিল না। অভিনয় করতে চেয়েছে সবাই, ভালোবেসে করেছে।"   

‘ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করার বিরোধী’

আফজাল হোসেন টেলিভিশনে একক এবং ধারাবাহিক দুটোতেই কাজ করেছেন। তবে তিনি নিজেকে ধারাবাহিক নাটকের ‘ঘোর বিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরলেন। 

ধারাবাহিক নাটক ‘নায়ক’ নিয়ে এই প্রসঙ্গ ওঠে, যে নাটক প্রথম পর্বের পর আর আলোর মুখ দেখেনি। তখন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমল।

আফজাল বলেন, "প্রথম কথা আমি টেলিভিশনে ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করার বিরোধী। অভিনয়টা আমি পেশা হিসেবে নিই নাই, কিন্তু অভিনয়টা আমার কাছে খুব ইমোশনাল একটা জায়গা। আমার মনে হয়েছে যে আমি যে বিবিধ সময় বিবিধ চরিত্র করব, ওটার মধ্যে যে উত্তেজনাটা আছে, যে আনন্দটা আছে, এই যে দাঁত ব্রাশ করার মত রোজ একটা কাজ করা, এটায় অত উত্তেজনা নাই।"   

একই সঙ্গে নিজের বিচিত্র কাজের পরিধি তুলে ধরে নিমা রহমানকে তিনি বলেন, "আর তুমি ভালো করে জানো যে আমি অভিনয় ছাড়া অনেক কিছু করতাম, ইন্টারেস্টিং কাজ। তো ওরকম বাঁধা পড়ে থাকতে চাইতাম না।"

আফজাল হোসেন তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনে দুইটি ধারাবাহিক 'নায়ক' ও 'বহুব্রীহিতে' অভিনয় করেছেন।   

ধারাবাহিকে যুক্ত হওয়ার ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, প্রয়াত নাট্যকার আব্দুল্লাহ আল মামুন তাকে টেলিভিশনে নিয়ে এসেছিলেন।  

"উনি একদিন আমাকে ডেকে বলেন যে তোমাকে একটা ধারাবাহিক করতে হবে। তো আমি বলছিলাম মামুন ভাই, আমি করতে চাই না। তিনি বলেন, ‘কেন করতে চাও না?’ আমি বললাম, একটা চরিত্রে দিনের পর দিন অভিনয় করা এটা খুব আনন্দদায়ক না। 

““উনি হেসে বললেন, 'আনন্দদায়ক কীভাবে হতে পারে বল?' আমি বললাম যে হতে পারে একটা কিছু যে প্রত্যেক পর্বে আলাদা কিছু ঘটবে। তখন মামুন ভাই জানতে চান, কীভাবে এটি আনন্দদায়ক করা সম্ভব।”

উত্তরে আফজাল হোসেন নিজের এক বন্ধুর উদাহরণ টেনে একটি প্রস্তাব দেন। বন্ধুটির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমার একজন বন্ধু আছে এরকম, যে বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সে নিজেকে পাল্টায়।”

আফজালের বন্ধুর চরিত্রের ধরনটি আবদুল্লাহ আল মামুন পছন্দ করেন। এরপর তারা সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গেও নাটকের ধারণাটি নিয়ে বসেন। 

মিলনের কেমন লাগল? আফজাল বলেন, “মিলন বলল ফ্যান্টাস্টিক আইডিয়া। লিখে ফেলল একটা নাটক। জীবনের গল্প, কোনো বানানো গল্প না, কিন্তু সেই গল্পের মধ্যে এই চরিত্রটা হচ্ছে যে নিজেকে বিভিন্নভাবে বদলায়।

নাটকটির পটভূমি নিয়ে আফজাল হোসেন বলেন, "প্রথম যে গল্পটা হয়েছিল, সেই গল্পটার মধ্যে এক ধরনের নেগেটিভিটি, মানে ওখানে একদল মাস্তানের কিছু ঘটনা ছিল যে, মাস্তানের সঙ্গে মাস্তানি না, মাস্তানের সঙ্গে তোমার ভালো আচরণ দিয়েও তাদেরকে তুমি বশীভূত করতে পারো, এটাই ছিল বিষয়টা।”

কিন্তু ‘নায়ক’ নাটকটির বিষয়বস্তু তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশ কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে নেয়নি। 

পরের পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে আফজাল বলেন, "কোনো একটা পক্ষ মনে করেছিল যেটা, আমরা প্রতিশোধ নেব এভাবে, যেটা বন্ধ করে দেব। আর তখন এরশাদ সরকার এসেছে। ওখান থেকে একটা বিষয় বলা হয়েছিল যেটার মধ্যে অনেক ভায়োলেন্স আছে। ওই একটা শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সেটা ছিল একটা চমৎকার নাটক।" 

'বহুব্রীহি': কথা ছিল ১৩ পর্বের, হয়ে গেল ২৬ 

দ্বিতীয় ধারাবাহিক 'বহুব্রীহি'র প্রস্তাব আসে প্রযোজক নওয়াজেশ আলী খানের কাছ থেকে। সাহিত্যিক হ‌ুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে আফজাল হোসেন তার ধারাবাহিক করা নিয়ে বিরূপ মনোভাবের কথা বলেন। হ‌ুমায়ূন বলেন, গল্পটা হবে ভিন্ন ধরনের। এই নাটকে একজন চিকিৎসকের চরিত্র পান আফজাল।

সজ্জন চরিত্রের ওই চিকিৎসক পাড়ার মিলি নামের এক তরুণীকে দেখলেই এলোমেলো হয়ে যায়। কাজ ও কথায় গোলমাল পাকিয়ে ফেরেন। নাটকটির প্রচার শুরু হলে তুমুল জনপ্রিয় হন আফজাল হোসেন।   

তিনি বলেন, "হ‌ুমায়ূন আহমেদ বললেন এটা অন্যরকম গল্প হবে। গল্পটা হচ্ছে যে আপনি খুব সাধারণ একটা ছেলে, একটা মেয়ের প্রেমে যখন পড়েছেন তখন আপনি মানে নার্ভাসনেসের চোটে মানুষ অনেক ধরনের বিষয় করে বোকামি করে, এগুলোই করবেন। তারপর যখন সম্পর্কটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে তখন আপনি নরমাল মানুষ যেটা সেটাই। আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং মনে হল। 

“মনে হল যে ১৩টা পর্বের গল্প, একটা মানুষের জার্নিটা শুরু হবে একটা মেয়েকে নিয়ে এবং সেই মেয়ের প্রেমে পড়ে সে অনেক উল্টাপাল্টা কাজ করবে এন্টারটেইনিং এবং তারপর আস্তে আস্তে আবার সে স্বাভাবিকতায় ফিরবে।" 

তবে নাটক ও চরিত্র জনপ্রিয় হওয়ার পর সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে গিয়ে তার চরিত্রের পাগলামি-বোকামি ক্রমে বাড়ানো হচ্ছিল বলে মনে হয় আফজালের। 

তার ভাষায়, "কিন্তু এই নাটকটা জনপ্রিয় হল, এই চরিত্রটা জনপ্রিয় হল এবং স্বাভাবিকভাবে একটা বিষয় থাকে যে মানুষ তো আসলে জনপ্রিয়তাটা ধরে রাখতে চায়। তো সুতরাং যে বিষয়গুলো এনজয় করছিল অডিয়েন্স, এনজয় করার বিষয়গুলো একটু বাড়ানো হচ্ছিল। আমার পাগলামি বা বোকামিটা আবার বাড়ছিল।”

একটা পর্যায়ে নাটকটির পর্বের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেল জানিয়ে আফজাল বলেন, “তো আমি কিন্তু বলে নিয়েছিলাম যে আমি ১৩ পর্বের বেশি করব না। তো ওটা আবার ২৬ পর্ব হয়ে গেল। তো আপনারা এখন গুটিয়ে ফেলেন আমাকে অব্যাহতি দেন। তো ওই ১৩ না ১৫ পর্ব মানে ওটা ম্যানেজ করতে যে দুটো পর্ব লাগে ওটা করে আমি অব্যাহতি নিই।" 

‘ফিল্মের জায়গা তৈরিই হয়নি’

আফজাল হোসেনকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি নিজেকে 'সিনেমা পাগল' হিসেবে আখ্যা দিলেও বড় পর্দায় তাকে খুব বেশি পায়নি দর্শক। এর কারণ কী?   

উত্তরে তিনি বলেন, "আমি সিনেমা দেখার পাগল। আমি ছোটবেলা থেকে সিনেমার জন্য বহু কিছু করেছি। আমার দেখতে ভালো লাগে সিনেমা। সিনেমায় অভিনয় আমার করবার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু যখন আমি মঞ্চে করছি টেলিভিশনে করছি এবং শ্রদ্ধেয় কাজী জহির যখন আমাকে কমার্শিয়াল ফিল্মের নায়ক বানিয়েছিলেন, তখন আমার মনে হয়েছিল যে একটা জেনারেশনকে উনি হয়ত ফিল্মে আনতে চাচ্ছেন।"   

কম কাজ করার কারণ ব্যাখ্যা করে আফজাল বলেন, কাজে নেমে তিনি বুঝলেন দেশে চলচ্চিত্রের জায়গাটা ‘তৈরি হয়নি’।

“আমাদের যে ভাবনাটা আছে, আমরা যেটা টেলিভিশনে করতে পেরেছি, আমরা যেটা মঞ্চে করতে পেরেছি ফিল্মে সেই জায়গাটা পৌঁছায় নাই। ফিল্মে হয়ত আমার মত বয়সী একজন ছেলে বা একটা মেয়ে অভিনয় করতে যাবে, কিন্তু গল্পটা পুরনো ধাঁচেরই থাকবে। অভিনয়ের ধারাটাও পুরনো ধাঁচেরই থাকবে। তো সেটা অল্পতেই বুঝতে পারার পর আমার মনে হয়েছিল যে এই দিকে বোধহয় সময় নষ্ট না করাই ভালো হবে। আমি ধরে নিয়েছিলাম যে ১৫-২০ বছর এটার কোনো বদল হবে না।" 

ফেইসবুক: 'এটা একটা মেলার মাঠ'   

কিছুদিন আগে ফেইসবুক দেওয়া পোস্টে আফজাল হোসেন লিখেছিলেন, "মন খারাপ হয়। আমাদের মনে যে স্বচ্ছতা ছিল তা হারিয়ে গেছে, এখন কে কোন কথার কী মানে করবে কারো জানা নেই। কথা বলতে হয় হিসেব করে।"

এ কথার সূত্র ধরে সঞ্চালকের প্রশ্ন ছিল সোশাল মিডিয়া কীভাবে দেখেন আফজাল। 

তিনি বলেন, "ফেইসবুকে সক্রিয় আমি বহুকাল ধরেই। ফেইসবুকটা আমার কাছে মনে হয় এটা একটা ওপেন মেলা, মেলার মাঠ। এখানে কেউ বাদাম বিক্রি করতেও আসছে, এখানে কেউ অনেক সুন্দর একটা ছবি এঁকেও বিক্রি করতে আসছে, কেউ ম্যাজিক দেখাতেও আসছে। এবং মেলাটার একটা সুবিধা হচ্ছে এই যে অনেক মানুষের দেখা সাক্ষাৎ হয়। এখন পকেটমার তো তার স্বভাব তো আর বদলাবে না, সে তো মেলায় পকেট কাটতেই আসবে। 

“আবার যে নামাজ পড়ে, সে মেলা দেখতে আসুক, নামাজের সময়টা আসলে এখান থেকে সরে যেয়ে নামাজটা পড়বে। তা আমি বলতে চাচ্ছি কথাটা যে, মেলা বিচিত্র মানুষের। যার যে কাজ সে তো করবে। আমি ছবি আঁকি, তো আমার মনে হয় যে আমি কী ধরনের ছবি আঁকছি সেটা নিয়ে দু'কথা লিখি।”

আফজাল বলেন, "আমি মানুষের সম্পর্ক নিয়ে ভাবি, সেটা নিয়ে যদি আমি দুই কথা লিখি। আমি রাজনীতি কখনো করিনি, কিন্তু রাজনীতি নিয়ে প্রত্যেক মানুষের তো একটা মত আছে। সেই মতটা যদি আমি বলি, তাহলে অসুবিধা তো কিছু নাই। আরেকজন মানুষের যদি আমার কথার সঙ্গে দ্বিমত থাকে, সে তার কথাটা লিখতে পারে। হল কি, একটা সময় দেখা গেল যে এই বিষয়টা তা না। বিষয়টা হচ্ছে আমার কথাটা আরেকজনের ভালো লাগেনি তো এমন একটা হয়তো অমর্যাদাকর অসম্মানকর কথা বলল, সেটা বলার কিন্তু কোনো কারণই নেই।"  

মতপার্থক্য হলেই অসম্মানজনকভাবে আক্রমণ করার প্রবণতা নিয়ে আপত্তি আছে আফজাল হোসেনের। 

তিনি বলেন, "খোঁটা দিল একটা, খোঁটায়ও কোনো অসুবিধা নাই তো। যদি তীক্ষ্ণ কথা বলার যোগ্যতা থাকে বলুক মানুষ। যদি নিজের যুক্তি থাকে সেটাও বলুক মানুষ। কিন্তু এরকম বিষয়টা এরকম না যে গ্রামে যখন আমরা ছোটবেলায় কারোর উপর রাগ করতাম, তো আমরা রাগ কীভাবে দেখাতাম? আমাদের তো ছোটদের তো কোনো ক্ষমতা ছিল না। আমাদের ক্ষমতা ছিল একটাই ঢিল নিয়ে ওর টিনের বাড়ি হলে টিনের বাড়িতে একটা ঢিল দিয়ে দিলাম বড় একটা শব্দ হোক। 

“কিন্তু এখন বড় মানুষগুলো ছোটদের মত আচরণ করে। ওরা ঢিলটাই মারে। তো সেই ঢিল তো এখন একটা নিরাপদ বোধ হয় না। সেই কারণেই বলছি যে লিখেছে ওইটা যে, সেটা বুঝে শুনে লিখতে হয় ভাবতে হয়।" 

'সংগ্রাম না, সময়টা পাশে ছিল’

বিজ্ঞাপন মাধ্যমকে আধুনিকতায় ‘মুড়েছেন’ আফজাল হোসেন, তার এই সাফল্যের নেপথ্য সংগ্রামের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি ‘সংগ্রাম’ হিসেবে দেখতে নারাজ।

এই অভিনেতা বলেন, "সংগ্রাম না। আমি বলি, ওই সময়টা প্রত্যেককে সাহায্য করেছে। প্রত্যেকের পেছনে একটা জোরদার শক্তি হিসেবে কাজ করেছে সময়টা। আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম, একটা ইচ্ছা প্রকাশ করলাম সেটা শুধু নিজের ইচ্ছা-স্বপ্ন হয়ে থাকেনি, চারপাশের মানুষ সাহায্য করেছে এগিয়ে যেতে। এই সময়টার সুবিধা আমরা পেয়েছি।" 

থিয়েটার থেকে বিজ্ঞাপনে আসার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেন, "থিয়েটার করতে এলাম, একটা শখের থিয়েটার করলাম, একজন দামি মানুষ বললেন, রেগুলার থিয়েটার করো। শুরু করলাম, ওই সূত্রে জীবনটা বিবিধভাবে বদলাতে শুরু করল। আমাদের সময়ে অধিকাংশ মানুষ চেয়েছিল অভিনয় ছাড়া আর কিছু করব না, কিন্তু এটা সম্ভব হয়নি। মনে হয়েছিল, কিছু একটা তো থাকতে হবে, তাহলে অভিনয়টা করতে পারব। বড় চাকরি বা বড় ব্যবসা, যা অনেক টাকা এনে দেবে, সেটা করতে পারব না, টাকার জন্য আমি কিছু করতে পারব না। ভেতরের যে চাহিদা, যে তাগিদ, সেটা যেন করতে পারি, এমন কিছু একটা করতে হবে আমাকে।"

আর্ট কলেজের শিক্ষা, স্ক্রিপ্ট লেখার অভ্যাস আর মঞ্চ-অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর কথা ভেবেই বিজ্ঞাপনের দিকে ঝোঁকেন আফজাল। 

"আর্ট কলেজে পড়া শেষ করেছি, ছবি আঁকা সম্পর্কে আমার একটা ধারণা ছিল, আমি স্ক্রিপ্ট লিখি, মঞ্চে কাজ করে একটা অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে আমার মনে হয়েছিল কি যদি আমি বিজ্ঞাপনের কাজ করি তাহলে আমার লেখার শক্তিটাকে কাজে লাগাতে পারব, ডিজাইন করার শক্তিটাকে কাজে লাগাতে পারব। উপস্থাপনার যে বিষয়টা আছে মঞ্চ করতে করতে যেটা হয়েছে সেটাও হয়তো কাজে আসবে এইসব মনে করে আমি চেষ্টা করা শুরু করেছিলাম যে বিজ্ঞাপন করতে পারি কিনা।"

শুধু ধারণা থেকেই বিজ্ঞাপন তৈরি 

পিয়ার্সন্স নামের একটি নতুন কোম্পানি তখন বিজ্ঞাপন বানাতে চাইছিল। কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই সেই কোম্পানির এমডির কাছে যান আফজাল হোসেন।

তিনি বলেন, "আমি বিজ্ঞাপন বানাতে চাই বলে এমডি সাহেবের সামনে গেলাম। উনি তো প্রশ্ন করতে পারতেন, আপনি কে হে, বিজ্ঞাপন কেন বানাতে চান, আপনার অভিজ্ঞতা কী আছে তাহলে ওখানেই ইতি ঘটে যেত। কিন্তু উনি একটা তরুণের কাছ থেকে শুনলেন, আমি কেন, কী করতে চাচ্ছি। উনি জানতে চাইলেন না আমার অভিজ্ঞতা কী, আমার ধারণাটা শুনতে চাইলেন। ধারণাটা পছন্দ করলেন, ভাবলেন না যে ধারণা ভালো কিন্তু বানাবে কীভাবে। এই যে উনি আমাকে এগিয়ে দিলেন, সাহসটা দিলেন।"

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিজ্ঞাপন নিয়ে এগোতে গিয়ে সাহায্য নিতে হয়েছিল ক্যামেরাম্যান আব্দুল লতিফ বাচ্চুর কাছে, যার সঙ্গে আগে একটি সিনেমায় কাজ করেছিলেন তিনি।  

আফজাল হোসেন বলেন, "আমার কোনো ট্রেনিং নেই, শুধু ভেবেছি এভাবে এভাবে হতে পারে। কিন্তু কিছু জ্ঞান তো মানুষের থাকতে হয়। তো ওই যে আমি একটা সিনেমায় অভিনয় করেছিলাম সেই সিনেমার পরিচালক এবং ক্যামেরাম্যান যিনি ছিলেন তিনি দেশের অত্যন্ত বিখ্যাত একজন ক্যামেরাম্যান আব্দুল লতিফ বাচ্চু। আমি ওনাকে গিয়ে বললাম একটা ছবি বানাতে চাই এই আমার স্ক্রিপ্ট। উনি দেখলেন। বললেন, ‘বানায়ে ফেলছো’। আমি বললাম মানে? তিনি বললেন, ‘স্ক্রিপ্ট তো কেউ এরকম ভাবে লেখে না যেভাবে লিখছ ছবি টবি এঁকে টেকে এরকম ভাবে। তো এটা তো শুধু ক্যামেরাম্যান হিসেবে শুট করে দিলেই হয়। হয়ে গেল’।"   

সেই বিজ্ঞাপনটির সাফল্য নিয়ে আফজাল বলেন, "সেটা টেলিভিশনে যারা দেখেছে, কোনো মানুষ ভুলতে পারেনি। মানুষ এত বেশি পছন্দ করেছিল যে তারপর আর আমাকে স্ট্রাগল করতে হয়নি, পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।"

'আড্ডানামায়' নিমা রহমান সত্তর ও আশির দশকের অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে কার অভিনয় সবচেয়ে বেশি পছন্দ ছিল তা জানতে চাইলে আফজাল হোসেন সুনির্দিষ্ট কোনো নাম বলতে রাজি হননি।

তিনি বলেন, "আমি ভেবে দেখেছি, এরকম প্রশ্ন যখন অন্যরা করে, তখন আমার নিজের মনে হয় এটা করা উচিত না। কেন বলি, প্রত্যেক মানুষের কিন্তু একটা নিজস্বতা আছে। আমি যখন একজনকে বলব না, তখন আমার মনে হয় কি যে ওর যে যোগ্যতাটা, সেটাকে আমি অতটা গুরুত্ব দিলাম না। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আলাদা একটা শক্তি আছে।” 

নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যায় আফজাল বলেন, "এর মধ্যে কোনো ছলচাতুরি নেই, আমি প্রত্যেকটা মানুষকে আলাদা করে দেখেছি এবং তাদের শ্রেষ্ঠ বিষয়গুলো ধরার চেষ্টা করেছি যে ও কোন কোন বিষয়ে আমার চেয়ে এগিয়ে। এটা আমি মনে করি যে এটা আমার অনেক হেল্প করেছে। আমার যে দুর্বলতা আছে সেটা আমি জানি। আমার যে দুর্বলতাগুলো আছে সেটা আমি জানি। কিন্তু কোন শক্তিটা আমার নেই, সেটা অন্যের অভিনয় দেখে কিন্তু আমাকে খুঁজে বের করে নিতে হয়েছে।"

নির্মাতারা বর্ষীয়ানদের নিয়ে ভাবছেন? 

বর্তমান নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকরার বয়স্কদের নিয়ে ভাবছেন কি না প্রশ্ন করলে আফজাল হোসেন দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘মোটেও না’।"

আক্ষেপ প্রকাশ করে এই অভিনেতা বলেন, "এদেরকে চরিত্রই মনে করে না, বিবেচনাই করে না। কারণ প্রত্যেকে মনে করে, এই ধরনের বিষয় দেখবে, এই ধরনের বিষয় দেখবে না। অনেক কাল ধরে আমাদের দেশের মানুষের মাথায় এই চিন্তাটা ঢুকেছে।"

সৃজনশীলতা বনাম বাজার দর্শনের পার্থক্য বোঝাতে কালজয়ী কিছু সৃষ্টির উদাহরণ টানেন আফজাল হোসেন।

তিনি বলেন, "ধরা যাক 'সোলস'। সোলস যখন চিটাগাংয়ের কয়েকটা ছেলে, ইয়াং ছেলে, যখন কলেজের করিডোরে দেখেছি এই গানটা লিখছে, ওরা কি ভেবেছে যে এই গানটা লিখলে কিন্তু মানুষ বেশি শুনবে না? গানটা লিখেছে, সুরটা করেছে মানে গানটাই ছিল মনোযোগ, ভাবেনি যে এইটা দেখবে কি শুনবে কি শুনবে না এইটা আগে ভাবেনি।" 

সংগীত ও সাহিত্যের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো কিছু সৃষ্টির আগে নির্মাতা সেটার প্রতিক্রিয়া কি হবে সেটা ভেবে নির্মাণে হাত দেন না। তাহলে সৃজনশীলতা থাকে না।

আফজাল হোসেন কথায়, শিল্পের কাজ হল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা।

"আমি একটা ভালো গান শুনলাম, আমার ভেতরে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হল, আমি ওই গানটা নিয়ে ভাবলাম, আমি কিছু মৌলিক সময় কাটাতে পারলাম, কিছু সুন্দর অনুভব নিয়ে সময় কাটাতে পারলাম। এই জন্যই এটা হয়, তাই না? পৃথিবীর তাবৎ শিল্পকলা শিল্পকর্মের মধ্যে সৃজনশীলতার আগে মানুষকে ভাবতে হয় না যে এভাবে করলে ভালো হবে এভাবে করলে মানুষ দেখবে না।" 

বর্তমানের কনটেন্ট তৈরি নিয়ে তিনি বলেন, "আমাদের এখানে বর্তমানে যেটা হচ্ছে সেটা হল জীবনের চাইতে ভেবে নেওয়া হচ্ছে বিষয় কোনটা মানুষ দেখবে। তার কারণে জীবন সম্পর্কের মানুষ কিন্তু আমাদের এখনকার কন্টেন্টে থাকে না।" 

'অভিনয় করি অভিনেতা হওয়ার জন্য না'

এ পর্যন্ত কয়টি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে জানতে চাইলে আফজাল হোসেন সংক্ষেপে বলেন, ‘পাঁচটা’। 

লেখালেখি পুরোদমে চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে? আফজাল বলেন, তিনি লেখক হতে লেখেন না, অভিনেতা হতেও অভিনয় করেন না। 

“আমি যে কাজই করি, কোন পরিচয়ের জন্য আমি করি না, কোন প্রাপ্তির জন্য আমি করি না। আমি মনে করি যে আমি খুবই সৌভাগ্যবান একজন মানুষ যে আমি এগুলো করতে পারি।"

নিজের পাওয়া ও না পাওয়া নিয়ে তার ভাষ্য, "আর যতটুকু করতে পারি ওটাতে আমি খুশি আর যেটুকু পারি না যেটা সেটা আমাকে অবশ্যই দুঃখ দেয়, কষ্ট দেয়। এবং ওই দুঃখ এবং কষ্টটার দরকার আছে আরো বাড়তি কিছু করার জন্যে। আমি মনে করি যে এক মানুষ একটা জীবন পেয়েছে সেই জীবনটা তার নিজের মত করে উপভোগ করতে পারা উচিত, উপভোগ করার চেষ্টা করা উচিত, আমি সেটাই করি।"

কবিতা 'দুঃস্বপ্ন'

দীর্ঘ আলাপচারিতার শেষে নিমা রহমান বলেন, "আজকের মত বোধহয় এই পর্যন্ত থাকলেই ভালো। অনেক কথা হল, অনেক স্মৃতিরোমন্থন হল। অনেক ভালো লাগলো। অনেক ধন্যবাদ।"

জবাবে আফজাল হোসেন বলেন, "ভালো লাগলো যে ডেকেছো, আর আমার আরও বেশি ভালো লাগলো যে একটা সময়ে তোমার কবিতা আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম, তোমার অভিনয় দেখতাম, আর একটা সময় কোনো কিছুই আর করলে না। আবার যেরকম একটা কাজের মধ্যে এসে ঢুকলে, আর আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল, এটা খুব ভালো লাগল।"

জীবন শুরু হয়েছিল আবৃত্তি দিয়ে—এই কথা মনে করিয়ে নিমা রহমান একটি কবিতা আবৃত্তির অনুরোধ জানান। আফজাল হোসেন বলেন, "আমি ঠিক আবৃত্তি না, আমার সাম্প্রতিক একটা কবিতা এমনি পড়ি, অনুভবটা অন্তত পাওয়া যাবে। কবিতাটার নাম 'দুঃস্বপ্ন'।"

তারপর তিনি পড়ে শোনান– 

কাল সারারাত ঘুম হয়নি একটা মানুষের

মোটেও স্থির থাকেনি তার ঘরের অন্ধকার

মানুষটার কেবলই মনে হচ্ছিল কোথাও বড়সড় একটা গোলমাল হয়ে গেছে

ভুল করে সুটকেস যেমন অদল বদল হয়ে যায়, রাত ছিল তেমনি শীতল, অস্বস্তি, অস্থিরতার

কেবলই মনে হচ্ছিল বালিশটায় অন্যরকম গন্ধ

মনে হচ্ছিল বিছানার চাদর দীর্ঘশ্বাসে অতি মলিন

এত অন্ধকার রাত আগে কখনোই দেখেনি সে

তাই বারবার মনে হতে থাকে, সে ভুল ঘরে শুয়ে

আলো জ্বেলে দেখা গেল ঘরের মতোই ঘর, মশারিটা চার হাতে ধরে আছে চারটা দেয়াল

অন্য কোথাও ঘরের ভেতর মশারির মতো ঘর আছে, অন্য কোথাও পাহাড়েরা পাহাড় হয়েই বেঁচে থাকে

সেখানে সন্দেহ, অবিশ্বাস ইত্যাদির নাম গন্ধ নেই

মানুষেরা সেখানে গাছপাখিদেরও ভাষা বোঝে

এখানে মায়াহীন মানুষেরা ছড়াছুড়ি করে সূর্য-চন্দ্র, এখানেই আলোর মধ্যে ফিসফিস করে অন্ধকার

অবসন্ন চোখ ও মন তাকে নিরন্তর ভাবায়, এটা ভুল বানানের পৃথিবী

মনে হতে থাকে, তার মনে হতেই থাকে, অন্য কোথাও আরেকটা পৃথিবী রয়েছে

সেখানে প্রেম, ধর্ম ও মানুষ সবই আছে, সেইখানেই তার জন্ম হওয়ার কথা ছিল।