Published : 03 Sep 2026, 09:20 PM
তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মঞ্চ, দর্শক, নির্দেশনা ও অভিনয়; ৭৮ বছর বয়সের জীবনে থিয়েটারের সঙ্গেই বসবাস ৬০ বছর।
নাটকের প্রতি তার আগ্রহের শুরু একেবারে শৈশবে। জমিদারবাড়ির পূজামণ্ডপে হ্যাজাক বাতির আলোয় ‘কর্ণার্জুন’ নাটক আর ‘সোহরাব রুস্তম’ যাত্রাপালা দেখে অভিনয় বিষয়টিকে অন্য সবকিছুর থেকে আলাদা ভাবতে শুরু করেন।
কৈশোরে ঢাকা বেতার ও আকাশবাণীর নাটক শোনা, শিশির ভাদুড়ীর অভিনয়ের খবর রাখা আর কলকাতায় বাবার দেখা প্রফেশনাল থিয়েটারের গল্প শুনে নাটকের পোকা পুরোপুরি মাথায় ঢুকে যায়। তরুণ বয়সে অভিনেতা হওয়ার আগেই তিনি হয়ে যান নাট্যকার।
তিনি মামুনুর রশীদ। নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ও সংগঠক–বহু পরিচয় ধারণ করেন তিনি।
গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ ‘আড্ডানামা’য় অতিথি হয়ে এসে বলেছেন নাটকের প্রতি তার ভালোবাসার কথা। বলেছেন একাত্তরের স্মৃতিকথা।
শিল্পচর্চায় জীবিকা সংকট, বয়সের কারণে অবমূল্যায়ন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং বিনোদন জগতের বর্তমান অবক্ষয় নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।
তবে ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আশা হারাননি এই প্রবীণ অভিনেতা। তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন তার শৈশবে দেখা সেই অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের।
আড্ডনামা সঞ্চালনা করেছেন অভিনেত্রী নিমা রহমান। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রচার হয়েছে ‘আড্ডানামা’র পঞ্চম পর্ব। এর আগের চার পর্বে অতিথি হয়েছিলেন অভিনেতা আবুল হায়াত, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, আফজাল হোসেন এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।
'আমি কিশোরী মায়ের সন্তান'
নিজের জন্মের গল্প বলতে গিয়ে মামুনুর রশীদ ফিরে যান চল্লিশের দশকের শেষ দিকে, টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী থানার পাইকড়া গ্রামে, তার নানাবাড়িতে।
তিনি বলেন, "আমার জন্ম আমার মাতুলালয়ে, মামাবাড়িতে। সেই সময়টা, ৪০-এর দশকের শেষের দিকে, ৪৮-এ, তখন একটা রেওয়াজ ছিল যে কোনো মেয়ে গর্ভবতী হলে বাপের বাড়িতে চলে যেত। আমি তো একটা কিশোরী মায়ের সন্তান।”
মায়ের সঙ্গে বয়সের ব্যবধান কত জানতে চাইলে তিনি বলেন, "১৪ বছর, সাড়ে ১৪ বছর। একদম কিশোরী। সেই জন্যই আরো একটু এক্সট্রা কেয়ার নেওয়ার জন্যই সম্ভবত আমার নানাবাড়িতে জন্ম হয়েছিল।"
অভিনেতার বাবার বাড়িও একই জেলার ঘাটাইল থানায়, নানাবাড়ির পাশের থানাতেই।
বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান তিনি।
ছয় ঋতু আর দিগন্ত ছোঁয়া শৈশব
শৈশব কেমন কেটেছে জানতে চাইলে মামুনুর রশীদ বলেন, নিতান্তই গণ্ডগ্রামে, তবে খুব ভালোবাসায় ঘেরা।
"চারিদিকে এত ফসলের মাঠ ছিল, যে ফসলের মাঠগুলো এখন শেষ হয়ে গেছে ঘরবাড়িতে, সেরকম ছিল না। যেদিকে তাকাই দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ তারপর দিগন্ত রেখা এবং এই ছয়টা ঋতুকেই অনুভব করতে পারতাম।"
মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, বাবার সরকারি চাকরির সূত্রে তার প্রথম স্কুল ছিল ময়মনসিংহের ফুলপুরে।
গল্পে কথায় তিনি বলেন, সেই সময় ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদে সেতু ছিল না, পারাপারের বাহন ছিল ফেরি। তার নানাবাড়ি বা দাদাবাড়ি থেকে ফুলপুরে যেতে পথে পড়ত মধুপুরের ভয়ঙ্কর জঙ্গল।
“মধুপুরে এত গাছপালা ছিল, বাঘ, হাতি, ডাকাত ছিল। মাঝে মাঝেই বাসের সামনে হাতি এসে দাঁড়াত। রীতিমতো ভয়, ডাকাতি হয়, বাঘ এসে বসে থাকে। এগুলো আমি স্বচক্ষে দেখেছি।"
এসএসসির পর ১৯৬৩ সালে তার প্রথম ঢাকায় আসা। রাজধানীতে ঢোকার আগে তিনি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, তবে সেখানে পড়া বেশিদূর এগোয়নি। ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েও সেখানকার পড়া শেষ করেননি। তারপর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। সেখান থেকে পাস করার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ পরীক্ষা দেন। বিএ পাসের পর এমএ করেন।
হ্যাজাক বাতির আলোয় দেখা নাটক
অভিনয়ে আসার গল্প বলতে গিয়ে মামুনুর রশীদ ফিরে যান সাত-আট বছর বয়সের স্মৃতিতে।
তিনি বলেন, "প্রথম যে নাটকটা আমি দেখেছিলাম, সেটা ছিল 'কর্ণার্জুন'। আবছা মনে আছে কর্ণার্জুন, কাত্তায়ন এইসব চরিত্রের কথা। তখন তো ইলেকট্রিসিটি ছিল না, হ্যাজাক বাতির আলোতে হত। আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং লাগত, কিছুক্ষণ পরপর হ্যাজাকের দমটা ফুরিয়ে আসছে, একটা লোক একেবারে আবেগহীনভাবে এসে পাম্প দিয়ে যাচ্ছে, আবার আলো হচ্ছে।"
এরপর নয়-দশ বছর বয়সে দেখেন যাত্রা, যা তার মনে গভীর দাগ কাটে।
তিনি বলেন, "এগুলো থেকেই বোধহয় অভিনয়ের প্রতি আমার আগ্রহটা জেগেছে। অনেক যাত্রা দেখেছি, তার মধ্যে আমার দাগ কেটে আছে 'সোহরাব রুস্তম'।"
ঢাকার জীবনে থিয়েটারের খোঁজ করতে শুরু করেন মামুনুর রশীদ। কারণ স্কুলে ওপরের ক্লাসে পড়ার সময় থেকেই আকাশবাণী ও ঢাকা বেতারের নাটক শোনাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কানে আসত কলকাতার থিয়েটার-সংস্কৃতির খবরও।
অভিনেতা হওয়ার আগেই নাটক লেখা
মামুনুর রশীদ বলেন, "ঢাকায় এসে খুঁজতাম যে, এই শহরে কি কলকাতার মত নিয়মিত নাটক হয় না? মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে নাটক হত।"
৪৭ সালের পর ঢাকায় কিছু পেশাদার থিয়েটার দল গড়ে উঠেছিল।
সেই গল্পের ঝাঁপি খুলে তিনি বলেন, "তার মধ্যে একটা হচ্ছে মিনার্ভা থিয়েটার। এটা আসিরউদ্দিন সাহেব করেছিলেন। আনোয়ার হোসেন, আরো যারা তখনকার দিনের অভিনেতা, তারা অভিনয় করতেন এবং কিছু টাকাও পেতেন অভিনয় করে, হয়ত সেটা খুবই সামান্য। কিন্তু আসিরউদ্দিন সাহেব এই দলটাকে ধরে রাখতে পারেননি।"
পলিটেকনিকে পড়ার সময় সেখানকার শিক্ষক রাকিবউদ্দিনের নির্দেশনা মামুনুর রশীদকে প্রভাবিত করে।
তিনি বলেন, "রাকিবউদ্দিন সাহেব সিনেমাও করেছেন, উনি আমাদের শর্মিলী আপার (অভিনেত্রী শর্মিলী আহমেদ) হাজবেন্ড। খুব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডিরেকশন দিতেন।
“নির্দেশনা দিতে বসে উনি বলে যাচ্ছেন, দৃশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন। উনার ওই বলে যাওয়াটা আমার খুব ভালো লাগত। পরে আমি নাটক লেখা শুরু করলাম, সেটা অভিনয়ও হল, বেশ সফলও হল।"
টেলিভিশনে প্রথম নাটক লেখা ১৭ বছর বয়সে
১৯৬৪ সালে দেশে টেলিভিশন আসার সময়টাকে 'উত্তেজনাকর ব্যাপার' বলে বর্ণনা করেন মামুনুর রশীদ।
তিনি বলেন, "আমাদের ডাইনিং হলে একটা টেলিভিশন ছিল পলিটেকনিকে। প্রথম দিন থেকেই টিভিতে নাটক হয়। নাটকটা দেখি, আর ধাঁধার মত লাগে। মনে হয় টেলিভিশনটা একটা সাংঘাতিক উত্তেজনাকর জায়গা।"
সেই টেলিভিশনেই নাটক লেখার ইচ্ছা জাগে তার মনে; বয়স তখন সতের-আঠারো বছরের বেশি নয়।
তিনি বলেন, "লিখেও ফেললাম। আব্দুল্লাহ ইউসুফ ইমাম ছিলেন প্রযোজক। ঢুকে গেলাম টেলিভিশনের মধ্যে। লেখাপড়া গৌণ হয়ে গেল তখন। আর যে ঢুকলাম, আজ অবধি চলছে।"
মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত তিনি কেবল লিখেই গেছেন, অভিনয় করেননি। তার কথায়, মুস্তাফা মনোয়ার ও আব্দুল্লাহ আল মামুনের মত প্রযোজকদের কাছ থেকে পেয়েছেন বড় প্রেরণা; আর সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় মুস্তফা মনোয়ারের সঙ্গে আবার দেখা হলে একটি মঞ্চনাটক লেখার পরিকল্পনা করেন তিনি।
মামুনুর রশীদ বলেন, "লিখতাম সারারাত। সকাল বেলায় শুনে উনি তো বলতেন যে এটা কিছু হয় নাই। আবার লেখো। এইরকম করতে করতে প্রায় তিন মাস চার মাস পরে নাটকটা লেখা শেষ হল। নাম 'পশ্চিমের সিঁড়ি'।”
ওই নাটকটি কলকাতায় মঞ্চস্থ হওয়ার কথা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত হয়নি। বেশ কিছুদিন রিহার্সালও চলে। এরপর দেশ স্বাধীন হলে নাটকটি বাংলাদেশের মাটিতে দেখানো হয়।
মামুনুর রশীদ বলেন, “ওই আমার প্রথম পূর্ণাঙ্গ একটা মঞ্চ নাটক লেখা।"
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো
একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকাতেই ছিলেন মামুনুর রশীদ, আটকা পড়ে গিয়েছিলেন এক বন্ধুর বাসায়। যেখানে চলছিল একটি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ।
তিনি বলেন, "বুঝতে পারছি ট্যাংক যাচ্ছে, ব্যারিকেডগুলো আগেই তুলে ফেলেছে। এভাবে সারারাত চলে গেল, সকাল হল। আমাদের কারোরই খাওয়া-দাওয়া নাই, ক্ষুধাও নাই। বুঝতে পারছি ইকবাল হলে অ্যাটাক হচ্ছে, ইপিআরে অ্যাটাক হচ্ছে, ইউনিভার্সিটিতে অ্যাটাক হচ্ছে, রাজারবাগে অ্যাটাক হচ্ছে।"
ভোরের আজানের সময়ও গোলাগুলি থামেনি। পরদিনও একইভাবে কাটে।
তিনি বলেন, "অনেক দূর বা কাছ থেকে অনেক কান্নার শব্দ পাচ্ছিলাম, হয়ত কোনো মা সন্তান হারিয়েছে, রাস্তায় যারা থাকে তারা। টেলিফোনগুলো সব অকেজো, সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান বক্তৃতা দিল, তার কণ্ঠস্বর এমন, যেন একটা দানব কথা বলছে।"
২৭ মার্চ দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলে বন্ধুর বাসা থেকে বের হন মামুনুর রশীদ। পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা দেখে থমকে যান।
"দিনটি আমার জীবনের একটা বিরাট ভয়ঙ্কর স্মৃতি। কেন জানি মনে হল নিউ মার্কেটের ভেতরে দেখি। গিয়ে দেখছি অনেক মৃতদেহ, যারা কসাই, তাদের হাতে দা ধরা, মরেছে গুলিতে। গরুর রক্ত আর মানুষের রক্ত একাকার।"
পরদিন সকালে জিঞ্জিরা হয়ে শুভড্যা গ্রামে চলে যান মামুনুর রশীদ, পরে বহু জায়গা ঘুরে পৌঁছান টাঙ্গাইলে, যেখানে দেখা হয় কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে। যুদ্ধে যাবেন বলে অস্ত্রও সংগ্রহ করেন।
অস্ত্র সংগ্রহের পর একটা পর্যায়ে মামুনুর রশীদের মনে অন্য একটি ভাবনা উদয় হয়।
তিনি বলেন, “একটা পর্যায়ে মনে হল, এই অস্ত্রের কাজ বোধহয় আমার না। তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে, শুনি, আমি ওখানে যাব।"
এরপর টাঙ্গাইল থেকে আগরতলা হয়ে পায়ে হেঁটে বহু পথ পাড়ি দিয়ে তিনি কলকাতায় পৌঁছান।
“তারপরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সন্ধান পেলাম। বাকি সময়টা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করেছি।"
স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, 'আরণ্যক নাট্যদল'
স্বাধীনতার পর ডিসেম্বরেই দেশে ফেরেন মামুনুর রশীদ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পরিচয় হওয়া অভিনেতা আলী যাকেরের সঙ্গে মিলে তখনই পরিকল্পনা করেছিলেন, দেশে ফিরে নিয়মিত নাটক করতে হবে।
ঢাকায় ফিরে বাদল রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেন মুনীর চৌধুরীর নাটক 'কবর' এর প্রদর্শনী করার। 'আরণ্যক নাট্যদল' প্রতিষ্ঠা হল বাহাত্তরের পহেলা ফেব্রুয়ারি। নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি অভিনয়ও করেন মামুনুর রশীদ।
“২০ তারিখে আমরা নাটক নামালাম, কবর। মুস্তাফা ফকীরের অভিনয় করেছি। আলী যাকের ছিলেন, সুভাষ দত্ত ছিলেন, ইনামুল হক ছিলেন, নাজমুল হুসাইন ছিলেন। কোনো মহিলা নাই, এটা নারী ভূমিকাবর্জিত নাটক।
“এরপরে 'পশ্চিমের সিঁড়ি' করলাম। তারপর তো অনেক নাটক, এখনো করছি।"
'অভিনয়, নির্দেশনা, নাট্যরচনা, সবই উপভোগ করি'
অভিনয়, নাট্যরচনা আর নির্দেশনা এই তিনটির মধ্যে কোনটা করতে বেশি ভালো লাগে জানতে চাইলে মামুনুর রশীদ বলেন, তিনটি কাজেই সৃজনশীলতা খুঁজে পান তিনি।
"সবগুলোই এনজয় করি। নাট্যকার তো একা একা লিখতে হয়, ওইটা একটা প্রেরণা। তারপর মুখ্য হয়ে ওঠে নির্দেশক। তারপর আরো মুখ্য হয়ে ওঠে অভিনেতা, যখন সে মঞ্চে অভিনয় করে, পরিচালককেও দেখা যায় না, নাট্যকারকেও দেখা যায় না, দেখা যায় অভিনেতাকে।
“প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যেই সৃজনশীলতা থাকে, এই কারণেই সবটাই আমার কাছে ভালো লাগে।”
'থিয়েটার থেকে আজও কোনো আয় নেই'
সংগ্রাম আগে বেশি ছিল, নাকি এখন? জানতে চাইলে মামুনুর রশীদ বলেন, তার সবচেয়ে বড় লড়াই হল জীবিকার। যে শিল্প নিয়ে তিনি বেঁচে আছেন, সেখান থেকে অর্থের সংস্থান নেই বলে হতাশ তিনি।
মামুনুর রশীদ বলেন, “থিয়েটার থেকে আমরা কোনো টাকা পাই নাই, এখনো পাই না, ভবিষ্যতেও পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু সেটা একটা হতাশার কথা। বহুবার চেষ্টা করেছি এটা দিয়ে জীবিকার ব্যবস্থা করা যায় কিনা। এটা একটা কঠোর সংগ্রাম।
“আমি একটি শিল্পকে ভালোবাসি, শিল্পের জন্য আমি নিবেদিত, কিন্তু সেখান থেকে আমার কোনো জীবিকার ব্যবস্থা হচ্ছে না। আমাকে কাজ করতে হচ্ছে অন্য জায়গায়, কেউ অফিসে চাকরি করেন, কেউ ব্যবসা করেন। আমি ওইগুলোর কোনোটাতেই সুবিধা করতে পারিনি, যার ফলে সার্বক্ষণিকভাবে এই কাজটাই করতে হচ্ছে।"
এই নির্দেশক-অভিনেতা বলেন, ১৯৯৪ সালে বেসরকারি খাতে টেলিভিশন প্যাকেজ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর নাটকের মানুষদের সার্বক্ষণিক মিডিয়াকর্মী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
“তাতে আমাদের পারিশ্রমিক বাড়ল, আমরা নিজেরা প্রোডাকশন করতে পারলাম, সেগুলো টেলিভিশন স্টেশনে প্রচার হত, কালক্রমে অনেকগুলো টেলিভিশন স্টেশনও হয়ে গেল। ভালো দিক। কিন্তু যেটা হয়েছে, টেলিভিশন স্টেশনগুলো এখন আবার পড়ে গেছে, আবার একটা অবক্ষয়ের পথে গেছে। এখন ওটিটি একটা জায়গা করে নিয়েছে।”
'এখন তো আমাদের মত লোকদের নিতে চায় না'
মামুনুর রশীদ তুলে ধরেন বর্তমান সময়ের নতুন সংকটের কথা। তা হল, বয়স্ক অভিনেতাদের প্রতি নাট্যকারদের অবহেলা।
তার কথায়, "এখন তো আমাদের মত লোকদের নিতেও চায় না। এখন যেসব স্ক্রিপ্ট লেখা হয়, সেখানে বয়স্ক লোকদের চরিত্র থাকে কম। অথচ আমাদের পাশের দেশ পশ্চিমবঙ্গে বা মুম্বাই, এমনকি হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতারা তো আমাদের চেয়ে বয়সে বড়। আল পাচিনো, ডাস্টিন হফম্যান বা রবার্ট ডি নিরো এরা সবাই আমাদের চেয়ে বয়সে বড়, কিন্তু তারা একটা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে, তাদের নিয়ে স্টোরি লেখা হচ্ছে।”
এখানকার পরিস্থিতি ‘অদ্ভুত’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, জীবনের এই দিকটা এখনকার নাট্যকারদের চোখে পড়ে না।
“বয়সের শেষের দিকে অভিনয়ের দিক থেকেও অনেক ধরনের ম্যাচিউরিটি আসে, সেটা দেখতে পায় না। এটা একটা দুর্ভাগ্যের বিষয়। তারপরেও জীবন চলছে।"
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে অভিনয়শিল্পীদের পরিস্থিতির শিকার হওয়ার প্রসঙ্গও তোলেন মামুনুর রশীদ।
তিনি বলেন, "যখনই কোনো সরকারের পরিবর্তন ঘটে, তখনই দেখা যাচ্ছে এক শ্রেণির অভিনেতারা ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে যাচ্ছে, আরেক শ্রেণির অভিনেতারা কাজ করছে। আমরা রাজনৈতিকভাবেও মাঝে মাঝে ভিকটিমাইজ হয়েছি। এরকমভাবে শিল্পীরা পৃথিবীর অন্য কোথাও ভিকটিমাইজ হয় কি না, আমার জানা মতে হয় না। এটা হওয়ার কথা নয়। অভিনয় করে, সে যদি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করে করুক, কী আসে যায়।
“সাম্প্রতিককালে যেটা হয়েছে, সেটা আরো খারাপ। মঞ্চ নাটকের উপরেও আঘাত এসেছে। নাটক বন্ধ করে দিতে হয়েছে, মবের কারণে। আমার উপরে হামলা হয়েছে, আমাকে অভিনয় করতে দেবে না এরকম একটা সিচুয়েশন তৈরি হয়েছিল। যাই হোক, আমি অভিনয় করেছি।"
‘স্বপ্ন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের’
জীবনের এই পর্যায়ে এসে স্বপ্ন কী জানতে চাইলে মামুনুর রশীদ ফিরে যান মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শে।
তিনি বলেন, "আমি যেভাবে বেড়ে উঠেছি ছোটবেলা থেকে, আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কোনো ধর্মীয় বাধা-নিষেধ ছিল না কখনোই, আমরা আমাদের মত করে বেড়ে উঠেছি।
“মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার প্রধান মূল আদর্শই ছিল একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। আমি চাই এই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটা হোক।"
তিনি স্মরণ করেন কবি কুসুমকুমারী দাশের কবিতার পঙক্তি– “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে. কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।”
মামুনুর রশীদ আক্ষেপ করে বলেন, বাংলা ভাষার উঁচু মানের সাহিত্য ও শিল্পের সম্পদ এদেশে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।