Published : 31 Jan 2026, 04:01 PM
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পুরস্কার জিতে নেওয়া ‘সাঁতাও’ সিনেমার পরিচালক খন্দকার সুমন বলেছেন, এই অর্জন কেবল তার একক বা টিমের নয়; এই সাফল্য একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের।
রংপুরের প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামময় জীবন আর অবহেলিত বাস্তবতার গল্পের সিনেমা ‘সাঁতাও’। চার বছর আগে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সিনেমাটি তৈরিতে হাত দিয়েছিলেন সুমন। এরপর নানা ধরনের প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে ২০২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি সিনেমাটি আলোর মুখ দেখে।
সেই সিনেমটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে জায়গা করে নিয়েছে সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক ও সেরা অভিনেত্রী-এই তিন প্রধান শাখায়। এছাড়া শব্দ গ্রাহক শাখায়ও পুরস্কার জিতেছে ‘সাঁতাও’।
‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জয়’
পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি জানিয়ে খন্দকার সুমন গ্লিটজকে বলেন, "এই স্বীকৃতির সবচেয়ে বড় আনন্দ হচ্ছে, একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ জয়ী হয়ে গেল, যেই মানুষগুলোকে সাধারণত সমাজের মূলধারার দৃষ্টিতে তেমনভাবে দেখা হয় না, তাদের জীবনের শ্রম ও কষ্টগুলো আমি পর্দায় বড় করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সেই প্রচেষ্টার মূল্যায়ন হয়েছে। সেই মানুষগুলোর দিকে যদি জাতীয়ভাবে নজর যায় তাহলে সেটাই হবে আমার মূল পুরস্কার।"
এই নির্মাতা বলেন, "যেহেতু চলচ্চিত্রটি পুরস্কৃত হয়েছে এটার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে, আমার বিশ্বাস সেই আগ্রহ থেকে প্রান্তিক মানুষের জীবন ও সমস্যার দিকে বৃহত্তর সমাজের নজর ফেরানো সম্ভব।"
পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে কোনো প্রত্যাশা ছিল না কী না প্রশ্নে কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন এই নির্মাতা।
প্রয়াত নির্মাতা তারেক মাসুদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, "তারেক মাসুদের মত গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা দীর্ঘ সময় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে স্বীকৃতি পাননি, ২০২৩ সালে এসে তিনি পুরস্কার পেয়েছেন। তারেক ভাইয়ের মত নির্মাতা মূল্যায়িত হয় না এই দেশে, আমরা কীভাবে আশা করি আমাদের কাজের মূল্যায়ন করা হবে। সেই বাস্তবতা থেকেই আলাদা কোনো প্রত্যাশা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়নি।"
পুরো টিমের অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন নির্মাতা।
এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্যা, রোদ, খরাসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে রংপুর অঞ্চলে শুটিং হয়েছে সিনেমাটির। ক্যামেরাম্যান থেকে শুরু করে প্রোডাকশন বয়, সবার পরিশ্রমেই চলচ্চিত্রটি পূর্ণতা পেয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
"আমার কলাকুশলীরা যেভাবে শীত বর্ষা গ্রীষ্ম সব কিছুকে উপেক্ষা করে আমার ভাবনাটাকে সিনেমায় রূপান্তর করে দিছে এটার জন্য আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ এবং আমি খুবই আপ্লুত যে তাদের পরিশ্রম বৃথা যায় নাই, সেই কঠিন শ্রমের স্বীকৃতি পেয়েছে, সেটিই যেন বড় তৃপ্তির জায়গা।"
সাঁতাও সিনেমার চিত্রনাট্যে প্রান্তিক মানুষের জীবন ও সংকটের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়েছে। মা হারানো এক গরুর বাছুর আর সন্তানহারা এক নারী পরস্পরের মাঝে খুঁজে নেয় আশ্রয়। মানুষের সঙ্গে প্রাণী-প্রাণ-প্রকৃতির এই সম্পর্কই ‘সাঁতাওকে’ করে তুলেছে আলাদা।
৯৭ মিনিটের এ সিনেমা ২০২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল। আইনুন নাহার পুতুল, ফজলুল হক ও আব্দুল্লাহ আল সেন্টুসহ অনেকে সাঁতাওয়ের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
শিল্পী হিসেবে এই স্বীকৃতি সর্বোচ্চ পাওয়া: অবন্তী সিঁথি
এবারের পুরস্কার তালিকায় সর্বোচ্চ আটটি পুরস্কার পেয়েছে রায়হান রাফীর পরিচালিত চলচ্চিত্র 'সুড়ঙ্গ'। সিনেমার 'এ গাঁ ছুঁয়ে বলো' গানের জন্য সেরা গায়িকা হয়েছেন অবন্তী দেব সিঁথি।
পুরস্কার পাওয়ার খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে অবন্তী সিঁথি বলেন, “খবরটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম, স্বপ্ন নাকি সত্যি সেটা বিশ্বাস করতে সময় লেগেছে। যে কোনো মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একটা কাঙ্ক্ষিত বিষয়। শিল্পী হিসেবে এই স্বীকৃতি সর্বোচ্চ পাওনা। যারা আমাকে এই সম্মাননার যোগ্য মনে করেছেন তাদের কৃতজ্ঞতা।"
বিশেষ মুহূর্তে বাবা-মাকে স্মরণ করে অবন্তী সিঁথি বলেন, “বাবা–মা বেঁচে থাকলে আজকের এই সাফল্যে তারা ভীষণ খুশি হতেন। তাদের মুখে গর্বের হাসি দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই যায়। এই অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি সেই না–থাকার শূন্যতাও গভীরভাবে স্পর্শ করছে আমাকে।"
২০২৩ সালের এই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ২৮টি বিভাগে ৩০ চলচ্চিত্র, শিল্পী ও কলাকুশলী নির্বাচিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ২০২৩ সালের জন্য এই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে।
শাকিব খানের ‘প্রিয়তমা’ চলচ্চিত্র বিভিন্ন শাখায় পাঁচটি পুরস্কার পেয়েছে।
এ বছর যৌথভাবে আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং প্রয়াত চিত্রগ্রাহক ও নির্মাতা আব্দুল লতিফ বাচ্চু।
পুরস্কার পেলেন যারা
>> সেরা অভিনেতা আফরান নিশো; চলচ্চিত্র 'সুড়ঙ্গ'
>> সেরা অভিনেত্রী আইনুন পুতুল; চলচ্চিত্র ‘সাঁতাও’
>> সেরা চলচ্চিত্র ‘সাঁতাও’
>> সেরা পরিচালক কে. এম. হালিমুজ্জামান (খন্দকার সুমন); চলচ্চিত্র ‘সাঁতাও’
>> আজীবন সম্মাননা: প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং প্রয়াত চিত্রগ্রাহক ও নির্মাতা আব্দুল লতিফ বাচ্চু
>> পার্শ্ব চরিত্রে সেরা অভিনেতা মনির আহম্মেদ শাকিল; ‘সুড়ঙ্গ’
>> পার্শ্ব চরিত্রে সেরা অভিনেত্রী নাজিয়া হক অর্ষা; ‘ওরা সাতজন’
>> খলচরিত্রে সেরা অভিনেতা আশীষ খন্দকার; ‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’
>> কৌতুক চরিত্রে সেরা অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম; ‘সুড়ঙ্গ’
>> সেরা শিশুশিল্পী মো. লিয়ন; ‘আম কাঁঠালের ছুটি’
>> শিশু শিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার আরিফ হাসান আনাইরা খান; ‘আম কাঁঠালের ছুটি’
>> সেরা গায়ক বালাম; ‘প্রিয়তমা’ চলচ্চিত্রের প্রিয়তমা গানের জন্য
>> সেরা গায়িকা অবন্তী দেব সিঁথি; 'সুড়ঙ্গ' চলচ্চিত্রের ‘গোটা পৃথিবীতে খুঁজো, এ গাঁ ছুঁয়ে বলো গানের জন্য’
>> সেরা গীতিকার সোমেশ্বর অলি; ‘প্রিয়তমা’ চলচ্চিত্রের ‘ইশ্বর’ গানের জন্য
>> সেরা সুরকার হয়েছেন প্রিন্স মাহমুদ; ‘প্রিয়তমা’ চলচ্চিত্রের ‘ইশ্বর’ গানের জন্য
>> সেরা কাহিনীকার ফারুক হোসেন; ‘প্রিয়তমা’
>> সেরা চিত্রনাট্যকার নিয়ামুল মুক্তা; ‘রক্তজবা”
>> সেরা সংলাপ রচয়িতা (যুগ্মভাবে) রায়হান রাফী ও সৈয়দ নাজিম উদ দৌলা; ‘সুড়ঙ্গ’
>> সেরা সম্পাদক সালাহ উদ্দিন আহমেদ; ‘ওরা সাতজন’
>> সেরা শিল্প নির্দেশক শহীদুল ইসলাম; ‘সুড়ঙ্গ’
>> সেরা চিত্রগ্রাহক সুমন কুমার সরকার; ‘সুড়ঙ্গ’
>> সেরা শব্দগ্রাহক সুজন মাহমুদ; ‘সাঁতাও’
>> সেরা পোশাক ও সাজসজ্জা বীথি আফরীন, ‘সুড়ঙ্গ’
>> সেরা মেকআপম্যান সবুজ; ‘প্রিয়তমা’
>> সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মরিয়ম (নির্মাতা চৈত্রালী সমদ্দার)
>> সেরা প্রামাণ্যচিত্র লীলাবতী নাগ: দ্য রেবেল (নির্মাতা এলিজা বিনতে এলাহী)
>> সেরা নৃত্য পরিচালক হাবিবুর রহমান; চলচ্চিত্র 'লাল শাড়ি'
>> সেরা সংগীত পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী ইমন (ইমন চৌধুরী); চলচ্চিত্র 'অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন'
আরও পড়ুন: