Published : 01 Oct 2025, 01:06 PM
সামগ্রিকভাবে সারাদেশে ভালো সংবাদের তেমন খোঁজ খবর পাওয়া যায় না আজকাল। কিন্তু এরই মধ্যে বাংলা চলচ্চিত্রের ঠিকানা দীর্ঘকালই নির্দিষ্ট ছিল দেশের বাণিজ্যিক প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে, তা এখন ঐ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে তরুণ তরুণীদের মধ্যে অনেকেই এখন শিল্পসম্মত সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে এসেছে। এটাও আনন্দের কথা যে, সরকার এ বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রণোদনা দিচ্ছে। যাকে দেশের সংস্কৃতির জগতে একটু ভালো, একটু অন্যরকম এবং ইতিবাচক উদ্যোগ বলে চিহ্নিত করা যায়। নিকট অতীতে অনেকগুলি বাংলা সিনেমা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত সপ্তাহে বেশ কয়েকটি বাংলা সিনেমা বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছে। তার মধ্যে ‘বাড়ির নাম শাহানা’ সিনেমাটি আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে।
এই সিনেমার বিশেষত্ব হয়ত অনেকে খুব আলাদা করে শনাক্ত করতে পারেননি। কিন্তু যে কাহিনীটা পরিচালক লীসা গাজী আমাদের সামনে হাজির করেছেন তা আমাদের খুবই চেনা বাস্তবতা; আবার এ কথা ভাবতেও প্ররোচিত করে যে, সাধারণ বিষয় নিয়েও চমৎকার শিল্পসম্মত সিনেমাটি তৈরি করা যায়।
‘বাড়ির নাম শাহানা’ সিনেমাটি প্রথম ঢাকায় প্রদর্শিত হয়েছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে, ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। একই সময়ে সিনেমাটির বিশেষ প্রদর্শনী হয় কলকাতায়। তবে মজার বিষয় হল, ঢাকা এবং কলকাতার আগে ২০২৩ সালে এই সিনেমার প্রিমিয়ার হয়েছিল ভারতের মুম্বাই শহরে। এ বিষয়ে আরো কিছু তথ্য উপস্থাপন করতে চাই। এই সিনেমা ইউরোপের নানান শহরে দেখানো হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও এই সিনেমার প্রিমিয়ার প্রদর্শনী হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে এটি প্রদর্শিত হয়েছিল। এছাড়া রাশিয়া, স্পেন, মেক্সিকো, টরেন্টো এবং চীনের শামেন শহরেও এই সিনেমা দেখানো হয়েছে।
ঢাকাতে প্রদর্শনের সময় এই সিনেমা খুব আলোচনায় না এলেও এর কপালে কিন্তু অন্যান্য জায়গা থেকে বেশ ঈর্ষণীয় ফুল চন্দন পড়েছে। ভারতের চলচ্চিত্র সমালোচক সংস্থা এই সিনেমাটিতে ‘জেন্ডার সেনসিটিভি অ্যাওয়ার্ড’ এ ভূষিত করেছে। তাছাড়া ২০২৩ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে এই সিনেমা দর্শক-শ্রোতাদের ভোটে সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে।
সিনেমার পরিচালক লীসা গাজী এবং অধিকাংশ অভিনেতা অভিনেত্রী আমাদের নাটকের জগতের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে আছেন আমিরুল হক চৌধুরী, লুৎফর রহমান জর্জ, কাজী রুমা ও নায়লা আজাদ নূপুর।
সাধারণ চোখে এই সিনেমার কাহিনীর মধ্যে খুব উঁচু স্বরে কোন বক্তব্যের খোঁজ পাওয়া যাবে না। কিন্তু যথেষ্ট মনোযোগ প্রদান করলেই বোঝা যাবে এর অন্তর্গত গভীর বার্তা। এই সিনেমার প্রধান চরিত্র দীপা (আনান সিদ্দিকা)। নামেই বোঝা যায় সে এক নারী। সমাজ-অর্থনৈতিক বিচারে দীপা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারভুক্ত। সংসারে তেমন অভাব নেই, আবার খুব সচ্ছলতাও নেই। তার বাবা আয়যোগ্য কোন চাকরি বা ব্যবসায় নিয়োজিত নন। তার ভাই কোন এক অজানা কারণে পরিবার থেকে হারিয়ে গেছে। এ ঘটনাও এই সিনেমার উপজীব্য নয়। দীপার মামা যিনি সমাজে কিছুটা প্রতিষ্ঠিত এবং খুব বিত্তবান না হলেও তার যেটুকু সম্পদ আছে তার দ্বারাই তিনি দীপাদের পরিবারের প্রধান অভিভাবকের স্থান দখল করে আছেন। তিনিই এই পরিবারের খানদানির প্রধান প্রতিনিধি। সাধারণ অর্থে ভালো মানুষ, সংসারের ভালো-মন্দ তিনি চান এবং নিয়ন্ত্রণও করেন। যেমনটি আমাদের সমাজে মাঝে মাঝে ঘটে থাকে, তারই অনুসৃতিতে মামা (আমিরুল হক চৌধুরী) ভাগ্নি দীপার জন্য লন্ডনবাসী এক পাত্র নির্বাচন করেন।
সাধারণ বিচারে এই পাত্রকে আমরা খুব নিন্দামন্দ করতে পারব না। স্বামী হিসেবে তার প্রধান চাওয়া হলো তার স্ত্রী ইসলাম ধর্মীয় যাবতীয় আচার-আচরণ যথাযথ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবেন। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে স্বামী বা পুরুষের কর্তৃত্ববাদ। দীপার জন্য যা খুবই দুর্বহ। প্রবাসেও বাংলাদেশের মানুষ কিভাবে ধর্মীয় মূল্যবাদের দিকে ঝুঁকছে সে বিষয়ে পরিচালক বোধ করি একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন। দীপা যখন আর স্বামীর চাপিয়ে দেয়া দুঃসহ রক্ষণশীলতা মানতে কোনভাবেই পারছে না, তখন অন্য এক প্রবাসী বাঙালি নারীর সহায়তায় সে দেশে ফিরে আসে।
এরপর গল্পটা যেমন হবার তেমনি হয়েছে। বাবা মা এবং তাদের পারিবারিক কর্তৃত্ববাদের প্রতিনিধি মামা কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছেন না। ফলত, দীপার জন্য জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই কাহিনীতে নারীর উপর সামাজিক চাপ প্রদর্শনের পরেও তার শক্তিটাকেও দেখাতে চেয়েছেন পরিচালক । আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা যে, এমন নারীর উপর অলৌকিক কোন শক্তি ভর করতে পারে এবং সেজন্য গ্রাম্য ওঝাকে ডেকে আনা হয়। ওঝার (জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে আসে আরেকটি নারী শিশু। তার নাম পরী (মুগ্ধতা মোর্শেদ ঋদ্ধি)। দীপা তার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারে যে এই শিশুটিকেও সামাজিক নির্যাতনের উপাদান বানানো হয়েছে। সে তখন এই শিশুটির উপর নির্যাতনের প্রবল প্রতিবাদ করে, টাকা দিয়ে ওঝাকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করে এবং শিশুটিকে তার নিজের গ্রামে ফিরিয়ে দিয়ে আসার সব ব্যবস্থা করে।
এই পর্যালোচনায় সবটা কাহিনী নিয়ে বলার অবকাশ নেই। তবু দীপা জীবনের নানান বাধা পেরিয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা দেয় এবং তা পাস করার পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেয় । দীপার এই সাফল্য তখন তার সমগ্র পরিবার উপভোগ করে। সরকারি ডাক্তার হওয়ার সম্মানের জন্য দীপাকে যে পরিবারের বাইরে গিয়ে থাকতে হবে সে বিষয়েও কেউ আর প্রশ্ন তোলে না। নিজের একা থাকার এই স্বাধীনতাকে আরো অর্থবহ করে তোলবার জন্য দীপা পরীকে তার নিজের কাছে নিয়ে আসে। কাহিনীর এই সম্প্রসারণের ফলে পরীর মত অবহেলিত এক কন্যা শিশুকে দারিদ্র ও নির্যাতন থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে আমরা সমাজটাকে আরো গভীরভাবে পড়ে নিতে পারি এবং এর মাধ্যমে দীপার চরিত্র আরো অর্থবহ হয়ে ওঠে। এই কাহিনীতে এক হিন্দু সম্প্রদায়ের যুবককে (ইরেশ যাকের) দেখতে পাই, যে কম বয়সেই তার স্ত্রীকে হারিয়েছে। দীপার মা বারবার এই যুবকের দুর্ভাগ্যের কথা উল্লেখ করেন। আমার মনে হয়েছে, পরিচালক এর মাধ্যমে আমাদের সমাজে এখনও যে সামান্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অবশিষ্ট আছে, তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
বাড়ির নাম শাহানা সিনেমার প্রায় সব চরিত্রের অভিনেতা অভিনেত্রীদের দক্ষতার প্রশংসা করতেই হবে। দীপার চরিত্রে আনান সিদ্দিকা অসাধারণ অভিনয় করেছেন। বাড়ির কাজের সহায়ক জুলেখার চরিত্রে কামরুন নাহার মুন্নি অভিনয়ের জন্য তার কাছ থেকে প্রাপ্য সব দাবি মিটিয়েছেন। সকলের অভিনয়ের মধ্যেই মুন্সিয়ানার ছাপ আছে কিন্তু অভিনয় ছাপিয়ে আমাকে যা মুগ্ধ করেছে তা হল, এই ছায়াছবি নির্মাণে চমৎকার শিল্পঋদ্ধ পরিমিতিবোধ। উল্লেখ করতে চাই, মূল কাহিনীর রচয়িতা লীসা গাজী, কিন্তু ছবির জন্য যৌথভাবে চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন লীসা গাজী এবং আনন সিদ্দিকা।
লিসা গাজী এদেশে নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে লন্ডন শহরে নিজ এলাকার নাট্য সংগঠনেও তিনি বেশ সক্রিয়। তার লেখা রৌরব নামে একটি অসাধারণ উপন্যাস আছে, যার কাহিনীতেও প্রতিফলিত হয়েছে এই সমাজে নারীদের অসহায় বন্দিত্ব। এই উপন্যাসটি ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাড়ির নাম শাহানা ছবিতে পরিচালক এই সমাজে নারীর অবস্থান যে শুধু ভঙ্গুর তা দেখাতে চাননি, নারীর শক্তিমত্তা ও সাফল্যও দেখাতে চেয়েছেন।
এই ছবির আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল,এই সমকালে যখন অভিবাসীদের সমস্যা নিয়ে Diaspora নামের discourse সারা পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে, তার উপাদানও চমৎকারভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও বাড়ির নাম শাহানা সিনেমার এক ব্যতিক্রমী চরিত্র আছে। যা শুধু অভিবাসনের সমস্যাকেই চিহ্নিত করে না। অভিবাসীরা মিলিতভাবে কাজ করতে পারে তার এক চমৎকার নিদর্শন এই ছবির নির্মিতির মধ্যে লক্ষ করা যায়। এই বিষয়টা অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই দর্শকদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। লীসা গাজী এ কারণেও আমাদের হাততালি দাবি করতে পারেন। ছবিতে প্রচলিত অর্থে কোন গান নেই। অবশ্য আমার মনে হয়েছে, ছবির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একটি বা দুটি লোকগীতি বা রবীন্দ্রসঙ্গীতের অংশ ব্যবহার করা যেত। কিন্তু সঙ্গীতের পরিমিত ও সুসংহত ব্যবহার এই ছবির এক বড় অলংকার। এই ছবির সংগীত পরিচালনায় আছেন একজন বাঙালি নারী--সোহিনী আলম এবং একজন ব্রিটিশ পুরুষ অলিভার উইক্স। সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্ব পালন করেছেন যোবায়ের মুসাভভির, যিনি নিজেও একজন অভিবাসী। গুপী বাঘা প্রোডাকশনস ও কমলা কালেক্টিভ নামে একটি শিল্প সংগঠন ছবিটির প্রযোজক। ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক হলেন ফয়সাল গাজী। শব্দ নিয়ন্ত্রণ বা প্রক্ষেপণের দায়িত্ব পালন করেছেন নাহিদ মাসুদ এবং Steve Cummings। এই তথ্যগুলিকে বিবেচনায় নিলে Diaspora বিষয়ে এই ছবির মধ্যে Diaspora-র এক ধরনের নতুন সংজ্ঞা আমরা আবিষ্কার করতে পারি।
এমন সব বৈশিষ্ট্য বাড়ির নাম শাহানা সিনেমাটিতে অনন্যতা দান করেছে। যে বাড়িতে দীপা বাবা-মাসহ বাস করত বা এখনো করে তার স্বত্ব যে তাদেরই এবং তার মামার নয়, এই সত্যটা কাহিনীর সমাপন ঘটায়। এতে বাড়তি মাত্রা কতটুকু যুক্ত হয় সে বিষয়টি কিন্তু অত গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। কারণ পরিচালক ইতোমধ্যেই সংগ্রাম করতে অক্লান্ত দীপাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে নারীর শক্তি ও তার ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতে পারে এমন একটা বার্তা প্রদান করেছেন। এই সিনেমার যে পোস্টার প্রকাশ্যে দেখা গেছে, সেটিকে সবটা কাহিনী বোঝানোর জন্য আরেকটু অর্থবহ করা সম্ভব ছিল বলে আমি মনে করি। এই সিনেমাটি ঢাকায় আরো অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা দাবি করে। আশা করি, পরবর্তী সময়ে সিনেমাটি যদি পুনরায় প্রদর্শিত হয় তখন হয়তো এর কপালে বাড়তি অভিনন্দন জুটতে পারে।
শফি আহমেদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য এবং থিয়েটার স্টাডিজের অধ্যাপক। শিক্ষকতা করছেন চার দশক ধরে। নাটকের ক্ষেত্রে শেকসপিয়ার এবং আধুনিক ইউরোপিয়ান থিয়েটার বিষয়ে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ।