Published : 23 Jan 2026, 12:50 PM
বাংলা চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায় নায়করাজ রাজ্জাকের যে গানগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল, সেগুলোর বড় একটি অংশের কণ্ঠশিল্পী খুরশীদ আলম।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে রাজ্জাকের জন্য গাওয়া বহু গানের কথা স্মরণ করে এই শিল্পী বলেন, প্রয়াত নায়কের ঠোঁটে যদি ১০০টি গান থাকত, তার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল তার গাওয়া।
শুক্রবার নায়করাজ রাজ্জাকের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী। দিনটি ঘিরে করে রাজ্জাকের সঙ্গে নিজের স্মৃতি, সিনেমার গানের নেপথ্যের গল্প এবং সেই সময়ের চলচ্চিত্র জগতের নানা অভিজ্ঞতার কথা গ্লিটজের সঙ্গে আলাপচারিতায় তুলে ধরেছেন খুরশীদ আলম।
খুরশীদ আলম বলেন, "রাজ্জাক সাহেব প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারি নিজের জন্মদিন বড় উৎসবের মত করে পালন করতেন। চলচ্চিত্র অঙ্গনের নায়ক-নায়িকা, পরিচালক, সংগীত পরিচালক সবাই থাকতেন সেই আয়োজনে।
“আমি বহুবার গিয়েছি। রাত ১২টা, কখনো ১টা পর্যন্ত চলত আয়োজন। তিনি মানুষকে নিয়ে আনন্দ করতে ভালোবাসতেন, পার্টি দিতে ভালোবাসতেন।”
কেবল জন্মদিনই নয়, কোনো সিনেমা টানা ৫০ সপ্তাহ বা ৭৫ সপ্তাহ চললে সেটিকেও রাজ্জাক উৎসবের উপলক্ষ বানাতেন।

খুরশীদ আলমের কথায়, “রাজ্জাক ভাই যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন এই উৎসব চলেছে। এমন উৎসব করার মানসিকতা সব নায়কের মধ্যে ছিল না।”
পর্দায় রাজ্জাকের গাওয়া খুরশীদ আলমের প্রথম গান ছিল ‘বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’। ১৯৬৯ সালে প্রথম চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার সুযোগ পান খুরশীদ আলম। সিনেমার নাম ছিল ‘আগন্তুক’। এই গানটি দিয়েই যেন ডানা মেলেছিলেন এই শিল্পী। ক্যারিয়ারে আর ঘুরে তাকাতে হয়নি খুরশীদ আলমকে।
সিনেমার এই গানের পেছনের গল্পও শুনিয়েছেন খুরশীদ আলম।
তিনি বলেন, "‘আগন্তুক’ সিনেমার সংগীত পরিচালক ছিলেন আজাদ রহমান। সিনেমার একটি গান ‘দেখ ভেবে তুই মন, আপন চেয়ে পর ভালো’ এ কোরাস করার জন্য ডাক পাই আমি। এই গানের প্রধান শিল্পী ছিলেন নজরুলসংগীতের খ্যাতিমান শিল্পী সোহরাব হোসেন। খুরশীদ আলমের সঙ্গে কোরাসে ছিলেন শ্রীপুরের পল্লীগীতির শিল্পী আব্দুর রব এবং মিয়া মহম্মদ বদরুদ্দিন।
“এই গানের রেকর্ডিংয়ের সময় আজাদ রহমান খুরশীদ আলমকে দিয়ে সিনেমার আরেকটি গান গাওয়ানোর কথা ভাবেন। সেই গানটিই ছিল ‘বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’।”
গানটির কথা লিখেছিলেন খুরশীদ আলমের চাচা আবু হায়দার এবং সুর করেছিলেন আজাদ রহমান।
খুরশীদ আলম বলেন, "আজাদ রহমান প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে গানটি শিখিয়েছেন। এরপর বলেছিলেন, 'সিনেমার জন্য তাকেই এই গানটি গাইতে হবে'।"
এই গায়ক বলেন, বাবুল চৌধুরীর পরিচালনায় ‘আগন্তুক’ সিনেমায় এই গানটি নায়করাজ রাজ্জাকের ঠোঁটে ফুটে উঠবে এ কথা জেনে রেকর্ডিংয়ে গেলেন তিনি, কিন্তু সিনেমার প্রযোজক তাকে দেখে আজাদ রহমানকে বলেন, ‘আজাদ, শিল্পী বদলাও’।

সে সময় খুরশীদ আলম ছিলেন ইন্টারমিডিয়েট পাস করা একজন তরুণ। বেতারে তিনি তখনো সি-গ্রেডের শিল্পী। অন্যদিকে আজাদ রহমান কলকাতা থেকে আসা একজন প্রতিষ্ঠিত সংগীত পরিচালক। ঢাকায় আসার আগেই তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং কলকাতায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত শিল্পীদের দিয়ে গান করিয়েছিলেন।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে খুরশীদ আলম বলেন, "সেই পরিস্থিতিতে আজাদ রহমান প্রযোজককে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমি গলা চিনতে ভুল করি না। এই শিল্পী যদি এই গান না গায়, তাহলে আমি আপনার সিনেমায় সুরকার হিসেবেই থাকব না’।”
তখন প্রযোজক শর্ত দেন গানটি যদি সিনেমায় হিট হয়, তবেই খুরশীদ আলম পারিশ্রমিক পাবেন।
খুরশীদ আলম বলেন, "গানের রেকর্ডিংয়ের সময় রাজ্জাক সাহেব সবসময় উপস্থিত থাকতেন। গানটি কীভাবে গাওয়া হচ্ছে, তিনি মনোযোগ দিয়ে দেখতেন, যাতে পর্দায় সঠিক অভিব্যক্তি দিতে পারেন।"
প্রযোজকের এই আচরণ দেখার পর রাজ্জাক নিজ উদ্যোগে খুরশীদ আলমকে বাসায় নিয়ে যান। খুরশীদ আলম পরপর তিন দিন রাজ্জাকের বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানে রাজ্জাক তার স্ত্রী, ছেলে, ড্রাইভার, বাবুর্চি ও নিরাপত্তারক্ষীর সঙ্গে খুরশীদ আলমের পরিচয় করিয়ে দেন।
"রাজ্জাক সাহেব সেসময় নিজের কথা বলা, হাসি, রাগ সবকিছু বুঝিয়ে দেন, যাতে গানটি তার ঠোঁটে সঠিকভাবে মেলানো যায়। পরে আরও দুই দিন উনার সঙ্গে বাসায় গিয়েছিলাম, উনাকে বোঝার জন্য। রাজ্জাক তখন আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “খুরশীদ সাহেব, চিন্তা করবেন না। এমনটা হয়। আপনি খুব ভালো করবেন গানে।”
পরবর্তীতে গানটি রেকর্ড হয়। সিনেমা মুক্তির পর ‘বন্দী পাখির মত মনটা কেঁদে মরে’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
১৯৭৩ সালের ‘প্রিয়তমা’ সিনেমায় রাজ্জাকের ঠোঁটে খুরশীদ আলমের গাওয়া ‘আমার এই কলজেটায় চাক্কু মেরে’ গানটি এবং অন্যান্য গান তাদের জুটিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। রাজ্জাক পরিচালিত ‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমার ‘ও চোখে চোখে পড়েছে যখনই’, ‘ও দুটি নয়নে’সহ খুরশীদ আলমের গাওয়া বহু গান দর্শকের পছন্দের তালিকায় ছিল।

তিনি হয়ে উঠলেন ‘স্ক্রিন আইডল’
রাজ্জাক রূপালি পর্দায় নিজেকে দিয়েছিলেন উজাড় করে। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোতে কলকাতার সিনেমা মুক্তি পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। উত্তম-সুচিত্রা আর সৌমিত্রে বুঁদ হয়ে থাকা পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত বিকল্প হিসেবে খুঁজে পায় রাজ্জাকে।
তিনি হয়ে উঠলেন ঢাকাই সিনেমার ‘স্ক্রিন আইডল’। কলকাতার বচন আর বাচন নিয়ে ঢাকাই সিনেপাড়ায় একাধারে শাসন করলেন দুই দশক; নায়ক হিসেবে।
রাজ্জাকের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়, ১৯৪২ সালে; তার পারিবারিক বাসস্থান ছিল টালিগঞ্জের নাকতলায়।
সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সরস্বতী পূজা উপলক্ষে স্কুলের নাটকে প্রথম অভিনয় রাজ্জাকের। এরপর কলেজে পড়ার সময় তিনি ‘রতন লাল বাঙালি’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন।
পাঁচশ চলচ্চিত্রের অভিনেতা রাজ্জাকের অভিনয়জীবন শুরুতে মোটেও মসৃণ ছিল না। তীব্র জীবন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।
নায়ক হওয়ার লক্ষ্যে ১৯৬১ সালে মুম্বাই গিয়ে সিনেমা বিষয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। মুম্বাই থেকে ফিরে তিনি কলকাতার ‘পংকতিলক’ ও ‘শিলালিপি’ নামে দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত নায়কদের দাপটে ছিলেন একবারেই মলিন।
এ অবস্থার মধ্যেই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার ভেতর ১৯৬৪ সালে ঢাকায় চলে আসেন রাজ্জাক। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র জগৎ তখন বিকশিত হচ্ছে। রাজ্জাক ভাবলেন, টালিগঞ্জের চেয়ে ঢাকায় সুযোগের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
অবশ্য ঢাকাতেও তাকে প্রচুর সংগ্রাম করতে হয়েছে। তখন তিনি বিবাহিত। আর্থিক সঙ্কট যেমন ছিল, তেমনি ছিল প্রতিষ্ঠার পথে নানা বাধা।
এক সাক্ষাৎকারে রাজ্জাক বলেছিলেন, “আমি আমার জীবনের অতীত ভুলি না। আমি এই শহরে রিফিউজি হয়ে এসেছি। স্ট্রাগল করেছি, না খেয়ে থেকেছি। যার জন্য পয়সার প্রতি আমার লোভ কোনোদিন আসেনি।”
১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে সেখানে অভিনয়ের সুযোগ নেন রাজ্জাক। তখন ধারাবাহিক নাটক ‘ঘরোয়া’য় অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় করা। আবদুল জব্বার খানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান তিনি, তবে নায়ক হিসেবে নয়। সহকারী পরিচালক হিসেবে।
এর মধ্যেই ‘তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি ভূমিকায় অভিনয় করেন রাজ্জাক। এরপর ‘ডাকবাবু’, উর্দু ছবি ‘আখেরি স্টেশন’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রেও তাকে দেখা যায়।
এক সময় নির্মাতা জহির রায়হানের নজরে পড়েন রাজ্জাক। তিনি ‘বেহুলা’য় লখিন্দরের ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ দেন রাজ্জাককে; সুচন্দার বিপরীতে। ‘বেহুলা’ ব্যবসাসফল হওয়ায় আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি রাজ্জাককে।
তার অভিনীত জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি বাংলা চলচ্চিত্রের একটি মাইলফলক।
সুদর্শন রাজ্জাক সুচন্দার পর শবনম, কবরী, ববিতা, শাবানাসহ তখনকার প্রায় সব অভিনেত্রীকে নিয়ে একের পর এক ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র দেন ঢালিউডকে।
সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলা সিনেমায় আবির্ভাব ঘটে রাজ্জাক-কবরী জুটির। একের পর এক সিনেমাতে অভিনয় করেছেন তারা। ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘ঢেউ এর পরে ঢেউ’ এবং স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’সহ বিভিন্ন সফল সিনেমা উপহার দেন এই জুটি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে রাজ্জাক অনেকদিন ছিলেন এক নম্বর হিরো। তিনশ সিনেমা তিনি করেছেন। প্রযোজনা করেছেন কিছু ব্যবসা সফল সিনেমা।
রাজ্জাক সবচেয়ে বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন শাবানার বিপরীতে। ১৯৭০ সালে ‘মধুমিলন’ সিনেমা দিয়ে রুপালি পর্দায় জুটি বাঁধেন তারা। তারপর ‘অবুঝ মন’, ‘সাধু শয়তান’, ‘মাটির ঘর’, ‘দুই পয়সার আলতা’সহ অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছেন তারা।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন রাজ্জাক। এর মধ্যে আছে স্বাধীনতা পদক (২০১৫), পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা অভিনেতা)।
২০১৭ সালের ২১ অগাস্ট নায়করাজ চলে যান না ফেরার দেশে। বনানী করস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।