Published : 04 Aug 2026, 12:22 AM
বলিউড সিনেমার ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ খ্যাত নায়িকা মীনা কুমারীর সঙ্গে কবি-গীতিকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক গুলজারের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা এবং নিখাদ বন্ধুত্বের।
সেই বন্ধন এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা হয়ে উঠেছিল সম্পর্কের বড় পরিচয়।
মীনা কুমারীর মার্জিত ব্যবহার, উর্দু ভাষার ওপর অসাধারণ দখল এবং ব্যক্তিত্ব গুলজারকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। পরে একাধিক সিনেমায়তে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাদের বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হয়।
একবার অসুস্থতার সময় রোজা রাখা সম্ভব হচ্ছিল না মীনা কুমারীর। তখন গুলজার বলেছিলেন, তিনি মীনা কুমারীর হয়ে রোজা রাখতে চান।
বাবা-মায়ের দেয়া নাম মেহজাবিন বানু হলেও পর্দায় মীনা কুমারী নামেই সুপরিচিত ছিলেন ভারতীয় এই অভিনেত্রী। ১৯৩৯ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে রূপালি দুনিয়ায় পা রাখেন মীনা কুমারী। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন থিয়েটার কর্মী। তাই ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে পরিচিত হন মেহজাবিন।
গেল শনিবার ছিল মীনা কুমারীর জন্মবার্ষিকী। সে উপলক্ষ্যে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গুলজার ও মীনা কুমারীর বন্ধুত্বের এক অনন্য দিক তুলে ধরেছে।
এই সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ঘটনাটি ঘটে ১৯৭১ সালে। গুলজার যখন তার প্রথম পরিচালিত সিনেমা ‘মেরে আপনে’ তৈরি করছিলেন। তখন মীনা কুমারীর বয়স ত্রিশের মাঝামাঝি।
দীর্ঘদিনের মদ্যপানের কারণে অভিনেত্রী লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হলেও অভিনয়ের প্রতি তার নিষ্ঠার বিন্দুমাত্র ঘাটতি পড়েনি বলে ভাষ্য গুলজারের।
গুলজার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “শুটিংয়ের আগে আমি তার পাশে বসে দৃশ্য পড়ে শোনাতাম। তিনি চোখ বন্ধ করে মন দিয়ে শুনতেন চিত্রনাট্য। মনে হত, সংলাপ নয়, পুরো চরিত্রটাকেই নিজের মধ্যে ধারণ করছেন।”
ক্রমশ অসুস্থতা বাড়তে থাকায় রমজান মাসে রোজা রাখা মীনা কুমারীর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। নিয়মিত ওষুধ খেতে হত। কিন্তু মীনা রোজা ভাঙতে রাজি ছিলেন না।
তখন গুলজার তাকে বুঝিয়ে বলেন, “আপনি ওষুধ খান, আমি আপনার হয়ে রোজা রাখব। এই সওয়াব আমরা দুজনে ভাগ করে নেব।”
বন্ধুর জন্য দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মীনা কুমারীর মৃত্যুর পরও বহু বছর ধরে গুলজার রমজানে রোজা রেখেছেন, কেবল সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য।
১৯৭২ সালে মীনা কুমারীর মৃত্যুর আগে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদও গুলজারের হাতে তুলে দিয়ে যান।
নিজের ব্যক্তিগত ডায়েরি, কবিতা এবং অপ্রকাশিত লেখাগুলির দায়িত্ব তিনি দিয়ে যান প্রিয় বন্ধুকে।
বলিউড সিনেমার ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ খ্যাত নায়িকা মীনা কুমারী উর্দুতে কবিতা লিখতেন। সেই লেখালেখিতে তিনি ব্যবহার করেছেন ছদ্মনাম ‘নাজ’। তার লেখায় ফুটে উঠত এক কবির হৃদয়ের গভীর অনুভূতি। যে অনুভূতিতে খেলা করত আকুলতা, বিষন্নতা এবং প্রেম ও একাকীত্ব।
মীনা কুমারীর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে একাকিত্ব আর অপূর্ণ ভালোবাসার কথা। কোনো একটি কবিতায় একটি পংক্তি ছিল এমন, “জীবন কেবল ভালোবাসা দিয়ে চলে না।“
মীনা কুমারীর কবিতাকে ধরা হয় দিনপঞ্জির পাতার মত, যেন এক অকপট স্বীকারোক্তি।
অনেকেই মনে করতেন, তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে হয়ত জীবনের নানা বিতর্কিত ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
তবে গুলজার সেই ধারণা নস্যাৎ করে জানিয়েছিলেন, সেখানে কোনো চাঞ্চল্যকর তথ্য নেই। বরং রয়েছে এক সংবেদনশীল মানুষের গভীর অনুভূতি, নিঃসঙ্গতা এবং জীবনকে দেখার এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি।
গুলজার বলেন, “একদিন আমি তার লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশ করতে চাই। সেখানে মীনা কুমারীর মন, চিন্তা আর অনুভূতির সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করবে মানুষ।”
মীনার জীবন কেমন ছিল
দারিদ্র্য ও সংগ্রামময় জীবনে ছোটবেলা বলে কিছু ছিল না মীনার জীবনে। বুদ্ধি হবার আগ থেকেই শিখেছেন ক্যামেরার সামনে নিজেকে মেলে ধরতে। ১৯৪৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রধান অভিনেত্রী হিসেবে অভিনয় করেন ‘বাচ্চো কি খেল’ সিনেমায়। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে হাতে নেন একের পর এক সিনেমা।
কেবল সুর্দশনাই নয়, অভিনেত্রী হিসেবেও মীনা ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দী। ১৯৫৪ সালে ‘বাইজু বাউরা’ সিনেমার জন্য প্রথম অভিনেত্রী হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জেতেন তিনি। পরের বছর ‘পরিনীতা’র জন্য আবারও পুরস্কৃত হন তিনি। তবে ১৯৬৩ সালে ‘সাহেব বিবি অউর গোলাম’ সিনেমার জন্য সব বিভাগে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে রেকর্ড গড়েন তিনি!
সমাজ ও পুরুষতন্ত্রের যাতাকলে পিষ্ট অত্যাচারিত নারীর চরিত্রে বেশি অভিনয় করতে দেখা গেছে এ অভিনেত্রীকে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের আদর্শ ভারতীয় নারীর প্রতিরূপ হিসেবেই পর্দায় উপস্থাপিত হয়েছেন তিনি। তবে আদর্শ গৃহবধূ ও প্রেমিকা চরিত্রের বাইরে ‘মিস ম্যারি’ (১৯৫৭), ‘শরারত’ (১৯৫৯) ও ‘কোহিনূর’ (১৯৬০)-এর মতো বেশ কিছু কমেডি সিনেমায় স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।
মীনা কুমারী একজন প্লেব্যাক গায়িকা ও পোশাক শিল্পীও ছিলেন।
রূপালি পর্দায় সাফল্যের শীর্ষে থাকলেও বাস্তব জীবন মোটেও সুখকর ছিলো না মীনা কুমারীর। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে ছিলো বনিবনার অভাব। ১৯৫২ সালে খ্যাতিমান পরিচালক কামাল অমরোহির সঙ্গে বিয়ে হলেও তাদের দাম্পত্য জীবন ছিলো সংঘাতপূর্ণ। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই সিনেমায় কাজ করা নিয়ে স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্য ঘটে তার। ফলে বিয়ের অল্পদিনের মাথায় স্বামী-সংসার ছেড়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন তিনি।
ব্যক্তিজীবনে হতাশা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও অত্যধিক মদ্যপান অল্প বয়সেই তার জীবনে বয়ে আনে লিভার সিরোসিসের মতো জটিল রোগ। ১৯৭২ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়েসে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান হিন্দি সিনেজগতের অন্যতম প্রতিভাবান এ নক্ষত্র।
মীনা কুমারীর এ করুণ পরিণতির সঙ্গে তুলনা করা হয় হলিউড অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোকে। দু’জনই দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বড় হয়ে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছন। কিন্ত সহসাই যেন হারিয়ে যান বিস্মৃতির অতলে।