Published : 10 Sep 2026, 10:53 PM
সন্তানের অসুস্থতার দিনে অফিসে পৌঁছাতে পাঁচ মিনিট দেরি হওয়ায় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীকে। তাকে বলা হয়েছিল, তিনি মা নাকি কর্মজীবী নারী হতে চান, সেই সিদ্ধান্ত আগে নিতে হবে।
অপমানিত হয়ে এক কথায় চাকরি ছেড়ে দেন; কিন্ত সেই সংকট মোড় ঘুরিয়ে দেয় জীবনের। পুরনো ক্লায়েন্টদের যোগানো সাহস, স্বামী-শাশুড়ি এবং বাবা-মায়ের ভরসায় নিজের জমানো ১০ হাজার টাকার সঙ্গে ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খুলে ফেলেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা; নাম দেন ‘অ্যাডকম’।
বৃহস্পতিবার গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ 'আড্ডানামার’ ষষ্ঠ পর্বে অতিথি হয়ে এসেছিলেন দেশের বিজ্ঞাপন শিল্পের প্রথম নারী কর্ণধার গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী।
ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় বিনাবেতনে কাজ করা এবং বিবাহোত্তর জীবনে করাচিতে গিয়ে বিজ্ঞাপনী জগতে ঢুকে পড়ার গল্প তিনি অনুষ্ঠানে শুনিয়েছেন।
গীতিআরা বলেছেন, দাদু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্রগতিশীল চিন্তাধারা এবং দিকনির্দেশনা তাকে মুক্ত মানসিকতা ধারণ করার শক্তি যুগিয়েছে।
আড্ডনামা সঞ্চালনা করেছেন অভিনেত্রী নিমা রহমান। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল।
আগের পাঁচ পর্বে অতিথি হয়েছিলেন অভিনেতা আবুল হায়াত, মামুনুর রশীদ, আফজাল হোসেন, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।
মা চাইতেন মেয়ে সুবাস ছড়াবে চম্পা ফুলের মত
ছয় ভাইবোনের মধ্যে গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী সবার বড়। ডাক নাম চম্পা, এই নাম রেখেছিলেন তার মা।
গীতিআরা বলেন, "উনার রুমের বাইরে একটা চম্পা ফুলের গাছ ছিল, ফুলটা ফুটলে আস্তে আস্তে সুন্দর একটা গন্ধ বের হত। তো হলাম আমি, নামও হল চম্পা। ভালো নাম গীতিআরা সাফিয়া, চৌধুরীটা স্বামীর থেকে নিজে থেকেই যুক্ত করেছি। বেশিরভাগ লোকই আমাকে চম্পা নামে চেনে।"
জীবনে সবচেয়ে বেশি কে উদ্বুদ্ধ করেছেন? গীতিআরা বলেন, "আমার আব্বা-আম্মার কথাই সবচেয়ে আগে বলব। আব্বা যে কোনো কাজের আগে বলতেন 'জাস্ট ডু ইট'। আমি যদি কিছু করতে ভয় পেতাম, তিনি বলতেন, শুধু করে ফেল। আস্তে ধীরে কথা বললে আব্বা বলতেন ‘মিনমিন করছিস কেন’।
“আম্মা সবসময় বলতেন, 'মা তুমি পারবে, করো, তোমার কোনো চিন্তা নাই'।"
তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন তার দাদু, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, যিনি নাতনিকে নানা কাজে উৎসাহ আর সাহস দিতেন।
গীতিআরা সাফিয়া বলেন, "যখনই স্কুলের রেজাল্ট হত, দাদু আসতেন, জিজ্ঞেস করতেন রেজাল্ট কী হল। ভালো হলে ভালো বলতেন, খারাপ হলে বলতেন কেন খারাপ হল, তুই তো পারিস, একটু মনোযোগ দিস। গল্পের বই এনে দিতেন। ছোটকাল থেকে এই আদর পেয়ে পেয়ে মানুষ হলাম।"
উচ্চমাধ্যমিক পাস করার দিন দাদুকে ঘিরে একটি স্মৃতি তার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
গীতিআরা সাফিয়া বলেন, "সেদিন দাদু এসেছেন, দেখি আম্মা কাঁদছেন, বের হচ্ছেন না, ফাঁক দিয়ে দাদুকে দেখছেন আর চোখ মুছছেন। আমি ভাবছিলাম, আম্মা পাগল হয়ে গেছেন নাকি! দাদু আমাকে ১০০ টাকা দিলেন, তারপর একটা পার্কার কলম দিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, কী পড়বি ঠিক করেছিস? তারপর ব্রিফকেস থেকে একটা ইউনিভার্সিটির ভর্তির ফরম দিলেন। ফরম দেওয়ার পরই আম্মা বেরিয়ে এলেন।
"পরে জানতে পারলাম, মা আশঙ্কা করছিলেন, ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর দাদু হয়ত বিয়ের কথা বলবেন। ভর্তির ফর্ম দেখে সেই আশঙ্কা কেটে যায়।"
ইসলামে নারীর অধিকার নিয়ে দাদুর শিক্ষা
গীতিআরা সাফিয়া বলেন, অনার্স পাস করার পর দাদু তাকে জিজ্ঞেস করেন, কোরআন শরীফ তিনি বুঝে পড়েন, নাকি তোতাপাখির মত মুখস্থ পড়েন?
তিনি বলেন, "আমি বললাম, দাদু সত্যি কথা বলতে গেলে এখন তোতাপাখির মতই পড়ি, মৌলভি সাহেব যখন শিখিয়েছিলেন তখন মানে বুঝতাম, এখন তোতাপাখির মত। তখন উনি ব্রিফকেস থেকে ইংরেজি অনুবাদসহ একটা কোরআন শরীফ বের করে দিলেন। বললেন, তোর তো বাংলার চেয়ে ইংরেজিতে দখল বেশি, তাই ইংরেজি অনুবাদটা দিলাম, ভালো করে পড়বি।
"দাদু তখন বললেন যে, দেখ, তোর দেখতে দেখতে অনার্স হয়েছে, দেখতে দেখতে মাস্টার্স হয়ে যাবে। আব্বা-আম্মা জোর করে তোকে কারও সঙ্গে বিয়ে দিতে পারেন। ইসলাম তোকে নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকার দেয়।"
দাদুর কথায় নাতনি তখন মহাখুশি। কারণ ততদিনে নাজিম কামরান চৌধুরীর (গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর স্বামী) সঙ্গে তার মন দেওয়া-নেওয়া হয়ে গেছে। তিনি ভাবলেন, তাহলে জীবনসঙ্গী বাছাইয়ে অন্যের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে চলতে হবে না।
গীতিআরা বলেন, “দাদুর এই জিনিসগুলো কিন্তু আমাকে অনেক উৎসাহিত করেছে। অনেক ভুল বোঝাবুঝি থেকে বের করে এনেছে।"
পাকিস্তান অবজারভারে বিনাবেতনে কাজ
অর্থনীতি পড়তে চাইলেও বাবার ইচ্ছায় ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী। ছাত্রজীবনেই পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ আসে তার।
তিনি বলেন, "আমি কেজি টু থেকেই ছোটদের পাতায় ইংরেজিতে লিখতাম। প্রথমে পূর্ব পাকিস্তানের কাগজে, তারপর পশ্চিম পাকিস্তানের কাগজে পাঠালাম, বের হল। তারপর ইন্ডিয়াতে পাঠানো শুরু করলাম, সেটাও বের হল। আব্বার ইচ্ছা ছিল ইংরেজি সাহিত্য পড়লে তিনি খুশি হবেন, প্রফেসর হতে পারব। কিন্তু আব্বা বুঝলেন, আমি হতাশ।"
মেয়ের হতাশা বুঝতে পেরে বাবা তাকে পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় বিনাবেতনে কাজের সুযোগ করে দেন।
গীতিআরা বলেন, "আব্বা পত্রিকার মালিক আর সম্পাদক দুজনকেই চিনতেন। বললেন, আমার মেয়ে হতাশ, ওকে একটা কাজ দেন, ওর ধারণা ওকে টিচার হতেই হবে, না হয় সাংবাদিকও হতে পারে, যেটা সে পছন্দ করে, বেতন দিতে হবে না।
“প্রথম একমাস ছোটদের পাতা দেখতাম, তারপর মহিলাদের পাতা, তারপর ফিল্ম পেইজ–তিনটা পেইজের কাজ করতাম। সবাই ওখানে ছেলে, আমি একটা মেয়ে বসতাম।"
করাচিতে বিজ্ঞাপনী জগতে প্রবেশ
পছন্দের পাত্র নাজিম কামরান চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ে হয় গীতিআরা সাফিয়ার। বিয়ের পর স্বামীর বদলির সুবাদে করাচিতে চলে যান। যেখানে একটি নৈশভোজে পরিচয় হয় 'শি' ম্যাগাজিনের সম্পাদকের সঙ্গে, যিনি তাকে কাজে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
সেসময় ক্লায়েন্টদের সমস্যার কথা শুনে নিজে থেকেই বিজ্ঞাপনের কপি লিখে দেওয়া শুরু করেন গীতিআরা সাফিয়া। পরে ঢাকায় ফেরার পর এক বিজ্ঞাপন কোম্পানির প্রধানের প্রস্তাবে আবারও চাকরিতে যোগ দেন।
ঘড়ির কাঁটা ধরে অফিসে পৌছানো অভ্যাস ছিল গীতিআরা সাফিয়ার। কাজ করতেন এক মনে রাত পর্যন্ত, কিন্তু একদিন ছেলের প্রচণ্ড জ্বরের কারণে পাঁচ মিনিট দেরি হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ শুনতে হয় কটূ কথা।
সেই গল্প শুনিয়ে তিনি বলেন, "আমার ছেলের ১০৩ জ্বর। তবুও ছেলের জ্বরটা একটু নামার পর শাশুড়িকে বলে অফিসে গেলাম। বস বললেন, 'আপনি লেট করেছেন'। আমার মনে হল, উনি কতটা অকৃতজ্ঞ, আমি সবসময় আগে আসি, এত রাত পর্যন্ত কাজ করি, সেটা মূল্যায়ন করলেন না।
“উনি ঘড়ি দেখে বললেন, 'মিসেস চৌধুরী, আপনি সিদ্ধান্ত নিন আপনি একজন মা হতে চান নাকি একজন কর্মজীবী নারী।' আমি উনাকে এক মাসের নোটিস দিয়ে চাকরি ছেড়ে দিলাম।"
ক্লায়েন্টদের চাপে নিজের এজেন্সি খোলার সিদ্ধান্ত
চাকরি ছাড়ার পরদিনই একের পর এক ক্লায়েন্টের ফোন আসে তার কাছে।
গীতিআরা সাফিয়া বলেন, "টেলিফোন বাজল, এক ক্লায়েন্ট বললেন হ্যালো মিসেস চৌধুরী, আপনি বাড়িতে কী করছেন? আমি বললাম, আমি পদত্যাগ করেছি। সে বলল, আমি জানি, কিন্তু আমাদের জন্য যে কাজ শুরু করেছিলেন তা শেষ করতে হবে। আমি বললাম, আমি অন্য এজেন্সি থেকে কীভাবে করব? বলল, না, ধারণাটি আপনার ছিল, আপনাকেই শেষ করতে হবে।
“ফোন রাখতেই আরেকটা ফোন, আরেক ক্লায়েন্ট। হ্যালো মিসেস চৌধুরী, আপনার জন্য বাড়িতে বসে থাকাটা ভালো নয়। আমি বললাম, আমি তো এজেন্সি ছেড়ে দিয়েছি। বলল, আমি জানি, আপনাকে আমাদের জন্য কিছু কাজ করতে হবে, নিজের এজেন্সি খুলুন।"
শাশুড়ি, মা ও বাবার কাছে পরামর্শ চাইলেন গীতিআরা, প্রত্যেকের কাছ থেকেই পেলেন উৎসাহ আর সাহস।
কিন্তু জমানো ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা। এজেন্সি খোলার জন্য ৫০ হাজার টাকার ঋণ প্রয়োজন ছিল। বাবা বা স্বামীর কাছ থেকে টাকা নিতে চাননি। পারিবারিক পরিচিতিও কাজে লাগাতে অনীহা ছিল তার।
গীতিআরা সাফিয়া বলেন, "সব ব্যাংক বলে টাকা জমা দিতে হবে। আমি পাগল হয়ে গেলাম। শেষে উত্তরা ব্যাংকে গেলাম, সেখানকার প্রধান আমাকে চিনতেন, কিন্তু জানতেন না আমি কার মেয়ে। আমি প্রায় কেঁদে ফেলি অবস্থা। উনি বললেন, 'আপনার অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে? আর যেসব ক্লায়েন্ট কাজ দিতে চেয়েছে, তাদের থেকে একটা চিঠি আনবেন যে তারা পেমেন্ট এই অ্যাকাউন্টে জমা দেবে। ক্লায়েন্টরা চিঠি দিল। আমার জমানো মাত্র ১০ হাজার টাকা দেখে উনি বললেন, বাকি টাকা আমি দেব, আমি গ্যারান্টার হলাম।"
আগের এজেন্সির পাঁচজন সহকর্মী বিনাবেতনেই তার সঙ্গে যোগ দিতে রাজি হন। তবে প্রথম মাস থেকেই তিনি তাদের বেতন দিতে সক্ষম হন। অবশ্য নতুন ক্লায়েন্টদের সংশয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবার।
গীতিআরা বলেন, "ক্লায়েন্টের কাছে গেলে প্রথমে বলত, ‘আপনি একজন নারী, আপনি কি পারবেন?’ বিদেশিরা জিজ্ঞেস করত, ‘আপনি একজন মুসলিম নারী, আপনার কি কাজ করার অনুমতি আছে? আপনার স্বামী কি অনুমতি দেবেন?’ আমি বলতাম, অবশ্যই আমার অনুমতি আছে, আমাকে আটকানোর সে কে?"
সন্তান লালন-পালন ও স্বামীর সহযোগিতা
গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর ভাষ্য, তিনি ছিলেন ‘সচেতন’ মা। নিজের সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং নিয়ে আসার কাজটি নিজেই করতেন।
তিনি বলেন, "আমি ওদের স্কুল থেকে তুলে এনে বাসায় খেতাম, তারপর এজেন্সিতে নিয়ে যেতাম, এক কোণে বসিয়ে হোমওয়ার্ক করতে বলতাম। একটু বড় হলে ছোটখাটো কাজে লাগিয়ে দিতাম। এভাবেই ওরা দুজনেই অ্যাডভার্টাইজিংয়ে আগ্রহী হয়ে গেল।"
আর স্বামী নাজিম কামরান চৌধুরী সম্পর্কে জানতে চাইলে গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী তাকে বর্ণনা করেন একজন উৎসাহদাতা এবং সহায়ক মানুষ হিসেবে।
তিনি বলেন, "সে খুবই দারুণ এবং সাহায্যকারী মানুষ, আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছে। সে বলত, "জাস্ট ডোন্ট লিসেন। তুমি যা করতে চাও করো। আমি কি কখনো মানা করেছি? জাস্ট ডু ইট।
“সে আমাকে অনেক আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। তখন যদি সে বাধা দিত, তাহলে মুশকিল হয়ে যেত।"