জ্বালানি তেলের ‘মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায়’ মূল্যস্ফীতি ফের ঊর্ধ্বমুখী
চলতি বছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশ।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সেপ্টেম্বরে খাদ্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় মূল্যস্ফীতির পারদ কিছুটা চড়েছে।
চলতি অর্থবছরের তৃতীয় মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮.৩৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস বুধবার মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
গত ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের শেষ মাস জুনে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় ৮.৩২ শতাংশ, যা ছিল আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। পরে মাস অগাস্টে এর হার আরও কমে ৮.২৬ শতাংশে দাঁড়ায়।
জ্বালানি তেলের ‘মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায়’ নিম্মমুখী মূল্যস্ফীতি ফের ঊর্ধ্বমূখী হওয়ার কথা বলেছেন অর্থনীতির গবেষক বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায় সরকার। এতে পরিবহন, খাদ্যপণ্যসহ অনেক জিনিসের দাম বেড়ে গেছে।
“ওই মাসের ১০ দিনে তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে জিনিসপত্রের দামে। এর প্রভাব আগামী দিনেও পড়বে। সে কারণে আগামী দু-এক মাস মূল্যস্ফীতি কমবে না বলেই মনে হচ্ছে।”
সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মানে হচ্ছে—গত বছরের সেপ্টেম্বরে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা এখন কিনতে খরচ করতে হয়েছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে।
বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে; তবে খাদ্যবহির্ভুত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে।
ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ; আগের মাস অগাস্টে হয়েছিল ৭ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ।
অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে খাদ্যবহির্ভুত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ; অগাস্টে হয়েছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে সরকার।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলনের ধাক্কায় দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছিল। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরের কয়েক মাস সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করছিল।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে রাখার লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার। তবে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ওই আর্থিক বছর।
এদিকে সেপ্টেম্বর শেষে (২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর) দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন মাস পর গত জুলাইয়ে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামে। গত এপ্রিলে ৯ দশমিক শূন্য চার শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। মে মাসে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছিল। জুনে তা সামান্য কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নামে।
জুলাইয়ে তা থেকে আরও দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৯ শতাংশের নিচে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছিল; অগাস্টে তা আরও কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নামে।
চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল দেশে। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে। মার্চে অবশ্য কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমেছিল। এরপর টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে ছিল।
গ্রামের পাশাপাশি শহরেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে
সেপেম্বরে গ্রামের পাশাপাশি শহরেও সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে।
পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে এ মাসে গ্রামীণ এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
আগের মাস অগাস্টে গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক শূন্য এক শতাংশ; খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসে শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ; খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
অগাস্টে শহর এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৭ দশমিক শূন্য চার শতাংশ; খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
মজুরি সূচক কমেছে
মূল্যস্ফীতি বাড়লেও চলতি অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে মজুরি সূচকও কমেছে। এ মাসে জাতীয় গড় মজুরির হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগের মাস অগাস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ।
এর মানে হল—সেপ্টেম্বরেও মূল্যস্ফীতি মজুরি হারের চেয়ে বেশিই রয়ে গেছে।
মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়; কিংবা খাবার, পোশাক, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হয়।
মানুষের আয় বেশি বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও তা কিনতে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু দেশে সাড়ে চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম।
সাধারণত প্রতি মাসে যত মূল্যস্ফীতি হয়, এর বেশি হারে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মজুরি বৃদ্ধির হারকে টপকে যায় মূল্যস্ফীতি।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। আর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। এরপর আর কোনোমাসেই মূল্যস্ফীতিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি মজুরি সূচক।
