৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

মূল্যস্ফীতি কমলেও মজুরি প্রবৃদ্ধিতে ভাটা: প্রকৃত আয় কমে বিপাকে সাধারণ মানুষ

“মানুষের খরচ করার সামর্থ্য কমছে। অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। আবার অনেকের তো সঞ্চয়ও নেই।”

আবদুর রহিম হারমাছি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Sep 2026, 11:30 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:56 AM

সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার খবর এলেও তার বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা কাটছে না। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস অগাস্টে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। তবে একই মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার আরও কমে ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

অগাস্টের মূল্যস্ফীতির এই হার গত ১০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হারও গত সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। 

পরিসংখ্যান বলছে, টানা সাড়ে চার বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির (৫.৮৬%) চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার (৫.৯২%) কিছুটা বেশি ছিল। কিন্তু পরের মাস ফেব্রুয়ারি থেকেই আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পারদ উপরে উঠতে শুরু করে, যা আর নিচে নামেনি। 

দীর্ঘদিন ধরে এই বিপরীতমুখী প্রবণতার কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের ‘প্রকৃত আয়’ বা ক্রয়ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে।

পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট বা মাসভিত্তিক হিসাবে অগাস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ হওয়ার অর্থ হল, গত বছরের অগাস্টে চাল, ডাল, যাতায়াত, বাসাভাড়াসহ জীবনযাপনের যেসব খরচ মেটাতে ১০০ টাকা লাগত, এ বছরের অগাস্টে তা বেড়ে ১০৮ টাকা ২৬ পয়সা হয়েছে। 

এর বিপরীতে, জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হওয়ায়, গত বছর ১০০ টাকা আয় করা ব্যক্তির আয় এ বছর বেড়ে ১০৮ টাকা ৫ পয়সা হয়েছে।

অর্থাৎ আয় যতটুকু বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় তার চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে। তাতে বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষকে খরচের ফর্দ কাটছাঁট করতে হচ্ছে কিংবা সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “আমরা খুশি হতাম যদি মূল্যস্ফীতি কমার সঙ্গে সঙ্গে মজুরি সূচক বৃদ্ধি পেত। বর্তমান তথ্য বিশ্লেষণ করলে উদ্বেগজনক একটি চিত্র দেখা যায়। সেটি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি প্রকৃত মজুরির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ বাস্তবে আয় বাড়লেও বাজারের বাড়তি খরচ তা খেয়ে ফেলছে।”

দীর্ঘ সময় ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় ‘ভয়ানকভাবে’ কমে যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “মানুষের খরচ করার সামর্থ্য কমছে। অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। আবার অনেকের তো সঞ্চয়ও নেই।”

ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “বাজারে সব জিনিসের দামই চড়া। এর মধ্যেই গ্যাস-বিদ্যুতের জন্য সবার বাড়তি খরচ হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, বোরো ধানের ভরা মৌসুম পার হলেও আমাদের প্রধান খাদ্যপণ্য চালের দাম কিন্তু কমেনি।”

মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে শুধু কঠোর মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে বাজার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।

ওঠানামার আবর্তে মূল্যস্ফীতি ও মজুরি 

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় সার্বিক মূল্যস্ফীতি এক ধাক্কায় ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে উঠেছিল। ওই বছরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার কারণে মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করলেও মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের ঘরেই আটকে ছিল।

এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছর এক অঙ্কের মূল্যস্ফীতি নিয়ে শুরু হলেও বছরজুড়ে তা ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে তা কমে ৮ দশমিক ৩২ এবং অগাস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে, বিবিএসের মজুরি সূচকও দীর্ঘ সময় ধরে কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি। চলতি বছরের শুরু থেকেই এটি ৮ শতাংশের ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। জুলাইয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২২ শতাংশ থাকলেও অগাস্টে তা কমে ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমেছে।

ঝুঁকিতে অনানুষ্ঠানিক খাত 

দেশের শ্রমশক্তির সবচেয়ে বড় অংশটি মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যার প্রায় পুরোটাই মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান। 

বিবিএসের সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মে নিয়োজিতদের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত। 

এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৮৮ শতাংশ এবং শহরে ৭৪ শতাংশ মানুষ এই খাতে কাজ করেন। সামাজিক সুরক্ষাহীন এই বিপুল শ্রমশক্তিই বাজারদরের ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি ভুগছে।

বিবিএস প্রতি মাসে কৃষিশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, জেলে, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিকসহ ৪৪ ধরনের পেশাজীবীর তথ্য সংগ্রহ করে মজুরি হারের সূচক তৈরি করে। 

অগাস্ট মাসের তথ্য অনুযায়ী, খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে কম মজুরি বেড়েছে শিল্প খাতে, ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এছাড়া সেবা খাতে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ মজুরি বেড়েছে।

মজুরি হার সূচকের একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিবিএসের এই সূচক পুরো শ্রমবাজারের সব ধরনের কর্মী বা চাকরিজীবীর আয়কে প্রতিনিধিত্ব করে না। বেতনভোগী ও তুলনামূলক উচ্চ আয়ের পেশাজীবীরা এই মজুরি সূচকের আওতায় নেই।

ফলে এই সূচক থেকে মূলত তুলনামূলক কম মজুরির শ্রমজীবী মানুষের আয় ও মূল্যস্ফীতির মধ্যকার চাপের একটি চিত্র পাওয়া যায়। মধ্যবিত্তের ওপর চাপ কতটা বাড়ল, তা বোঝা যায় না।