Published : 25 Aug 2026, 11:54 PM
গতবছরের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায়ের চাপ যখন এনবিআরের মাথার ওপর, তখন এ সংস্থাকে কাজ করতে হচ্ছে জনবল ঘাটতি ও পুরোপুরি সমন্বিত না হওয়া ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে।
গত অর্থবছর এনবিআর ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছিল। সেখান থেকে এবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
অথচ এনবিআরের শুধু আয়কর বিভাগেই অনুমোদিত ১২ হাজার ৭৬৪টি পদের মধ্যে ৪ হাজার ৫৫২টি পদ খালি। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশেই জনবল নেই।
অন্যদিকে ই-টিআইএন, ই-রিটার্ন, ই-টিডিএস, ভ্যাট অনলাইন, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডসহ একাধিক ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু থাকলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই।
একজন করদাতার আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসসংক্রান্ত সব তথ্য এখনও এক জায়গায় দেখার ব্যবস্থা হয়নি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থাপনাও পুরোপুরি চালু হয়নি।
এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে রাজস্ব বাড়াতে কর্মকর্তানির্ভর প্রচলিত জরিপ থেকে সরে ডিজিটাল জরিপ, ভৌগোলিক তথ্য, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং একজন ব্যক্তির পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য এক জায়গায় আনার পরিকল্পনা করছে এনবিআর।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত রোববারের বৈঠকে এনবিআরের উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ওইদিন সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকটি হয়।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের ব্যয় নির্বাহে এনবিআরের সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর পদক্ষেপ এবং সংস্থাটির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত উপস্থাপনা দেওয়া হয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ কমিটির সদস্য এবং এনবিআরের চেয়ারম্যান ও সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বড় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য সামনে রেখে এনবিআরকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণে জোর দিতে বলা হয়েছে।
“দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে হবে। তা না হলে সরকারের ব্যয় নির্বাহে বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরতা থাকবে। এনবিআরকে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে কাজ করতে হবে।”
বিশাল চাপ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর নিয়ন্ত্রিত কর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৬ দশমিক ৯ শতাংশই এনবিআরের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে।
এনবিআরের প্রতিবেদনের হিসাবে, সরকারের আদায় করা প্রতি ১০০ টাকা রাজস্বের মধ্যে প্রায় ৮৬ টাকাই আসে সংস্থাটির মাধ্যমে। ২০০১-০২ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় ছিল ২০ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। এরপর ২৫ বছরে বেড়ে তা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি এসেছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।
এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ দশমিক ৫০ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ।
‘গতানুগতিক জরিপে ফল আসেনি’
করজাল বাড়ানোর পুরনো পদ্ধতিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ বেশি ছিল। জরিপ চালিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোঁজা এবং সম্ভাব্য করদাতা শনাক্ত করা হত।
কিন্তু ওই পদ্ধতি কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি বলে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন।
এ কারণে এবার জরিপের কাজ যতটা সম্ভব ডিজিটাল করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বা জিআইএস ব্যবহার করে শহরের জমি ও ভবনের পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া সম্ভব। কোনো জমিতে আগে কী ধরনের ভবন ছিল, পরে ভবনটি কতটা বড় হয়েছে, কত তলা হয়েছে এবং হোল্ডিংয়ের মালিক কে—এ ধরনের তথ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে। এসব তথ্য এনবিআরের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্যও এপিআই বা স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তির পুরো ‘ইকোনমিক ফুটপ্রিন্ট’ বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ছাপ দেখতে চায় এনবিআর।
কে কোথায় লেনদেন করছেন, কী সম্পদ কিনছেন, ব্যবসা করছেন কি না এবং তার কর দেওয়ার সম্ভাব্য সক্ষমতা কত, এসব তথ্য মিলিয়ে কর প্রশাসনের অগ্রাধিকার নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
টিআইএন আছে, রিটার্ন নেই
এনবিআরের প্রতিবেদনে শুধু নতুন টিআইএন দেওয়াকে করজাল সম্প্রসারণ হিসেবে না দেখার কথা বলা হয়েছে। এনবিআরের লক্ষ্য হবে টিআইএনধারীকে প্রথমে রিটার্ন দাখিলকারী এবং পরে নিয়মিত কর দেওয়া সক্রিয় করদাতায় পরিণত করা।
এ জন্য ব্যাংক হিসাব ও বড় অঙ্কের লেনদেন, জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাট কেনাবেচা, গাড়ির মালিকানা এবং কোম্পানির পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারের তথ্য ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি ব্যবসার লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি, ক্রেডিট কার্ড ব্যয়, বিদেশ ভ্রমণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং সরকারি কেনাকাটার তথ্যও দেখা হবে।
উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, শিক্ষা ও চিকিৎসায় বড় ব্যয়, ডিজিটাল ব্যবসা, পেশাগত আয় ও বাড়িভাড়ার তথ্যও ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনায়।
এসব তথ্য মিলিয়ে টিআইএন না থাকা সম্ভাব্য করদাতা এবং টিআইএন থাকলেও রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে চায় এনবিআর।
করদাতাদের সক্রিয়, রিটার্ন দেন কিন্তু কর নেই, রিটার্ন দেন না, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় এবং সম্ভাব্য করদাতা—এভাবে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সক্রিয়, রিটার্ন দেন কিন্তু কর নেই, রিটার্ন দেন না, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় এবং সম্ভাব্য করদাতা–এই কয়েকটি শ্রেণিতে করদাতাদের ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে এনবিআরের।
আয়-সম্পদ না মিললে ঝুঁকির তালিকায়
একজন করদাতার ঘোষিত আয় ও বাস্তব আর্থিক কর্মকাণ্ড মিলিয়ে দেখতে ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ম্যাচিং সিস্টেম’ করার পরিকল্পনাও এনবিআরের রয়েছে।
প্রতিবেদনে একটি উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বছরে ১২ লাখ টাকা আয় ঘোষণা করলেন। কিন্তু তার ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তিনি ৫০ লাখ টাকার গাড়ি ও ১ কোটি টাকার জমি কিনেছেন এবং বছরে পাঁচবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এ ধরনের অসামঞ্জস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার ব্যবস্থা করা হবে।
প্রত্যেক করদাতার জন্য সমন্বিত প্রোফাইল তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। সেখানে ঘোষিত আয়, কর পরিশোধ, ব্যাংক লেনদেন, স্থাবর সম্পত্তি, গাড়ি, কোম্পানির মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি ও বিদেশ ভ্রমণের তথ্য থাকবে।
আয়, ব্যয় ও সম্পদ অর্জনের মধ্যে বড় পার্থক্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে বেশি ঝুঁকির শ্রেণিতে নেওয়া হবে। উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও শুধু ঘোষিত আয় নয়, সম্পদ বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তথ্য বিবেচনায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
জনবল ঘাটতির জবাব প্রযুক্তিতে?
এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশের বাস্তবতায় রাতারাতি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা সম্ভব নয়। তাই যে কাজগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব, সেখানে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ কমাতে চায় সংস্থাটি। এতে একই জনবলকে অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
আয়কর বিভাগের জনবল পরিস্থিতির চিত্রও এনবিআরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
উপকর কমিশনারের অনুমোদিত ৪৬৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ২৪৬ জন, খালি ২২০টি। কর পরিদর্শকের ১ হাজার ৬২১টি পদের মধ্যে ৬৩৪টি খালি। ১১ থেকে ১৬ গ্রেডের ৬ হাজার ২১টি পদের মধ্যে কর্মরত ৩ হাজার ৬২৮ জন; শূন্য ২ হাজার ৩৯৩টি পদ।
সব মিলিয়ে আয়কর বিভাগে অনুমোদিত ১২ হাজার ৭৬৪ পদের বিপরীতে কর্মরত ৮ হাজার ২১২ জন।
এনবিআর বলেছে, রাজস্ব আহরণের পরিধি ও কাজের জটিলতার তুলনায় অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ কম। তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা সায়েন্স, ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং, অর্থনীতি ও ট্রান্সফার প্রাইসিংয়ের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
‘ওয়ান এনবিআর আর্কিটেকচার’
প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসনের পরিকল্পনার পাশাপাশি বর্তমান ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাও তুলে ধরেছে এনবিআর।
ই-টিআইএন, ই-রিটার্ন, ই-টিডিএস, ভ্যাট অনলাইন, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডোর মত ডিজিটাল ব্যবস্থা এখন এনবিআরে রয়েছে। কিন্তু এগুলো অনেকাংশে আলাদাভাবে কাজ করে।
ই-টিআইএন, ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর বা বিআইএন এবং কাস্টমস নিবন্ধনের জন্য পৃথক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। কিন্তু একজন করদাতার সব তথ্য নিয়ে একক হিসাব এখনও নেই।
এ কারণে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের পৃথক ডিজিটাল ব্যবস্থাকে ‘ওয়ান এনবিআর আর্কিটেকচার’-এর আওতায় আনার কথা বলেছে সংস্থাটি।
কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র, কোম্পানি নিবন্ধন, ভূমি, আমদানি-রপ্তানি, সঞ্চয়পত্র, বিআরটিএ ও ডিপিডিসির সঙ্গে এনবিআরের কিছু তথ্য বিনিময় হচ্ছে। ব্যাংক, বিডা এবং অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তথ্য আদান-প্রদানের কাজ চলছে।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও এই ডিজিটাইজেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুর্নীতি ঠেকাতে কর্মকর্তা ও সেবাগ্রহীতার সরাসরি যোগাযোগের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলেছেন কমিটির সদস্যরা।
দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত বা শাস্তির পাশাপাশি যে প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, সেটি বদলানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
করদাতার রিটার্নও তৈরি করবে সিস্টেম
এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, ছোট ব্যবসায়ীসহ অনেক সম্ভাব্য করদাতা রিটার্ন দাখিলের জটিলতা নিয়ে সমস্যায় পড়েন। কর আইনে নিয়মিত পরিবর্তন হওয়ায় একজন ছোট ব্যবসায়ীর পক্ষে সব বিধান জানা কঠিন।
এ কারণে করদাতার আয় ও লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে সিস্টেম থেকেই রিটার্নের একটি খসড়া তৈরি করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। করদাতা সেটি দেখে তথ্য ঠিক আছে কি না যাচাই করবেন। ঠিক থাকলে জমা দেবেন, ভুল থাকলে সংশোধন করবেন।
বিশেষ করে বেতনভোগীদের জন্য ‘প্রি-ফিলড ট্যাক্স রিটার্ন’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বেতন, ব্যাংকের সুদ, উৎসে কাটা কর, বিনিয়োগ ও কর রেয়াতের তথ্য সিস্টেমে থাকলে করদাতাকে নতুন করে সব তথ্য পূরণ করতে হবে না।
এনবিআর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এতে কর কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি যোগাযোগ কমবে এবং মানুষের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাজস্ব হারানোর সুযোগও কমবে।
বকেয়া ও কর ছাড়েও নজর
নতুন করদাতা খোঁজার পাশাপাশি পুরনো বকেয়া আদায়েও জোর দিতে চাইছে এনবিআর। সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে কাস্টমসের তথ্যের বরাতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া রাজস্ব থাকার কথা বলা হয়েছে। এই বকেয়া আদায় কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে কর অব্যাহতি বা কর ছাড়ও পর্যালোচনা করতে চায় সংস্থাটি। এনবিআরের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য ও খাতে প্রায় ৭৭ হাজার ১৬০ কোটি টাকার কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর বলছে, জনস্বার্থ ও শিল্পের প্রয়োজন বিবেচনায় কর ছাড় থাকবে। তবে কোন সুবিধা কতটা প্রয়োজন, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে।
এনবিআর বলছে, জনস্বার্থ ও শিল্পের প্রয়োজন বিবেচনায় কর ছাড় থাকবে। তবে কোন সুবিধা কতটা প্রয়োজন, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে।
ভ্যাট ব্যবস্থায় ই-ইনভয়েসিং, ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা, সরকারি বিভিন্ন সিস্টেমের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং ই-কমার্স থেকে রাজস্ব আদায়ের কাঠামো তৈরির কাজও চলছে।
তামাক পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ নজরদারিতে ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কারখানায় কাউন্টিং ডিভাইসের সঙ্গে এআই ক্যামেরা বসানো এবং সিগারেটের স্ট্যাম্পে কিউআর বা এআর কোড দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে।
অবৈধ সিগারেটের তথ্য দেওয়ার জন্য নাগরিকদের ব্যবহারের উপযোগী মোবাইল অ্যাপ চালু এবং তথ্যদাতাকে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখতে চায় এনবিআর।
কাস্টমসেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মিস-ইনভয়েসিং বা আমদানি-রপ্তানির মূল্য কম-বেশি দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি এবং বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থপাচার ঠেকাতে প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোতে বাংলাদেশের মিশনে প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমস অ্যাটাশে পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে সংস্থাটি।
কাঠামো বদলানোর আলোচনা
এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টিও সরকারের আলোচনায় রয়েছে।
রাজস্ব নীতি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা দুটি বিভাগে ভাগ করার জন্য ২০২৫ সালে দুটি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। সংসদ কার্যকর হওয়ার পর সেগুলো আইনে রূপান্তর না হওয়ায় অধ্যাদেশ দুটি বাতিল হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বর্তমান সরকার ২৮ এপ্রিল রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পর্যালোচনা করতে একটি উচ্চপর্যায়ের সংস্কার কমিটি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিটি ইতোমধ্যে চারটি সভা করেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে।
লক্ষ্য বড়, পরীক্ষা বাস্তবায়নে
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বলে এনবিআরের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। মধ্যমেয়াদে তা ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এ জন্য করহার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, তথ্য মিলিয়ে কর ফাঁকি শনাক্ত, বকেয়া আদায়, কর সুবিধা পর্যালোচনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের ওপর বেশি জোর দেওয়ার কথা বলছে সংস্থাটি।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চলতি বছরের বড় রাজস্ব লক্ষ্য সামনে রেখে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস–এই তিন বিভাগে কোন কোন খাত থেকে বাড়তি রাজস্ব আসতে পারে, তার একটি রোডম্যাপ করা হয়েছে।
এখন সেই রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ করার কথা বলছেন তারা।
ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে করদাতা ও এনবিআর কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ কমানোর উদ্যোগকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখছেন অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, “অনলাইনে কর দেওয়া ও রিটার্ন জমার সুযোগ যত বাড়বে, করদাতাদের এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তত কমবে। এতে সেবা সহজ হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও কমবে।”
তবে এই পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন মুশফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “অনলাইনে কর দেওয়া ও রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা ইতোমধ্যে চালু হয়েছে। ধাপে ধাপে আরও কার্যক্রম অনলাইনে নেওয়া হলে করদাতাদের ভোগান্তি ও সরাসরি যোগাযোগ আরও কমানো সম্ভব হবে।”