জাতীয় আয়ে ঘরকন্নার কাজের ভূমিকা কতটা, জানাবে সরকার

“নারীরা মুরগি পালেন, ডিম…, গাভী দেখেন, ঘরদোর পরিষ্কার করেন, রান্না করেন, বাচ্চারে খাওয়ান, ঘাট থেকে পানি আনেন; তিনি না করলে কাউকে দিয়ে করাতে হত, দাম দিতে হত। সেইটা আমরা মূল্যায়ন করেছি,” বলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Oct 2023, 03:53 PM
Updated : 18 Oct 2023, 03:53 PM

নারীরা তাদের ঘরের কাজের মধ্য দিয়ে জাতীয় আয়ে কতটা ভূমিকা রাখছে, সরকার সেই হিসাব বের করেছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ বিষয়ে গবেষণার পর প্রতিবেদনও হাতে পেয়েছেন তারা। আগামী সপ্তাহেই সে তথ্য প্রকাশ করা হবে।

বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকার র‌্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ বিষয়ে এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরেন মান্নান।

সরকার বাল্যবিয়ে বন্ধে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বাল্যবিবাহ অনেক পীড়াদায়ক বিষয়। কমবয়সে বিয়ে করলে, ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, তাদের অনেক দুর্গতি হয়। রোগবালাই হয়, কাজ করতে পারে না। রোগ-বালাই হয়। পড়াশোনা করতে পারে না। অনেক দুর্ঘটনার শিকার হয়। এছাড়া, এই যে এরা কাজ করল না, জাতীয় উৎপাদনে ভূমিকা রাখল না, এতে আমাদের জাতিগতভাবেও অনেক ক্ষতি হয়। সরকার নিজেরাও এই বিষয়ে কাজ করছে।"

তবে ঘরের কাজেরও যে অর্থমূল্য আছে, সে বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, "ঘরকন্নার কাজ কি কাজ না? বাচ্চাদের দেখাশোনা কি কাজ নয়? আমরা কিন্তু এই মুহূর্তে ঘরকন্নার কাজের হিসাব করছি। আমাদের ঘরের কাজ, আমার মায়ের কাজ, আমার স্ত্রীর কাজের মূল্য কত, জাতীয় আয়ে আমরা এটা নিরূপণ করছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইতোমধ্যে উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা এটা করেছে। আমার কাছে রিপোর্ট চলে এসেছে।"

"প্রধানমন্ত্রী চান, নারীদের যেন প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়। নারীরা মুরগি পালেন, ডিম…, গাভী দেখেন, ঘরদোর পরিষ্কার করেন, রান্না করেন, বাচ্চারে খাওয়ান, ঘাট থেকে পানি আনেন; তিনি না করলে কাউকে দিয়ে করাতে হত, দাম দিতে হত। সেইটা আমরা মূল্যায়ন করেছি। আগামী সপ্তাহে আমরা সংখ্যাটা পাবলিকলি জানিয়ে দেব।"

উচ্চ আয়ের পরিবারে সন্তানদের বাল্যবিয়ের প্রবণতা যে কম, সে বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের একটি বড় কারণ দারিদ্র্য।

“সেক্ষেত্রে আমাদের প্রধান দায়িত্ব দারিদ্র্য দূর করা। আমরা চাচ্ছি, আমরা যেন জ্ঞানে-বিজ্ঞানে একটা আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে পারি। তবে আধুনিক মানে বেলাল্লাপনা নয়। বেহায়াপনা নয়। আধুনিক মানে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

“আমরা বিজ্ঞান পড়ব, সবকিছু করব, আবার আমাদের নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরব। আমরা যে বাঙালি, আমাদের যে নিজস্ব পরিচয় আছে, ভাষা আছে, এগুলা নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগার কোনো কারণ নাই। অনেক হয়েছে। এবার সময় হয়েছে নিজেকে নিজে তুলে ধরার।"

গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা (জিএসি) ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল-এর অর্থায়নে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর কমব্যাটিং 'আরলি ম্যারিজ ইন বাংলাদেশ' (সিইএমবি) প্রকল্পের জাতীয় র্পযায়ের ‘অবহতিকরণ সভা’ ছিল এদিন। মন্ত্রী সেখানে এসেছিলেন অতিথি হয়ে।

মান্নান বলেন, বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য বাংলাদেশ যে আর হাত পেতে সাহায্য নিচ্ছে না, সে বিষয়টা স্পষ্ট হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।

“অনেক উচ্চ আয়ের দেশ নিজের ইচ্ছায়, স্বেচ্ছায় এই (বাল্যবিয়ে বন্ধের) কাজটা করছে। শুধু এই ক্ষেত্রে না, অন্যান্য ক্ষেত্রেও। আমাদের সরকারের মাধ্যমেও করছে, বেসরকারি মাধ্যমেও করছে। তবে এটা কোনো খয়রাতের বিষয় না। এটা মাথা থেকে বের করা উচিৎ।

“সুতরাং, আমি অনুরোধ করব, যারা দাতাসংস্থা শব্দটি ব্যবহার করেন, এটা এড়িয়ে চলা ভালো আমাদের জন্য। হ্যাঁ, নিলে আমি স্বীকার করব।"

বাল্যবিবাহ বন্ধ করার জন্য অর্থ খরচের সামর্থ্য এখন বাংলাদেশের আছে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, "আমরা ৬০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে পদ্মাসেতু বানাইনি? আমরা কি মেট্রোরেল বানাইনি? আমরা কি মানুষকে শিক্ষাদীক্ষা দিচ্ছি না? তার তুলনায় এইগুলা তো অত বেশি পরিমাণ নয়। আমরা এইগুলা করতে পারব। এটা আমাদের জন্য অ্যাফোর্ডেবল।

"কিন্তু অন্যদের সঙ্গে করতে ভাল্লাগে। একাও করা যায়, তবে সঙ্গী থাকলে হাঁটা যায় ভালো, গান গাওয়া যায় ভালো, খেতেও আরাম লাগে, এমনকি চা খেতেও ভালো লাগে। সকল কাজে সঙ্গী-সাথী থাকলে ভাল্লাগে। আমরা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলি। আমরা বিচ্ছিন্ন দেশ নই। তবে এরা না করলে কি আমরা করতাম না? আমাদের কি মিনিস্ট্রি অব চাইল্ড ওয়েলফেয়ার আছে না? সুতরাং, এটা কোনো গরীমার বিষয় নয়।"

জিএসি ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল-এর অর্থায়নে প্ল্যান ইন্ট্যারন্যাশনাল বাংলাদেশ ঝালকাঠি জেলার সকল উপজেলা এবং ভোলা জেলার তিনটি উপজেলাসহ বাংলাদেশের মোট ৪১টি জেলায় ২০১৮ সালের জুন মাস থেকে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় এ প্রকল্পের আওতায় বাল্যববিাহ প্রতিরোধে বিভিন্ন র্কাযক্রম পালন করে আসছে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, "সিএমপিসি শক্তিশালীকরণ এবং এনপিএ বাস্তবায়নের জন্য আরও সহায়তার প্রয়োজন। প্রয়োজন রয়েছে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও কিশোর কিশোরীদের ক্ষমতায়নের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিরাপদ প্রবেশাধিকারের সুযোগ সৃষ্টির। এছাড়াও স্কুলের পাঠ্যক্রমের মূলধারায় জেন্ডার সমতার বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে।"

চলতি বছর ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া এ প্রকল্পের অবদান, ফলাফল ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার র্তীথ সারথী সিকদার।

তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় ঝালকাঠি ও ভোলা জেলার মোট ১ লাখ ২৯ হাজার বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন তারা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ঝালকাঠি ও ভোলার ১ লাখ ৪০ হাজার ৯৯৮ জন কিশোর-কিশোরী এখন যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, জেন্ডার সমতা এবং শিশু সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সক্রিয় প্রতিনিধি হিসেবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে তারা।

এছাড়া মোট ৩০৯২ জন কিশোর-কিশোরী এই প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে ‘স্বাবলম্বী’ হয়েছে এবং ১০৮ জন কিশোর-কিশোরী কারিগরী প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরিতে যুক্ত হয়েছে। মহামারীর সময় ভোলার ১৬০০ পরিবার এবং ঝালকাঠির ১৬০০ পরিবার এই প্রকল্প থেকে অর্থ সহায়তা পেয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

জেলা পর্যায়ে ঝালকাঠি ও ভোলার রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আরডিএফ) সুশীলন এবং জাতীয় পর্যায়ে এনডিপি, ইপসা, এফআইভিডিবি, ঢাকা আহছানিয়া মিশন, আরডিআরএস, রূপান্তর ও গ্রীন হিল এ প্রকল্পে কাজ করেছে।

বাংলাদেশে কানাডার হাই কমিশনার লিলি নিকোলস, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর পলিসি, অ্যাডভোকেসি ইনফ্লুয়েন্সিং অ্যান্ড ক্যাম্পেইন ডিরেক্টর নিশাত সুলতানা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।