Published : 17 Nov 2024, 09:41 PM
দুটি সনাতনী সংগঠনকে যুক্ত করে ‘বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের’ ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রোববার বিকালে চট্টগ্রামের ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরে সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ’ এবং ‘বাংলাদেশ সম্মিলিত সংখ্যালঘু জোটের’ ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের’ ঘোষণা করেন পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সারা দেশের নির্যাতিত নিপীড়িত সনাতনী সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে দুটি সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে এখন থেকে ‘সনাতনী জাগরণ জোটের’ ব্যানারে আন্দোলন সংগ্রাম করবে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর হাজারী গলিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কথিত হামলা পরবর্তীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন, এই ঘটনায় আটক ও নির্যাতনের শিকার নিরিহ সনাতনীদের মুক্তি দিয়ে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দাবি তুলে ধরেন।
চিন্ময় কৃষ্ণ ব্রহ্মচারী অভিযোগ করে বলেন, “৫ অগাস্টের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘর, উপাসনালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নজিরবিহীন হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, জায়গা-জমি দখল, লুটপাট, নির্মম নির্যাতন এবং প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে। নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে।
“সারাদেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনা কারণে ভয়ভীতি দেখিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অসংখ্য শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অসংখ্যা নিরপরাধ সনাতনীতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তির নজীরবিহীন এসব ন্যাক্কারজনক ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ নিতে আমরা দেখিনি। নির্যাতন এখনো অব্যাহত থাকায় সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিনানিপাত করছে।
চিন্ময় কৃষ্ণ ব্রহ্মচারী আরও বলেন, ক্রমাগত ধর্মীয় বঞ্চনা, বৈষম্য ও নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবাদে এবং অস্তিত্ব রক্ষায় বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ তথা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রাষ্ট্রের কাছে ৮ দফা যৌক্তিক দাবি উত্থাপন করে।
তিনি বলেন, “দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল পর্যায় থেকেও ৮ দফার যৌক্তিকতা স্বীকার করেছে। কিন্তু লালদিঘির শান্তিপূর্ণ গনজমায়েতকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং বহির্বিশ্বে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অশুভ উদ্দেশ্যে জাতীয় পতাকার অবমাননার কথিত অভিযোগে ৩০ অক্টোবর ১৯ জনের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা হয়।
“সনাতন ধর্মের অনুসারীরা নিজের মাতৃভূমিকে মাতৃতুল্য রূপে শ্রদ্ধা করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাথে সনাতনী সম্প্রদায়ের অসীম ত্যাগের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাটি সর্বৈব মিথ্যা, বানোয়াট, ষড়যন্ত্রমূলক ও ভিত্তিহীন।”
গত ৫ নভেম্বর হাজারী গলির ঘটনা এই ষড়যন্ত্রের অংশ উল্লেখ করে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস আরও বলেন, “আমরা কোনো অপরাধীর পক্ষে নই। হাজারী গলিতে সেদিন আইনশৃংলা বাহিনীর ওপর কোনো দুষ্কৃতিকারী যদি হামলা করে থাকে, আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হোক।”
এর সাথে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘অতি উৎসাহী’ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
দুই সংগঠনের এক হওয়া প্রসঙ্গে মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী বলেন, সনাতনীদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্রিয়াশীল সকল সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ মোর্চা বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ ও বাংলাদেশ সম্মিলিত সংখ্যালঘু জোট শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে। বৃহৎ ঐক্যের স্বার্থে দুটি জোট ঐক্যবদ্ধভাবে ‘বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “ইসকনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা ভিত্তিহীন। আমেরিকা সন্ত্রাসী বা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। যদি ইসকন সন্ত্রাসী সংগঠন হতো তাহলে কেন আমেরিকার মতো জায়গায় গোয়েন্দা প্রধান করা হলো একজন ইসকন ভক্ত তুলসী গ্যাবার্ডকে!”
আরেক প্রশ্নের জবাবে চিন্ময় কৃষ্ণ বলেন, “সবাই কথায় কথায় বলে আপনারা আগের ১৫ বছর কোথায় ছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালে দুর্গাপূজার সময় রক্তাক্ত শারদে আরও বিস্তৃত আন্দোলন হয়েছে। নন্দনকাননে মহাসমাবেশ করেছিলাম তখন।
“সেই সমাবেশে বিরোধী দল বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের নেতারাও বক্তব্য রাখেন। সেই আন্দোলনগুলো করতে গিয়ে সরকারের দিক থেকে আমাদের বলা হয়েছিল আপনারা বিভক্ত। এক হয়ে আসুন। এখন বলতে চাই আমরা কোনো দলের লেজুরবৃত্তি করব না। এ জন্য আমরা একীভূত হয়েছি।”
সংবাদ সম্মেলন থেকে জানানো হয়, হাজারী গলির ঘটনার পর ১৫ দিন কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছিল। ২২ নভেম্বর পূর্ব ঘোষিত রংপুরের বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া চরমোনাই মাহফিলের কারণে বরিশালের বিভাগীয় সমাবেশ ২৯ নভেম্বর থেকে পিছিয়ে ২০ ডিসেম্বর নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া খুলনার বিভাগীয় সমাবেশ ৬ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ১৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে চিন্ময় কৃষ্ণ ব্রহ্মচারী বলেন, ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসিজদ ভাঙার দিন। আমরা এটা সমর্থন করি না। তাই সেটা ১৩ ডিসেম্বর হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন লীলারাজ গৌর দাশ ব্রহ্মচারী, অজপানন্দ ব্রহ্মচারী, স্বামী পরিতোষানন্দ গিরিসহ সাধু সন্তু ও সংগঠকরা।